kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


একটি ক্রীড়ামুখী জাতি

ইকরামউজ্জমান

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



একটি ক্রীড়ামুখী জাতি

এআইপিএস এশিয়ার সম্মাননা হাতে ইকরামউজ্জমান।

মধ্য এশিয়ার দেশ তুর্কমেনিস্তান। রাজধানী কাশগাবাত।

দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করেছে ১৯৯১ সালের ২৭ অক্টোবর। জনসংখ্যা ৫০ লাখের কিছু বেশি। আগামী ২৭ অক্টোবর দেশের মানুষ স্বাধীনতার ২৫ বছর উদ্যাপন করবে। তুর্কমেনিস্তানে গিয়েছিলাম প্রথমবারের মতো এআইপিএস এশিয়া কর্তৃক প্রদত্ত ‘এশিয়া অ্যাওয়ার্ড’ অনুষ্ঠান থেকে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি (বিএসপিএ) কর্তৃক মনোনীত হয়ে ব্যক্তিগত ‘এশিয়া অ্যাওয়ার্ড’ গ্রহণের জন্য। এটা আমাদের দেশের ক্রীড়াঙ্গন, বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি ও ব্যক্তিগতভাবে আমার নিজের জন্য মাইলফলক ও স্মরণীয়।

তিন দিনব্যাপী (২০ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর) পুরো অনুষ্ঠানটির পৃষ্ঠপোষক তুর্কমেনিস্তান মিডিয়া ফোরাম। মিডিয়া ফোরাম এআইপিএস এশিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে এশিয়ার ক্রীড়া সাংবাদিক ও লেখকদের অবদানের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে, তুর্কমেনিস্তান এবারই প্রথম (সেন্ট্রাল এশিয়াতেও প্রথম) পঞ্চম এশিয়ান ইনডোর গেমস ও মার্শাল আর্ট গেমস (২০ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭) আয়োজনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মাধ্যমকে অবগত করা ও তাদের খোলাখুলি মতামত গ্রহণের আয়োজন করেছে। এর মধ্যেই নতুন স্পোর্টস কমপ্লেক্স, ভিলেজ ও ৩০টি আধুনিক স্পোর্টস স্থানান্তরের কাজ ৭৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ইনডোর এশিয়ান গেমসের ‘কাউন্ট ডাউন্ট’ শুরু হয়েছে ‘মার্বেল সিটি’ আমগাবাতে। আয়োজকদের বক্তব্য, ইনডোর এশিয়ান গেমসে ২১টি খেলায় এশিয়া ও ওশনিয়া থেকে ৬২টি দেশ অংশগ্রহণ করবে।

তুর্কমেনিস্তানে পৌঁছানোর আগে কোনো ধারণাই ছিল না চমৎকার এই দেশটির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, নিজস্ব ক্রীড়ার ঐতিহ্য আর লালনপালন সম্পর্কে ক্রীড়াচর্চার প্রতি আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার আকর্ষণ ও ভালোবাসা। দেশের কিশোর তরুণ ও যুব সমাজ ক্রীড়াচর্চাকে জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলতে আগ্রহী। ক্রীড়াচর্চায় আছে শত ভাগ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। অবাক হয়েছি দেশের প্রেসিডেন্ট গুলবাঙ্গুলি বারদিমোমেদিউ ক্রীড়াপ্রীতি, ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর দৃঢ় প্রতিশ্রুতির কথা জেনে এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধমে। সরকারপ্রধানের লক্ষ্য হলো ক্রীড়াচর্চার মাধ্যমে সুস্থ ও সবল জাতি গঠন। তুর্কমেনিস্তানকে এশিয়ার একটি ক্রীড়াপিপাসু দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা।

এশিয়ান অ্যাওয়ার্ডের জমকালো অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক শুরুর আগে ২০ সেপ্টেম্বর ভোর ৬টায় দেশের প্রেসিডেন্ট হাজার হাজার দেশবাসী, বিদেশ থেকে আগত বিভিন্ন খেলার আন্তর্জাতিক কর্মকর্তা, বিশেষ অতিথি ও ২৯টি দেশের ৮২ জন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে ২৩ জন পুরুষ ও মহিলা খেলোয়াড়কে আন্তর্জাতিক গেমসে পদক জয়ের জন্য পুরস্কৃত করেন প্রকাশ্যে বড় রাস্তায় একসঙ্গে দাঁড়িয়ে। যেটা আমাকে টেনেছে তা হলো এত ভোরে ট্রাকসুট আর ট্রেনার সু পরা সদা হাস্যময় প্রেসিডেন্ট। অনুষ্ঠানস্থলের অনেক আগ থেকেই জিপ থেকে নেমে একাই হেঁটে আসেন তাঁর জন্য নির্মিত সাধারণ প্যান্ডালে। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিযুক্ত অফিসাররা তাঁকে শুধু দূর থেকে লক্ষ করে চলেছেন। মঞ্চে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কোনো ভিড় নেই। সবাই রাস্তার অপর প্রান্তে। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের পর পুরস্কার বিতরণী। সেখানেও তিনি একা। এরপর ‘বাইসাইকেলে’ চড়ে তিনি সবার আগে। আমরা বিদেশি গণমাধ্যমের স্পোর্টস প্রতিনিধিরা তাঁর সঙ্গে চলেছি। তিনি সাইকেল চালাচ্ছেন আর হাত নাড়ছেন। মনে হয়েছে, এটা এশিয়ার অনেক দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য শিক্ষণীয় হওয়া উচিত।

