kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ওদের পায়েই ভবিষ্যৎ

শাহজাহান কবির   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ওদের পায়েই ভবিষ্যৎ

বয়সভিত্তিক ফুটবলের একটা জাগরণ হয়েছে, অনেকটাই অলক্ষ্যে। গত বছর অনূর্ধ্ব-১৬ সাফ ফুটবলে ছেলেরা চ্যাম্পিয়ন হয়ে সেটি প্রথম দেখিয়েছে।

একই সময়ে অনূর্ধ্ব-১৪-এর মেয়েদের দাপট দেখানো শুরু। সেই ধারাবাহিকতায় এবার অনূর্ধ্ব-১৬-এর আসরে ইতিহাস গড়া।

অনূর্ধ্ব-১৬-এর ছেলেদের পরিণতি ভয়াবহ। যে একাডেমি থেকে তারা নিজেদের তৈরি করেছে, চ্যাম্পিয়নশিপের পরপর উপহার হিসেবেই কি না সেই একাডেমিটি বন্ধ করে দেওয়া হলো। একবছর পেরিয়ে গেছে, সাদ, নিপুদের খুঁজে পেতেই এখন আতশ কাচ প্রয়োজন। মেয়েরা এভাবে হারিয়ে যাচ্ছে না এটা বলাই যায়। কারণ আগামী বছর থাইল্যান্ডে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের মূল পর্ব খেলবে তারা। তার আগে সাফের দলেও সুযোগ পাবে এই দলের সেরা পারফরমাররা। মেয়েদের ঘরোয়া ফুটবল এখনো সেভাবে দাঁড়ায়নি বাংলাদেশে, জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ হলেও অনিয়মিত, লিগ শুরু হয়েও বন্ধ হয়ে গেছে। এর বাইরে কোনো টুর্নামেন্টও হয় না। গত বছরদুয়েক এএফসির টুর্নামেন্টের ব্যস্ততায় বয়সভিত্তিক জাতীয় দলই অগ্রাধিকার পেয়েছে সবচেয়ে বেশি। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে প্রতিভা বাছাই, ক্যাম্প ও জাতীয় দলের অনুশীলন—এই তিনটি ধাপেই মূলত কাজ হয়েছে। কোচ গোলাম রব্বানী সে কারণেই অনূর্ধ্ব-১৬-এর মেয়েদের সাফল্যের পেছনে ফেডারেশনের অবদানকেই দেখেন সবচেয়ে বড় করে।

ঠিক একবছর পর শুরু হতে যাওয়া মূল পর্বের জন্য এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই হবে মূল ব্যাপার। বাছাই পেরিয়ে বাংলাদেশ এই প্রথম খেলবে সেই আসরে। যেখানে প্রতিপক্ষ তিনবারের চ্যাম্পিয়ন জাপান, দুবারের চ্যাম্পিয়ন উত্তর কোরিয়া, এক আসরে শিরোপা জেতা দক্ষিণ কোরিয়া। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সপ্তম অংশগ্রহণ হবে এটি, উত্তর কোরিয়া খেলবে ষষ্ঠবারের মতো। এ ছাড়া স্বাগতিক থাইল্যান্ড ও চীন আগের সব কয়টি আসরেই খেলেছে। অস্ট্রেলিয়াও অংশ নেবে পঞ্চমবারের মতো। ২০০৫ সালে শুরুর আসরে বাছাই পর্ব ছাড়াই সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ, কিন্তু বাছাই পেরিয়ে ১১ বছর পর এই প্রথম সুযোগ হলো বাংলাদেশের। প্রতিপক্ষ দলগুলোর সঙ্গে ব্যবধানটা এখানেই স্পষ্ট। নিজেদের ব্যাপক উন্নতি ছাড়া এই মূল পর্বের লড়াইয়ে লড়াই করাটাই যে কঠিন হবে এটা নিশ্চিত। ফেডারেশন তার জন্য কিভাবে কাজ শুরু করে এটিই হবে দেখার।

