kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হকিতে স্বপ্ন দেখা

শাহজাহান কবির

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



 হকিতে স্বপ্ন দেখা

হকিতে প্রতিপক্ষ ভারত হলেই ১২ বছরের পুরনো স্মৃতিতে জাবর কাটা হয়েছে এত দিন। ২০০৪ সালে অনূর্ধ্ব-২১ চ্যালেঞ্জ কাপে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্বাগতিক বাংলাদেশ।

একযুগ পর আশরাফুল, রোমান, ফজলে রাব্বীরা নতুন ইতিহাস লিখতে চলেছেন।

অনূর্ধ্ব-১৮ এশিয়া কাপের এই আসরের আগে সেভাবে কিন্তু তাদের নিয়ে আলোচনাই হয়নি। খেলোয়াড়দের প্রায় সবাই বিকেএসপির ছাত্র বলে প্রস্তুতির ভারটা সেখানকার কর্তৃপক্ষের হাতেই ছেড়ে দিয়েছিল ফেডারেশন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির রোজকার রুটিনের ভেতরেই চলছিল তাদের অনুশীলন। এদিকে ফেডারেশন ব্যস্ত ছিল জাতীয় দলের মূল কোচ নিয়োগ দেওয়া নিয়ে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পৃষ্ঠপোষকতার আশ্বাসের পরও কোচ ঠিক করতে না পারাটা তাদের ব্যর্থতা হিসেবেই ধরা হচ্ছিল। এই সময়টায় ফেডারেশন উঠেপড়ে লাগে সেই কোচের জন্য। রাসেল মাহমুদ, মামুনুর রহমানদের ফের জার্মানিতে গিয়ে খেলার সুযোগ পাওয়াটাও ছিল আলোচনায়। বছরদুয়েক আগে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ ফাইভ-এ-সাইড এশিয়া কাপে ভারতকে হারিয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে ফাইনাল খেলে রানার্স আপ হয়ে ফিরেছিল। রোমান, আরশাদদের সেই সম্ভাবনার পাল্লাতেই মাপা হচ্ছিল যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়াই। ফলে আত্মবিশ্বাসেও ঘাটতি ছিল। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে কোচ কাওসার আলীই যেমন জোর দিয়ে বলতে পারেননি তাদের ফাইনালে খেলার কথা। ভারতকে হারানোর সমীকরণ তাদের মাথায়ই ছিল না। গ্রুপে ভারতের কাছে হেরে ওমানকে হারিয়ে রানার্সআপ হয়ে সেমিফাইনাল খেলা। সেখানে যেহেতু পাকিস্তানের মতো দলকে সামলানোর চ্যালেঞ্জ, বাংলাদেশ তাই অপেক্ষায় ছিল অঘটনের। ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলবেলা সব আমূল বদলে গেল। ভারতকে এমন দারুণ খেলে হারাবে বাংলাদেশ—কে ভাবতে পেরেছিল? এটি তো অঘটন না। ৫-৪ গোলের এক থ্রিলার। ভারত যেখানে একবার লিড নিয়ে পরের সববার পিছিয়ে পড়ে সমতা ফিরিয়েছে। বাংলাদেশকে তারা ছুঁতেই পারেনি শেষ পর্যন্ত। এটি যে স্রেফ চমক ছিল না ওমানের বিপক্ষে পরের ম্যাচেও তার প্রমাণ।

