kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দ্রুততম ১০০

রাহেনুর ইসলাম   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



দ্রুততম ১০০

নামের সঙ্গে জুড়ে গেছে কয়েকটি ‘দ্রুত’। ২০১৫ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর একটি বলের গতি স্পিডগানে ছুঁয়েছিল ঘণ্টায় ১৬০.৪ কিলোমিটারের কাঁটা।

টেস্ট ইতিহাসের দ্রুততম বল এটাই। সে সঙ্গে দ্রুততম ইয়র্কারও। গতির নেশায় না মেতেও দ্রুতগতির এই দুটি কীর্তিতে গর্ব করতেই পারেন মিচেল স্টার্ক। বাঁ-হাতি এই অস্ট্রেলিয়ান গড়েছেন আরো একটি দ্রুততম রেকর্ড। ওয়ানডে ইতিহাসের দ্রুততম উইকেটের সেঞ্চুরির কীর্তিটা এখন তাঁর। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচেই ভেঙেছিলেন সাইকলাইন মুস্তাকের ১৯ বছরের রেকর্ড। পাকিস্তানি এই স্পিনার শততম উইকেটের স্বাদ পান ১৯৯৭ সালে ৫৩তম ম্যাচে। স্টার্ক সেটা ভাঙলেন নিজের ৫২তম ম্যাচে। তবে থেমে থাকতে চান না এখানেই, ‘অবশ্যই আমি খুশি। ৫২ ওয়ানডেতে ১০০ উইকেট বিশেষ কিছু। এই একটি কীর্তি গড়ে ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারব না। এ জন্য যেতে হবে বহু দূর। কঠোর পরিশ্রম করে সেই চেষ্টাই করব আমি। ’

শুরুটা নড়বড়েই ছিল স্টার্কের। ২০১০ সালে বিশাখাপত্তমে ভারতের বিপক্ষে ৫১ রান দিয়ে পাননি উইকেটের দেখা। ২৮৯ রানের পাহাড় গড়েও ৫ উইকেটে হারে অস্ট্রেলিয়া। অভিষেকে ব্যর্থ হলেও নিজেকে চেনান দ্বিতীয় ওয়ানডেতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। ৯ ওভারে ২৭ রানে নেন ৪ উইকেট। আগুনে গোলায় বোল্ড করেছিলেন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ ও চামিরা সিলভাকে। নেন লাসিথ মালিঙ্গা আর জীবন মেন্ডিসের উইকেটও। এরপর পেছনে ফেরে তাকাতে হয়নি আর। ২৯তম ওয়ানডেতে পা রাখেন উইকেটের হাফ সেঞ্চুরিতে। তখনো বোঝা যায়নি ঝড়ের গতিতে সেঞ্চুরি করে ফেলবেন স্টার্ক! কেননা তাঁর চেয়ে দ্রুত ২১ জন বোলার পৌঁছেছিলেন এই মাইলফলকে। মাত্র ১৯ ওয়ানডেতে ৫০ উইকেট নিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন রহস্য স্পিনার অজন্থা মেন্ডিস। স্টার্কের সেখানে লেগেছে ১০ ম্যাচ বেশি। ক্যারম বল রহস্য ফাঁস হওয়ার পর জারিজুরি কমে যায় মেন্ডিসের। দূর্বোধ্য থেকে হয়ে পড়েন খোলা বই। তাই শততম উইকেটের মাইলফলকে পৌঁছতে এই লঙ্কান স্পিনারের লেগে যায় ৬৩ ম্যাচ। সেখানে স্টার্ক ১০০ উইকেট নিলেন ৫২তম ম্যাচে, অর্থাৎ মেন্ডিসের চেয়ে ১১ ওয়ানডে কম খেলে! সময় যত গড়িয়েছে তাঁকে দেখে ব্যাটসম্যানদের আতঙ্ক বেড়েছে ততই। গতি আর সুইংয়ের অপূর্ব মিশেলের যে রসায়ন, তাতে সমীহ না করে উপায় নেই কারো।

স্টার্কের ইকোনমি রেট, বোলিং গড় আর স্ট্রাইক রেটের চিত্রটা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওপরেই উঠেছে ক্রমশ। প্রথম ২৮ ওয়ানডেতে ওভারপিছু রান দেন ৫.০১। গড় ২২.৪৮ আর স্ট্রাইক ২৬.৮। পরের ২৪ ম্যাচে সেই গড় কমে দাঁড়িয়েছে ১৬.৮৪ আর স্ট্রাইক রেট ২২.৩। টি-টোয়েন্টির এই যুগে গ্লেন ম্যাকগ্রার মতো কিংবদন্তি জানিয়েছেন, ‘এই সময়ে খেললে ওয়ানডেতে ৫ স্ট্রাইক রেট রাখতে পারলে খুশি থাকতাম। ’ সেখানে সর্বশেষ ২৪ ম্যাচে স্টার্কের ইকনোমি রেট ৪.৫২। এ জন্যই তাঁকে নিয়ে অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথের উচ্ছ্বাস, ‘ব্যাটসম্যানদের যুগে বোলররা যেখানে অসহায়, তখন স্টার্কের মতো বোলার পাওয়া সৌভাগ্যের। একাই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে ও। ’

