kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সবচেয়ে বড় আনন্দ আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সবচেয়ে বড় আনন্দ আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা

ছবি : মীর ফরিদ

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবাহনী হয়ে উঠেছিল ফুটবল আর আবাহনীর তারুণ্যের প্রতীক। সেই আবাহনীকে গড়ে তোলায় যাঁরা ছিলেন অগ্রভাগে, তাঁদের একজন শেখ আশরাফ আলী, স্ট্রাইকার থেকে স্টপারে রূপান্তরিত হয়েও যিনি দেশসেরাদের একজন হয়ে খেলে গেছেন বছরের পর বছর।

কিন্তু এই ৭০ বছরে এসে ফুটবল মাঠের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ছাড়িয়ে আশরাফের কাছে নিজের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের গর্বিত সদস্য। ও হ্যাঁ, তাঁর সেন্টার ফরোয়ার্ড থেকে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হয়ে ওঠা কিন্তু এই স্বাধীন বাংলা দলের প্রয়োজনেই। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নোমান মোহাম্মদ

 

প্রশ্ন : আপনাকে সবাই চেনেন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে। কিন্তু শুনেছি যে ক্যারিয়ারের শুরুতে নাকি সেন্টার ফরোয়ার্ড ছিলেন। সত্যি?

শেখ আশরাফ আলী : সত্যি। আমার ক্যারিয়ারের শুরু স্ট্রাইকার হিসেবে। তা কলকাতা মোহনবাগানের জুনিয়র দলে কিংবা ঢাকা লিগে ফায়ার সার্ভিসের হয়ে খেলার সময়ও। ১৯৬৯ সালে ঢাকা মোহামেডানে আসি। লিগের শুরুতে আমি দলের মূল স্ট্রাইকার। ক্রিকেটার পাইলটের বাবা যে শামসু, আমার জন্য সে একাদশে সুযোগ পায় না। গোল করি নিয়মিত। কিন্তু মৌসুম কিছু দূর এগোনোর পর মোহামেডান নিয়ে আসে মাকরানি খেলোয়াড়দের। আলী নেওয়াজ, ইদ্রিস, আমির বক্সরা আসার পর বসিয়ে দেয় আমাকে। অভিমান হয় খুব। পরের মৌসুমে জিদ করে চলে যাই ইস্টএন্ডে। আমার জায়গায় মোহামেডানে আসে সালাউদ্দিন।

প্রশ্ন : স্ট্রাইকার থেকে ডিফেন্ডার হন কিভাবে?

আশরাফ : স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে খেলার সময়। এমনিতে আমার মানসিক শক্তি অনেক। গোলরক্ষক ছাড়া যেকোনো পজিশনে খেলতে পারার বিশ্বাস ছিল। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে দেখা যায়, বেশির ভাগই ফরোয়ার্ড ও মিডফিল্ডার। এনায়েত, নওশের, সালাউদ্দিন, প্রতাপদা, লালু, খোকন, সুরুজ—এমন অনেকে। কিন্তু ডিফেন্সে খুব বেশি কেউ নেই। পিন্টু ভাই, আইনুল, হাকিম, বিমল—এমন কয়েকজন। তখন আমি নেমে আসি ডিফেন্সে। স্টপার হই পিন্টু ভাইয়ের সঙ্গে। সাংবাদিক জামান ভাই তো এখনো দেখা হলে আমাকে বলেন, ‘তুমি স্ট্রাইকার পজিশন বাদ দিয়ে স্টপার হলে কেন?’ বলি, ‘কী করব? দলকে তো ধরে রাখতে হবে!’

প্রশ্ন : স্বাধীনতার পর ঢাকার ক্লাব ফুটবলে ফেরা কি ডিফেন্ডার হিসেবে নাকি স্ট্রাইকার?

আশরাফ : স্বাধীন বাংলা দলে তান্না ভাই ছিলেন ম্যানেজার। আলী ইমাম-সালাউদ্দিনরা আমার খেলা দেখে। ওরা মিলে স্বাধীনতার পর যখন আবাহনী দল করে আমাকে চায় স্টপার হিসেবে। সেন্টার ফরোয়ার্ডে আর খেলা হয়নি।

প্রশ্ন : কিন্তু স্ট্রাইকার পজিশনের জন্য লোভ হয়নি? গোল দেবেন, খ্যাতি বাড়বে, জনপ্রিয়তা হবে—যা ডিফেন্ডারদের ক্ষেত্রে কঠিন...

আশরাফ : আমার ওসব লোভ নেই। মাঠের ফুটবলে নেই, মাঠের বাইরের জীবনেও নেই।

প্রশ্ন : পরে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে খ্যাতিমান আপনি। কিন্তু স্বাধীনতার পর প্রথম যে বাংলাদেশ জাতীয় দল হয়, সেখানে নাকি আপনি রাইট ব্যাকে খেলেন?

