kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রত্যাশা পেশাদার নৈপুণ্যের

সাইদুজ্জামান

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



প্রত্যাশা পেশাদার নৈপুণ্যের

দেশের এক নম্বর খেলা। তার ওপর বাকি খেলাগুলোর অবস্থা এতটাই নাজুক যে খেলা না থাকলেও ক্রিকেটের পেছনে সর্বমহলের ভিড়টা লেগেই থাকে! তাই ক্রিকেটাঙ্গন নতুন মৌসুমকে সামনে রেখে সরগরম—এভাবে ঠিক বলা যাচ্ছে না।

তবে এটা ঠিক যে এমন একটি মৌসুমে পা রাখতে যাচ্ছেন মাশরাফি বিন মর্তুজারা, যা তাঁদের জন্য অনেকটাই অপরিচিত। হোম সিরিজ তো আছেই, সঙ্গে দেশের বাইরে উপমহাদেশ ছাড়িয়ে সুদূর ট্রান্স-তাসমান পরিবেশেও খেলবে বাংলাদেশ। বলার অপেক্ষা রাখে না, এর মধ্যে আগামী বছরের জুলাইয়ে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিকে ঘিরে বড় স্বপ্নও আছে মাশরাফিদের। ক্যালেন্ডারটা ঠিকঠাক থাকলে পরের ১০ মাসে সাতটি টেস্ট, ১৯টি ওয়ানডে আর গোটা চারেক টি-টোয়েন্টির ‘পাগলা ঘণ্টি’ বাজছে ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে।

পাগলা ঘণ্টিই তো! যাঁরা গত প্রায় ১৫ মাসে কোনো টেস্ট খেলেননি, ১০ মাস আগে শেষ ওয়ানডে খেলেছেন, তাঁদের জন্য এত ম্যাচ টানা খেলে যাওয়া সহজ নয় মোটেও; সে আপনি যতই ক্ষুধার্ত কিংবা চনমনে হন না কেন! দীর্ঘ বিরতি নিঃসন্দেহে মুশফিক-সাকিবদের ক্ষুধা বাড়িয়েছে। চলমান ফিটনেস অ্যান্ড ট্রেনিং ক্যাম্পের যা খবর, তাতে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ফিট বাংলাদেশ দল। তবু লাগাতার ম্যাচের ধকল তো আর অস্বীকার করা যাবে না। আবার অন্য দেশের দিকে তাকালে মনে হবে, এ যুগের ক্রিকেটারদের জীবন তো এমনই। আজ টেস্ট খেলে কাল সকালে ওয়ানডে আর রাতে টি-টোয়েন্টি। যদি পারো তো তাল মিলাও, নইলে অন্য কিছু করার পথ তোমার সামনে সর্বদাই উন্মুক্ত!

অবশ্য এর কোনোটিই অভিযোগ নয়। বরং ব্যস্ত সূচিতে ‘উন্নয়নশীল ক্রিকেট রাষ্ট্র’ বাংলাদেশ কি প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেটিই হতে পারে পরের ১০ মাসের প্রধানতম আকর্ষণ। রোমাঞ্চের তো অভাব নেই। ওয়ানডেতে ক্রমশ দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠা বাংলাদেশ পারবে তো ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডকে কাবু করতে? টেস্টে কি আবার দুধদাঁত বেরিয়ে পড়বে মুশফিকুর রহিমদের? ট্রানজিশনের মধ্য দিয়ে যাওয়া শ্রীলঙ্কাকে কি চোখ রাঙানো যাবে না এবারও? ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে আরেকবার কি বাঘের গর্জন শোনানো যাবে? চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বিশ্বকে চমকে দেওয়ার স্বপ্ন কি পূরণ হবে? এমন সব প্রশ্নে মিশে রোমাঞ্চ। রোমাঞ্চ প্রত্যাশাও তৈরি করবে নিশ্চিতভাবেই, যে চাপ বয়ে বেড়ানো কঠিনও। তাই ধরেই নেওয়া যায়, ২৫ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডের প্রথম বলটা গড়ানোর পর থেকে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি পর্যন্ত প্রেশার কুকারে বসে পড়বেন মাশরাফিরা। প্রত্যাশার বেলায় আমরা ন্যায়-অন্যায় নিয়ে থোড়াই পরোয়া করি!

