kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আমার নিজের কাছেই প্রত্যাশা বেশি

তিনে তিন

► টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি—তিন ফরম্যাটের র‌্যাংকিংয়েই একনম্বর অলরাউন্ডার হয়েছিলেন গত বছর জানুয়ারিতে। এই কীর্তি গড়তে পারেননি আর কেউই।
►একমাত্র বোলার হিসেবে কোনো দেশের তিন ফরম্যাটেরই সর্বোচ্চ উইকেট সাকিবের।

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



  আমার নিজের কাছেই প্রত্যাশা বেশি

ছবি : মীর ফরিদ

প্রশ্ন : ১০ বছর পার করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একাদশ বছরে পা রাখলেন। তো, আপনার শৈশবে ফিরতে চাচ্ছি না।

জানতে চাচ্ছি, এই কটা বছরে যা করেছেন কিংবা পেয়েছেন, তাতে কি আপনি খুশি?

সাকিব আল হাসান : হ্যাঁ, আমি হ্যাপি। এই ১০ বছরে যেখানে এসে পৌঁছেছি, ক্যারিয়ার শুরুর সময় এর ধারেকাছেও কিছু ভাবিনি। তবে এই জায়গায় দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালে মনে হয়, আরো কিছু করতে পারলে পুরোপুরি ভালো লাগত। তবে এখনকার কথা বলে তো লাভ নেই, ক্যারিয়ার শুরুর সময়ের কথা ভেবে এখন যেখানে আছি, তাতে আমি খুশি।

প্রশ্ন : ম্যাচের পর তো সবাই হাইলাইটস দেখে। আপনার ক্যারিয়ারের এটুকু সময়ের হাইলাইটস প্যাকেজ যদি করতে বলি...

সাকিব : কিছু তো মনে পড়েই। আমার প্রথম সফর ছিল আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। ভারতে ২০০৬ সালের ওই টুর্নামেন্টে শ্রীলঙ্কার ম্যাচটা। এরপর ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটা। টেস্টে আমার প্রথম সেঞ্চুরি, মুলতানে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচটা, টেস্টে প্রথমবার ৫ উইকেট পাওয়া, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ৯২, পাকিস্তানের সঙ্গে ১৪৪, ভারতের বিপক্ষে হোম সিরিজ তো মনে থাকবেই। তবে খারাপটাও মনে থাকবে। যেমন ২০১১ সালের বিশ্বকাপ। জয়ের সংখ্যা চিন্তা করলে একেবারে খারাপ না। প্রতিটি বিশ্বকাপে তো আমরা তিনটি করেই ম্যাচ জিতেছি। ওই বিশ্বকাপেও তিনটি জয়ের একটা বড় দলের বিপক্ষে ছিল। তবু বলব, ভাগ্য আমাদের পক্ষে ছিল না, তাই বিশ্বকাপটা খারাপই গেছে বলতে হবে।

প্রশ্ন : এত ভালোর মধ্যে তিন ফরম্যাটেই র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকার ব্যাপারটা উল্লেখ করলেন না যে!

সাকিব : র‌্যাংকিং নিয়ে আসলে কখনো সেভাবে চিন্তা করিনি। এটা হয়ে গেছে, আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। তবে হ্যাঁ, নিজে নিজে চিন্তা করলে একটু ভালো তো লাগেই। এক ধরনের অর্জন তো, এখন পর্যন্ত সেখানে কেউ যেতে পারেনি। এটা গর্বের। তবে অতটা না যে বিষয়টা নিয়ে খুব একটা চিন্তা করার দরকার আছে। বরং আমি আশা করি, বাংলাদেশের কেউ কেউ আরো বড় বড় অর্জন নিয়ে আসবে। সেদিন বাংলাদেশের ক্রিকেটও আরো উঁচুতে জায়গা করে নেবে। তাই এখন র‌্যাংকিং নিয়ে খুব বেশি ভাবি না। খেলাটা উপভোগ করি, এটাই বড় কথা।

প্রশ্ন : আপনার ক্যারিয়ারে সে অর্থে দুঃসময় আসেনি। যা এসেছে তা বিতর্ক। শৃঙ্খলাভঙ্গ টাইপের ঝামেলা। শাস্তিও হয়েছে। সেগুলো আপনি কিভাবে দেখেন?

