kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দল বদলের উত্তাপ

মাজহারুল ইসলাম    

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



দল বদলের উত্তাপ

আপাতত বন্ধ কেনাবেচা। পর্দা নেমে গেছে গ্রীষ্মকালীন দলবদলের জানালার।

জানুয়ারির শীতকালীন উইন্ডোয়ও হয় ফুটবলার বেচাকেনা। তবে নতুন মৌসুম শুরুর আগে দল গুছিয়ে নেওয়ার আসল কাজটা ক্লাবগুলো সেরে নেয় এই গ্রীষ্মের বাজারেই। তাই এর পরতে পরতে থাকে চমক আর ভরপুর নাটক। থাকে টাকার ঝনঝনানি। প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবকে টেক্কা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত খেলোয়াড়কে দলে ভেড়াতে রীতিমতো টাকার বস্তা নিয়ে বসে থাকে জায়ান্টরা। পরস্পরের সঙ্গে লিপ্ত হয় অন্য রকম এক প্রতিযোগিতায়! 

এবারের গ্রীষ্মকালীন দলবদলের বাজারেরও শুরু থেকে শেষ দিন পর্যন্ত জমানো ছিল ভরপুর চমক আর নাটকীয়তায়। ইউরোপের সেরা তিন লিগ, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, ইতালিয়ান সিরি ‘এ’ ও জার্মান বুন্দেসলিগা টাকা খরচে ভেঙেছে নিজেদের আগের  রেকর্ড। ফুটবলে সর্বকালের সেরা ব্যয়বহুল ট্রান্সফারের দুটিই কিন্তু হয়েছে এই গ্রীষ্মকালীন দলবদলে।

পল পগবাকে জুভেন্টাস থেকে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ফিরিয়ে আনতে হোসে মরিনহোর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ভেঙেছে ট্রান্সফারের সর্বকালের সব রেকর্ড। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ট্রান্সফার রেকর্ডের সঙ্গেও জড়িয়ে তুরিনের ওল্ড লেডিদের নাম। বিক্রেতা নয়, এবার ইতালিয়ান চ্যাম্পিয়নরা ক্রেতা। পগবাকে ছেড়ে দিয়ে নাপোলি থেকে গনসালো হিগুয়েইনকে কিনতে ৯০ মিলিয়ন ইউরো ব্যয় করেছে জুভেন্টাস। টাকার অঙ্কে যা সর্বকালের চতুর্থ সর্বোচ্চ ট্রান্সফারের রেকর্ড। আবার অপছন্দের খেলোয়াড়কে বিনা পয়সায় ছেড়ে দেওয়ার নজিরও আছে। এই যেমন ইতালির মেজাজি ফরোয়ার্ড মারিও বালোতেল্লিকে নিসের কাছে তুলে দিতে লিভারপুল নেয়নি কানাকড়িও।

গ্রীষ্মকালীন দলবদলের পুরোটা জুড়ে ছিল পগবার জুভেন্টাস ছাড়ার গুঞ্জন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে তাঁকে পাওয়ার লড়াইয়ে ছিল রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবও। তবে নিজ দেশের ইউরোয় প্রত্যাশিত আলো ছড়াতে না পারায় হয়তো রণেভঙ্গ দেয় চ্যাম্পিয়নস লিগের বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। ফরাসি তারকা শেষ পর্যন্ত ফিরে যান পুরনো ডেরায়! ম্যানইউতে। তাতে সবচেয়ে ‘দামি’ ফুটবলারও বনে যান পগবা। ১০৫ মিলিয়ন ইউরোয় ট্রান্সফারের নতুন রেকর্ড গড়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনে যে রেড ডেভিলরা।

একসময় পগবার ঠিকানা ছিল ওল্ড ট্র্যাফোর্ডই। ম্যানইউর বড় দলে অভিষেকের পরের বছরই ২০১২ সালে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের দল ছেড়ে পাড়ি জমান জুভেন্টাসে। চার বছর পর সেই পগবার গায়ে ১০০ মিলিয়ন ইউরোর তকমা লাগিয়ে তাঁকে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ফিরিয়ে আনলেন হোসে মরিনহো। দামটা একটু বেশিই হয়ে যায়নি তো!

মরিনহো কোচ হওয়ার পর মানইউয়ে প্রথম নাম লেখান ভিয়ারিয়াল ছেড়ে আসা এরিক বেইলি। নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফ্রি ট্রান্সফারে প্যারিস সেন্ত জার্মেইন থেকে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে পাড়ি জমিয়েছেন জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচও। ফরাসি চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না করে সুইডিশ এ স্ট্রাইকার নাম লেখান রেড ডেভিলসে। আর বরুশিয়া ডর্টমুন্ড ছেড়ে ৪২ মিলিয়ন ইউরোয় ম্যানইউয়ে এসেছেন হেনরিখ মিখিতারিয়ান। গ্রীষ্মের দলবদলে ম্যানইউর খরচের অঙ্কটা ১৮৫ মিলিয়ন।

