kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

আসল জয়

রাহেনুর ইসলাম

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আসল জয়

জনি ব্রাউনলি-অ্যালিস্টার ব্রাউনলি

১০ কিলোমিটার দৌড় জয়ের দ্বারপ্রান্তেই ছিলেন। প্রথম হলে জিততে পারতেন বিশ্ব ট্রায়াথলনের শিরোপাও।

কিন্তু প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে ফিনিশিং লাইনের কাছাকাছি এসে পড়ে যাচ্ছিলেন জনি ব্রাউনলি। মেক্সিকোর কোজুমেলের ট্র্যাকে জনির পেছনেই তখন তাঁর বড় ভাই অ্যালিস্টার ব্রাউনলি। তিনিও নামি অ্যাথলেট। অলিম্পিকে সোনা জিতেছেন দুবার। জনি পড়ে গেলে তাঁর সামনে সুযোগ ছিল রেসটা জেতার। কিন্তু ভাইয়ের দুর্দশায় তাঁকে পেছনে ফেলার সুযোগটা নেননি ২৮ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ। ছোট ভাইকে এগিয়ে দেন নিজের কাঁধ। শেষ কয়েক মিটার জনির হাত কাঁধে নিয়ে পৌঁছেন ফিনিশিং লাইনে। এরপর ধাক্কা দিয়ে জনিকে পার করিয়ে দেন লাইন। আর নিজে হন তৃতীয়। তবে বিশ্ব ট্রায়াথলন ফেডারেশন দুই ভাইকেই যৌথভাবে দ্বিতীয় ঘোষণা করেছে।

এমন মহানুভবতায় অ্যাথলেটিকস দুনিয়ায় এখন শ্রদ্ধার পাত্র অ্যালিস্টার। তিনি এগিয়ে না এলে ট্র্যাকে পড়ে মারাও যেতে পারতেন জনি ব্রাউনলি। কেননা জনি লাইন পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি ঢালা হয়েছিল মাথায়। এরপর সোজা হাসপাতালে। সেখানে বিছানায় শুয়ে থাকার একটি ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘ধন্যবাদ অ্যালিস্টার। নতুন জীবন পেলাম তোমার কারণে। ’ ছোট ভাইয়ের মৃত্যু শঙ্কা করেছিলেন অ্যালিস্টারও, ‘তখন পড়ে গেলে আর সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা না পেলে মারাও যেতে পারত জনি। নির্বোধটা এমন গরমেও সঙ্গে যথেষ্ট পানি রাখেনি। ওর জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও নিজের কাঁধ এগিয়ে দিতাম আমি। ’ দুই ভাইকেই ডিসকোয়ালিফাইড করার আবেদন জানিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকান ট্রায়াথলন ফেডারেশন। কিন্তু বিশ্ব ট্রায়াথলন ফেডারেশন বাতিল করে সেই আবেদন। উল্টো সংস্থাটি প্রশংসাই করে দুই ভাইয়ের, ‘স্পোর্টসম্যানশিপের অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে ব্রাউনলি ভাইয়েরা যা অনুকরণীয়। এটাই আসল জয়। ’

এমন খেলোয়াড়ি আচরণের দৃষ্টান্ত আরো আছে ক্রীড়াঙ্গনে। এবারের রিও অলিম্পিকের কথাই ধরুন। মেয়েদের পাঁচ হাজার মিটার দৌড়ের বাছাইপর্বে ভালো অবস্থানে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাবি ডি অগুস্তিনো ও নিউজিল্যান্ডের নিক্কি হাম্বলিন। শেষ দুই হাজার মিটারের সময় সংঘর্ষ হয় দুজনের। দুজনই তখন ট্র্যাকে লুটিয়ে। হাম্বলিনকে একা না ছেড়ে এগিয়ে যান অ্যাবি ডি অগুস্তিনো। তাঁকে তোলার পর আবারও দৌড় শুরু দুজনের। কিছু দূর যেতেই পায়ের ব্যথায় লুটিয়ে পড়েন অ্যাবি ডি অগুস্তিনো। পাশেই থাকা নিক্কি হাম্বলিনও ছেড়ে যাননি তাঁকে। শেষ পর্যন্ত ফিনিশিং লাইন অতিক্রম করেন দুজনই। স্বাভাবিকভাবে তাঁরা জিততে পারেননি রেসটা। তবে জিতেছেন সবার হৃদয়। এমন খেলোয়াড়ি আচরণের জন্য আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি ‘পিয়েরে দ্য কুবার্তিন’ অ্যাওয়ার্ডে সম্মানিত করে দুজনকেই।