সাকিব : আমার মনে হয়, ওই ঘটনাগুলো আমি খুব পজিটিভভাবে নিতে পেরেছি। এটাকে আমি আমার ক্যারিয়ারের অন্য রকম একটা অ্যাচিভমেন্টই বলব। কারণ এমন কিছু পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, যেখান থেকে অন্য অনেকে হয়তো বের হয়ে আসতে পারত না। হয়তো পারত, তবে আমি যত অল্প সময়ে পেরেছি তেমনটা হতো না। আমার মনে হয়, ওই ঘটনাগুলো থেকে আমি অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। সব কিছু পজিটিভভাবে নিতে শিখেছি। এটা অনেক বড় পাওয়া। আমি যত দিন খেলব কিংবা খেলার পরও এই শিক্ষাটা আমার কাজে লাগবে।

প্রশ্ন : সেসব ঘটনার প্রতিটির পরই আপনি দারুণভাবে প্রত্যাবর্তন করেছেন। পারফরম্যান্সটাকে অন্য লেভেলে নিয়ে গেছেন। এটা কি চাপা ক্ষোভ কিংবা কাউকে দেখিয়ে দেওয়ার তাড়না থেকে?

সাকিব : (হাসি) না, তেমন কিছু না। হতে পারে একটা ব্রেক ছিল। মাইন্ড ফ্রি ছিল বলেই হয়তো (হাসি)। আসলে আমি জানি না, প্রত্যাবর্তন ম্যাচগুলো কেন ভালো খেলেছি। কারণ এমন না যে ফেরার আগে বাড়তি কিছু করতাম। নিষেধাজ্ঞার সময় বিদেশে চলে গিয়ে প্র্যাকটিস করিনি, সবাই যা করেছে আমিও তাই করেছি। হ্যাঁ, খেলা না থাকায় ফিটনেস নিয়ে হয়তো টুকটাক কাজ করেছি। এ তো সবাই-ই করে। তবে আমার মনে হয় ভাগ্য সহায়তা করেছে, অনেকের সমর্থনও আছে, যেটা আমাকে হেল্প করে। যদিও বাইরের কথা আমাকে খুব বেশি প্রভাবিত করে বলে মনে হয় না। তবে যাদের কথার প্রভাব আছে বলে মনে হয়, তাদের সঙ্গে কথা বলি।

প্রশ্ন ঃ সবশেষ আইপিএলে সব ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়নি। কিন্তু এবার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে অন্য সাকিবকেই সবাই দেখেছে। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ঘরোয়া ক্রিকেটে আপনাকে এতটা মন লাগিয়ে খেলতে দেখা যায়নি। এর পেছনে কি আইপিএলের সব ম্যাচ খেলতে না পারার অভিজ্ঞতা প্রভাব ফেলেছে?

সাকিব : কিছুটা। আসলে টানা ম্যাচ খেললে হয় কি, নিজের পারফরম্যান্স পর্যালোচনার জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যায় না। এবার প্রিমিয়ার লিগের আগে আইপিএলে খেলেছি। তো, সেখানে কয়েকটা ম্যাচ ড্রপড ছিলাম। সে সময় ভেবে দেখেছি যে আমার পারফরম্যান্সের গ্রাফটা ঠিক জায়গায় নেই। ছয় মাসে যতটা ওপরে যাওয়ার কথা, সেভাবে যায়নি। তখনই চিন্তা করেছি যে এরপর যখনই সুযোগ পাব পারফরম্যান্স গ্রাফটা ঠিক করব। মনে হয়েছে বয়সটা এখন ৩০ ছুঁই ছুঁই। এ বয়সে ফিটনেস নিয়ে বাড়তি কাজ করা লাগবে। আগে অত ট্রেনিং না করলেও চলত কিন্তু এখন ট্রেনিংটা বেশি বেশি করতে হবে। এর পরপরই দেশে ফিরে এসে প্রিমিয়ার লিগে খেলেছি।

প্রশ্ন : সব ধরনের ক্রিকেটের সূত্রে নানা ধরনের ড্রেসিংরুমে সময় কাটে আপনার। যদি বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমের সঙ্গে তুলনা করতে বলি...