আশরাফ : সেন্ট্রাল ডিফেন্সে তখন ছোট নাজির ও পিন্টু ভাই। কিন্তু আমাকে তো একাদশ থেকে বাদ দেওয়ার উপায় নেই। খেলানো হয় তাই রাইট ব্যাকে। নতুন পজিশন, তবে আমার আত্মবিশ্বাস সব সময় বেশি। ভাবি, এ জায়গা কিছুতেই ছাড়া যাবে না। লেফট ব্যাকে শুরুতে আইনুল থাকলেও জায়গা ধরে রাখতে পারেনি। ওর জায়গা নিয়ে নেয় নান্নু। কিন্তু নিজের জায়গা আমি ছাড়িনি। ওই দলটি কিন্তু আমার পুরো মুখস্ত। ৪-২-৪ ফর্মেশনে গোলরক্ষক শান্টু। ডিফেন্সের কথা তো বললাম। মিডফিল্ডে সলিমুল্লাহ ও কায়কোবাদ। রাইট আউট প্রতাপদা, লেফট আউট টিপু। স্ট্রাইকারে সালাউদ্দিন-এনায়েত। আমি বলছি ১৯৭২ সালে গৌহাটিতে বরদুলই ট্রফি খেলতে যাওয়া দলের কথা। আমরা তখনো ফিফার সদস্য হইনি। যে কারণে বাংলাদেশ নাম নিয়ে খেলতে পারিনি। খেলি ‘ঢাকা একাদশ’ নামে।

প্রশ্ন : ডিফেন্ডার হিসেবে আপনার শক্তির জায়গা কোনটি?

আশরাফ : সবার আগে বলব গতির কথা। গতিতে আমার সঙ্গে কেউ পারত না। তাতে হয় কি, স্ট্রাইকার বলের কাছে পৌঁছার আগেই আমি পৌঁছে যাই। কাভারিং খুব ভালো হয়। সঙ্গে ডিফেন্ডারদের অন্য যেসব গুণ থাকতে হয়, তা তো ছিলই। ছিল ভীষণ আত্মবিশ্বাস। প্রতিপক্ষের কাউকে কখনো গোনায় ধরিনি। আর খুব গতি থাকায় অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকতাম এমনিতেই।

প্রশ্ন : এত গতি হয় কিভাবে? মানে আলাদা কোনো অনুশীলন...

আশরাফ : আরে, আমি স্কুল জীবন থেকে ১০০ মিটার, ২০০ মিটারে দৌড়াই না! স্বাধীনতার পর জাতীয় অ্যাথলেটিকসে পর্যন্ত অংশ নিই। সেখানে পদক জিতিনি, কিন্তু দুই ইভেন্টেই ফাইনালে উঠি। সেখানে সেরা আটের মধ্যে হই চতুর্থ। জাতীয় অ্যাথলেটিকসে চতুর্থ হওয়া স্প্রিন্টারের সঙ্গে ফুটবল মাঠের অন্যরা পারে?

প্রশ্ন : পরে আর অ্যাথলেটিকস করেননি?

আশরাফ : না। পূর্ণ মনোযোগ দিই ফুটবলে।

প্রশ্ন : ডিফেন্ডার হিসেবে আপনি খুব পরিচ্ছন্ন ফুটবল খেলতেন বলেও পুরনো দিনের দর্শকরা মনে করতে পারেন।

আশরাফ : ঠিক তাই। জীবনে কখনো লাল কার্ড দূরে থাক, হলুদ কার্ড পর্যন্ত দেখিনি আমি।

প্রশ্ন : এবার একটু জানতে চাই আপনার ফুটবলের শুরুটা?

আশরাফ : আমার বাবা-দাদার দেশ বর্ধমান। মা-নানিদের দেশ যশোর। আমার জন্ম কলকাতায়; আট ভাইবোনের মধ্যে সপ্তম। বাবা শেখ শাহাজাদা পুলিশে চাকরি করেন, মা রাহাতুন্নেসা গৃহিণী। ১৯৪৬ সালে কলকাতা রায়টের সময় বাবার পরিবারের প্রায় সবাই মারা যান। তাঁরা যৌথ পরিবারে একসঙ্গে থাকতেন। প্রায় ৩০০ জনের মতো মারা যান রায়টে। আমার বয়স তখন তিন মাস। কলকাতা থেকে এসে যশোরে থিতু হই আমরা। ওখানে নানি-খালারা থাকেন। আব্বা প্রতি সপ্তাহের ছুটিতে আসেন। ১৯৫০ সালের দিকে যশোরে কি এক রোগের মহামারি হয়। তখন আবার পরিবার নিয়ে আব্বা চলে যান কলকাতায়।

প্রশ্ন : ফুটবলের শুরু...

