kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সামান্য এই আমাকেও কত কিছু দিয়েছে হ্যান্ডবল

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সামান্য এই আমাকেও কত কিছু দিয়েছে হ্যান্ডবল

ছবিঃ মীর ফরিদ

অজনপ্রিয় খেলাগুলোর অসুবিধা এই যে এগুলো দিয়ে তারকাখ্যাতি পাওয়া যায় না। তবু কেউ কেউ আছেন যাঁরা এসব না ভেবে স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাটতে থাকেন।

তারপর পৌঁছে যান এমন এক তীরে যেখানে তাঁদের উপেক্ষা করতে পারে না কেউ। হ্যান্ডবলের মো. আকরাম হোসেন তেমনই একজন। হ্যান্ডবল মাঠে এমন সব কীর্তি করেছেন যে প্রায় সবাই একমত, এই খেলাটাতে তিনিই বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা। অন্তরালের এই শ্রেষ্ঠর সঙ্গে নোমান মোহাম্মদের দীর্ঘ আলাপচারিতা, যাতে মাঠ কাঁপানো আকরামের ভেতরের আরেকটি মানুষের খোঁজ মেলে। যে টাকা-খ্যাতি-প্রতিষ্ঠা কিছু না পেয়েও অদ্ভুত রকম তৃপ্ত!

 

প্রশ্ন : বাংলাদেশে তো হ্যান্ডবল খুব প্রচলিত খেলা না। কিন্তু এই খেলায় দেশের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে আপনার নাম উঠে আসে প্রায় সবার মুখে। তা কত গর্বের—এখান থেকেই শুরু করতে চাই কথোপকথন।

মো. আকরাম হোসেন : আমার খুবই ভালো লাগে। এখনো যখন কোনো টুর্নামেন্ট উপলক্ষে কোথাও যাই, সবাই এসে আমার সঙ্গে হাত মেলায়। হাসিমুখে কথা বলে। তাতে এত ভালো লাগে। জেলা পর্যা‍য় থেকে হ্যান্ডবল খেলোয়াড়রা টুর্নামেন্ট খেলতে এলে পুরনো বন্ধুবান্ধব বলে দেয় ওদের দেখে রাখার জন্য। পারলে কিছু টিপস দেওয়ার জন্য। তখন মনে হয়, হ্যান্ডবল বোধ হয় কিছুটা খেলতে পেরেছি। যে কারণে খেলা ছাড়ার এত বছর পরও আমাকে সবাই মনে রাখে। আর হ্যান্ডবলে আমি বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা কি না, সে বিচার করবেন দর্শকরা, আপনারা সাংবাদিকরা। আমি তা মুখে বলে বড়াই করব না। কিন্তু ওই যে হ্যান্ডবল খেলোয়াড় হিসেবে এখনো যে অনেকে চেনেন, এতেই আমার গর্ব।

প্রশ্ন : কিন্তু মনে হয় না, যদি ফুটবলের সেরা সালাহউদ্দিন-এনায়েতের মতো হতাম কিংবা ক্রিকেটের সেরা সাকিব আল হাসানের মতো—তাহলে আরো বেশি জনপ্রিয় হতাম? খ্যাতি-অর্থ থাকত আরো বেশি?

আকরাম : তা তো অস্বীকার করার নেই। আমাদের সময় ফুটবল সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। এখন যেমন ক্রিকেট। ওসব খেলার সেরা হতে পারলে আরো অনেক ওপরে যেতে পারতাম। তখন বাংলাদেশের সবাই এক নামে চিনত আমাকে। টাকাপয়সা থাকত প্রচুর। তাই বলে ওসব ভেবে আফসোস করার লোক আমি নই। কারণ ফুটবল-ক্রিকেট খেললে খুব একটা ভালো তো করতে পারতাম না। ওসব খেলার সেরা অন্তত হতে পারতাম না। খুব বেশি লোকে তাই চিনত না আমাকে। এর চেয়ে হ্যান্ডবল খেলেছি নিজের মনের মতো করে, এই খেলার সবচেয়ে ভালো খেলোয়াড়দের একজন হতে পেরেছি, তাতে অল্প কিছু লোক হলেও আমাকে চেনেন, সুবাদে ছোটখাটো একটা চাকরিও হয়েছে। আমি এতেই খুশি। হ্যান্ডবল খেলে জনপ্রিয়তা কিংবা টাকাপয়সায় হয়তো ফুটবলার-ক্রিকেটারদের মতো হতে পারিনি। কিন্তু এই খেলার সেরা হিসেবে যে সম্মান আমি পাই, তার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা হয় না।

