kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কেনাও যায় অলিম্পিকের সোনা!

সামীউর রহমান   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কেনাও যায় অলিম্পিকের সোনা!

একটি অর্থনৈতিক সমীক্ষা বলছে, রিও অলিম্পিকে প্রতিটি সোনা জয়ের পেছনে গ্রেট ব্রিটেনের খরচ হয়েছে চার মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি! ইউকে স্পোর্টের প্রধান নির্বাহী লিজ নিকোল জানিয়েছেন এতে করে ব্রিটেনের প্রত্যেক নাগরিকের বছরে প্রদেয় কর থেকে মাত্র এক পাউন্ডের কিছু বেশি গেছে অলিম্পিক প্রস্তুতির পেছনে, যা খুবই কম! অলিম্পিকে জেতা সোনার মূল্য কত—সেই বিতর্কে না গিয়ে বরং চোখ ফেরানো যাক সোনাজয়ীরা তাঁদের অলিম্পিক পদক বিক্রি করে কত টাকা পান! চোখ কপালে উঠলেও সত্যি কথাটা হচ্ছে, অনেক পদকজয়ীই পরবর্তী সময়ে তাঁদের অলিম্পিক পদক বিক্রি করে দিয়েছেন। কেউ চিকিৎসার খরচ তুলতে, কেউ-বা দাতব্য কাজে।

সংগ্রাহকদের কাছে অলিম্পিক পদকের চাহিদা অনেক, তাই অনেক সময়ে দামটাও হয় বিস্ময়কর। অলিম্পিকের স্মারক সংগ্রাহকদের সংস্থা অলিম্পিয়ান কালেক্টরস ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ডন বিগসবির কাছ থেকেই জানা যায়, ‘লোকে বলবে, অলিম্পিকের পদক কখনো কেনা যাবে না। একজন সংগ্রাহককে এই কথাটাই সবচেয়ে বেশি উসকে দেয়। ’ যারা কখনো অলিম্পিকে অংশ নিতে পারেননি, যাঁরা জিততে পারেননি, পদক কিনতে বেশি আগ্রহ থাকে তাঁদেরই। তাই অলিম্পিক পদকের ক্রেতার অভাব হয় না।

রিও অলিম্পিকে চাকতি নিক্ষেপে রুপা জিতেছিলেন পোল্যান্ডের পিওতর মালাচাওস্কি। ৩৩ বছর বয়সী এই ক্রীড়াবিদ দেশে ফিরেই নিলামে তুলেছিলেন নিজের অনেক কষ্ট-শ্রম-ঘামের বিনিময়ে অর্জন করা অলিম্পিক পদকটি। নিলামে পদকটি বিক্রি হয়েছিল ৮৪ হাজার মার্কিন ডলারে, সবটাই তিনি দান করেছিলেন তিন বছর বয়সী ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু ওলেক সিমানস্কির চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনে, যা ছিল শিশুটির চিকিৎসা ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশের সমান। শুরুতে এই পদকটি বিক্রির জন্য অনলাইন কেনাবেচার সাইট আমাজন ডটকমে বিজ্ঞাপন দিলেও পরবর্তী সময়ে পোলিশ ধনকুবের কুলচিয়াক পরিবার সেটি কিনে নেয়। অলিম্পিক পদকের অবশ্য বাঁধাধরা কোনো দাম নেই। কার পদক, কোন অলিম্পিকে জেতা, কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা জড়িত কি না, এমন অনেক কিছুর সঙ্গে সংগ্রাহকদের চাহিদা মিলেই দামটা ঠিক হয় পদকের। সংগ্রাহকদের কাছে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি দাম উঠেছে ১৯৮০ সালের শীতকালীন অলিম্পিকে সোনা জেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দলের গোলরক্ষক জিম ক্রেইগের সোনার পদকের। এ জন্য নাকি অনেকে এক থেকে দেড় মিলিয়ন ডলার দিতেও রাজি!

চোখ কপালে তোলা দামে বিকিয়ে আরো অনেকেরই পদক। ১৯৬০ সালের শীতকালীন অলিম্পিকে আইস হকিতে সোনাজয়ী যুক্তরাষ্ট্র দলের সদস্য বিল ক্রিস্টিয়ানের পদকটি অনলাইন নিলামে তুলেছিলেন ছেলে ডেভ। খুব একটা আশাব্যঞ্জক দামে অবশ্য বিকোয়নি সেটি, সাড়ে তিন লাখ ডলার চাইলেও পরে পঞ্চাশ হাজার ডলারের কিছু বেশিতে তিনি বিক্রি করেছেন পদকটি। ১৯৮০ সালের শীতকালীন অলিম্পিকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সোনা জেতাটাকে মনে করা হয় ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম বড় অঘটন। অলিম্পিকের আগে প্রদর্শনী ম্যাচে ১০-৩ গোলে হারানো যুক্তরাষ্ট্রই যখন ফাইনালে সোভিয়েত দলটাকে হারিয়ে সোনা জিতে নেয়, তখন তাকে অঘটন না বলেই-বা উপায় কী! জিম ক্রেইগের দলের জয় নিয়ে হলিউডে হয়েছে ছবি, এমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মারক পদকটা বিক্রিই করে দিতে বাধ্য হন মার্ক ওয়েলস। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র দলে খেলা ওয়েলস পিঠের চোটের অস্ত্রোপচার করাতে ৪০ হাজার ডলারে বিক্রি করে দেন নিজের পদক। পরবর্তী মালিক সেটা ২০১০ সালে বিক্রি করেন ৩ লাখ ১০ হাজার ডলারে। লাভ হয় ২ লাখ ৭০ হাজার ডলার! ‘মিরাকল অন আইস’ দলের আরেক সদস্য মার্ক পাভেলিচ ২০১৪ সালে নিজের পদকটা বিক্রি করে দেন আড়াই লাখ ডলারের কিছু বেশি দামে।

