kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রাসাদ থেকে রাস্তায়!

রাহেনুর ইসলাম   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



প্রাসাদ থেকে রাস্তায়!

১৯৮৬ বিশ্বকাপ। কোয়ার্টার ফাইনালে ‘ঈশ্বরের হাত’ দিয়ে গোল করলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা।

রেফারি গোলের বাঁশি বাজাতেই তাঁর দিকে তেড়ে গিয়েছিলেন ইংলিশ ডিফেন্ডার ক্যানি স্যানসম। হাত দিয়ে করা গোল মানবেন কিভাবে? সেই ম্যাচেই ৬ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে সর্বকালের অন্যতম সেরা গোল করেছিলেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। সেই ছয় ডিফেন্ডারের একজনও স্যানসম। সেবার আটকাতে না পারলেও ম্যাচটিতে বেশ কয়েকবার ম্যারাডোনার কাছ থেকে বল কেড়েছিলেন তিনি। সেই ম্যাচের স্মৃতিতে একবার বলেছিলেন, ‘সত্যিকারের এক জাদুকর ম্যারাডোনা। ফুটবল মাঠে এক ধাঁধার নাম। ’

এখন নিজেই বিশাল ধাঁধা হয়ে পড়েছেন ইংল্যান্ডের হয়ে ৮৬ ম্যাচ খেলা এই ডিফেন্ডার। খেলোয়াড়ি জীবনে এক মিলিয়ন পাউন্ডের ম্যানসনে থাকা স্যামসম এখন কপর্দকহীন। গত সপ্তাহে ব্রিটিশ একটি দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ‘গত ১০ দিন ধরে গৃহহীন আমি। রাত কাটছে পার্কের বেঞ্চে। ’ হঠাৎ কী এমন ঘটে গেল যে প্রাসাদ থেকে রাস্তায় নেমে আসলেন স্যানসম? আসলে অ্যালকোহল আর জুয়ার ফাঁদে পড়েই এমন দৈনদশা তাঁর। ১৯৮৮ সালে জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকে শুরু। অতিরিক্ত অ্যালকোহল আসক্তি কমাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন স্ত্রী এলাইনা। পাঁচ-পাঁচবার ভর্তি করেছিলেন পুনর্বাসনকেন্দ্রে। কাজ হয়নি কোনোভাবে। তাই স্যানসমকে ছেড়ে যান তিনি। জুয়ায় হেরে আর মদের নেশায় বিক্রি করতে হয়েছে ১ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রাসাদ। এমনকি বিয়ের আংটিটা পর্যন্ত! ৯০০ ডলারের সেই আংটি ছেড়ে দিয়েছেন মাত্র ৬০ পাউন্ডে। ইংল্যান্ড আর আর্সেনালসহ অন্য ক্লাবে খেলা সব স্মারক আর জার্সিও বিক্রি করেছেন পানির দরে। এরপর মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় বোন মেরির বাড়িতে। বেরিয়ে যান সেখান থেকেও। এখন অবস্থা এমন যে পার্ৎকের বেঞ্চে থাকুন বা অন্য কোনোখানে, হাতে মদের বোতল থাকা চাই একটা! সেই টাকাই বা পাচ্ছেন কোথা থেকে? সেটা আসছে মাসিক এক হাজার ২০০ পাউন্ডের পেনশন থেকে। এর অর্ধেক অবশ্য আইনগত কারণে দিতে হয় তাঁকে ছেড়ে যাওয়া স্ত্রী এলাইনাকে। বাকি টাকার পুরোটাই যায় মদের পেছনে। স্যামসনের সব হারানোর কথা অকপটে স্বীকার করলেন বোন মেরি, ‘ও একেবারে কপর্দকহীন। জমানো কিছুই নেই। বিয়ের আংটিটা পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছে। ’

পুরনো ক্লাব আর্সেনাল নানাভাবে সাহায্য করেছে স্যানসমকে। কিন্তু জুয়া আর অ্যালকোহলের আসক্তি কাটাতে না পারাতেই সব হারিয়েছেন তিনি। প্রাসাদ থেকে রাস্তায় নামার পরও অ্যালকোহল ছাড়তে পারছেন না কেন? তাঁর সোজা জবাব, ‘এটা আর সম্ভব নয়। চেষ্টা করেছি মদ ছেড়ে দেওয়ার; কিন্তু মদই ছাড়ে না যে! আর্সেনাল অনেক চেষ্টা করেছে। দুর্ভাগ্য আমিই শুধরাতে পারিনি নিজেকে। ’ মদের বোতল নিয়ে নেশায় চুর হয়ে যে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরেন, পুলিশ ধরে জেলে নেয় না? এমন প্রশ্নের জবাবে উদাসী স্যানসম, ‘ওরা গ্রেপ্তার করে না আমাকে। শুধু জানতে চায় কোথায় যাব? আমি কিছু বলি না। এরপর বিরক্ত হয়ে ছেড়ে দেয় কোনো এক পার্কে। ’

অথচ ক্যারিয়ারটা কত আলো ঝলমলে ছিল ৫৭ বছর বয়সী স্যানসমের। ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেছেন ৮৬ ম্যাচ, যা থ্রি লায়নসদের পক্ষে ১২তম সর্বোচ্চ। ডিফেন্ডারদের মধ্যে তাঁর ৮৬তম ম্যাচ খেলার কীর্তিটা ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় সেরা। ১৯৮৭ সালে অধিনায়ক হিসেবে আর্সেনালকে জিতিয়েছেন লিগ কাপের শিরোপা। ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটিতে সেই ১৯৮০ সালে ক্রিস্টাল প্যালেস থেকে যোগ দিয়েছিলেন এক মিলিয়ন পাউন্ডে। সঙ্গে দিতে হয় স্ট্রাইকার ক্লাইভ অ্যালেনকেও। ১৯৮৮ পর্যন্ত গানারদের হয়ে খেলেছেন ৩৯৪ ম্যাচ। ১৯৮৭ সালে জেতা লিগ কাপের অধিনায়কও ছিলেন স্যানসম। ওয়েম্বলিতে ২-১ গোলে জেতা ম্যাচটিতে আর্সেনালের দ্বিতীয় গোলের মুভের শুরুটা স্যামসনের পা থেকেই। ১৯৮৮ সালে আর্সেনাল ছাড়ার পরও খেলেছেন নিউক্যাসল, কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্স, কভেন্ট্রি সিটি, এভারটনের মতো ক্লাবে। সেই স্যানসমের এমন দুরবস্থা সত্যিই ট্র্যাজেডির।


মন্তব্য