১০০ উইকেট পর্যন্ত বোলারদের মধ্যে স্টার্কের ২৪.৪ স্ট্রাইক রেটই সবচেয়ে ভালো। দ্বিতীয় সেরা ২৬.২৪ স্ট্রাইক রেট ছিল শোয়েব আখতারের। পাকিস্তানি এই পেসারের অবশ্য শততম উইকেটে পৌঁছতে সময় লেগেছিল ৬০ ওয়ানডে। এ ছাড়া শেন বন্ডের স্ট্রাইক রেট ২৭.১৬, সাকলাইন মুস্তাকের ২৭.৭০, ওয়াকার ইউনিসের ২৮.৩০ আর মরনে মরকেলের ২৮.৫০। সাকলাইন মুস্তাক আর শোয়েব আখতারের মতো আরো এক পাকিস্তানিকে পেছনে ফেলেছেন স্টার্ক। সেটা ইনিংসে সবচেয়ে বেশি ৪ বা এর বেশি উইকেট নেওয়ার বেলায়। ১০০ উইকেট নেওয়ার পথে স্টার্ক ইনিংসে ৪ বা এর বেশি উইকেট পেয়েছেন ১১ বার। ওয়াকার ইউনিসের কীর্তিটা ছিল ১০ বার।

১০০ উইকেটে পৌঁছানোর পথে শুধু গড়ের দিক দিয়েই চারজনের পেছনে স্টার্ক। ৫৩ ওয়ানডেতে ১০০ উইকেট নেওয়া সাকলাইন মুস্তাকের বোলিং গড় ছিল ১৯.২৫, যা সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে গেছে এই স্পিনারকে। ৬১তম ম্যাচে শততম উইকেট নেওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি পেসার কার্টলি অ্যামব্রোসের বোলিং গড় দ্বিতীয় সেরা ১৯.২৫। ক্যারিবিয়ান আরেক কিংবদন্তি জোয়েল গার্নার আর পাকিস্তানের ওয়াকার ইউনিসের গড় ছিল সমান ১৯.৪০। গার্নার ৬৭তম ওয়ানডেতে আর ওয়াকার ৫৯তম ম্যাচে পেয়েছিলেন শততম উইকেটের স্বাদ। ১৯.৫২ গড়ে স্টার্ক আছেন পাঁচ নম্বরে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচে ৪২ রানে ২ উইকেট নিয়েছেন স্টার্ক। ৫৪ ওয়ানডেতে তাঁর উইকেট এখন ১০৬টি আর গড় ১৯.৫০। অন্তত এক হাজার বল করেছেন এমন বোলারদের মধ্যে তাঁর গড় পঞ্চম সেরা। ৯৮ ম্যাচে ১৪৬ উইকেট নেওয়া ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি জোয়েল গার্নার ১৮.৮৪ গড় নিয়ে সবার শীর্ষে। যে ছন্দে খেলছেন তাতে গার্নারের কাছাকাছি যেতে খুব বেশি সময় নেওয়ার কথা নয় স্টার্কের।

নিজেকে প্রমাণ করতে বড় মঞ্চ বেছে নেন তারকারা। গত ওয়ানডে বিশ্বকাপে সেটাই করেছেন স্টার্ক। অস্ট্রেলিয়ার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে অন্যতম ভূমিকা ছিল তাঁর। মাত্র ১০.১৮ গড়ে তিনি নেন ২২ উইকেট। বিশ্বকাপে ১৫ বা এর বেশি উইকেট নেওয়া বোলারদের মধ্যে স্টার্কের গড়ই সবচেয়ে ভালো। নিশ্চয়ই এমনি এমনি পাননি গত বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। ফাইনালে ৮ ওভারে ২০ রানে নেন ২ উইকেট। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা কিউই অধিনায়ক ব্রেন্ডন ম্যাককালামকে বোল্ড করেছিলেন প্রথম ওভারেই ০ রানে। এই এক উইকেটেই গড়া হয়ে যায় বিশ্বকাপ শিরোপার ভাগ্য। মাত্র ১৮৩ রানে গুটিয়ে যাওয়া নিউজিল্যান্ড একতরফা ম্যাচটিতে ৭ উইকেটে হারে ১০১ বল বাকি থাকতে। এই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে অকল্যান্ডে ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা বোলিং করেন স্টার্ক। ১৫১ রানে গুটিয়ে অস্ট্রেলিয়া পড়ে লজ্জাজনক হারের মুখে। স্টার্কের ৬ উইকেটে সেই ম্যাচই প্রায় জিতে গিয়েছিল মাইকেল ক্লার্কের দল। নাটকীয় ম্যাচটিতে শেষ পর্যন্ত ১ উইকেটে হারে অস্ট্রেলিয়া।

দেশের মাটিতে সবাই নিজেকে মেলে ধরেন প্রবলভাবে। স্টার্কও ব্যতিক্রম নন। পাশাপাশি দেশের বাইরে আর উপমহাদেশের মতো কঠিন কন্ডিশনেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন বাঁ-হাতি এই পেসার। অস্ট্রেলিয়ার পেসবান্ধব উইকেটে ২৮ ম্যাচে ৫৬ উইকেট নিয়েছেন ১৭.০০ গড় আর ওভারপিছু ৪.৪৭ ইকোনমি রেটে। সেখানে দেশের বাইরে ২৪ ম্যাচে ৪৫ উইকেট ২২.৬৬ গড় ও ৫.১০ ইকোনমি রেটে। তাঁর ১০০ উইকেটের ৭১টি ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের। তবে বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষেও গড়টা প্রায় সমান। ডান হাতিদের বেলায় গড় যেখানে ১৯.৪৭ সেখানে বাঁ-হাতিদের বিপক্ষে ১৯.৬৩। ক্যারিয়ারের অভিষেকে উইকেটহীন থাকাটা পোড়ায়নি খুব বেশিবার। পাঁচ ওভার বল করেছেন এমন ৮ ম্যাচেই কেবল উইকেটের দেখা পাননি স্টার্ক। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণে তিনি এখন ধারাবাহিকতার অপর নাম।


মন্তব্য