সাকিব : নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের টাই সেরা। এই ড্রেসিংরুমে আমরা এমন কয়েকজন আছি, যারা আন্তর্জাতিক আর ঘরোয়া ক্রিকেট মিলিয়ে একসঙ্গে গত ১৫-১৬ বছর ধরে খেলছি। তাই আমরা আমাদের যতটা ভালো করে চিনি, হয়তো আমাদের মা-বাবারাও আমাদের এতটা ভালো করে চেনেন না। আমরা তো একে অন্যের মনও পড়তে পারি। অন্য ড্রেসিংরুমও খারাপ না, সবাই খুব ফ্রেন্ডলি। আর সব ড্রেসিংরুমে একটা সাধারণ আলোচনা থাকে, সেটা হলো ম্যাচ জেতা। বাংলাদেশ, কলকাতা কিংবা জ্যামাইকা—সব দলের ড্রেসিংরুমের লক্ষ্যটা একই। তাই কোনো অসুবিধা হয় না।

প্রশ্ন : ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং—সব বিভাগেই আপনার কাছে দলের চাওয়া ছিল সব সময়, এখনো পরিস্থিতি পাল্টায়নি। এত দিন পর দল নতুন করে কিছু কী আপনার কাছে চাচ্ছে?

সাকিব : দলে প্রত্যেকের ভূমিকাই বদলাতে থাকে, একেক সময় একেকটা রোল প্লে করতে হয়। আগে যেমন টেস্ট-ওয়ানডেতে পাঁচ কিংবা ছয়ে ব্যাটিং করতাম। কিন্তু ব্যাটিংয়ে যেতে আমার বেশি সময় লাগত না, উইকেট পড়ে যেত দ্রুত। ওয়ানডেতে প্রায় প্রতি ম্যাচেই ৩০-৩৫ ওভার ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেতাম। তাতে একম্যাচ খারাপ করলেও পরের ম্যাচে পুষিয়ে দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যেত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। জানিই না প্রতিদিন ব্যাটিং পাব কি না (হাসি)! হয়তো ৪০-৪৫ ওভার পর ব্যাটিংয়ে নামছি, তখন আমার রোলটা ভিন্ন। কোনো দিন হয়তো ব্যাটিংই পেলাম না। আবার হঠাৎ একদিন সেই আগের মতো ইনিংসের মাঝপথে ব্যাটিংয়ে নামতে হয়। এগুলো কিন্তু অন্য রকম চ্যালেঞ্জ। আমার কাছে এই চ্যালেঞ্জটা মজাই লাগে। তবে আগে কাজটা অনেক সহজ ছিল। কারণ জানতাম যে আগেই ব্যাটিংয়ে নামতে হবে। এখন হয়তো অনেক দিন পর এমন সুযোগ আসবে এবং আপনাকে সফল হতেই হবে। এটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আমি এটা এনজয় করি। আগে আমাকে অ্যাটাকিং বোলিং করতে হতো। এখন কখনো কখনো ডিফেন্সিভ বোলিং চায় দল। কারণ অন্য কেউ হয়তো অ্যাটাকিং বোলারের রোলটা প্লে করছে।

প্রশ্ন : এ পর্যন্ত ক্যারিয়ারের পুরো সময়ই সোনার চামচ মুখে পার করে দিলেন, ঢালাও প্রশংসা পেয়ে আসছেন। কিন্তু এখন মাঝেমধ্যেই টুকটাক শোনা যাচ্ছে যে সাকিবের সেই ধারটা নেই। এমন ফিসফাঁস কি আপনার কাছে সবার প্রত্যাশা বেশি বলেই?

সাকিব : হতে পারে। তবে আমি আমারটা বলতে পারি। আমার নিজেরই আমার নিজের কাছে প্রত্যাশা আরেকটু বেশি। আমার সামর্থ্য আছে আরো ভালো করার। শুরুতেই যেটা বলেছি যে অতীতের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আমার আরো বেশি কিছু করার ছিল। ১৫০টার মতো ওয়ানডেতে সাড়ে চার হাজারের মতো রান করেছি, সেটা আরো বেশি হতে পারত। তবে সেসব ভেবে তো আর লাভ নেই। এখন চিন্তা থাকবে ক্যারিয়ারের বাকি সময়টায় যেন আরো চার-পাঁচ হাজার রান করতে পারি। সেটা অর্জনের জন্য আমাকে এক্সট্রা কিছু করতেই হবে। তাই কার আমার প্রতি কি এক্সপেকটেশন আছে, সেসব ভাবি না। প্রত্যাশার দাবিটা আমার নিজের কাছে নিজের। আমার একটা ব্যাপারেই মজা লাগে, অন্য সবার চেয়ে ভালো পারফরম্যান্স করা।

প্রশ্ন : ক্যারিয়ারে তো অনেক ল্যান্ডমার্কই ছুঁয়েছেন। বাকি অংশে নিজের কাছে নতুন কী প্রত্যাশা?