আশরাফ : আব্বা ছিলেন কলকাতার নামকরা ফুটবলার। কালীঘাটে খেলেন। আর শুধু ফুটবল না, ক্রিকেট-সাঁতারেও দুর্দান্ত। তাঁর অনেক পুরস্কার। আব্বাই আমাকে ফুটবলের দিকে আগ্রহী করে তোলেন। তাঁর এক বন্ধু বিডি চ্যাটার্জি নিয়ে যান মোহনবাগান জুনিয়র দলে। আমার বয়স তখন ১০-১২ বছর। সিনিয়র ও জুনিয়র দল তো অনুশীলন করে পাশাপাশি। ওদের কোনো খেলোয়াড় ইনজুরিতে থাকলে আমাদের এখান থেকে ভালো কাউকে নিয়ে প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলে। সে সুবাদে চুনী গোস্বামী, পিকে ব্যানার্জি, জার্নাল সিং—এমন বিখ্যাত সব ফুটবলারের সঙ্গে খেলি। অল ইন্ডিয়া স্কুল গেমসে অংশ নিই পশ্চিমবঙ্গের হয়ে। চ্যাম্পিয়ন হই।

প্রশ্ন : ঢাকা আসেন কিভাবে?

আশরাফ : ১৯৬৪ সালে মোহনবাগান সিনিয়র দলে আমার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। কিন্তু আমাকে বাদ দিয়ে আরেকজনকে নেয়। জেদ নিয়ে কলকাতা ছাড়ি। যশোরের পাশাপাশি ঢাকায়ও তো আমার অনেক আত্মীয়স্বজন। ১৯৬৫ সালে ঢাকা চলে আসি। আমার বন্ধু এরশাদ নিয়ে যায় গিয়াস ভাইয়ের কাছে। তিনি ফায়ার সার্ভিসে দলের ট্রায়ালে নিয়ে যান কোচ বজলু ভাইয়ের কাছে। সে দলের খেলোয়াড় হয়ে যাই আমি।

প্রশ্ন : মোহামেডানে যোগ দেন কোন মৌসুমে?

আশরাফ : তিন মৌসুমে খেলি ফায়ার সার্ভিসে। ১৯৬৮ সালে পেশোয়ারের এক টুর্নামেন্টে অতিথি খেলোয়াড় হিসেবে আমাকে নিয়ে যায় ঢাকা মোহামেডান। ১৯৬৯ সালে নাম লেখাই সে ক্লাবে।

প্রশ্ন : কত টাকায়, মনে আছে?

আশরাফ : ফায়ার সার্ভিসে খেলার সুবাদে চাকরি হয় সেখানে। মাসে বেতন ২৪০ টাকা। এর বাইরে বছরে এক হাজার টাকার মতো দেয়। মোহামেডানে যাই আড়াই হাজার টাকায়। এর পরের কথা আগেই বলেছি। ১৯৭০ সালে মোহামেডান থেকে বেরিয়ে যোগ দিই ইস্ট এন্ডে। এরপর তো দেশে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

প্রশ্ন : সেই যুদ্ধে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের হয়ে লড়াইয়ে শামিল ছিলেন আপনি। কিভাবে ওই দল তৈরি হয়, তা যদি একটু বলেন?

আশরাফ : যুদ্ধ শুরু হলে সীমান্ত অতিক্রম করে আমি চলে যাই কলকাতা। মা-আব্বা ওখানে থাকেন। কলকাতায় গিয়ে প্রথম বিভাগের দল স্পোর্টিং ইউনিয়নে শুরু করি খেলা। একদিন গড়ের মাঠে অনুশীলন করে ট্রামে করে পার্ক সার্কাসের বাসায় ফিরছি। ট্রামে দেখা প্রতাপদার সঙ্গে। এই প্রথম পরিচিতি কোনো ফুটবলারের সঙ্গে দেখা। তাঁর কাছে জানি, আলী ইমাম থাকেন মোহনবাগান ক্লাবে। কিছু দিন পর রাস্তায় দেখি সাদা শার্ট-প্যান্ট পরা একটি ছেলে। প্যাটেলের মতো লাগছে না! গিয়ে দেখি তাই তো। ও আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আশরাফ ভাই, অন্য ফুটবলারদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে?’ প্রতাপদা ও আলী ইমামের কথা বলি। তখন প্যাটেল বলে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের আইডিয়ার কথা। আমি তা প্রথম শুনি ওর কাছ থেকে। প্যাটেল, প্রতাপদা, আলী ইমাম ও আমি—এই চারজন বসে ঠিক করি কিভাবে কী করা যায়! প্যাটেল রাজনীতির সঙ্গে আগে থেকে যুক্ত ছিল বলে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়। রেডিওতে ঘোষণা করা হয়; প্রতাপদারা গিয়ে আগরতলা থেকে কায়কোবাদসহ অনেককে নিয়ে আসে। তৈরি হয় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল।

প্রশ্ন : মাঠে নামার পর দর্শক প্রতিক্রিয়া পান কেমন?