প্রশ্ন : আপনাদের শৈশবে ফুটবলের সঙ্গে পরিচয় আলাদা কোনো ঘটনা না। এখন ক্রিকেটের বেলায় যা। কিন্তু হ্যান্ডবলের সঙ্গে পরিচয় তো অবশ্যই আলাদা কিছু। আপনার সেই পরিচয় হয় কিভাবে?

আকরাম : আমি আসলে ফুটবলার ছিলাম। পজিশন স্টপার ব্যাক। খুলনায় সে সময় প্রচুর ফুটবল খেলি। এমনকি যখন পুরোদস্তুর হ্যান্ডবল খেলোয়াড় হয়ে গেছি, তখনো আজাদ স্পোর্টিংয়ের হয়ে দুই বছর ঢাকা দ্বিতীয় বিভাগে ফুটবল খেলি ১৯৮৮ ও ১৯৮৯ সালে। যা হোক, খুলনায় থাকতেই ফুটবলের পাশাপাশি আমি শটপুট ও ডিসকাস থ্রো করি। কারণ আমার শরীরে অনেক শক্তি। খুলনা জেলার হয়ে শটপুট-ডিসকাস থ্রোতে অংশ নিতেই প্রথম আসি এই আনসার-ভিডিপি একাডেমিতে। এখানকার খোলা মাঠ, গাছপালা, পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই। ভাবি, এখানে আমাকে চাকরি নিতেই হবে। সে অনুযায়ী চেষ্টা করে মাসছয়েকের মধ্যে পরীক্ষা দিয়ে অ্যাথলেট হিসেবে খেলোয়াড় কোটায় চাকরি হয়। সময়টা ১৯৮৪ সাল।

প্রশ্ন : হ্যান্ডবলের সঙ্গে তখনো পরিচয় হয়নি?

আকরাম : না। হ্যান্ডবল নামে কোনো খেলা যে দুনিয়ায় আছে, তাই তখনো জানি না।

প্রশ্ন : জানেন কিভাবে?

আকরাম : বাংলাদেশ আনসার-ভিডিপিতে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরের ঘটনা, মনে হয় ১৯৮৫ সালে। আমাদের নতুন হ্যান্ডবল দল হবে। সেখানে দল নির্বাচন করা হয় শরীরের উচ্চতা, হাতের আকার ও পায়ের গতি দেখে। সে হিসেবে ২০ জনের দলে আমি সুযোগ পেয়ে যাই। তখন জীবনে প্রথম খেলাটির সঙ্গে পরিচয়। আর ইকবাল ভাইয়ের কাছে হ্যান্ডবলের হাতেখড়ি।

প্রশ্ন : অপরিচিত এই খেলা আয়ত্ত করেন কিভাবে?

আকরাম : প্রথমে হ্যান্ডবল খেলার ভিডিও দেখানো হয় আমাদের। কিভাবে খেলতে হয়, বলে দেওয়া হয় নিয়মকানুন। তখন আবার আনসার-ভিডিপিতে মেয়েদের হ্যান্ডবল দল ছিল। বিকেলবেলা গিয়ে ওদের খেলা দেখি। কিভাবে লাফ দিতে হয়, দৌড়াতে হয়, দৌড়ানোর সময় বল মারতে হয়—শুরু হয় এসবের অনুশীলন। আর সত্যি বলতে কি, শুরু থেকেই খেলাটি আমার মনে ধরে যায়। মনে হয়, এখানে ভালো করতে পারব। যে কারণে মনপ্রাণ ঢেলে অনুশীলন শুরু করি। আস্তে আস্তে আয়ত্ত করে ফেলি হ্যান্ডবল। আর কোচ হিসেবে যখন আলী আসগর স্যার এলেন, এরপর আমাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তাঁর অধীনেই মূলত আমি আজকের আকরাম হয়ে উঠি।

প্রশ্ন : আলী আসগর তো বিকেএসপির কোচ। তাঁকে আপনি কোথায় পান?