সাকিব : (হাসি) জানি না। বিশ্বকাপ জেতা হতে পারে। অন্তত ফাইনাল যদি খেলতে পারি, তা হলেও দারুণ ব্যাপার হবে। আমার মনে হয়, ২০১৯ বিশ্বকাপেই আমাদের দারুণ সম্ভাবনা আছে। আমি এখনো বিশ্বাস করি, গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল পর্যন্ত যাওয়ার বড় একটা সুযোগ ছিল। তো, পরের চার বছরে দলের অবস্থা আরো ভালো হবে। তাসকিন আর মুস্তাফিজ তো মাত্রই ক্যারিয়ার শুরু করেছে। পরের চার বছরে ওরা অনেক পরিণত হবে, দলের সবাই আরো অভিজ্ঞ হবে। মাশরাফি ভাই যদি ফিট থাকেন, মাশরাফি ভাইও খেলবেন। সবাই খুব পিক টাইমে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ খেলব। তাই আমাদের উচিত পরের বিশ্বকাপে আরো ভালো করা।

প্রশ্ন : ২০১৯ বিশ্বকাপে কি আসলেই দারুণ কিছু করা সম্ভব?

সাকিব : আসলেই। আমাদের এই দল থেকে পরের বিশ্বকাপের আগে কেউ যদি অবসর নেয়ও, সেটা মাশরাফি ভাই ছাড়া আর কাউকে দেখি না। বাকিদেরও যদি ধরি, তাহলেও ৮-৯ জন থাকবে, যারা ২০০-২৫০ ম্যাচের অভিজ্ঞতা নিয়ে ইংল্যান্ডে যাবে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে অভিজ্ঞ দল হবে হয়তো বাংলাদেশ। তা ছাড়া ইংল্যান্ডের কন্ডিশন কিংবা পেস বোলিং নিয়ে আর চিন্তার কিছু আছে। এখন অন্যরা আমাদের নিয়ে টেনশন করবে! অত দূর কেন, আগামী বছরের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে না যেতে পারাটাও আমাদের জন্য খারাপ ফল হবে।

প্রশ্ন : আপনাকে নিয়ে একটা কথা বাতাসে ভাসছে, আক্রমণাত্মক হলেই নাকি আপনি ভালো ক্রিকেট খেলেন? ‘শান্ত’ সাকিব সে তুলনায় পিছিয়ে থাকে!

সাকিব : আমার কাছে মনে হয় এটা সত্যি। অ্যাগ্রেসিভ থাকলে আমি ভালো খেলি। এখন আমার মধ্যে রাগটা একটু কম। সে কারণেই মনে হয় সেই পারফরম্যান্সটা করতে পারছি না। এটা আমি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। খেয়াল করে দেখেছি, আমি যখন ভালো ক্রিকেট খেলেছি তখন খুব অ্যাগ্রেসিভ ছিলাম, ওলটপালটভাবে রাগারাগি করতাম।

প্রশ্ন : তাহলে কি ক্যারিয়ারের পরের ভাগটায় ‘রাগী’ সাকিব ফিরে আসবে!

সাকিব : জানি না! কিন্তু বিরাট কোহলিকে দেখেন। বাইরে থেকে ওকে দেখে মনে হবে খুব বদমেজাজি। তবে আমি জানি, ও কেমন। আমি নিশ্চিত যে দিন নিজেকে বদলে ফেলবে, সেদিন আর এই পারফরম্যান্স থাকবে না কোহলির। এটা আমি বিশ্বাস করি।

প্রশ্ন : মাঠে আপনাকেও কিন্তু বোঝা যায়। কখনো কখনো মনে হয় যেন অনিচ্ছা থেকে মাঠে নেমেছেন। এটা কি ক্লান্তির কারণে?

