kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রদ্রিগেজরা পারেন, বাকীরা পারেন না

মাসুদ পারভেজ   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



রদ্রিগেজরা পারেন, বাকীরা পারেন না

বুকের মধ্যে আগুন নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। সেই আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে মিসায়েল রদ্রিগেজ তৈরি হয়েছিলেন তাক লাগিয়ে দেওয়ার জন্য।

অথচ অবজ্ঞা আর অবহেলায় এই তরুণ বক্সারের অলিম্পিক স্বপ্ন বিসর্জনেই যেতে বসেছিল!

শেষ পর্যন্ত যেতে পারেনি। বুকের ভেতর যে পুষে রেখেছিলেন কিছু করে দেখিয়ে দেওয়ার আগুন। রিও ডি জেনেইরোতে একই গেমস ভিলেজে থাকা আব্দুল্লাহেল বাকী ও মাহফিজুর রহমান সাগররাও যদি তাঁর মতো বুকের মাঝে আগুন পুষে নিজেদের চিরকালীন হাহাকারটা গোপন করতে পারতেন! পারলে কে জানে হয়তো অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার জন্য অংশ নেওয়াটাই বাংলাদেশের নিয়তি হয়ে থাকত না!

এই অংশ নিতে গিয়ে দেখা যায় কেউ কেউ নিজের সেরা ফর্মই হারিয়ে বসেন। অথচ যাওয়ার আগে তাঁদের মুখে নানা আশার বাণীই শোভা পায়। শোনা গেছে এই রিও অলিম্পিকের আগেও। শ্যুটার বাকী যেমন দফায় দফায় দাবি করে গেছেন অনুশীলনে তাঁর অলিম্পিক মানের স্কোর হয়েছে। যদিও রিওতে গিয়ে তাঁর হতাশ করা পারফরম্যান্সই। অলিম্পিকের ঠিক আগেই জার্মানিতে বিশ্বকাপ শ্যুটিংয়ে নিজের ক্যারিয়ার সেরা স্কোরটাও ধরে রাখতে পারেননি ব্রাজিলে গিয়ে। কেন অলিম্পিকের মতো আসরে গিয়ে বাকীরা মেলে ধরতে পারেন না নিজেদের? তাঁর নিজের মুখ থেকেই শুনুন কিংবা তাঁর সাবেক-বর্তমান কোনো সতীর্থের জবানিতে, জবাবটা মোটামুটি একই রকম। সেখানে আত্মসমালোচনার চেয়ে বঞ্চনার হাহাকারই মিশে থাকে বেশি। এই যেমন রিওতে বাকীর ব্যর্থতা নিয়ে ২০০২ সালে ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসের সোনজয়ী শ্যুটার আসিফ হোসেন খানই বলছিলেন, ‘বাকীর স্কোরে উন্নতি হয়েছিল কিন্তু স্থায়িত্ব আসেনি। তার জন্য যেমন নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার দরকার ছিল, সে সেটা পারেনি। ’

এই না পারায় শ্যুটিং ফেডারেশনের দায়টাও এসে যায়। কিন্তু সত্যিই কি বাকীকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পাঠানোর চেষ্টায় কমতি ছিল তাঁদের? অবশ্যই না। রিওতে যাওয়ার আগে এ বছরই শ্যুটিংয়ের তিনটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন বাকী। গত বছরও গেছেন একটি বিশ্বকাপে। সেই সঙ্গে অংশ নিয়েছেন এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও। উচ্চ বেতনে আসা ডেনিশ কোচ ক্রিস্টিয়েনসেনও গত বেশ কিছুদিন ধরে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের শ্যুটারদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। এসবকেও অনেক মনে হবে, যখন শুনবেন যে মিসায়েল রদ্রিগেজ কত বাধার পাহাড় ডিঙিয়েই না গিয়েছিলেন অলিম্পিকে। রিওতে শেষ পর্যন্ত পাঁচটি পদক জেতা মেক্সিকো যখন একটি পদকের জন্য রীতিমতো হাপিত্যেশ করে মরছিল, তখন অনেক খরার পর একপশলা বৃষ্টির স্বস্তি রদ্রিগেজই এনে দিয়েছিলেন। বক্সিংয়ের মিডলওয়েট শ্রেণিতে ব্রোঞ্জ জেতা এই তরুণকে বলেই দেওয়া হয়েছিল যে তাঁর রিও যাওয়া হচ্ছে না। কারণ বাজেট নেই। অলিম্পিকে পদক জেতার চ্যালেঞ্জ পরে, আগে রিওতে যেতে নিজের খরচ নিজে জোগানোর চ্যালেঞ্জ নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই রাস্তায় নেমে গিয়েছিলেন রদ্রিগেজ।

