kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ইংলিশ চ্যালেঞ্জ

নোমান মোহাম্মদ

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০




ইংলিশ চ্যালেঞ্জ

অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হলেই কার্ডিফ থেকে অনুপ্রেরণা নেয় বাংলাদেশ। ফিরে ফিরে ২০০৫ সালের সেই হিরণ্ময় মুহূর্ত।

দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে দ্বৈরথে ইতিহাসের উজ্জীবনী সুধা হয়ে ছিল গায়ানা। ২০০৭ বিশ্বকাপের সেই অমরকাব্য ফিরে এসে বিশ্বাস জোগাত বাংলাদেশকে। এই তো গত বছর সিরিজের আগ পর্যন্তও। সেখানে অবশ্য শেষ দুই ম্যাচ জিতে সিরিজ জয়ের পর যোগ হয় প্রেরণার নতুন উপাদান।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আজ থেকে শুরু হওয়া সিরিজের জন্য ইতিহাসের অমন একক অনুপ্রেরণা নেই। ফিরে আসছে ২০১০ সালের ব্রিস্টল। ২০১১-র চট্টগ্রাম। ২০১৫-র অ্যাডিলেড। ইংল্যান্ডে গিয়ে ইংল্যান্ডকে হারানোর রেকর্ড রয়েছে। নিজ দেশেও গুঁড়িয়ে দেওয়া গেছে ইংরেজদের জাত্যভিমান। আবার নিরপেক্ষ ভেন্যুতেও তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশের সামনে। বিশ্বাসের জ্বালানি তাই একক উৎস থেকে নয়। দাবানল হয়ে তা বাংলাদেশকে তাতিয়ে দেওয়ার কথা।

তাতে এই সিরিজেও জ্বলে-পুড়ে খাক হবে ইংল্যান্ড, বাংলাদেশের ক্রিকেটবীরদের কাছে এই প্রত্যাশায় বাড়াবাড়ি নেই একটুও।

সিরিজটি নিয়ে জলঘোলা কম হয়নি। নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে ইংল্যান্ডের বাংলাদেশ সফর ঢেকে ছিল গভীর অনিশ্চয়তার মেঘে। মেঘ সরিয়ে সূর্যের হাসির দেখা মিললেও অন্তত দুজন ক্রিকেটার এ কারণে সফরে আসেননি। বাংলাদেশের ক্রিকেটকর্তাদের জন্য তাই এই সিরিজ নির্বিঘ্নে আয়োজনের চ্যালেঞ্জ সবচেয়ে বেশি।

আর ক্রিকেটারদের সামনে চ্যালেঞ্জ ব্রিস্টল, চট্টগ্রাম, অ্যাডিলেডকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা। গত বছর দুয়েকের যে অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা, তা অব্যাহত রাখা। উন্নতির সোপানের আরো কিছু ধাপ টপকে পরাশক্তি হওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়া। মাশরাফি বিন মর্তুজার দলের জন্য এই চ্যালেঞ্জ বড় কম নয়।

সে চ্যালেঞ্জ জয়ের জন্য প্রস্তুতি পর্ব ছিল আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ। নিরাপত্তাহীনতার কারণে ইংল্যান্ডের সফর যখন অনিশ্চিত, তখনই তড়িঘড়ি করে আয়োজন করা হয় তা। বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য যা ভীষণ কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত। গেল মার্চে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। পরের ছয় মাসে ঘরোয়া ক্রিকেট, অনুশীলন ক্যাম্প নিয়ে বেশ ব্যস্ত ক্রিকেটাররা। কিন্তু দেশের জার্সি গায়ে পূর্ণ গ্যালারির সামনে আর নামা হয়নি। আর বিবেচ্য যদি হয় ওয়ানডে, তাহলে বিরতি সাড়ে ১০ মাসের। গেল নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের পর থেকে ৫০ ওভারের ফরম্যাট খেলা হয়নি মাশরাফির দলের।