যিনি বা যাঁরা মৌসুম শুরুর পরিকল্পনায় আফগানিস্তানকে রেখেছেন, তিনি বা তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ। চ্যালেঞ্জে ভরপুর একটা মৌসুমের আগে এ রকম একটি সিরিজ বড্ড দরকার ছিল। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে দীর্ঘ লে-অফে থাকা বাংলাদেশের জন্য। পরের মাসেই ইংল্যান্ড সিরিজের আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের হাওয়া যে গায়ে মেখে নেওয়া যাবে।

প্রস্তুতি মানেই কিন্তু আর সেই ঢিলেঢালা ব্যাপারস্যাপার নেই। তাই আফগানিস্তান সিরিজের আগে প্রস্তুতি জুড়ে দেওয়ায় আবার ভাববেন না যে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। যত দূর জানি, এ সিরিজটিকেও পর্যাপ্ত মর্যাদা দিচ্ছে বাংলাদেশ দল। তবে আফগানরা যে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল, এ নিয়ে তো আর দ্বিমত নেই। একজন ক্রিকেটারের জন্য যেমন অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল অভিষেকের জন্য যথোপযুক্ত, তেমনি ব্যস্ত মৌসুম শুরুর আগে র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকা দলের সঙ্গে খেলতে চায় বিশ্বের সব দেশই। ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন বাজে আসন্ন মৌসুমের প্রস্তুতি সংগীত।

কেউ কেউ ভাবছেন, আকস্মিক ভয়ংকর হয়ে ওঠার ক্ষমতা আছে আফগানদের। এখন সেই দলটির কাছে হারলে তো মৌসুমের শুরুতেই মানসিকভাবে ভেঙেচুরে যাবে বাংলাদেশ! যুক্তি আছে, তবে বেশি আছে ভীতি। কিন্তু ভয় নিয়ে আর যাই হোক, ক্রিকেট খেলা যায় না। আশার কথা, এ ভয় বাংলাদেশ দলের কাছে ‘প্রাগৈতিহাসিক’। ২০১৫ বিশ্বকাপ ম্যাচে আফগানিস্তানকে হারানোর পর থেকে নেই বলেই জানি। তবে ক্রিকেট ম্যাচ যখন, তখন পূর্বাভাস পাল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকছেই। তবে যদি পাল্টেও যায়, তাতে বাংলাদেশ দলের দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি নয়। যদি সে রকম কিছু হয়ও, তবে ধরে নিতে হবে, গত বছরদেড়েকে মাশরাফিদের পারফরম্যান্স নিছকই ‘ফ্লুক’ ছিল। সাফল্য থেকে প্রত্যাশিত আত্মবিশ্বাস তাঁরা শুষে নিতে পারেননি।

অতটা নৈরাশ্যে আক্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ অবশ্য এখনই দেখা যাচ্ছে না। দলে নিজের জায়গা ধরে রাখার যে লড়াই, তাতে শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররাও যেভাবে লড়ছেন, তাতে বরং আশাবাদী হওয়ার উপকরণই বেশি। দরকার শুধু পেশাদার নৈপুণ্য। সবশেষ এশিয়া কাপে আফগানিস্তানের কাছে জেতা ম্যাচ হেরেছিল বাংলাদেশ। ফতুল্লার সে ম্যাচে তাদের পেশাদারিত্ব আড়ালে পড়ে গিয়েছিল অজানা ভীতির। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরের কোনো এক বা একাধিক দিনে আবারও ভীতি ছড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমে, ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। সিরিজের স্কোরলাইনটা তাই ৩-০ হওয়ারই কথা। আবার এদিক-সেদিকও হতে পারে। তবে মৌসুম শুরুর সিরিজে বাংলাদেশ দলের কাছে একটাই চাওয়া- পেশাদারি নৈপুণ্য। হাল না ছাড়া ও অভাবিত কোনো ফলে ভেঙেচুরে না যাওয়া। সময় কোথাও থেমে থাকে না। এ মৌসুমে সময় তো আর দ্রুতগামী!