আশরাফ : খুব ভালো। আমাদের মূল লক্ষ্য তো ম্যাচ জয় না, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরি করা। ম্যাচের আগে পতাকা তুলি, জাতীয় সংগীত গাই। কৃষ্ণনগরের প্রথম ম্যাচের আগে ওখানকার ডিসি অনুমতি দিতে চাননি। কারণ ভারত তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু আমাদের জেদের কারণে তিনি অনুমতি দিতে বাধ্য হন। আমাদের হাতে অস্ত্র না থাকলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতায় নিজেদের মতো অংশ নিই। কিন্তু সে স্বীকৃতি কী আমরা পরে পেয়েছি?

প্রশ্ন : স্বীকৃতি বলতে?

আশরাফ : এখন তো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার। কই, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি তো দেয়নি তারা। আমাদের ডেকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে চা-ও তো খাননি। বুঝি যে আমাদের দলে নানা বিভাজন আছে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টুর রাজনৈতিক পক্ষ আলাদা হতে পারে। কিন্তু স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নিয়ে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি তো ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলতে পারেন না। ১৯৭১ সালে স্লোগান ছিল একটিই—‘জয় বাংলা’। পিন্টু ভাই তাঁর দলীয় ফোরামে গিয়ে যা খুশি বলুন। তবে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অনুষ্ঠানে ‘জয় বাংলা’ ছাড়া অন্য কিছু বলতে পারেন না। আমি কাউকে ভয় পাই না, সরাসরি কথা বলি। যে কারণে এগুলো বলছি। পিন্টু ভাই, প্রতাপদারা এখন যা করছেন, তা জঘন্য। খুব অন্যায়। কিন্তু তাঁদের মতো দু-একজন তো স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের মালিক নন। তাঁদের কারণে আমাদের স্বীকৃতি দেওয়া হবে না কেন?

প্রশ্ন : স্বাধীনতার পর নতুনভাবে তৈরি হওয়া আবাহনীর প্রথম দলে ছিলেন আপনি। এই ক্লাবে যাওয়ার গল্পটি একটু শুনতে চাই।

আশরাফ : স্বাধীনতার পরের মৌসুমে আমার খেলার কথা ওয়ান্ডারার্সে। তাদের সঙ্গে কথা পাকা সাড়ে তিন হাজার টাকায়। এক হাজার অগ্রিম। বাকি টাকার জন্য দুই-তিন তারিখ দিয়ে ঘোরায়। মেজাজ যায় খারাপ হয়ে। তখন আমাদের খেলোয়াড়দের আড্ডার এক জায়গা ছিল ইসলামিয়া হোটেল। সেখানে আলী ইমাম একদিন বলে, ‘শেখ কামাল নতুন দল করছে আবাহনী নামে। আমরা অনেকেই সেখানে যাচ্ছি। তুমি যাবে নাকি?’ সত্যি বলতে কী, শুরুতে খুব আগ্রহী ছিলাম না। নতুন দল, কেমন না কেমন হয়! পরে জিজ্ঞেস করি, কে কে যাচ্ছে। নামগুলো শুনে আগ্রহ হয়। ওদিকে ওয়ান্ডারার্স টাকার জন্য ঘোরাচ্ছিল বলে মেজাজ খারাপ। দুয়ে মিলে চলে যাই আবাহনীতে। অগ্রিম এক হাজার টাকা ফেরত দিয়ে দিই ওয়ান্ডারার্সকে।

প্রশ্ন : আবাহনীতে যান কত টাকায়?

আশরাফ : পাঁচ কিংবা সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায়।

প্রশ্ন : স্টপার হিসেবে?

আশরাফ : ঠিক তাই।

প্রশ্ন : শেখ কামালের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল?

আশরাফ : খুব ভালো। বঙ্গবন্ধু নিজে খেলাপাগল ছিলেন। তিনি তো ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে ফুটবল খেলতেন। কামাল ভাইও খেলাপাগল। ইকবাল স্পোর্টিংই তো পরে আবাহনী হয়। সেখানে খেলোয়াড় জোগাড় ও দল তৈরির কাজে মূল অবদান আলী ইমাম ও তান্না ভাইয়ের। আর কামাল ভাইয়ের মতো মানুষ হয় না। সব সময় হাসিখুশি। খেলোয়াড়দের খুব সম্মান করতেন। আমরাও বুঝতাম, আবাহনী ক্লাব আর এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য কতটা চেষ্টা ছিল কামাল ভাইয়ের।

প্রশ্ন : ১৯৭২ সালে যে চেষ্টার শুরু, তা পূর্ণতা পায় ১৯৭৪ সালে। লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় আবাহনী। সে অনুভূতি যদি একটু ভাগাভাগি করেন?