ওমান দলটি গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের সমকক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমনকি র‌্যাংকিংয়ে কয়েকবার এগিয়েও গেছে তারা বাংলাদেশের চেয়ে। ঘরের মাটিতে বাংলাদেশ হয়তো ওদের হারালো আবার কোনো আন্তর্জাতিক আসরে গিয়ে ওদের কাছেই হার। এমনটিই চলেছে গত কয়েক বছর। অনূর্ধ্ব-১৮-এর আসরে এবার ভারতকে হারানোর পরও তাই স্বস্তি ছিল না ওমানকে নিয়ে। সত্যি বলতে বাংলাদেশ দল নিজেদের শক্তিমত্তা নিয়েই ছিল সন্দিহান; কারণ টুর্নামেন্টের আগে কোনো প্রস্তুতি ম্যাচই খেলা হয়নি তাদের। এমন অবস্থায় বাংলাদেশের কাছে হারা ভারত ওমানিদের বিধ্বস্ত করে ১১-০ গোলে, ভারতীয়দের বিপক্ষে নিজেদের জয়টা যে ফ্লুক ছিল না তা প্রমাণে ওমানিদের বিপক্ষে তাই রোমানদেরও জিততে হতো ভালোভাবে। স্বাগতিক দর্শকদের উচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে সেই ম্যাচ ১০-০ গোলে জিতে সব দ্বিধাই দূর করে দিয়েছে এই খেলোয়াড়রা। দলে সিনিয়র জাতীয় দলে খেলা চার খেলোয়াড়—রোমান সরকার, আশরাফুল ইসলাম, ফজলে হোসেন ও আরশাদ হোসেন। রোমান গত লিগেও স্থানীয়দের মধ্যে ছিল অন্যতম সেরা পারফর্মার। চ্যাম্পিয়ন দল মেরিনার ইয়াংসে খেলা আরশাদ লিগের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলস্কোরার। আশরাফুল অনেক দিন ধরেই ছায়া হয়ে আছে পেনাল্টি কর্নার স্পেশালিস্ট মামুনুর রহমানের, ফজলে রাব্বীও জাতীয় দলের ব্যাক আপ ফরোয়ার্ড হিসেবে ভালোই নজর কেড়েছিল। এই খেলোয়াড়দের নিয়ে জুনিয়র আসরে ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখাই যায়। কিন্তু অনূর্ধ্ব-১৮ পর্যায়ে এর আগে কখনোই না খেলার অনভিজ্ঞতা ও প্রস্তুতি ম্যাচের ঘাটতি দল হিসেবে নিজেদের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়। এবারের এই পারফরম্যান্সের পর পুরনো সত্যটাই আবার তাই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, যেমনটা বলছিলেন সাবেক তারকা খেলোয়াড় ও কোচ মাহবুব হারুন—‘কোনো রকম প্রস্তুতি ম্যাচ ছাড়াই টুর্নামেন্টের একেবারে প্রথম ম্যাচেই ভারতকে হারিয়ে দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। আমাদের যে সামর্থ্য আছে তা বিভিন্ন সময়ই প্রমাণিত হয়েছে। কিন্ত এটা আমরা ধরে রাখতে পারি না। ’ যে কারণে ভারত, পাকিস্তানের বিপক্ষে এখনো ছোট দলের তকমা নিয়েই খেলতে হয়। গতবছর জুনিয়র (অনূর্ধ্ব-২১) এশিয়া কাপে কোরিয়াকে হারানোটাও স্রেফ অঘটন হয়েই থাকে। খেলোয়াড়রা সিনিয়র পর্যায়ে উঠতে না উঠতেই ব্যবধান দাঁড়িয়ে যায় যোজন যোজন। তার জন্য অবশ্য ঘরোয়া হকিতে বিশৃঙ্খল দায় আছে, জাতীয় দল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সাজাতে না পারার দায় আছে। সম্প্রতি অবশ্য নতুন করে ভাবনাচিন্তা চলছে জাতীয় দল নিয়ে। রাসেল, মামুনুরদের জার্মানিতে খেলা, সেখানে ক্যাম্প সেই ভাবনার অংশ হিসেবেই। অনূর্ধ্ব-১৮ টুর্নামেন্ট খেলে রোমান আরশাদরাও যোগ দেবে জার্মানির ক্যাম্পে। এখন প্রত্যাশা একটাই, এই উদ্যোগটাও যেন স্রেফ চমকে শেষ না হয়। বারবার সম্ভাবনা দেখিয়েও পিছিয়ে গেছে হকি, আর কত! রোমান, আশরাফুলরা আরো একবার যে স্বপ্ন দেখিয়ে চলেছে তা যেন আর মিথ্যা না হয়। সিনিয়র দলের হাল ধরবে যখন তারা তখনো যেন ভারত, পাকিস্তান এমনই কাঁপে লাল-সবুজের সামনে—এটাই তো প্রত্যাশা।


মন্তব্য