kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ফুটবল-ক্রিকেট কোথাও নেই সিলেট

সামীউর রহমান, সিলেট থেকে ফিরে

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ফুটবল-ক্রিকেট কোথাও নেই সিলেট

খেলোয়াড় আছে, অবকাঠামোও আছে। সোনালি অতীত? সেও আছে।

নেই শুধু বর্তমান। তাই একসময় জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পেলেও এখন আর ফুটবল, ক্রিকেট কোথাও নেই সিলেট।

প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল বলে আর্থিক সামর্থ্য হয়তো সিলেটবাসীর খানিকটা বেশিই। শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘুরে যত বিপণি বিতান, সেখানে থরেবিথরে সাজিয়ে রাখা ভিনদেশি প্রসাধন আর খাদ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে যত ফাস্টফুড ও রেস্তোরাঁ চোখে পড়ে, তাতে বোঝা যায় টাকা উড়ছে সিলেটে। রাস্তায় হালফ্যাশনের মোটরবাইকে সশব্দে চড়ে চলে যাওয়া তারুণ্যের হাতে সাম্প্রতিকতম মুঠোফোনেও তারই ইঙ্গিত। যে দৃশ্য বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে সহজলভ্য নয়। খুলনা শহরে সারা দিনে রাস্তা দিয়ে কয়টি গাড়ি চলে সেটা হাতে গোনা যায়। সন্ধ্য্যা নামলেই যেন ঘুমিয়ে পড়ে শিববাড়ী মোড়। অথচ মধ্যরাতের জিন্দাবাজার আলো ঝলমলে। তাই ফ্যাশন আর চাকচিক্যে খুলনাবাসীকে টেক্কা দিলেও সিলেটের লোকদের একটা জায়গায় এসে চুপ করে যেতেই হবে। সেটা হচ্ছে ক্রিকেট, দেশের প্রাণের প্রতিধ্বনি। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দূরের যশোরে, মানসম্মত হোটেলেরও ঘাটতি আছে। এমনকি স্টেডিয়ামের চেহারাটাও খুব মনকাড়া নয়। তবুও ফি বছরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ হচ্ছে খুলনায়। এ বছরের গোড়াতে তো জিম্বাবুয়ের সঙ্গে টানা চারটি টি-টোয়েন্টি হয়ে গেল রূপসা পাড়ের শহরে। টেস্ট ম্যাচও হচ্ছে বেশ কয় বছর ধরে। সঙ্গে বিপিএলের ম্যাচ তো আছেই। বাড়তি পাওনা বিপিএলে খুলনার দল। এ বছর যারা আত্মপ্রকাশ করেছে খুলনা টাইটানস নামে, আগের ফ্র্যাঞ্চাইজির নাম ছিল খুলনা রয়্যালস। অথচ প্রাচুর্যের শহর সিলেটে এখনো পা পড়েনি বাংলাদেশ জাতীয় দলের। এমন নয় যে খেলার অবকাঠামো নেই। বিশ্ব টি-টোয়েন্টির সময় গড়া নয়নাভিরাম স্টেডিয়াম আছে, আছে বিমানবন্দর, তারকামানসম্পন্ন হোটেলসহ সব কিছুই। তবুও শুধুই অপেক্ষা!

প্রাচুর্য্যে হয়তো সব কিছু কেনা যায় না। জাতীয় দলের ম্যাচ আয়োজনে অবকাঠামোর সঙ্গে খানিকটা কূটনীতি ও সাংগঠনিক তত্পরতাও দরকার। সেসবের অভাব থাকতেই পারে, তবে টাকায় তো বিপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি কেনা যায়। সেটাও তো কখনো সিলেটের কোনো বিত্তবান ক্রীড়াপ্রেমীর হাতে গেল না! বিপিএলের প্রথম আসরে সিলেট রয়্যালস ছিল বিস্তর আর্থিক কেলেঙ্কারি ও অনিয়মের অন্য নাম। সংবাদ সম্মেলন মঞ্চে দল মালিকদের বসার জায়গায় চেয়ারের কমতি না থাকলেও হোটেলের বিল ও খেলোয়াড়দের পাওনা মেটানোর সময় মালিকদের খুঁজে পাওয়া যেত না। তার ওপর ফ্র্যাঞ্চাইজির টাইটেল স্পনসর গিয়েছিল এক বিতর্কিত এমএলএম কম্পানি গ্লোবাল নিউওয়ের হাতে, যারা পরে আবার নিজেদের মালিকও দাবি করছিল! এমন নড়বড়ে ম্যানেজমেন্টের দল মাঠেই বা ভালো করে কী করে? ১০ ম্যাচে মাত্র দুই জয়ে পয়েন্ট টেবিলের তলানিতে থাকা সিলেট রয়্যালসের সঙ্গে সিলেটের নাম জুড়ে থাকায় সিলেটবাসীর সম্মানহানি হচ্ছে, এ নিয়ে সিলেটে হয়েছিল মানববন্ধনও।