আকরাম : বিকেএসপি থেকে আনসার-ভিডিপি একাডেমিতে এসে আমাদের ট্রেনিং করান স্যার। সকালে গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসা হয়, আবার বিকেলে ট্রেনিং শেষে দিয়ে আসা হয়। কোচ হিসেবে আলী আসগর স্যারকে পাওয়ার কারণে আমার হ্যান্ডবল খেলা খুব ভালো হয়ে যায়।

প্রশ্ন : নতুন এই খেলায় শুরু থেকেই কি আপনি অন্যদের ছাড়িয়ে যান?

আকরাম : আলাদা করে নজর কোচের কাড়ি প্রথম থেকে। জাম্প, শ্যুটিং, পাসিং দেখার পর কোচ বলেন, হ্যান্ডবলে আমার সহজাত ক্ষমতা অন্য পাঁচজনের চেয়ে ভালো। কিন্তু জাতীয় পর্যা‍য়ে খেলার শুরুতে মূল দলে ছিলাম না। আমাকে রাখা হয় স্ট্যান্ডবাই।

প্রশ্ন : কত সালের ঘটনা?

আকরাম : ১৯৮৫ সালের শেষের দিকে। হ্যান্ডবলের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ওই প্রথম অংশ নেয় পুরুষদের আনসার-ভিডিপি দল। শুরুতে তো আমাকে নামায়নি। ১০ মিনিট পর নামায় মাঠে। ৩০ মিনিটের খেলায় বাকি তখন ২০ মিনিট। তাতে এমন খেলা খেলি যে আমাকে আর একবারও ওঠায়নি। অন্য সব খেলোয়াড়ের বদল হয়, আমার হয় না। ওই যে দলে চলে আসি, আমাকে কেউ বাদ দিতে পারেনি। সেরা সাতে খেলি পরের সব ম্যাচ। যদিও সেরা তিনের মধ্যে দল সেবার থাকতে পারেনি।

প্রশ্ন : জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ ছাড়া হ্যান্ডবল লিগেরও নিয়মিত আয়োজন হয় তখন। সেখানেও কি খেলেন আপনি?

আকরাম : ১৯৮৬ সালে লিগে খেলার জন্য ইকবাল ভাই আমাকে নিয়ে যান ঢাকায়। তখন আনসার-ভিডিপি দল খেলে না লিগে। ইকবাল ভাই কোন একটি দলে যেন খেলান আমাকে, এত দিন পর নাম মনে করতে পারছি না। কিন্তু মনে আছে, ওই লিগে আমার দল চ্যাম্পিয়ন হয়, আমি পাই সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। আরো মনে আছে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরের ঘটনা। তখন ঢাকা শহরে এত যানজট ছিল না। একাডেমি থেকে বাসে উঠে এক ঘণ্টা, সোয়া ঘণ্টায় গুলিস্তান চলে যাই। খেলা শেষে আবার বাসে ফিরে আসি। লিগে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আমার গলায় পদক দেওয়া হয় আর সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার হিসেবে ছোট্ট একটি ট্রফি। খেলার মাঠ থেকে গুলিস্তানে গিয়ে তো বাসে উঠি। এরপর গাজীপুরে এই আনসার-ভিডিপি একাডেমিতে ফেরা পর্যন্ত পুরোটা সময়ে গলার পদক খুলিনি; হাতের ট্রফিও ব্যাগের ভেতর রাখিনি। এত ভালো লাগে যে মনে হয় সবাইকে ডেকে ডেকে বলি সাফল্যের কথা। বাসের লোকজন আমার দিকে শুধু তাকায়। চেহারায় খুশি দেখে সবাই বোধ হয় বুঝতে পারে।

প্রশ্ন : হ্যান্ডবলে আপনার পজিশন কোনটি?

