kalerkantho


এ কোন পথে ফুটবল!

সনৎ বাবলা   

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



কদিন ধরে ফুটবলের একটা সুখস্মৃতির কথা খুব মনে পড়ছে। কলকাতায় মহাবিস্ফোরণ ঘটিয়েছে শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাব, ঢাকার একটি ক্লাব কলকাতার ফুটবলের বটবৃক্ষে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়েছে। যেটা আবাহনী-মোহামেডানের মতো জায়ান্টরাও আগে কখনো পারেনি, দুই বছর আগে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে এমন তুলকালাম বাধিয়েছে যে ক্রীড়াঙ্গনের সবার মুখে মুখে শেখ জামালের নাম। মানুষের হঠাৎ ফুটবল আসক্তি বেড়ে গিয়েছিল। জাতীয় দলের অক্ষমতাকে ছাপিয়ে যেন পুরো দেশের ফুটবলের ছবি হয়ে উঠেছিল শেখ জামাল ধানমণ্ডি, দলটির সাফল্য যেন হৃদয় ছুঁয়ে গেছে সবার। কলকাতায় ফুটবল বিপ্লব ছাড়াও নেপালের পোখরা কাপ এবং ভুটানের কিংস কাপ জয়ে এখন উপমহাদেশীয় ক্লাব ফুটবলেও তারা মহা শক্তিধর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

দেশের যেকোনো ফুটবলপ্রেমীর জন্য এটা দারুণ এক সুখানুভূতি। কিন্তু এ দেশের দুর্ভাগা ফুটবলের কপালে সুখ বেশি দিন সয় না! এই সফল দলটি এখন মাঠের পরিবর্তে আদালতে দৌড়াঝাঁপ করছে। আদালতের নির্দেশে আটকা পড়েছে স্বাধীনতা কাপ। এই ক্লাবের লড়াই ঘরের ছেলেদের ঘরে ফিরিয়ে আনার। আট ফুটবলার দল বদল করে অন্য দলে চলে গেলেও পুরনো ক্লাব তাদের দাবি ছাড়ছে না। নানা অনিয়ম তুলে ধরে তারা কাঠগড়ায় তোলার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে। এটা এখন আদালতের বিষয়, তাই ভালো-মন্দ আলোচনায় না যাওয়াই শ্রেয়। তবে চূড়ান্ত ক্ষতিটা হয়েছে ফুটবলের, অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে নতুন ফুটবল মৌসুম।

স্বাভাবিকভাবে অন্য ক্লাবগুলো এই দায় চাপাতে পারে ফুটবল ফেডারেশনের ঘাড়ে। তারা সুচারুভাবে কোনো কিছু করতে পারে না। দলবদলকে ঘিরে তারা নিয়ম করেন, আবার ফেডারেশনের পদাধিকারিক হয়ে নিজেদের ক্লাবের স্বার্থে সেই নিয়ম ভাঙেনও। দেশের ফুটবল একটা অদ্ভুতুড়ে জায়গা। জাতীয় দলের দিকে মুখ তুলে চাওয়ার কোনো জো নেই, কেবল হার আর হার। সঙ্গে বাড়তি পাওনা হয় ফুটবলারদের চূড়ান্ত অধঃপতনের ছবি। মাঠের খেলায় উপমহাদেশীয় ফুটবলেও বাংলাদেশের কোনো জায়গা নেই। কিছুদিন আগে বিশ্বকাপ বাছাই শেষ করেছে মাত্র ১ পয়েন্টের বিনিময়ে ৩২ গোলের বোঝা নিয়ে। এই পারফরম্যান্সের পর বিষণ্ন মনে ফেডারেশন কর্তাদের আলোচনায় টেবিলে বসার কথা, উত্তরণের পথ খোঁজার কথা। কিন্তু মাঠের খেলা নিয়ে ভাবার সময় নেই, কর্মকর্তারা নির্বাচনী হাওয়ায় ভেসে গিয়ে নিজেদের পদ-পদবি ঠিক রাখার উপায় খুঁজছেন। একবারও আয়নার মুখোমুখি হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করছেন না, ‘নির্বাচনে জিতলে ডুবে যাওয়া ফুটবল-জাহাজ টেনে তুলতে পারবেন কি না?’