শোভাযাত্রার পর কিছুক্ষণ বিরতি তারপর অলিম্পিক ভিলেজে এআইপিএস এশিয়ার ওয়ার্কিং সেশন। সেখানে একে একে প্রতিটি দেশের প্রেজেনটেশন, ভিডিও শো ওং বিভিন্ন বিষয়ের ওপর খোলাখুলি আলোচনা। পাশাপাশি চলেছে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে ইন্টারভিউ দেওয়া। এ ক্ষেত্রে তিন দিনে ১১ বার ইন্টারভিউ দিতে হয়েছে। কখনো এই ইন্টারভিউ ইংরেজি, তুর্কি ও রাশিয়ান ভাষায় প্রচারিত হয়েছে। যেটা লক্ষ করেছি তা হলো, তুর্কমেনিস্তানের মিডিয়া তাদের এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে চায়।

পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সরকার বরাদ্দ করেছে অলিম্পিক ভিলেজ, অলিম্পিক কমপ্লেক্সসহ ৩০টি বিভিন্ন নতুন আধুনিক ক্রীড়া স্থাপনা নির্মাণে। ক্রীড়া স্থাপনা নির্মাণের কাজ প্রায় ৭৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ আগামী বছরের মার্চ মাসের ৩১ তারিখের মধ্যে শেষ হবে। স্থাপনাগুলো অত্যাধুনিক। অলিম্পিক মানের। প্রতিটি খেলার স্থাপনায় আছে সব ধরনের সুযোগসুবিধা। চেষ্টা চলছে সর্বক্ষেত্রে একটি অত্যাধুনিক ক্রীড়াবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য। পাশাপাশি চলছে প্রতিটি খেলায় তুর্কমেনিস্তানের পুরুষ ও মহিলা ক্রীড়াবিদদের আবাসিক প্রশিক্ষণ। বিদেশি কোচ, দেশি কোচ, ডাক্তার, ফিজিও, মনোবিদ, ট্রেনার—সবাই আছেন প্রতিটি খেলার জন্য আলাদা আলাদা। সবাই নিজেদের খেলার স্থানে আবাসিক সুবিধা পাবেন। পরিদর্শনের সময় জানানো হয়েছে, বিশাল কমপ্লেক্স নির্মাণ ও গেমসের আয়োজনের জন্য প্রয়োজনে সরকার আরো অর্থ বরাদ্দ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যেটা লক্ষ করেছি তা হলো, এ ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা। ইনডোর গেমসের পর এই বিশাল স্পোর্টস কমপ্লেক্স ও স্থাপনাগুলো কিভাবে কাজে লাগানো হবে সেটাও এর মধ্যেই ভাবা হয়ে গেছে।

১৭৫ হেক্টর জমিতে নির্মিত হবে পুরো স্পোর্টস কমপ্লেক্স। স্থাপন করা হচ্ছে মনোরেল রোড। যা প্রতিটি স্থাপনাকে ঘিরে থাকবে। নতুন অলিম্পিক স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণ ৪৫ হাজার, ইনডোর ট্রাক থেকে শুরু করে সুইমিং পুল ও অন্যান্য খেলার স্থাপনা ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার দর্শক ধারণ করতে পারবে।

আয়োজকরা মনে করছেন, তাঁরা গেমস চলাকালীন স্থানীয় দর্শকের পাশাপাশি প্রচুর বিদেশি দর্শকও প্রতিটি খেলার ভেন্যুতে পাবেন। যা তাঁদের পর্যটন শিল্পে সহায়ক করবে।

২২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে গোল্ড মেডেল ও সার্টিফিকেট প্রদান করেন ডেপুটি চেয়ারম্যান স্পারদুরদি তেলবিইউ। মঞ্চে তাঁর সঙ্গে ছিলেন এআইপিএস এশিয়ার প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ কাসেম। পুরো অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন এআইপিএস এশিয়ার সেক্রেটারি জেনারেল মালিক মোহাম্মদ আজিজ।

২০০২ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত আমি নিজে দুই টার্ম এশিয়া এআইপিএস গভর্নিং বডিতে সংযুক্ত ছিলাম কার্যনির্বাহী সদস্য ও ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে। অনেক বন্ধুকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে থেকে কাজ করাটা উপভোগ করেছি। এবার ব্যক্তিগত কারণে কেউ কেউ ছিলেন অনুপস্থিত। তাঁদের সান্নিধ্য মিস করেছি।

আমার ব্যক্তিগত অবলোকন হলো, মোহাম্মদ কাসেমের নেতৃত্বে এআইপিএস এশিয়া নতুন উৎসাহে অনুপ্রাণিত হয়েছে। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে নতুন কমিটি ক্রীড়া সাংবাদিক ও লেখকদের জন্য যে ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত করেছে তা ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। ভাবতে ভালো লাগছে এআইপিএস এশিয়ার নতুন অধ্যায়ের শুরুর মিছিলে যোগ দিতে পেরেছি।

 


মন্তব্য