রিও যাওয়ার ফ্লাইটের টিকিটের জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়ে লেখা আকুল আবেদন গলায় ঝুলিয়ে ঘুরেছেন রাস্তায় রাস্তায়। এই স্টপেজে কোনো এক পাবলিক বাসে উঠে পড়েছেন তো পরের স্টপেজে নেমে গিয়ে উঠেছেন আরেকটায়। বড় মঞ্চে গিয়ে বড় কিছু করে দেখানোর জন্য নিজে নিচে নেমে, ছোট হয়ে রদ্রিগেজ নিজের স্বপ্নপূরণ করতে চেয়েছেন। সাধারণ মানুষের সহযোগিতা নিয়ে সেই স্বপ্নপূরণের সিঁড়িতে পা রাখা এই তরুণের তুলনায় বাংলাদেশের সাঁতারু মাহফিজুরকে ভীষণ সৌভাগ্যবানই বলতে হয়।

অলিম্পিকে যাওয়ার আগে এক বছর তিনি থাইল্যান্ডে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সেখানে অখণ্ড মনোযোগেই প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা তাঁর। রিওতে গিয়ে নিজের সেরা টাইমিংও করেছেন। তবে সার্বিক বিচারে তাঁর অবস্থান উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। তাঁর মতো স্প্রিন্টার মেসবাহ আহমেদকেও ভাবতে হয়নি কী করে রিওতে যাবেন! ভাবতে হয়েছে রদ্রিগেজকে। নিজের দেশে হওয়া অলিম্পিকে বাজি মাত করে দিয়েছেন বস্তিবাসী এক মায়ের মেয়ে রাফায়েলা সিলভাও। মেয়েদের জুডোতে ৫৭ কেজি ওজন শ্রেণিতে সোনা জেতা এই তরুণী বেড়েই উঠেছেন রিওর অপরাধপ্রবণ এক ফাভেলায় (বস্তি)। সেখানে একটি এনজিওর সহায়তায় সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য জুডো প্রশিক্ষণ শিবির থেকে উঠে এসে বিশ্বজয়ের গল্প লেখা রাফায়েলার জীবন খুব সহজ ছিল না। শত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে তবেই পায়ের নিচে মাটি পেয়েছেন। পৃষ্ঠপোষক নেই বলে হা-হুতাশ করেননি, অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধাদির জন্য হাল ছেড়ে দিয়েও বসে থাকেননি। রদ্রিগেজ-রাফায়েলারা নিজেদেরই নিজেরা অনুপ্রাণিত করে গেছেন অলিম্পিক পদক জেতার জন্য এবং সেটি জেতা হয়ে যাওয়ার পর এখন তাঁদের জীবন অনেকটা সহজও হওয়ার কথা। কারণ স্পন্সররাও সফলদের পেছনেই ছোটে, ব্যর্থদের পেছনে কিছুতেই নয়। নিষ্ঠুর করপোরেট জগতের নীতিটাই হলো এই যে সফল ক্রীড়াবিদের পেছনে কোনো প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ লগ্নিই করে নিজের সমপরিমাণ প্রচার নিশ্চিত করার জন্য। সেই পৃষ্ঠপোষণা পেতেও কষ্টেসৃষ্টে একটি জায়গায় যাওয়া লাগে, যে জায়গাটায় গেলে নামি প্রতিষ্ঠানগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়তেও দ্বিধা করে না। যেমন দ্বিধা করে না ভারতীয় উপমহাদেশে ক্রিকেটারদের পেছনে এনডোর্সমেন্ট খাতে দেদার খরচ করতে। বিশেষ করে ভারত আর বাংলাদেশ এমন ক্রিকেটমুখী যে সেখানে অন্য খেলার খেলোয়াড়রা সেভাবে প্রচারের আলোও পান না, যদি না বিশেষ কিছু করে ফেলেন। অন্য খেলাগুলোর উপেক্ষিত হওয়ার কারণও দেশ দুটির অতিরিক্ত ক্রিকেটমুখিতা। আর এর মধ্যেই ক্রিকেটমুখী মানুষকে অলিম্পিকমুখী করে ফেলেছিলেন পিভি সিন্ধু, সাক্ষী মালিক ও দীপিকা কর্মকাররা। এঁদের কেউ পদক জিতেছেন তো কেউ জাগিয়েছেন জেতার সম্ভাবনা। সেই সূত্রে দেশে ফিরে প্রাণঢালা সংবর্ধনার সঙ্গে তাঁদের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা নানা ঘোষণাও এসেছে। সাফল্য বাংলাদেশও দেখাতে পারত একই চিত্র। কিন্তু পারেনি কারণ বাকী বা সাগররা যে বুকের ভেতর আগুন নিয়ে স্বপ্ন দেখেন না। টোকিও অলিম্পিক সামনে রেখে রদ্রিগেজ-রাফায়েলারা হতে পারেন তেমন কোনো স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণাও।


মন্তব্য