সিগনাল ইডুনা পার্ক ছেড়ে ম্যানচেস্টারে নতুন ঠিকানা গড়েছেন ইকে গুন্ডোগানও। তাঁর নতুন ঠিকানা অবশ্য ওল্ড ট্র্যাফোর্ড নয়, ২৭ মিলিয়ন ইউরোয় তিনি নাম লিখিয়েছেন ম্যানচেস্টার সিটিতে। চলতি মৌসুমে সিটিজেনদের দায়িত্ব নেওয়া পেপ গার্দিওলা সেল্তা ভিগো থেকে উড়িয়ে এনেছেন স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড নলিতোকেও। নতুন মৌসুমে গার্দিওলার শিষ্য হয়েছেন জন স্টোনসও। এভারটন থেকে তাঁকে উড়িয়ে আনতে সিটিজেনদের ব্যয় করতে হয়েছে ৫৬ মিলিয়ন ইউরো। শালকে থেকে জার্মান ফরোয়ার্ড লিরয় সানেকে কিনেছে ৪৪ মিলিয়ন ইউরোয়। সব মিলিয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার ক্লাবগুলোর মধ্যে সবেচেয়ে বেশি ২১২.৮ মিলিয়ন খরচ করেছে গার্দিওলার ম্যানসিটিই। এই সিটিজেনদের ছেড়ে তুরিনোয় খেলতে গেছেন ইংলিশ গোলরক্ষক জো হার্ট।

দলবদলের বাজারে খরচ করেছেন আর্সেন ওয়েঙ্গারও। বরুশিয়া মুনশেনগ্ল্যাডবাখ থেকে সুইজারল্যান্ড ফুটবলার গ্রানিত জাকাকে আর্সেনালে ভেড়াতে তাঁকে গুনতে হয়েছে ৪৫ মিলিয়ন ইউরো। প্রায় সমান টাকা তিনি ব্যয় করেছেন ভ্যালেন্সিয়া থেকে শাকোদ্রান মুস্তাফিকে কিনতেও। দেপোর্তিভো লা করুনা থেকে স্প্যানিশ স্ট্রাইকার লুকাস পেরেসকে দলে ভিড়িয়েছে তারা ২০ মিলিয়ন ইউরোয়। সব মিলিয়ে গ্রীষ্মকালীন দলবদলের বাজারে ওয়েঙ্গারের খরচ ১১৩ মিলিয়ন ইউরো।

আরেক জায়ান্ট চেলসি খরচ করেছে ১১৩ মিলিয়ন। গ্রীষ্মকালীন দলবদলের জানালায় একেবারে শেষ দিনে চমক দেখিয়ে পিএসজি ছেড়ে পুরনো ঠিকানা স্ট্যাফোর্ড ব্রিজে ফিরে আসেন ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার দাভিদ লুইজ। এ জন্য চেলসিকে ব্যয় করতে হয়েছে ৪৫ মিলিয়ন ইউরো। আর বেলজিয়ানের তরুণ স্ট্রাইকার মিচি ব্যাতশুয়াইকে পেতে তাদের মার্শেইকে দিতে হয়েছে ৪০ মিলিয়ন। চেলসিতে এন্তোনিও কন্তের প্রথম চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়ও তিনি  আর ৩৮ মিলিয়ন ইউরোয় তারা লিস্টার সিটি থেকে কিনেছে ফরাসি মিডফিল্ডার এন গোলো কাতেঁকে।

সব মিলিয়ে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলো এবারের দলবদলে মোট ব্যয় করেছে ১.৪০৩ বিলিয়ন ইউরো। এরপরেই সিরি ‘এ’। তাদের অঙ্কটা ৬৬৯ মিলিয়ন। খরচের এ তালিকার শীর্ষে জুভেন্টাস। পল পগবাকে বিক্রি করে নগদ যে টাকা তারা পেয়েছিল তার প্রায় পুরোটাই ব্যয় করেছে তারা হিগুয়েইনকে কিনতে। নাপোলি থেকে আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডকে আনতে তাদের গুনতে হয়েছে ৯০ মিলিয়ন ইউরো। ব্যয়ে যা ফুটবল ট্রান্সফারেই তৃতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড। যদিও নাপোলিতে দুর্দান্ত একটি মৌসুম কাটানোর পরও জুভদের বিনিয়োগের পরিমাণ একটু বেশিই হয়ে গেল কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। রোমা ছেড়ে মিরালেন প্যানিকও যোগ দিয়েছেন জুভেন্টাসে। আর ফ্রি ট্রান্সফারে বার্সেলোনা থেকে তারা ভিড়িয়েছে ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক দানি আলভেজকে।