মেয়েরা তৈরি সব কিছুর জন্য, এ নিয়ে সন্দেহ নেই। বরং এই আসরে চ্যাম্পিয়নশিপ নিশ্চিতের পর তারাই বারবার আহ্বান জানিয়েছে, ফুটবল ফেডারেশন যেন প্রস্তুতির এই গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রয়োজনীয় সব কিছু করে। কোচ রব্বানীরও একই ভাবনা। ফেডারেশন কাজের সুযোগ করে দিলেই শুধু দলটাকে তিনি তৈরি করতে পারবেন এশিয়ার মূল লড়াইয়ে, ‘ওসব দলের (জাপান, কোরিয়া) বিপক্ষে ইরান, চায়নিজ তাইপেও পাঁচ-ছয় গোল হজম করে। বাছাই চ্যাম্পিয়ন হয়েই আমাদের কাজ তাই শেষ হয়ে যায়নি। বরং এখন আরো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আরো বেশি সুযোগসুবিধা দিয়ে এই দলটিকে এখন তৈরি করতে হবে। ’ বাছাইয়ের আগে বাইরের কোনো দলের বিপক্ষে একটিও প্রস্তুতি ম্যাচ খেলা হয়নি কৃষ্ণা, সানজিদাদের। সেই ঘাটতি তারা পুষিয়েছে দ্বিগুণ পরিশ্রম করে। দুই মাস আগে ঈদের ছুটির সময়ও তারা ক্যাম্পে। এবারের জয়ে সেই পরিশ্রম, ক্লান্তি অবশ্য ফুত্কারেই উড়ে গেছে। বরং নতুনভাবে উদ্দীপ্ত এখন এই মেয়েরা। বিশ্বকাপের স্বপ্নে যে এখন চোখ রাঙিয়েছে। সাধনায় সাধ মিটবে—এই বিশ্বাসও এখন তাদের বুকে। ভারত, ইরানকে হারানো সম্ভব—এটিও একসময় ভাবা যায়নি। মূল জাতীয় দল ভারতের বিপক্ষে হালি গোল হজম করেই অভ্যস্ত। ইরানিদেরও ছন্দময় ফুটবল থেকে একসময় এমনও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মেয়েদের এই মাপের শারীরিক সামর্থ্যই নেই। কতই না ভুল ছিল সেসব চিন্তা। অনূর্ধ্ব ১৬ দলই ২০১৪ সালে প্রথম দেখাল, তারাও লড়াই করতে পারে। সেবারের বাছাইয়ে ইরান, ভারত কাউকে হারানো না গেলেও লড়াই করেছিল সানজিদা, লিপিরা। কে ভাবতে পেরেছিল দুই বছরের ব্যবধানে তারাই সাধারণের কাতারে নামিয়ে আনবে ফাতেমি-ঘাসেমিদের! কৃষ্ণা, মৌসুমীরা এই বিশ্বাসটাই এখন বদলে দিয়েছে।

এবারের আসরে সবচেয়ে নজরকাড়া পারফরম্যান্স কৃষ্ণা রানীর। টাঙ্গাইলের এই মেয়ে মাঠে বিচরণ করে এতটাই স্বচ্ছন্দে যে মনে হয় ফুটবলটা তার রক্তে মিশে। দারুণ প্রতিভার সঙ্গে অসাধারণ সাহস—দুইয়ে মিলে প্রায় অপ্রতিরোধ্য ছিল এই কিশোরী। কৃষ্ণারও আগে নিজেকে জানান দিয়েছিল সানজিদা। ২০১৪ সালেই তার স্কিল দেখে মুগ্ধ গ্যালারি। এবারও তার প্রতিটা মুভমেন্টে প্রতিপক্ষ ডিফেন্স এলোমেলো হয়ে গেছে, গোলের সুযোগ তৈরি করে ফেলেছে বাংলাদেশ। মেয়েদের স্কিল ও সামর্থ্য নিয়ে যাঁরা সন্দিহান ছিলেন তাঁরাও এখন ভক্ত বনে গেছেন এই কিশোরী ফুটবলারদের। কৃষ্ণা, সানজিদা, অনুচিংরা দেশের ফুটবলেরই শুধু এখন বড় বিজ্ঞাপন নয়, বরং সাফল্য পেতে লড়াই করা এমন সবার অনুপ্রেরণাও। মেয়েদের ফুটবল শুরু করাটাই একসময় বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এখন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েরা পর্যন্ত ফুটবলে নাম লেখাচ্ছে। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ড কাপেই শুরু এই মেয়েদের। তাতে মাত্র কয়েক বছরেই বাংলাদেশ নাম লিখিয়ে ফেলেছে এশিয়ান এলিটদের কাতারে। সামনে অপার সম্ভাবনা যে পড়ে রয়েছে তা নিয়ে তাই সংশয় থাকার কথা নয়। সানজিদা, কৃষ্ণারা আজ বয়সভিত্তিক আসর মাতাচ্ছে, একসময় মূল জাতীয় দলের হয়েও তারা আগের সব সাফল্য ছাড়িয়ে যাবে, এই স্বপ্নটাও এখন জোরালো। ২০১০ থেকে বাংলাদেশেরা মেয়েরা সাফ ফুটবল খেলছে, আজ পর্যন্ত তারা ফাইনাল খেলতে পারেনি। অনূর্ধ্ব-১৬-তেই এশিয়ার সেরাদের কাতারে নাম লেখিয়ে ফেলা কৃষ্ণারা এই ইতিহাসটাও বদলে দেবে—এমনটা তো আশা করাই যায়।


মন্তব্য