দীর্ঘ বিরতি শেষে ওয়ানডে ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার প্রতিপক্ষ হিসেবে ইংল্যান্ডের চেয়ে আফগানিস্তান তুলনামূলক সহজ, তা অস্বীকারের উপায় নেই।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যাট-বলের সড়গড় হতে সময় লাগে কিছুটা। আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ হয়ে আছে এর প্রমাণ। সামর্থ্যে যোজন যোজন এগিয়ে বাংলাদেশ। কিন্তু প্রথম দুই ওয়ানডেতে দুই দলের পার্থক্য বোঝা যায়নি তেমন। প্রথম ম্যাচে তবু কোণঠাসা অবস্থা থেকেও জেতে বাংলাদেশ। যা বড় দল হয়ে ওঠার ইঙ্গিত বলে দাবি করেছিলেন মাহমুদ উল্লাহ। কিন্তু তাঁর সেই কথা বুমেরাং হয়ে ফেরত আসে পরের ম্যাচে। এবার যে আর পার পায়নি! ভীষণ বাজে ক্রিকেট খেলে আফগানিস্তানের কাছে হার মানতে হয় মাশরাফির দলকে।

সিরিজের তৃতীয় ম্যাচের আগে তাই বড্ড চাপে ছিল বাংলাদেশ। ইংল্যান্ড সিরিজ তখন আর ভাবনার চৌহদ্দিতে নেই। আগে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সম্মান বাঁচানোর প্রশ্ন। সেই কোণঠাসা অবস্থা থেকে কী দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন হয় স্বাগতিকদের। সিরিজে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে ‘বাংলাদেশ’-এর প্রতিচ্ছবি। তাতে আফগানিস্তানে বানিয়ে দেয় সত্যিকার ‘আফগানিস্তান’। ১৪১ রানের জয়-পরাজয়ের ব্যবধানেই তা স্পষ্ট।

আফগানদের বিপক্ষে না হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিরতির অজুহাত ছিল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তা থাকছে না। বরং প্রত্যাশার তার বাধা সেই উঁচুগ্রামেই। গত বছরই তো বিশ্বকাপের সেই অবিস্মরণীয় ম্যাচে ইংরেজদের বিপক্ষে জয়নিশান ওড়ায় বাংলাদেশ। এরপর পাকিস্তান-ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টানা তিন সিরিজ জয়। ইংল্যান্ডকে সামনে পেয়ে আরেক পরাশক্তি-বধের প্রত্যাশা তাই করবে না কেন মাশরাফির দল!

এই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বশেষ দুটি ম্যাচ সর্বশেষ দুই বিশ্বকাপে। ২০১১ সালে চট্টগ্রামে এবং ২০১৫ সালে অ্যাডিলেডে। এর আগে-পরে আর কখনো মুখোমুখি হয়নি দল দুটি। আইসিসির ফিউচার ট্যুর প্রোগ্রামের দোহাই দেওয়া যায় কিংবা সময়স্বল্পতা। তবে ইংল্যান্ড যে বাংলাদেশের সঙ্গে খেলতে আগ্রহী না—এই সত্য তাতে আড়াল হয় না। সর্বশেষ সাড়ে পাঁচ বছরে বিশ্বকাপে দেখা হয়েছে বলেই যেন খেলতে নেমেছে। এক গ্রুপে না থাকলে এই দীর্ঘ সময় ক্রিকেটের মঞ্চে হতো না এই দ্বৈরথ।

সর্বশেষ দুই মুখোমুখিতে জিতে ইংল্যান্ডকে ঠিকই জবাব দেয় বাংলাদেশ। এবার পূর্ণ সিরিজ খেলতে আসা ইংরেজদের সামনে আরেকবার নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়ার উপলক্ষ। আর তা ওয়ানডে দিয়ে হচ্ছে বলে সম্ভাবনার পালে জোর হাওয়া। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটের মধ্যে ওয়ানডেতেই সবচেয়ে শক্তিশালী বাংলাদেশ। আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে দীর্ঘ বিরতির অনভ্যস্ততা কেটেছে। আর ইংল্যান্ড সাম্প্রতিক সময়ে যত দুর্দান্ত ফর্মেই থাকুক না কেন, উপমহাদেশের কন্ডিশনে তাদের সামর্থ্য বরাবর প্রশ্নবিদ্ধ। তার ওপর নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে অধিনায়ক এউইন মরগান ও ওপেনার অ্যালেক্স হেলস আসেনি। বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে জো রুটকে।

সব মিলিয়ে টানা ছয় ওয়ানডে সিরিজ জেতা বাংলাদেশকে ঘিরে প্রত্যাশার পারদ অনেক উঁচুতে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই সাফল্যের সপ্তম স্বর্গে ওঠার সম্ভাবনা হাতছানি দিচ্ছে মাশরাফির দলকে। সেখানে জয়নিশান ওড়াতে পারবেন না বাংলার ক্রিকেটবীররা?


মন্তব্য