গ্রীষ্মকালীন জানালায় তৃতীয় সর্বোচ্চ খরচ বুন্দেসলিগার, ৫৪৩ মিলিয়ন। শীর্ষে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড। গ্রানিত জাকা-ম্যাট হুমেলসরা ইডুনা পার্ক ছেড়ে চলে গেলেও ফিরে এসেছেন জার্মানির হয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালের গোলদাতা মারিও গোেজ। ২০১৩ সালে ৩৭ মিলিয়ন ইউরোয় যোগ দিয়েছিলেন বায়ার্ন মিউনিখে। তিন বছর পর ২৬ মিলিয়ন ইউরোয় চার বছরের চুক্তিতে ফিরলেন পুরনো দলে। নতুন মৌসুমে বরুশিয়ার হয়ে খেলছেন তারকা আন্দ্রে শুর্লে ও মার্ক বার্তাও। সঙ্গে এমরিক অবামেয়াং ও মার্কো রয়েসদের রেখে দিয়ে বায়ার্নকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো দলই গড়েছে বরুশিয়া।

ব্যাভারিয়ানদের শক্তি বাড়িয়েছেন নতুন কোচ কার্লো আনচেলোত্তিও। বেনফিকা থেকে পর্তুগালের উঠতি তারকা রেনাতো সানচেসকে দলে ভিড়িয়েছে জার্মান চ্যাম্পিয়নরা। ইউরো শুরুর আগেই ব্যাভারিয়ানরা ৩৫ মিলিয়ন ইউরোয় দলে নিয়ে রেখেছিল ১৮ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারকে।

টাকার অঙ্কে ইংলিশ প্রিমিয়ারের ক্লাবগুলোর অর্ধেকটাও খরচ করেনি লা লিগা। সব মিলিয়ে গ্রীষ্মকালীন দলবদলে লা লিগার ক্লাবগুলোর ব্যয় ৪৫৮ মিলিয়ন ইউরো। বার্সেলোনা ও রিয়ালের মতো বিশ্বসেরা দল থাকার পরও স্প্যানিশ লিগের এ পিছিয়ে পড়ার পেছনে কারণ সম্ভবত দলবদলের বাজারে জিনেদিন জিদানের দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ না করা। স্প্যানিশ ক্লাবটি গ্রীষ্মের দলবদলে শুধু মেরাতাকে ঘরে ফিরিয়েছে ৪০ মিলিয়নে। তা ছাড়া আর কোনো খেলোয়াড় কেনেনি ‘লস ব্ল্যাঙ্কোস’। তাতে গত ২২ বছরের মধ্যে এই প্রথম বিশ্বের সবচেয়ে ‘দামি’ ফুটবলারকে  পাচ্ছে না মাদ্রিদের অভিজাতরা।

রিয়ালের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা অবশ্য দল গোছাতে ব্যয় করেছে ১৫৭ মিলিয়ন ইউরো। অ্যাতলেতিকোও খরচ করেছে ৮১ মিলিয়ন। এমনকি রিয়ালের চেয়ে সেভিয়া ও ভিয়ারিয়ালও ব্যয় করেছে বেশি। রিয়ালের টার্গেটে থাকা পর্তুগিজ মিডফিল্ডার আন্দ্রে গোমেসকে কেনার আগে কাতালান ক্লাবটি দলে ভিড়িয়েছে ফ্রান্সের দুই ডিফেন্ডার স্যামুয়েল উমতিতি ও লুকা দিনিয়াকে। অলিম্পিক লিওঁ থেকে সেন্টার ব্যাক উমতিতিকে কিনেছে ২৫ মিলিয়ন ইউরোয়, আর প্যারিস সেন্ত জার্মেই থেকে লেফট ব্যাক দিনিয়াকে এনেছে ১৬.৫ মিলিয়ন ইউরোয়।

দলবদলের শেষ দিকে ভ্যালেন্সিয়া থেকে ৩০ মিলিয়ন ইউরোয় বার্সেলোনায় নাম লিখিয়েছেন স্ট্রাইকার  পাকো আলকাসার। তবে ন্যু ক্যাম্প ছেড়ে চলে গেলেন ক্লাউদিও ব্রাভো। চিলিয়ান গোলরক্ষকের নতুন ঠিকানা ম্যানচেস্টার সিটি। আর তাঁর জায়গায় বার্সায় যোগ দিয়েছেন ডাচ গোলরক্ষক ইয়েস্পার সিইয়েসেন।

ফরাসি লিগ ওয়ানের ক্লাবগুলোর ব্যয় ১৯১ মিলিয়ন। সর্বোচ্চ ৭৫ মিলিয়ন খরচ করেছে লিগ চ্যাম্পিয়ন প্যারিস সেন্ত জার্মেইন। এ ছাড়া জেনিত ছেড়ে ব্রাজিলিয়ান হাল্ক ৫৫ মিলিয়নে পাড়ি জমিয়েছেন সাংহাইয়ে। গুঞ্জন ছিল হামেস রোদ্রিগেসেরও সান্তিয়াগো বার্নাব্যু ছাড়ার। ইউরোপ সেরার মুকুট ধরে রাখার মিশনে শেষ পর্যন্ত ২০১৪ কলম্বিয়ান ফরোয়ার্ডকে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্তই নেন জিনেদিন জিদান।


মন্তব্য