আকরাম : আমি লেফট নাইন মিটার। হ্যান্ডবল তো সাতজনের খেলা। একজন গোলরক্ষক। তাঁর সামনে সিক্স মিটার। ডান দিকে রাইট উইং, এর সামনে রাইট নাইন মিটার। ঠিক তেমনি বাঁ দিকের পেছনে লেফট উইং, সামনে লেফট নাইট মিটার। আর সিক্স মিটারের সামনে থাকে প্লে-মেকার। আমার পজিশন ছিল লেফট নাইট মিটার। প্লে-মেকার বল বানিয়ে দেয় আর দুই নাইন মিটার গোল পায় বেশি বেশি। তাদের অবশ্য জাম্প ভালো থাকতে হয়, হাতে শক্তি থাকতে হয়।

প্রশ্ন : ওই ঢাকা লিগে সেরা খেলোয়াড় হওয়ার পরের বছরগুলোয় ক্যারিয়ারের এগিয়ে চলাটা যদি একটু বলেন?

আকরাম : ১৯৮৬ সালের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে আমাদের আনসার-ভিডিপি দল তৃতীয় হয়, আমি জিতি সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। ১৯৮৭ সালে দল দ্বিতীয়, আমি সেরা খেলোয়াড়। ১৯৮৮ সালে দল তৃতীয়, আমি আবারও সেরা খেলোয়াড়। ১৯৮৯ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হয় ডিসেম্বরে, শেষ ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে। সেখানে যুগ্ম সেরা খেলোয়াড় হই আমি আর ববি। এই ববি হচ্ছে ফুটবলার কায়সার হামিদের ছোট ভাই। ১৯৯১ সালে গিয়ে আবার সেরা খেলোয়াড়। ১৯৯৪ সালেও। এসব সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার তো দেয় হ্যান্ডবল ফেডারেশন। এর বাইরে ১৯৯১ সালে সেরা হ্যান্ডবল খেলোয়াড় হিসেবে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি ও বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের পুরস্কার পাই।

প্রশ্ন : ১৯৮৬, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৮৯-৯০, ১৯৯১ ও ১৯৯৪—হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সেরা খেলোয়াড় হন ছয়বার। অন্য কেউ এতবার জিতেছেন পুরস্কারটি?

আকরাম : আমার তা মনে হয় না। আর দুটি সাংবাদিক সংস্থার সেরা হিসেবে যে পুরস্কার পাই, তাও আমি ছাড়া অন্য কোনো হ্যান্ডবল খেলোয়াড় পেয়েছেন বলে জানা নেই।

প্রশ্ন : ববির সঙ্গে একবার যুগ্মভাবে সেরা খেলোয়াড় হওয়ার কথা জানালেন। কায়সার হামিদের সঙ্গে ম্যাচ খেলেননি কখনো?

আকরাম : না। কায়সার ভাই ফুটবলই খেলতেন। তাঁর বাবা কর্নেল আবদুল হামিদই মূলত বাংলাদেশে হ্যান্ডবল খেলা নিয়ে আসেন। তাতে ববি ও সোহেল খুব সিরিয়াসলি খেলে। ওদের সঙ্গে অনেক খেলি আমি। সূর্য উদয় দলে খেলি, আবার আমাদের আনসার-ভিডিপি দলেও ওদের দুজনকে নিয়ে আসি। কিন্তু কায়সার হামিদ খুব একটা হ্যান্ডবল খেলেননি। মাঝেমধ্যে দ্বিতীয় বিভাগে খেলেন। তাঁর সঙ্গে তাই খেলা হয়নি।

প্রশ্ন : জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অনেকবার দ্বিতীয়-তৃতীয় হওয়ার কথা বললেন। চ্যাম্পিয়ন হননি কখনো?