ভ্লাদিমির ক্লিচকো আটলান্টা অলিম্পিকে সুপার হেভিওয়েট বিভাগে জিতেছিলেন সোনা। ইউক্রেনের এই কিংবদন্তি বক্সার পরে পেশাদার বক্সিং থেকে আয় করেছেন ২০ মিলিয়ন ডলার, এনডোর্সমেন্ট থেকে পেয়েছেন আর পাঁচ মিলিয়ন। ২০১২ সালে তিনিও নিজের অলিম্পিক পদকটা বিক্রি করে দেন। এর থেকে পাওয়া এক মিলিয়ন ডলার গিয়েছিল ইউক্রেনের দরিদ্র শিশুদের কল্যাণে একটি দাতব্য তহবিলে।

রোম অলিম্পিকে সোনা জিতে বড় মঞ্চে নিজের আগমনধ্বনি শুনিয়েছিলেন মোহাম্মদ আলী, তখন যদিও নাম ছিল ক্যাসিয়াস ক্লে। সেই অলিম্পিকেই মার্কিন বক্সিং দলের সহ-অধিনায়ক ছিলেন উইলবার্ট ম্যাকলিওর, যাঁকে সবাই চিনত স্কিটার নামে। রোম অলিম্পিকে লাইট মিডলওয়েট শ্রেণিতে সোনা জেতা স্কিটার কিছুদিন আগে তাঁর পদকটি বিক্রি করে পেয়েছেন হাজার ত্রিশেক ডলারের কিছু বেশি। মোহাম্মদ আলীর সোনার মেডেলটা ওহাইও নদী থেকে কোথায় গিয়ে যে পড়েছে! শোনা যায়, শ্বেতাঙ্গ না হওয়ায় একটি রেস্টুরেন্টে আলীকে ঢুকতে না দিলে অলিম্পিক পদকটা নদীর পানিতে ছুড়ে ফেলেছিলেন দ্য গ্রেটেস্ট।

১৯২৪ সালে ফ্রান্সের একটি শৈলশহর শ্যামোনিতে বসেছিল শীতকালীন অলিম্পিকের প্রথম আসর। আয়োজনটা ছিল বেশ ছোট, অংশ নিয়েছিল মোটে ২৯৪ জন। সেই অলিম্পিকেরই নাম না জানা একজন বিজয়ীর পদক কিছুদিন আগে বিকিয়েছে ৪৭ হাজার ডলারের বেশি দামে। প্রথম শীতকালীন অলিম্পিকের পদক দুর্লভ হওয়াতেই এত দাম। আরো একজন অজ্ঞাতনামা অলিম্পিয়ানের পদকও বিকিয়েছে ভালো দামে, তবে সেটা প্রথম আসরের পদকের প্রায় অর্ধেক দামে। ১৯৭৬ সালে, অস্ট্রিয়ার ইনসব্রুকে হয়ে যাওয়া শীতকালীন অলিম্পিকের আইস হকিতে সোনাজয়ী সোভিয়েত দলের এক সদস্যের পদকটা এ বছরের শুরুতে বিক্রি হয়েছে ২৬ হাজার ডলারে।  

অ্যাথলেটিকসে উসাইন বোল্ট এখন জীবন্ত কিংবদন্তি। তবে জেসি ওয়েনসকে শুধু ক্রীড়াবিদ হিসেবে দেখলে হবে না, বুঝতে হবে প্রেক্ষাপটটাও। ১৯৩৬ সালে, বার্লিন অলিম্পিকের আয়োজন হয়েছে এডলফ হিটলারের তত্ত্বাবধানে। সেখানে আর্যদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে মরিয়া হিটলারের সামনে কৃষ্ণাঙ্গ অ্যাথলেট জেসি ওয়েনস জেতেন ৪টি সোনা। তাঁর জেতা ৪টি সোনার ৩টি কোথায় আছে সেটা কেউ জানে না, তবে একখানা সযত্নে রেখেছেন রন বার্কলে। মার্কিন এই ধনকুবের ২০১৩ সালে নিলামে কিনে নেন ওয়েনসের মেডেল। দামটা ছিল ১.৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির কালেক্টরস কমিশন বলে একটি সংস্থা আছে। তারা অনেকগুলো পদক বিক্রিই তত্ত্বাবধান করেছে। সেই সংস্থার সদস্য জিম গ্রিনসফিল্ডারের কাছেই জানা গেল পদক বিক্রির প্রধান কারণগুলো, ‘বেশির ভাগ সময় আমরা যেসব পদক বিক্রি করে দেওয়ার প্রস্তাব পাই সেগুলো আসে খারাপ আর্থিক অবস্থায় থাকা অ্যাথলেটদের কাছ থেকে আর উত্তরাধিকারদের কাছ থেকে। বিশেষ করে মৃত অ্যাথলেটদের পরিবারে কে পদকটা রাখবে এই বিতর্কে জড়াবার চেয়ে অনেকেই বিক্রি করে দিতে চান। ’ পদক কেনাবেচায় জড়িত ইনগ্রিড ও’নিল জানান, ‘বিশ্বে কমবেশি ৫০ জন অলিম্পিক পদক সংগ্রাহক আছেন, তাঁদের অর্ধেকের বেশি আমেরিকান। ’ পদক ছাড়াও তাঁরা অলিম্পিকে দারুণ কিছু করা অ্যাথলেটদের জুতা, জার্সিসহ অনেক কিছু সংগ্রহে আগ্রহী এবং এসব ক্রীড়াস্মারক কেনাবেচায় কম টাকা হাতবদল হয় না!


মন্তব্য