সাকিব : (হাসি) এগুলো আসলে মানসিক ব্যাপার। কখনো কখনো হয় কি মাথা হয়তো বলছে আজকে হবে না। সেসব সময় চেষ্টা করেও মাথার চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলা যায় না। ভাগ্য সহায় হলে হয়তো চিন্তাটা সরে যায়। কিন্তু অনেক ম্যাচে হয় না। এর প্রভাব মাঝেমধ্যে এড়ানোও যায় না।

প্রশ্ন : আরো কত দিন খেলবেন, সাত-আট বছর, নাকি আরো বেশি?

সাকিব : ইচ্ছা আছে ২০২৩ বিশ্বকাপ পর্যন্ত খেলা। যদি খেলার সুযোগ হয়, তাহলে লিখে দিতে পারেন ওই আসর থেকেই ক্রিকেটকে বিদায় জানাব। তবে অত দূর যেতে হলে আমার ফিটনেস ও পারফরম্যান্স ধরে রাখতে হবে। ধরে রাখলে হবে না, উন্নতিও করতে হবে।

প্রশ্ন : তার মানে আরো সাত মিলিয়ে ১৭ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে! এত দিন একটা জিনিস উপভোগ করা যায়?

সাকিব : তা না হলে প্রিমিয়ার লিগে এত ভালো খেললাম কী করে! ক্রিকেট আমি এখনো আগের মতোই এনজয় করি। আমার জন্য ক্রিকেটে মজার শেষ নেই।

প্রশ্ন : অধিনায়কত্বের ব্যাপারে খুব কম মানুষই প্রকাশ্যে কিছু বলেন। ভদ্রতা কিংবা বিতর্ক এড়াতেই হয়তো। যদিও দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগটা সবার জন্যই সমান সম্মানের। আপনি কি একটু খোলাখুলি বলবেন অধিনায়কত্ব নিয়ে আপনার নিজের চিন্তাটা?

সাকিব : যদি কখনো অধিনায়কত্বের প্রস্তাব আসে, ঠিক আছে। তবে আমাকে অধিনায়ক হতেই হবে, এমন কোনো চাওয়া আমার নেই। একটা হলো প্রস্তাব এলো আরেকটা হলো আপনি চাইলেন। এখন অধিনায়কত্ব এলেও মনে হয় না খারাপ কিছু হবে। আবার কোনো দিন না এলেও আলাদা কোনো প্রতিক্রিয়া আমার হবে না।

প্রশ্ন : মাঠের অধিনায়ক সাকিবকে নিয়ে কখনো প্রশ্ন ওঠেনি, যতটা কথা হয়েছে মাঠের বাইরের অধিনায়ক সাকিবকে নিয়ে। পরিস্থিতি কি বদলেছে?

সাকিব : দেখুন, অধিনায়ক হওয়ার আগে আমি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটই খেলেছি অল্প দিন। ভালো ফল করার জন্য যে মানের ক্রিকেটার দরকার, সে রকম কেউ ছিলও না। এখনকার সঙ্গে তুলনা করলে তখন আমরা কেউ কিছু জানতাম-বুঝতাম বলে মনে হয় না। আসলে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ অনেক কিছুই শেখে। আর অফ দ্য ফিল্ড ক্যাপ্টেনের কিছু কাজ থাকে। সেখানে কোচ, দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদেরও রোল থাকে। এখন যেমন মাশরাফি ভাইয়ের পাশাপাশি দলে তিন-চারজন সিনিয়র আছে, যাদের জুনিয়র ক্রিকেটাররা ফলো করে, মানে। এই জিনিসগুলো আমার সময় ছিল না। আমরা সবাই-ই তো তখন জুনিয়র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনগুলো হয়েছে। ভবিষ্যতের অধিনায়কের কাজটা দেখবেন আরো সহজ হয়ে গেছে।

প্রশ্ন : প্রশ্নের উত্তরটা কিন্তু পাইনি। অফ দ্য ফিল্ড আপনি অন্তর্মুখী, সেভাবে সবার সঙ্গে কথাটথা হয় না!