১৯৯৬ সালে সেইলিংয়ের ভেন্দে গ্লোব ওয়ার্ল্ড রেসে ঝড়ো বাতাসে ডুবতে বসেছিলেন ফ্রান্সের সেইলর রাফায়েল দিনেলি। দূর থেকে ব্যাপারটা লক্ষ করছিলেন ইংল্যান্ডের সেইলর পিট গুস। তিনি তখন ভালো অবস্থানে। কিন্তু দিনেলিকে বাঁচাতে ছুটে যান রেস ভুলে। অস্ট্রেলিয়ান বিমানবাহিনীর সহায়তায় পরে উদ্ধার হন দিনেলি। এমন স্পোর্টসম্যানশিপ আর সাহসিকতায় ফরাসি সরকার ‘লিজিয়ন ডি অনার’ পুরস্কারে সম্মানিত করে পিট গুসকে। পুরস্কারটা নেওয়ার সময় গুস জানিয়েছিলেন, ‘রেসের আগে ওকে চিনতাম না আমি। কেননা অনেক পরে যোগ দিয়েছিল ও। সে যাই হোক কাউকে ডুবতে দেখে রেসটা জেতার চিন্তাই করিনি। ’

গতবছর অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের দ্বিতীয় রাউন্ডেও ঘটেছিল স্মরণীয় একটি মুহূর্ত। শেষ সেটে টিম স্মিজেকের বিপক্ষে ৬-৫ আর ৩-০ গেমে এগিয়ে থেকে সার্ভ করছিলেন রাফায়েল নাদাল। এক দর্শকের শব্দে মনোযোগ হারিয়ে প্রথম সার্ভটা বাইরে মেরেছিলেন নাদাল। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আম্পায়ারকে স্মিজেক জানান, ‘নাদাল যেন দুটি সার্ভেরই সুযোগ পায়। ’ মাইকে আম্পায়ার সেই ঘোষণা দেওয়ার পর নাদাল কৃতজ্ঞতা জানান ইশারায়। গ্যালারিও করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানায় স্মিজেককে। শেষ পর্যন্ত ৬-২, ৩-৬, ৬-৭, ৬-৩, ৭-৫ গেমে ম্যাচটা জেতেন নাদাল। কিন্তু দর্শক হৃদয় জয় করে নেন স্মিজেক।

২০০০ সালে ইংলিশ লিগে ম্যাচ চলছিল ওয়েস্ট হাম ও এভারটনের। ১-১ সমতার ম্যাচটিতে শেষদিকে তুমুল উত্তেজনা। ওয়েস্ট হামের একটি আক্রমণের সময় বক্সের বাইরে পড়ে গিয়েছিলেন এভারটন গোলরক্ষক পল জেরার্ড। সে সময়ই এক সতীর্থের ক্রস বক্সে ফাঁকায় পেয়ে যান ওয়েস্ট হামের ইতালিয়ান তারকা দি ক্যানিও। চাইলে বুক দিয়ে বল রিসিভের পর করতে পারতেন গোলও। কিন্তু গোলরক্ষককে মাটিতে লুটিয়ে থাকতে দেখে বলটা হাত দিয়ে ধরে চিকিৎসা করতে বলেন গোলরক্ষকের। পাশেই থাকা এভারটনের খেলোয়াড়রা এমন আচরণে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি ক্যানিওকে।

১৯৯৮ সালে পেশোয়ার টেস্টে ৩৩৪ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক মার্ক টেলর। পাকিস্তানি বোলারদের নিয়ে যেভাবে ছেলেখেলায় মেতেছিলেন তাতে করতে পারতেন ৪০০ রানও। কিন্তু ক্রিজ ছাড়েন ৩৩৪ রানেই। কারণ সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান ডন ব্র্যাডম্যানেরও সর্বোচ্চ রানের স্কোর ৩৩৪। ব্র্যাডম্যানের রেকর্ডটা অক্ষুণ্ন রাখতে আর ব্যাট করেননি তিনি।

শেষ করা যাক বাবা-ছেলের গল্প দিয়ে। ১৯৯২ অলিম্পিকের ৪০০ মিটার দৌড় সেমিফাইনালের ঘটনা। ভালো শুরু করেও ড্যারেক রেডমন্ড ১৫০ মিটার আগে ট্র্যাকে বসে পড়েন পায়ের পেশীতে টান পড়ায়। কিছুক্ষণ পর এক পায়ে চেষ্টা করেন রেসটা শেষ করার। দর্শকরা করতালি দিয়ে উৎসাহ জুগিয়ে যাচ্ছিলেন রেডমন্ডকে। কিন্তু পা-টা টানছিল না আর। তখনই গ্যালারি থেকে দৌড় আসেন তাঁর বাবা কিম রেডমন্ড। শেষ পর্যন্ত বাবার কাঁধে হাত রেখে শেষ করেন দৌড়টা। এরপর বাবা-ছেলে দুজনই ভেঙে পড়েন কান্নায়, যা ছুঁয়ে গিয়েছিল পুরো গ্যালারিকে।


মন্তব্য