এরপরই ইংল্যান্ড। এই সিরিজের পারফরম্যান্সটা আবার সর্বজনীন। মাঠের খেলার বাইরে বাংলাদেশ সরকার, ক্রিকেট বোর্ড, মিডিয়া থেকে শুরু করে গ্যালারির দর্শক; এমনকি আমজনতারও ‘রোল’ থাকবে। থাকতে হবে পরিস্থিতির কারণেই। নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বাংলাদেশে আসেনি অস্ট্রেলিয়া। ইংল্যান্ডও কম গাইগুই করেনি। এ অবস্থায় মাঠের ক্রিকেটে গড়াগড়ি খেলেও বাইরে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতেই হবে বাংলাদেশকে। মাঠের বাইরে একটা মুহূর্তের ‘স্খলন’ কিন্তু ডেকে আনতে পারে ভয়ংকর পরিণতি। আশার কথা, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নির্বিঘ্নে ক্রিকেট হয়েছে বাংলাদেশে। আশা করি, আতিথ্যে মুগ্ধ হয়েই দেশে ফিরবেন অ্যালিস্টার কুকরা।

মাঠেও সুখবরের আগাম সৌরভ। আফগানদের সঙ্গে তিনটি ওয়ানডে খেলে ইংল্যান্ড সিরিজের প্রস্তুতি নিয়ে রাখবে বাংলাদেশ। সঙ্গে ঘরের মাঠের সুবিধা থাকায় মাশরাফিদের ঘিরে তৈরি হবে প্রত্যাশা। ওয়ানডে সিরিজকে ঘিরে বাংলাদেশ দলের ভেতরেও রয়েছে প্রত্যাশা। ৩-০ নাকি ২-১; এ নিয়ে চাপা আলোচনা হওয়াও আর অবাস্তব নয়।

তবে একটা কথা রয়েছে। এউয়েন মরগ্যান ও অ্যালেক্স হেলস আসছেন না বলে আবার ইংল্যান্ডকে দুর্বল দল ভাববেন না। ওয়ানডে থেকে বিশ্রাম নিয়েছেন জো রুটও। তবু ইংল্যান্ড ইংল্যান্ডই আছে। এ যুগে দলের বাইরে কারো ছিটকে যাওয়ায় আর মুষড়ে পড়ে না কোনো দল। একজনের অনুপস্থিতিতে পাওয়া সুযোগটা নতুন কারো কাজে লাগানোর চেষ্টা আগের মতো এখনো আছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে অভ্যস্ততা। তিন ফরম্যাটে লাগাতার ক্রিকেটের কারণে ইনজুরি ও বিশ্রাম এখন নিয়মিত ব্যাপার, তাতে কখনোসখনো নামি ক্রিকেটারের অনুপস্থিতির অভাব পূরণ করতেও শিখে গেছে সব দল। বাংলাদেশও তো মুস্তাফিজুর রহমানকে ছাড়া খেলবে এ সিরিজ দুটি।

তাই ইংল্যান্ড ইংল্যান্ডই থাকছে। মুস্তাফিজহীন বাংলাদেশও সমান শক্তির দল। তো, অক্টোবরের এই শো-ডাউনের আগে আফগানিস্তানকে কোন পাল্লায় মাপবে বাংলাদেশ? মাপামাপির দরকার নেই, নিজেদের সেরা ক্রিকেটটাই খেলতে হবে মাশরাফিদের। সামান্যতম ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই, তা যতই ব্যস্ত মৌসুমের প্রস্তুতি সিরিজ হোক না কেন।


মন্তব্য