সাকিব : (হাসি) জানি না। আমার তো মনে হয় না। কখনো কথা লুকাই না, যা মনে আসে বলি। আমি যখন অধিনায়ক তখন জেমি (সিডন্স) কোচ। তিনিও মুখের ওপর বলে দিতেন। ড্রেসিংরুমে দুজন এমন মানুষ থাকাতেই হয়তো কারো কারো একটু সমস্যা হয়েছিল। আর ওই যে বললাম সময়। এখন দল অনেক পরিণত, সবাই বুঝতে শিখেছে। তা ছাড়া রেজাল্টও ভালো হচ্ছে। বিপিএল হওয়ায় নতুন যারা আসছে, তাদেরও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ কিছুটা বোঝা হয়ে যাচ্ছে। তাই বেশি কিছু না বললেও চলে।

প্রশ্ন : খেলার বাইরেও তো আপনার ব্যস্ততা আছে। পরিবারকে সময় দেওয়া, বিজ্ঞাপনের ব্যস্ততাও আছে। কিভাবে ম্যানেজ করেন?

সাকিব : জানি না, কোনো না কোনোভাবে হয়ে যাচ্ছে (হাসি)! আসলে খেলা নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকি। তার ওপর আমার মেয়ে হলো, তাই অনেকটা সময় বিদেশে থাকতে হয়েছে। তাই বলে স্পনসরদের তো আর বঞ্চিত করা যায় না। যখনই সময় পাই, দিনরাত সময় দিই। এভাবেই হয়ে যায়!

প্রশ্ন : তার পরও এ নিয়ে কোনো অনুযোগ শুনতে হয় না বাড়িতে?

সাকিব : না, বরং সমর্থনই পাই। আমি এমন না যে বাইরে বসে আড্ডা দিতে পছন্দ করি। ফ্রেন্ডদের সঙ্গে আড্ডা দিতেই হবে, এমনটা মনে হয় না। আড্ডা আমার বাসাতেই হয়, বন্ধুরা আসে। তাই কাজ ছাড়া আমার আসলে বাইরে যাওয়াই লাগে না। খেলার মতো বিজ্ঞাপনের শুটিংটাও আমার কমিটমেন্ট। শিশিরও (মিসেস সাকিব) জানে যে এটা আমাকে করতেই হবে। তাই কোনো সমস্যা হয় না। মাঠ, প্র্যাকটিস, শুটিং আর বাসা ছাড়া আমার যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই।

প্রশ্ন : এবার একটু বৈশ্বিক ক্রিকেট নিয়ে জানতে চাই। চারদিকে টি-টোয়েন্টির যে ডামাডোল তাতে টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কী?

সাকিব : আমিও ঠিক জানি না। আমার তো মনে হয় ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার মানুষ ছাড়া কেউ টেস্ট ক্রিকেট দেখতেই চায় না। আমি নিজেও দেখি না। আমার কাছে তো এখন ওয়ানডেই বোরিং লাগে! সত্যি বলছি।

প্রশ্ন : তার মানে কি ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টিই ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ?

সাকিব : খেলাটার কথা চিন্তা করলে তো সে অর্থে ক্রিকেটের কোনো ভবিষ্যৎই আমি দেখতে পাই না। দেখি না কারণ, খেলাটা মানুষকে টানছে না। আপনি এবারের আইপিএলই দেখুন। ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির পর আইপিএল থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল মানুষ। বাংলাদেশের মানুষ আইপিএল দেখেছে যেদিন মুস্তাফিজ অথবা আমার খেলা ছিল। বাংলাদেশের কথা কী বলব, ইন্ডিয়ার মানুষই এবার আইপিএল সেভাবে দেখেনি। গত ছয় বছরে আমার এমন অভিজ্ঞতা হয়নি। এবার কোনো ম্যাচেই গ্যালারি হাউসফুল ছিল না। অথচ আগের পাঁচ বছরই গ্যালারি ভরা দেখেছি। হঠাৎ এক-দুটি ম্যাচে হয় পাঁচ হাজার কম দর্শক হয়েছে। অথচ এবার প্রতি ম্যাচে খালিই ছিল হাজার পঞ্চাশেক চেয়ার! এসব দেখে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়েই আমি চিন্তিত। গ্লোবালাইজেশনের কথা বলা হয়, কিন্তু আমি কোনো আশার আলো দেখি না। কারণ সেই ১০টা টিমই খেলে যাচ্ছে, তারা ঠিকঠাকভাবে খেলে না। নতুন কোনো টিম আসছে না। দু-তিনটি টিম খেলার সূচি করে। বাকিরা আবার সেটার সঙ্গে একমত না। এসব দেখে মনে হয়, খেলাটাকে ব্যবসা ছাড়া অন্য কিছু না।

প্রশ্ন : টেস্ট খেলতে না পারার জন্য আক্ষেপ হয় না?