আকরাম : না। ফাইনালে গিয়ে হারি দুবার। এর মধ্যে ১৯৯৪ সালে তো ভীষণ দুর্ভাগ্য। সমান পয়েন্ট ছিল। অতিরিক্ত পাঁচ-পাঁচ ১০ মিনিট শেষেও তাই। টাইব্রেকারে গিয়ে পাঁচজন-পাঁচজন শট মারার পরও দুই দল সমান। এরপর সাডেন ডেথে গিয়ে হেরে যাই আমরা। হ্যান্ডবলে তখন নিয়ম ছিল, সাডেন ডেথে গিয়ে দুই দলের সেরা দুই খেলোয়াড় একটি একটি করে শট মারতে থাকবে, যতক্ষণ না ফল নির্ধারিত হয়। আমি তো আমার দলের সেরা। কিন্তু সাডেন ডেথে বিডিআরের ছেলেটি গোল করতে পারলেও আমার প্রথম শটই বারে লেগে ফেরত আসে। দল যায় হেরে। সবাই আমাকে সান্ত্বনা দেয়, কিন্তু নিজেকে বোঝাতে পারিনি। সারা পথ কাঁদতে কাঁদতে ফিরি। আনসার-ভিডিপিকে যে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে কখনো সেরা করতে পারিনি, এ দুঃখ এখনো আছে।

প্রশ্ন : লিগে?

আকরাম : লিগেও আনসার-ভিডিপির হয়ে পারিনি। তিনবার রানার্সআপ হই। আসলে বিডিআর তখন খুব শক্তিশালী দল। ওদের সঙ্গে পারা যেত না। এ ছাড়া মেনজিস, নারিন্দা, সূর্য উদয়—এমন বেশ কিছু ভালো দলও ছিল। ওরা আবার বিদেশ থেকে খেলোয়াড় নিয়ে আসে। তবে টুর্নামেন্টে আমরা চ্যাম্পিয়ন হই বেশ কয়েকবার। বর্ষাকালীন লিগ, এম আর খান টুর্নামেন্টে পাই চূড়ান্ত সাফল্য। আর আনসার-ভিডিপির হয়ে না পারলেও অন্য দলের হয়ে কিন্তু আমি লিগ চ্যাম্পিয়ন হই। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ১৯৯৬ সাল থেকে আনসার-ভিডিপির পুরুষদের হ্যান্ডবল দল বিলুপ্ত করা হয়। সাত-আট বছর তখন আমরা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ বা লিগে খেলিনি। তখন বাইরের দল সূর্য উদয়, মেনজিস, নারিন্দা, আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবে খেলি। আজাদ ছাড়া অন্য তিন দলের জার্সিতে হই লিগ চ্যাম্পিয়ন। নারিন্দা ক্লাবের হয়ে দুবার।

প্রশ্ন : আনসার-ভিডিপিতে না হয় চাকরি করেন, কিন্তু এই যে বাইরের দলে খেলেন, সেখানে পারিশ্রমিক পান কেমন?

আকরাম : হ্যান্ডবলে অত টাকা তো ছিল না। তবে এর মধ্যেও সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাই আমি। এক লিগে সবচেয়ে বেশি পাই ১৫ হাজার টাকা।

প্রশ্ন  : জাতীয় দলে খেলেন কত দিন?

আকরাম : আমাদের সময় জাতীয় দলের খেলা তেমন একটা হতো না। সাফ গেমসে হ্যান্ডবল ছিল না। পরে ২০১০ সালে বাংলাদেশের আসরে তা যুক্ত হয়। যত দূর মনে আছে, ১৯৯৩ সালে সুইডেনের একটি দল বাংলাদেশ সফরে আসে যখন, তখন জাতীয় দল গঠন করা হয়। ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, চট্টগ্রামে ওদের বিপক্ষে খেলি আমরা। এ ছাড়া একবার জার্মানির কি এক দল আসে। তবে সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক পর্যা‍য়ে প্রতিযোগিতামূলক হ্যান্ডবলের শুরু ২০০৬ সালে। সেবার প্রথম সাফ হ্যান্ডবল খেলতে জয়পুর যায় বাংলাদেশ দল। আমি সেই জাতীয় দলের অধিনায়ক। আর ২০০৮ সালে ঢাকায় জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সর্বশেষ খেলে তো বিদায় নিই হ্যান্ডবল থেকে। এ সময়ে জাতীয় দলের সব খেলাই খেলি আমি।

প্রশ্ন : জয়পুরের সাফ হ্যান্ডবলে দলের ও আপনার পারফরম্যান্স কেমন ছিল?