আশরাফ : আসলে আবাহনী ক্লাবে খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের বয়সের পার্থক্য তেমন ছিল না। কামাল ভাই, হারুন ভাই, মন্টু ভাই, তান্না ভাইদের বয়স আমাদের মতোই। আবাহনী ক্লাব ছিল তারুণ্যের ক্লাব। শুরু থেকেই আমরা ভালো দল। আর ১৯৭৪ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় অবশ্যই সবাই খুব খুশি হয়। ভালো দল যে বললাম, আসলে আবাহনীর মিডফিল্ড ও ফরোয়ার্ড লাইন ছিল খুব ভালো। ডিফেন্স ততটা না। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে আমি ও সাদেক ভাই। লেফট ব্যাক বাদশা। রাইট ব্যাকেও নামকরা কেউ না। মূল দায়িত্ব তাই আমাকেই সামলাতে হয়। আর গোলরক্ষক তো বরাবর খারাপ। মুসলিম, জুবায়ের, কাশেম, অনিরুদ্ধ, নিজাম, মঈন। কেউ তেমন ভালো না।

প্রশ্ন : শেখ কামাল নাকি একবার আবাহনীতে আপনাদের চার-পাঁচজন ফুটবলারকে মোটরসাইকেল দেন?

আশরাফ : আমারটি জামাল দেয়, অন্যগুলো কামাল ভাই।

প্রশ্ন : গল্পটি যদি একটু বলেন?

আশরাফ : শেখ জামাল, শেখ মারুফ ও মনজুর কাদেরের সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। তারা ছোটভাইয়ের মতো; আমার খেলার খুব ভক্ত। আসলে কামাল ভাইয়ের চেয়ে জামালের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো ছিল। ও আমার অনেক নাম দেয়। নাম দেয় ‘স্পার্টাকাস’, ‘ব্ল্যাক হর্স’। সংবাদপত্রে লেখা হয় ‘আবাহনীর ডিফেন্সে আশরাফ যেন স্পার্টাকাস; আশরাফ যেন ব্ল্যাকহর্স’। আরে, এমন নাম কে দিল! খোঁজ নিয়ে দেখি, সাংবাদিকদের কাছে আমার ওই নাম বলেছে জামাল। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতে অনেকবার যাই আমি। ওই বাড়ি থেকে হটলাইনে কলকাতায় মা-বাবার কাছে ফোন করার জন্য। জামালকে বলতাম, ও নিয়ে যেত।

প্রশ্ন : মোটরসাইকেলের কাহিনী...

আশরাফ : বলছি। এমনিতে আমি খুব শৌখিন ছিলাম। আবাহনী ক্লাবে একা এক রুমে থাকি। নিজের টাকা দিয়ে ওই আমলে ৩৫০ টাকা দিয়ে খাট বানাই। টেপ রেকর্ডার কিনি। আর ছোটবেলা থেকে আমার মোটরসাইকেলের খুব ঝোঁক। জামাল তা জানে। ও একবার জিজ্ঞেস করে, ‘আশরাফ ভাই, মোটরবাইক নেবেন?’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ দাও। ’ ও বলে, ‘বিদেশ থেকে আমার মোটরসাইকেল আসছে মাসখানেকের মধ্যে। এলে আপনাকে দেব। ’ আসার পর জামাল বোধ হয় কয়েক দিন চালায়। একদিন আবাহনী ক্লাবে আসে তা চালিয়ে। বলে, ‘আশরাফ ভাই, আপনার মোটরসাইকেল রেখে গেলাম। ’ আমি বলি, ‘কাগজপত্র, ব্লুবুক দিয়ে যাও। ’ ও সব কিছু দিয়ে যায়। এটি ১৯৭৩ সালের ঘটনা। আমার ওই মোটরসাইকেল দেখে টিপু, বাঁটু, বাদশা গিয়ে ধরে কামাল ভাইকে। তিনি এই তিনজনকে মোটরবাইক দেন। ওদেরগুলো ছিল ৮০ সিসি, আমারটি ১৭৫ সিসি।

প্রশ্ন : কত দিন চালান তা?