বিপিএলের সবশেষ আসরে কুমিল্লার অন্তর্ভুক্তি ও বরিশাল ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা বদলে যাওয়াতে আলিফ গ্রুপ খানিকটা অনীহা নিয়েই সিলেটের ফ্র্যাঞ্চাইজি নেয়। নতুন নাম সিলেট সুপারস্টারস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও মাঠের ভাগ্য বদলায়নি, তলানিতে থেকে শেষ চারে উঠতে ব্যর্থ। এবার তো শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে আসন্ন বিপিএলে কোনো দলই নেই সিলেটের। সিলেটের ধনকুবেরদের বিলেতে রাজকীয় বিয়ে কিংবা দেশে আলীশান বাড়ি বানানোর খবর পত্রিকায় চোখে পড়লেও ক্রীড়াঙ্গনে বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিচিতি বাড়ানোর এই সুযোগ নিতে এত অনাগ্রহের কারণ জানতে চাইলে স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকের উত্তর, ‘কী আর বলব! কোটি কোটি টাকা দিয়ে বাড়ি বানাচ্ছেন আর স্থানীয় লিগে মাত্র তিন লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটাও বকেয়া। ’ এখন পেশায় ব্যবসায়ী হলেও মাহিউদ্দিন সেলিম একসময় পরিচিত ছিলেন সিলেটের কৃতী ক্রীড়াবিদ হিসেবে। সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও সিলেট জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্টের গুরুদায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধেই। সিলেটে জাতীয় দলের খেলা দেখতে উপচে পড়া দর্শকের পর প্রিমিয়ার লিগের খেলায় দর্শক খরা নিয়ে কথা প্রসঙ্গে উঠে আসে সিলেটের পৃষ্ঠপোষকদের কথা। নিজের শহর নিয়ে অপ্রিয় কথাটা বলেই ফেলেন তিনি, ‘আসলে খেলার মাধ্যমে যে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি বাড়ানো যায়, এই ব্যপারটাই বোধ হয় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নেই। ’ তিনি উদাহরণ টানলেন সাইফ গ্লোবাল স্পোর্টসের। চট্টগ্রাম আবাহনীর পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানটি ক্রীড়াঙ্গনের মাধ্যমেই পরিচিতি বাড়িয়েছে। এ ছাড়া শুধু ব্যবসায়িক লাভক্ষতিই তো নয়, নিজের জেলার সুনাম বাড়ানোর জন্যও তো জাতীয় ক্রীড়া আয়োজনগুলো একটা বড় সুযোগ। কিন্তু সিলেটবাসী সেই সুযোগ নিচ্ছে কোথায়?

খুব দূরের কথা নয়, এই সহস্রাব্দের শুরুর দিকেও নিটল-টাটা জাতীয় লিগে সিলেট চতুরঙ্গ ছিল দেশের ফুটবল মানচিত্রে শক্ত প্রতিপক্ষ। ২০০৪ সালে সেমিফাইনালে ঢাকা আবাহনীর কাছে হেরে বিদায় নেওয়া সেই ক্লাবের এখন সেই সুখস্মৃতিই সম্বল। খেলোয়াড়রা কেউ পাড়ি জমিয়েছেন বিলেতে, কেউ পরপারে। যাঁরা আছেন, তাঁদের আর ফুটবলার পরিচয় নিয়ে এগিয়ে যাওয়া হয়নি।

রণজিত দাস, কার্জন, রেহানদের স্মৃতিমাখা সিলেট থেকে এই প্রজন্মেও পেশাদার লিগে খেলছেন বেশ কয়েকজন। তকলিস, ওয়াহেদ, ইয়ামিন মুন্না, সাদ, বিপলু, জনিসহ অনেকই খেলছেন চট্টগ্রাম আবাহনী, মোহামেডানের মতো ক্লাবে। জাতীয় দলে খেলা ফরোয়ার্ড তকলিস আক্ষেপ করেই বললেন, ‘সিলেটে নামিদামি লোক আছেন, অর্থমন্ত্রী সিলেটের. তাঁরা যদি চেষ্টা করেন তাহলে ফেনী সকার, চট্টগ্রাম আবাহনীর মতো সিলেটেরও একটা দল হবে। ’

ক্রীড়াঙ্গনের উন্নতির জন্য সবাই বলেন বিকেন্দ্রীকরণের কথা। খেলাটাকে ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা। তাই সিলেটের ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে উঠে আসা কোনো ক্রিকেটার যদি সাকিব আল হাসানের মতো বিশ্বসেরা হতে পারেন বা সিলেটের ক্লাব যদি হতে পারে বাংলাদেশের সেরা, তাহলে গর্বটা সিলেটবাসীরই হবে। তবে এই গর্বের অংশীদার হতে গেলে পৃষ্ঠপোষকতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা দরকার, যে দুটির অভাব আছে বলেই ক্রীড়াঙ্গনে পিছিয়ে আছে সিলেট।


মন্তব্য