আকরাম : ভালোই হচ্ছিল সব। কিন্তু সেমিফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে ওদের একজন খেলোয়াড়ের কনুই লেগে আমার ঠোঁট ফেটে যায়। মাঠ থেকে সোজা হাসপাতালে, ঠোঁটে সেলাই দেওয়া হয় বেশ কয়েকটি। আর সেমিতে দল যায় হেরে। পর দিন নেপালের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। আমার তখন ভয়াবহ অবস্থা। ঠোঁট ফুলে ঢোল, মুখে খাবার দিতে পারি না। চামচ দিয়ে কোনোমতে পানি বা নরম খাবার খাই। কিন্তু দেশের জন্য ওই অবস্থায়ই নেপালের বিপক্ষে মাঠে নামি আমি। জেতাই দলকে। আমি এখনো বিশ্বাস করি, যদি পাকিস্তানের বিপক্ষে আমার ইনজুরি না হতো, তাহলে সে ম্যাচে আমরা জিততাম।

প্রশ্ন : আপনি তো নাইন মিটার। গোল করার পজিশন তা। এক ম্যাচে সর্বোচ্চ কত গোল করেন, মনে আছে?

আকরাম : ৩৭ গোল।

প্রশ্ন : বলেন কী!

আকরাম : হ্যাঁ, জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে নাটোরের বিপক্ষে; আনসার-ভিডিপির জার্সিতে। সম্ভবত ১৯৮৬-৮৭ সালে। তখন বিডিআরের জাহাঙ্গীরের এক ম্যাচে ছিল ৩৬ গোল। আমি সে রেকর্ড ভেঙে দিই।

প্রশ্ন : আপনার রেকর্ড এখনো রয়েছে নিশ্চয়ই?

আকরাম : না। যতটুকু জানি, বিডিআরের শাহ আলম পরে ভেঙে দেয় ওই রেকর্ড।

প্রশ্ন : স্মরণীয় কয়েকটি ম্যাচের কথা একটু জানতে চাই।

আকরাম : স্মরণীয় বলতে প্রথমে মনে পড়ে বিমানের বিপক্ষে এক খেলার কথা। ১৯৮৯-৯০ কিংবা ১৯৯১ সাল। আনসার-ভিডিপিতে আমার সঙ্গের খেলোয়াড় ছিল শফি, খোকন, ফরিদ, ফেরদৌস, চাঁদ। আনসার-ভিডিপি কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে রাতারাতি ওরা সবাই যোগ দেয় বিমান দলে। স্যাররা মনে খুব কষ্ট পান, আমার কষ্ট তো বুঝতেই পারছেন। এত দিন একসঙ্গে চাকরি করছি, খেলছি—অথচ কিচ্ছু না জানিয়ে ওরা বিমানে চাকরি নিয়ে নেয়! এত বড় বেইমানি! আনসার-ভিডিপি থেকে বলা হয়, তবু আমরা হ্যান্ডবলে দল দেব। সিনিয়র খেলোয়াড় বলতে আছি শুধু আমি আর বাদশা। তখন করি কি, আমাদের আনসার-ভিডিপির বাস্কেটবল দলের খেলোয়াড়দের বলি হ্যান্ডবলে আসতে। কারণ ওরা লম্বা লম্বা, আর হ্যান্ডবল খেলাও অনেকটা বাস্কেটবলের মতো। ওদের নিয়ে তিন মাসের মতো অনুশীলন করি আলী আসগর স্যারের অধীনে। এবং এই দল নিয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে বিমানকে দিই হারিয়ে। আমাদের সঙ্গে যারা বেইমানি করে, তাদের হারানো আমার জীবনের এক স্মরণীয় ম্যাচ। মাঠে তাই কেঁদে দিই একেবারে।

প্রশ্ন : আর কোনো স্মরণীয় ম্যাচ?