আশরাফ : বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকা পর্যন্ত। ১৯৭৫ সালে মারদেকা টুর্নামেন্ট খেলতে যাওয়ার আগে ক্লাবে মোটরবাইক রেখে যাই। বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নিহত খবর পাই মালয়েশিয়ায়ই। ফিরে আসার পর চিন্তায় পড়ে যাই। এসবি, ডিবি, এনএসআই সব গোয়েন্দা সংস্থার লোকে ক্লাব গিজগিজ করে। জামাল আমাকে যে মোটরসাইকেল দেয়, তা দেশে আনার অনুমতি ছিল কেবল সেনাবাহিনীর জন্য। তখন বঙ্গবন্ধু নেই, ওই মোটরসাইকেল নিয়ে অনেক প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। কোন প্যাঁচে পড়ি, ঠিক নেই। সার্জেন্ট রহিম নামে একজন পুলিশের লোক ছিলেন, তাঁকে মোটরসাইকেল রাখতে দিই কিছু দিনের জন্য। ঠাণ্ডা হলে পরে নেব। কিন্তু ওই যে নিয়ে গেলেন, আর ফেরত দেননি। মোটরসাইকেলের নম্বরটি আমার এখনো মনে আছে। ঙ-১৩।

প্রশ্ন : ১৯৭৫ সালে মোহামেডানের কাছে আবাহনী হেরে যায় ০-৪ গোলে। ওই দলের রক্ষণভাগে ছিলেন আপনি। আবাহনী তখন চ্যাম্পিয়ন দল। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে এত বড় ব্যবধানে হারে কিভাবে?

আশরাফ : মূলত গোলরক্ষকের কারণে। আমাদের রক্ষণভাগকে ডজে কাটিয়ে গোল করেছে—কেউ এসে অমনটা বলুক তো! দূর থেকে শট করে গোল। যেখান থেকে মারে, গোল। গোলরক্ষক নিজাম এত খারাপ খেলে, যা বলার মতো না। একজন খেলোয়াড় তো গোলে মারবেই, কিন্তু গোলরক্ষক আছে কী কারণে? সে বল ধরবে না? নিজাম তা পারেনি। সে কারণেই আমরা চার গোলে হেরে যাই। এখানে আমাদের ডিফেন্ডারদের দোষ ছিল না। আর আবাহনীও অত খারাপ দল না। আগের বছরেরই তো চ্যাম্পিয়ন, বোঝেন না! চার গোল দেওয়ায় মোহামেডানের অনেক বড় কৃতিত্ব, আমি তা বলব না। বরং আমাদের গোলরক্ষক নিজামের ব্যর্থতা অনেক বেশি।

প্রশ্ন : চার গোলের সঙ্গে আরো দুটি ‘গোল’ নাকি দেয় মোহামেডান, যা বাতিল হয়ে যায় অফসাইডের কারণে?

আশরাফ : আমার তা মনে নেই।

প্রশ্ন : মনজু যে শেখ কামালের সামনে গিয়ে বারবার ইচ্ছা করে বল ছেড়ে দিয়ে আসেন, তা মনে আছে?

আশরাফ : মনজু যা করে, তা বাড়াবাড়ি। ও খেলোয়াড় হলো কোথা থেকে? আবাহনী থেকে। এরপর যেকোনো কারণে হোক আবাহনী ছেড়ে চলে যায়। তাই বলে এমনটা করবে? মনজু তো বড় খেলোয়াড় হয়ে ওঠে আমার চোখের সামনে। ও খেলে রাইট ব্যাকে, আমি সেন্ট্রাল ডিফেন্সে। ওর ওপরে উঠে যাওয়া সবাই এখনো মনে রাখে। কিন্তু ভুলে যায়, ওই সময় মনজুর রাইট ব্যাকের ফাঁকা জায়গায় আমি কাভার দিই। আমি ওকে উৎসাহ জোগাই সামনে যাওয়ার জন্য। পরে টুটুলের ক্ষেত্রেও তাই। ওরা ওপরে উঠে যাওয়ার পর যদি ওদিক দিয়ে গোলের পর গোল খেয়ে যেতাম, তাহলে কী ওভারল্যাপ করতে পারত মনজু-টুটুলরা? আমি সে জায়গা কাভার দিয়ে রাখি। কিন্তু এখন আর কেউ তা বলে না। শুধু ওদের প্রশংসা করে।

প্রশ্ন : আবাহনীতে থাকার সময় অন্য কোনো ক্লাবে খেলার প্রস্তাব পাননি?

আশরাফ : একবার পাই। ১৯৭৭ সালের লিগে চ্যাম্পিয়ন হয় আবাহনী। স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো দল হয় অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন; আমি সে দলের অধিনায়ক। পরেরবার বিজেএমসিতে খেলার প্রস্তাব পাই। অগ্রিম কিছু টাকাও নিই। ওরা আমাকে পাঠিয়ে দেয় কলকাতায়। সেখান থেকে দলবদলের শেষ দিনে কৌশল করে আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসে আবাহনীর কর্মকর্তারা। কলকাতায় জসিম নামে একজন ছিল, ও বলে ‘আমার বাসায় টাকা লাগবে। আপনাকে আজই ঢাকা যেতে হবে। ’ এলাম। বিমানবন্দরে নেমে দেখি, হারুন ভাই, মন্টু ভাইরা সবাই সেখানে। ধরে নিয়ে সোজা ফুটবল ফেডারেশনে। মাঝে এলিফ্যান্ট রোডে থেমে ‘আঁকাবাঁকা স্টুডিও’তে ছবি তোলা হয়। এরপর ফেডারেশনে গিয়ে আবাহনীতে থেকে যাওয়ার চুক্তিতে সই করি। বিজেএমসি থেকে যে ১০ হাজার টাকা নিই, তা ফেরত দেয় আবাহনী।