সাকিব : উম..যে ফরম্যাটেই হোক না কেন, আমি তো খেলাতেই আছি। সে কারণেই টেস্ট হচ্ছে, কি হচ্ছে না তা আমাকে খুব একটা টেনশন দেয় না। তবে খেলতে পারলে তো ভালোই হতো। একটা ব্যাপার দেখুন, কেভিন পিটারসেনের অভিষেক হয়েছিল ২০০৫ সালে, আমার ২০০৭ সালে। অথচ ও টেস্ট খেলেছে ১০০-র ওপর। আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পিটারসেনের চেয়ে বেশি সময় থেকেও আমি খেলেছি মাত্র ৪২টি টেস্ট। আমাকে বলতে পারেন, এতটা পার্থক্য কেন হলো?

প্রশ্ন : আপনার নিজের কী মনে হয়, কিভাবে ক্রিকেটকে বাঁচিয়ে রাখা যায়?

সাকিব : অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বাড়াতেই হবে। বিশেষ করে যে দেশগুলো ক্রিকেট সিরিয়াসলি খেলতে চায়, তাদের উৎসাহ দিতে হবে। এখন সেটা আপনি কিভাবে করবেন? হতে পারে অলিম্পিক কিংবা বিভিন্ন গেমসে। এশিয়ান গেমসে যেমন ক্রিকেট আছে। এখন অলিম্পিকে ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত করাতে পারলে আমেরিকা, চীন, রাশিয়ার মতো দেশও হয়তো ক্রিকেটে আগ্রহী হয়ে উঠবে। ওরা আগ্রহী হয়ে উঠলে কি হবে, ক্রিকেট বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্য আসবে। কোনো একটি দেশ একচ্ছত্র আধিপত্য করতে পারবে না। টাকাও আসবে আরো বেশি। টাকার কথাটা এ কারণেই বললাম যে ওটা ছাড়া খেলাটা তৃণমূলকে টানবে না। আজকে ক্রিকেটে টাকা আছে বলেই সবাই ক্রিকেট খেলছে। আমার কাছে এখনো ফুটবলই একনম্বর খেলা। কিন্তু ক্রিকেটে টাকা বেশি, তাই আমাদের দেশে ক্রিকেটাই বেশি খেলা হয়। যে দিন ফুটবলে টাকা আসবে, তখন মাঠে জায়গা পাবেন না!

প্রশ্ন : সবশেষ প্রশ্ন, ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?

সাকিব : আগেই বলেছি, ২০২৩ বিশ্বকাপটা খেলতে চাই। ওই বিশ্বকাপেই ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটা খেলব। তবে অত দিন খেলতে হলে নিজের আরো উন্নতি করতে হবে। দলে এখন অনেক প্রতিযোগিতা। তাই ২০২৩ সাল পর্যন্ত খেলা চালিয়ে যাওয়া মোটেও সহজ হবে না।

প্রশ্ন : দলে টিকে থাকা নিয়ে সাকিবও চাপে! তাহলে অন্যদের কী অবস্থা!

সাকিব : সবারই একই অবস্থা। কম্পিটিশন যে দলে আছে, সেটা সবাই জানে। জানে, টিকে থাকলে হলে ভালো খেলতেই হবে। শুধু কিছু রান বা উইকেট না, সেগুলো যেন দলের কাজে লাগে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। সবাই এটা ভালোভাবে বোঝে এবং সেভাবে করার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। এই চিন্তা কিংবা চেষ্টা পজিটিভভাবেই দেখে সবাই। আল্টিমেটলি এটা দলকে সাহায্যও করছে। নিজেদের মধ্যে পারফরম্যান্সের প্রতিযোগিতাটা ইতিবাচক—আমাদের ভালো করার পেছনে এটা অন্যতম একটা কারণ।


মন্তব্য