আকরাম : আনসার-ভিডিপির তখন দল নেই। আমি আর বাদশা খেলি ঢাকা জেলার হয়ে। পুলিশ দলের বিপক্ষে ঢাকা স্টেডিয়ামের সেমিফাইনালে গ্যাঞ্জাম লাগার পর তা চলে যায় মিরপুরের ইনডোর স্টেডিয়ামে। সেখানেও গণ্ডগোল। খেলা নিয়ে যায় বিডিআর পিলখানার ভেতরে। ম্যাচ শুরু হয় কিন্তু বাদশার দেখা নেই। যাই হোক, ওকে ছাড়াই আমরা জিতি দুই গোলের ব্যবধানে। খেলা শেষে বাদশা আসে। আমরা তো বকাবকি করি। কিন্তু বাদশা জানায়, মোটরসাইকেল নিয়ে বিডিআর গেট দিয়ে আসার পথে পুলিশ ওকে আটকে রাখে, যেন খেলতে না পারে। আমাকেও নাকি আটকের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কেন যেন আমি সরাসরি পথে না গিয়ে ঘুরপথে অন্য গেট দিয়ে পিলখানার ভেতরে ঢুকি। যে কারণে আটকাতে পারেনি। দলকে জিতিয়ে দিয়ে আমি নায়ক হয়ে যাই।

প্রশ্ন : নিজেকে লেফট নাইন মিটারে রেখে বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা একটি হ্যান্ডবল দল যদি করে দেন?

আকরাম : কঠিন কাজ। কারণ এখনকার ছেলেদের খেলা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখা হয় না। যাই হোক, তবু চেষ্টা করি। গোলরক্ষকে রাখি সেন্টুকে। রাইট উইংয়ে বিডিআরের খায়রুলকে রাখতে চাই। কিন্তু এই একটি পজিশনে এই আমলের একজনকে রাখি—বিডিআরের এমদাদ। দারুণ খেলে ও। রাইট নাইন মিটারে রাখি বিডিআরের রফিককে। গোলরক্ষকের সামনে সিক্স মিটারে মোস্তফা। আর ওর সামনে প্লে-মেকার হিসেবে মেনজিস। মূলত সূর্য উদয় দলে খেলত, ওর মতো প্লে-মেকার আজও চোখে পড়েনি। লেফট উইংয়ে বিডিআরের সাইদুল। আর লেফট নাইন মিটারে আমি। এই সাতজন খেললে বাংলাদেশের কোনো হ্যান্ডবল দল আমাদের হারাতে পারবে না।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ আনসার-ভিডিপিতে এখন কোন র‍্যাঙ্কে রয়েছেন?

আকরাম : আমি এখন হাবিলদার। হ্যান্ডবল দলের সহকারী কোচের দায়িত্ব পালন করছি। পাশাপাশি প্রশাসনিক নানা দিকেও সময় দিতে হয়। এখানে আমি একটু আনসার-ভিডিপির প্রতি নিজের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই। যদি এই বাহিনীতে চাকরি না করতাম, তাহলে আজকের হ্যান্ডবলের আকরাম হতে পারতাম না। আনসার-ভিডিপি আমাকে হ্যান্ডবলে আনে, অনুশীলন করায়, পাশাপাশি চাকরির মাধ্যমে দেয় আর্থিক নিশ্চয়তা। এই বাহিনীর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার তাই শেষ নেই।

প্রশ্ন : সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে চলে এসেছি। কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন আপনার জীবনের শুরুর কথা শোনা হয়নি। পরিবার নিয়ে, খুলনার শৈশব-কৈশোর নিয়ে একটু যদি বলেন?

আকরাম : আমার আব্বা মনসুর আলী শেখ; মা খোদেজা বেগম। আমরা ছয় ভাই, তিন বোন। আমি সাত নম্বরে। আব্বা ছিলেন কৃষক। তাঁকে আমরা ভাইরা কৃষিকাজে সহায়তা করতাম। আমি মাঠে কত দিন আব্বার সঙ্গে কাজ করেছি! পাশাপাশি আব্বা আমাকে পড়ালেখা করাতে চান, কিন্তু আমার যে আবার ফুটবলের নেশা। পড়ালেখা বাদ দিয়ে টিফিনের পর খেলতে চলে যাই। মাঠের পাশের এক বাড়িতে বুট-জার্সি-মোজা সব রেখে দিই। সেগুলো পরে ফুটবল খেলা। ভাণ্ডারকোট বহুমুখী মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে থাকার সময়ই আমি আন্তস্কুল ফুটবল খেলি। স্কুলের শারীরিক শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক হাবিব মাস্টার খুব উৎসাহ দেন আমাকে।

প্রশ্ন : বাসা থেকে উৎসাহ পান তখন?