প্রশ্ন : কিন্তু আবাহনীতে তো আপনি ক্যারিয়ার শেষ করতে পারেননি?

আশরাফ : না। ১৯৮০ সালে অসময়ে আমাকে ছেড়ে দেয় আবাহনী। অসময়, কারণ তা ক্যারিয়ারের শেষ সময়। পরে এক মৌসুম ওয়াপদায় খেলে অবসর নিই।

প্রশ্ন : মৌসুমে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পান কত?

আশরাফ : ঠিক মনে নেই। ২০-২৫ হাজার হবে হয়তো। তবে আমাদের ক্যারিয়ার তো অল্প দিনের। পরবর্তী জীবনের নিশ্চয়তার জন্য একবার কামাল ভাইয়ের কাছে যাই। ১৯৭৫ সালে মারদেকায় খেলতে যাওয়ার আগে। মোটরসাইকেল নিয়ে টিএসসিতে গিয়ে কামাল ভাইকে বলি, ‘আর কত দিন খেলব? আমাকে ব্যবসা-বাণিজ্য যাই হোক, কোনো একটা ব্যবস্থা করে দেন। ’ কামাল ভাই জানতেন, আমার একটি বাজে অভ্যাস আছে—তাস খেলার। তিনি বলেন, ‘আপনাকে এখন কিছু করে দিলে নষ্ট করে ফেলবেন। আমি তো আছিই। এখন ফুটবল খেলেন। পরে কিছু একটা করে দেব। ’ এর পরপরই তো কামাল ভাই মারা যান।

প্রশ্ন : তাস কি এখনো খেলেন?

আশরাফ : হ্যাঁ। আবাহনী ক্লাবে গিয়ে খেলি। এই ৭০ বছর বয়সে বাসা আর আবাহনী ক্লাব ছাড়া এখন কী আছে জীবনে!

প্রশ্ন : আমরা প্রায় শেষদিকে চলে এসেছি। কিছু প্রশ্নের উত্তর ঝটপট জেনে নিতে চাই। ক্যারিয়ারে যত ক্লাব দলে খেলেন, সেরা কোনটি?

আশরাফ : ১৯৬৯ সালের মোহামেডান ও স্বাধীনতার পরের আবাহনী।

প্রশ্ন : কোন সালের আবাহনী?

আশরাফ : ১৯৭৭ সালেরটি। সেবার ভালো এক গোলরক্ষক পাই, শ্রীলঙ্কা থেকে লায়নেল পিরিচ আসে। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে আমি ও নান্নু। রাইট ব্যাটে টুটুল, লেফট ব্যাটে রকিব। মিডফিল্ডে খোরশেদ বাবুল ও অমলেশ। রাইট আউট মহেন্দ্র পালা, লেফট আউট চুন্নু। স্ট্রাইকার সালাউদ্দিনের সঙ্গে শামসু ভাই অথবা সোহরাব।   দারুণ দল ছিল সেটি।

প্রশ্ন : যাঁদের বিপক্ষে খেলেন, কাকে সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে?

আশরাফ : আমার কাউকে কঠিন মনে হয়নি। বড় কারণ হতে পারে, আমি তো সালাউদ্দিনের বিপক্ষে খেলিনি।

প্রশ্ন : এনায়েত?

আশরাফ : হ্যাঁ, যাদের বিপক্ষে খেলেছি, তাদের মধ্যে সেরা এনায়েত। আর হাফিজ ভাই।

প্রশ্ন : সালাউদ্দিন-এনায়েতের একটি তুলনা করা হয়...

আশরাফ : আমি আসলে এই তুলনা করতে চাই না। কারণ দুজন দুই ক্যাটাগরির খেলোয়াড়। এনায়েতের শক্তি ছিল পাওয়ার ও শ্যুটিং। সালাউদ্দিনের স্কিল ও স্পিড। অনেক অনেক গোল করে সালাউদ্দিন, যা এনায়েত করেনি। আবার খেলার স্টাইল ও লম্বা চুলের স্টাইলের কারণে সালাউদ্দিনের দর্শকপ্রিয়তা অনেক বেশি। এনায়েত শুধুই মাঠের ফুটবলার, সালাউদ্দিনের বাড়তি অনেক অনেক কিছু ছিল। একে স্ট্রাইকার, তার ওপর স্টাইল—দুটি মিলে সালাউদ্দিন ওপরে চলে গেছে। কিন্তু ওই যে বললাম, আমি দুজনের তুলনা করতে চাই না।

প্রশ্ন : নিজের পজিশন সেন্ট্রাল ডিফেন্সে আর কাকে সবচেয়ে ভালো মনে হয়েছে?