ক্রিকেটকে দেখেও একটু লজ্জা হয় না ফুটবল সংগঠকদের। নিজেদের অক্ষমতাকে বুঝতে শেখেন না। তখন হয়তো খোঁড়া যুক্তি দেবেন, ফুটবলের ব্যাপ্তি বিশ্বময় আর ক্রিকেটের মাত্র ১০ দল। কিন্তু ১০ দলের মধ্যে লড়াইটাই যে ভীষণ উপভোগ করছে মানুষ। কারণ এ দেশের ক্রিকেটাররা বলে-কয়ে এখন পরাশক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানায়। পারফরম্যান্স দিয়ে তারা জিতে নিচ্ছে আমজনতার হৃদয়। মাশরাফি জিতলে পুরো জাতি গর্ববোধ করে, তেমনি কাঁদলে বিষণ্নতা ভর করে সবার মনে-অভিব্যক্তিতে। আর ফুটবলাররা? হার এমন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, তাদের চোখের পানি যেন শুকিয়ে গেছে। আর সুযোগ পেলে প্রশ্ন তোলে, ‘জাতীয় দল আমাদের কী দেয়?’

দিন তিনেক আগে এক হকি সংগঠক আফসোস করে বলছিলেন, ‘হকি শেষ হয়ে গেছে। কিছুদিন পর দেশে ক্রিকেট ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। ’

কেন? ক্রিকেট কি বলেছে হকি খেলা বন্ধ করে দিতে?

‘না। আমি কিন্তু ক্রিকেটের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে কিছু বলছি না। বরং একটা খেলা তো মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকবে। হকি লিগটা আবার পিছিয়ে গেল। কয়েকটি ক্লাবের আবেদনে তা পিছিয়ে গেল। হকির মতো ফুটবলেও শুরু হয়েছে টালবাহানা। ’

এটা সংগঠকদের ব্যর্থতা নয় কি?

‘সাদা চোখে দেখলে, যারা ফেডারেশনের চেয়ারে বসে আছে তারাই দায়ী। ভেতরে যে অনেক মারপ্যাঁচ আছে, সেটা তো আর বাইরের লোকজন বোঝে না। কোনো ক্লাব লোক দেখানোভাবে খেলার ঘোষণা দিয়ে আবার নানা অজুহাত দেখালে আপনি কী করবেন। একজন ক্রীড়া সংগঠকই আসলে পুরো ক্রীড়াঙ্গনকে শেষ করে দিচ্ছে। হকির পর এখন ফুটবলেও থাবা বসিয়েছে। সব ফেডারেশন টের পাচ্ছে কিন্তু সরকার বুঝতে পারছে না। ’

আপনি কি খুব নামিদামি ক্লাবের এক সংগঠকের কথা বলছেন? তিনি তো ক্রিকেটের সেবা করছেন!

‘ক্রিকেটে ঢুকেছেন অন্য উদ্দেশ্য নিয়ে। ওখানে যারা পরিচালক আছে তাদের সঙ্গে লড়াই করে পারবে না, সেটা তিনি জানেন। ফুটবল-হকি বন্ধ হয়ে গেলে তার দল করতে হয় না। এর চেয়ে আনন্দের আর কি আছে। ’

ভাবুন একবার, হালের এক সংগঠকের কী ভাবমূর্তি দাঁড়িয়েছে! এমন সংগঠকও আছেন যিনি ছুঁলে খেলাটির শুধু লোকসানই নাকি হয়, লাভ হয় না। তার খপ্পরেও পড়েছে ফুটবল। এত অশুভ শক্তি ঘিরে ধরেছে যে ফুটবলের বাঁচা সত্যিই কঠিন।

 

 


মন্তব্য