আকরাম : মোটেই না। আব্বা খুব রাগ করেন। কিন্তু আমার ঠিক বড় যে নোয়া ভাই, সেই আসলাম ভাই আবার উৎসাহ দেন খুব। তিনিই প্রথম কিনে দেন ফুটবলের বুট। আন্তস্কুলে খেলার সময় গ্রামের বাইরে নোয়া ভাই যান সঙ্গে। আব্বা এতেও রাগ করেন।

প্রশ্ন : পরে যখন বাংলাদেশের বড় হ্যান্ডবল খেলোয়াড় হন, টিভিতে-সংবাদপত্রে আপনার ছবি আসে, তখন আব্বার রাগ কমে?

আকরাম : খেলাধুলার কারণে আনসার-ভিডিপিতে চাকরি পাওয়ার পরই রাগ কমে যায়। আর খুব খুশি হন এক ঘটনায়। তখন আমাদের বাড়িতে টিভি নেই। পাশে হরিদাস মামার বাসায় টিভি। বিটিভির সংবাদে খেলার খবরে তিনি দেখেন, আমাকে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। ওই রাতেই হরিদাস মামা ছুটে গিয়ে আব্বাকে বলেন, ‘তোমার ছেলেকে তো টিভিতে দেখলাম। ও সেরা খেলোয়াড় হয়েছে। ’ আব্বা কী যে খুশি হন! এ ছাড়া আমি বেতন পাওয়ার পর সেখান থেকে কিছু টাকা বাড়িতে পাঠাই নিয়মিত...

প্রশ্ন : প্রথমে কত বেতন ছিল, মনে আছে?

আকরাম : ৫৫৫ টাকা। এর মধ্যে মেসে খাওয়ার জন্য ১৫০ টাকা দিই। ২০০ টাকা হাতখরচ আর বাকি ২০০ টাকা আব্বাকে পাঠাই। তিনি বলেন, ‘তোমার কাছে টাকা চেয়েছি? তুমি শুধু খাবে আর খেলাধুলা করবে। ’

প্রশ্ন : বিয়ে করেন কবে?

আকরাম : আমি বিয়ে করি ১৯৯৩ সালে। স্ত্রী দিলারা বেগম। আমাদের এক মেয়ে, এক ছেলে। মেয়ে মেঘলাকে ইন্টারমেডিয়েট পাস করার পর বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। ছেলে সাগর এখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে।

প্রশ্ন : তারা জানে, তাদের বাবা এত বড় হ্যান্ডবল খেলোয়াড়?

আকরাম : হ্যাঁ জানে। আনসার-ভিডিপিতে অনেকের কাছ থেকে শোনে তো। শুনে শুনে জানে।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। ক্যারিয়ার নিয়ে, জীবন নিয়ে আপনি কতটা তৃপ্ত?

আকরাম : আমি অনেক খুশি। আগেই বলেছি, আর্থিক না হলেও সম্মানের দিক দিয়ে হ্যান্ডবল খেলোয়াড় হিসেবে পেয়েছি অনেক। আর জীবনের হিসাব করলে এখন আছি ভালো অবস্থানে। আমি এক সাধারণ কৃষকের ছেলে। আমারও তো কৃষক হওয়ার কথা ছিল। পড়ালেখা বেশি দূর করিনি, এসএসসি পাস করিনি পর্যন্ত। এর পরও জীবনে যা কিছু পাওয়া, তা এই হ্যান্ডবলের কারণে। বাংলাদেশ আনসার-ভিডিপি আমাকে চাকরি দিয়েছে, হ্যান্ডবল খেলোয়াড় হিসেবে খুব সম্মান দেয়। দেশের কিছু লোক হলেও আমাকে চেনেন। এই আপনি ঢাকা থেকে গাজীপুরের আনসার-ভিডিপি একাডেমিতে চলে এসেছেন আমার সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য। তা কেন? কিছুটা হলেও হ্যান্ডবল খেলেছি, সে জন্য। সব মিলিয়ে তাই হ্যান্ডবলের ক্যারিয়ার নিয়ে ও জীবন নিয়ে আফসোস করার কোনো সুযোগই আমার নেই।


মন্তব্য