আশরাফ : ছোট নাজির ও জাকারিয়া পিন্টু ভাই। ছোট নাজিরের কথা সেভাবে কেউ বলে না। কিন্তু ও ছিল দুর্দান্ত স্টপার ব্যাক। আমি তো বলব, পিন্টু ভাইয়ের চেয়েও ভালো।

প্রশ্ন : আপনার স্মরণীয় কিছু ম্যাচের কথা জানতে চাই।

আশরাফ : ঢাকা একাদশের হয়ে রাশিয়ার মিনস্ক ডায়ানামোর বিপক্ষে খেলার কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। আমাদের পিন্টু ভাই, ছোট নাজির, এনায়েত সবাই ইনজুরিতে পড়ে মাঠের বাইরে চলে যায়। আমি ওই ম্যাচে খেলি জীবন দিয়ে। তিন গোলে হারি যদিও। কিন্তু সে খেলার পর দৈনিক পূর্বকোণে এত্ত বড় শিরোনাম ছিল, ‘আশরাফের নৈপুণ্যে কম গোল খেল দল। ’

প্রশ্ন : আবাহনী-মোহামেডানের কোনো ম্যাচ?

আশরাফ : আবাহনী-মোহামেডানের সব ম্যাচ স্মরণীয়। শুধু ওই ০-৪ গোলে হারার ম্যাচ বাদ দিয়ে।

প্রশ্ন : খেলা ছাড়ার পর কোচও তো হন আপনি?

আশরাফ : অনেক ক্লাবে কোচিং করাই। বিআরটিসি, আবাহনী, ভিক্টোরিয়া, আদমজী, মুক্তিযোদ্ধা এমন সব দলের। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল নিয়ে কোচ হিসেবে যাই সৌদি আরবে। এ ছাড়া ১৯৯৯ সালের দিকে কোচ হিসেবে সৌদি আরবে গিয়ে একবছর চাকরি করে আসি। ওদের এয়ারফোর্সের ছোট ছেলেদের কোচ ছিলাম। এখন শেখ জামাল ক্লাবের ফুটবল কমিটির সদস্য হিসেবে আছি। মাঝে কোচ ছিল না, তখন অনানুষ্ঠানিকভাবে সে দায়িত্ব পালন করি।

প্রশ্ন : বিয়ে করেন কবে?

আশরাফ : ১৯৭৯ সালে। স্ত্রীর নাম রাশিদা খাতুন। আমাদের দুই সন্তান। ছেলে শেখ কাউসার আলী মিশু ব্যবসা করছে। মেয়ে সুলতানা ইয়াসমিন আশা এমবিএ শেষ করে করছে চাকরি। আর আমিও কোচিংয়ের পর কিছু সময় চাকরী করি। অ্যাডভান্সড ডেভেলপমেন্টে ছিলাম। এরপর সালাউদ্দিনের ছোট ভাই জয়ের এসএস স্টিলে ছিলাম। বছরখানেক আগে সেখান থেকে অবসর নিই।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। জীবন নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে তৃপ্তি কতটা?

আশরাফ : অতৃপ্তি বলে কিছু নেই। আমি পুরোপুরি তৃপ্ত। ক্যারিয়ার বলুন কিংবা ব্যক্তিগত জীবন—সব দিকেই খুশি। সবচেয়ে বড় আনন্দ, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের হয়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে পেরেছি। আমাদের যুদ্ধ অস্ত্র হাতে ছিল না, কিন্তু তার চেয়ে কোনো অংশে কমও না। আমি বেঁচে থাকব না, কিন্তু এই ইতিহাস থাকবে চিরকাল। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্য হিসেবে আমাদের নাম থাকবে। এর চেয়ে বেশি আর কী পাওয়ার? এর বাইরেও মাঠের ফুটবল খেলেছি মনের আনন্দে। কোনো অতৃপ্তি নেই। দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছি; পেয়েছি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার। আর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও খুব সন্তুষ্ট। হ্যাঁ, আরেকটু অর্থকড়ি থাকলে, স্বাচ্ছন্দ্য থাকলে হয়তো ভালো হতো। কিন্তু আমি ওসব পাত্তা দিই না। যখন যে অবস্থায় থাকি, মানিয়ে চলি। চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। যে কারণে ৭০ বছর বয়সেও দিব্যি আছি।


মন্তব্য