kalerkantho


দ্য ফিনিশার

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



দ্য ফিনিশার

‘সর্বকালের সেরা ফিনিশার’—অত বড় স্বীকৃতিটা ইয়ান চ্যাপেলের দেওয়া। শট প্লেসমেন্টে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক এমনকি ক্যারিবীয় কিংবদন্তি ব্রায়ান লারার চেয়েও বেশি নম্বর দিতে চান এই ‘বিস্ময়’ ক্রিকেটারকে।

সুনীল গাভাস্কারের চোখেও তিনি ‘সীমিত ওভারে এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান। এ নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। ’ যাঁর প্রশংসায় শ্রীলঙ্কার সাবেক তারকা সনাৎ জয়াসুরিয়া তো ভাষাই খুঁজে পাচ্ছেন না, ‘সে কী ধরনের ক্রিকেটার, আমি বলতে পারছি না। এক কথায় অসাধারণ!’ তিনি বিরাট কোহলি। সাবেক ক্রিকেটার থেকে রুপালি পর্দার তারকা, সতীর্থ থেকে প্রতিপক্ষ সবার মুখে কোহলি-বন্দনা। ক্রিকেটপ্রেমীরা তাঁর মাঝে যাঁর ছায়া খুঁজে ফেরেন সেই শচীন টেন্ডুলকারও ভরিয়ে দিচ্ছেন প্রশংসায়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ‘কোয়ার্টার ফাইনাল’ রূপ নেওয়া শেষ ম্যাচে ম্যাচ-জেতানো কাব্যিক ইনিংসটার প্রশংসায় ‘ব্যাটিং জিনিয়াস’ লেখেন, ‘ওহ! অনবদ্য বিরাট কোহলি। ’

রান তাড়ায় কোহলি এই মুহূর্তে সর্বেসর্বা! তাঁর ধারেকাছেও নেই কেউ! বিশেষ করে সীমিত ওভারে। আরো নির্দিষ্ট করে বললে টি-টোয়েন্টিতে।

খুনে ব্যাটিংয়ের অপূর্ব প্রদর্শনীতে ম্যাচ শেষ করে বুক উঁচু করে মাঠ ছাড়ায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। যেকোনো কন্ডিশনে যেকোনো পরিস্থিতিতে একা গড়ে দিচ্ছেন ম্যাচের ভাগ্য। সেটা বৈশ্বিক মঞ্চই হোক আর দ্বিপক্ষীয় সিরিজ। কোহলিরাজ চলছে সবখানে।

উইকেটে থিতু হয়ে গেলে কতটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারেন ভারতের এই ব্যাটসম্যান তা কয়েক দিন আগে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে অস্ট্রেলিয়াও। জিতলে সেমিফাইনালের টিকিট আর হারলে ধরতে হবে বাড়ি ফেরার বিমান। মোহালিতে ভারত-অস্ট্রেলিয়ার অমন কঠিন সমীকরণের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া যে ৬ উইকেটের বড় ব্যবধানে হেরে বিদায় নিয়েছে তা তো কোহলি-বীরত্বেই। ১৬০ রানের জয়ের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ৫১ বলে ৮২* রানের অসাধারণ ইনিংস। অমন বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের পর প্রতিপক্ষের ভাগ্য যা হওয়ার তা-ই বরণ করতে হয়েছে সেদিন স্টিভেন স্মিথদের। হেরে সেমিফাইনালের আগেই ছিটকে গেছে অস্ট্রেলিয়া।

বাইশ গজের মঞ্চে অমন বীরত্বের কাব্য রচনা করেছেন কোহলি অসংখ্যবার। গত বছর বিশ্ব টি-টোয়েন্টির সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও ভারত বিজয় উৎসব করে ফাইনালে নাম লিখিয়েছিল কিন্তু তাঁর ব্যাটে সওয়ার হয়ে। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ম্যাচে ফাফ দু প্লেসিস-জেপি দুমিনিরা ১৭২ রানের বড় স্কোরই গড়ে দিয়েছিলেন প্রোটিয়াদের। দক্ষিণ আফ্রিকার ওই চ্যালেঞ্জটা ভারত ৫ বল হাতে রেখে মোটে ৪ উইকেট হারিয়ে টপকে গিয়েছিল কোহলির ৪৪ বলে করা ৭২* রানের অসাধারণ ইনিংসটায় ভর করেই।

২০১৬ সালে নিজ দেশের আসরেও ভারতের পথচলার তিনিই অগ্রসেনানী। ব্যাটে অবদান রেখেছেন প্রতিটি ম্যাচে। নাগপুরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে দল হারলেও তাঁর ব্যাট থেকে এসেছিল ২৩ রান। এরপর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিপক্ষে ইডেন গার্ডেন্সে অপরাজিত হাফসেঞ্চুরি। ১১৯ রানের জয়ের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ৩৭ বলে ৫৫ রান করে সেদিনও দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিয়েই মাঠ ছেড়েছিলেন তিনি। এরপর বাংলাদেশের বিপক্ষে করেন ২৪। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে আবার আবির্ভূত হন ভয়ংকর রূপে। প্রবল চাপকে জয় করে দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ম্যাচটা ধীরে ধীরে হাতের মুঠোয় এনে দেন ভারতকে। জেমস ফকনারের করা ১৮তম ওভারে ১৯ রান নেওয়ার পর কোল্টার -নাইলের করা ১৯তম ওভারে চারবার বলকে সীমানাছাড়া করে শঙ্কার সব মেঘ দূর করে ভারতকে এনে দেন সেমিফাইনালের টিকিট।

ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম সংস্করণে রান তাড়া করায় কোহলি আক্ষরিক অর্থেই রাজা! ১২০ বলের খেলায় তাঁর ক্যারিয়ার গড় ৫৫.৪২। স্ট্রাইক রেট ১৩২.৯৯। রান তাড়া করায় এই গড়টা আবার ১০০ ছুঁই ছুঁই। ৯১.৮০। সীমানাটা যদি আরেকটু ছোট্ট করে শুধু রান তাড়া করে দলকে জেতানোয় করা হয়, তখন তাঁর গড়টা আরো ঈর্ষণীয়। টি-টোয়েন্টিতে পরে ব্যাট করে দলকে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার সময় তাঁর মোট রান ৭৩৭। এর মধ্যে সাতবারই ছিলেন অপরাজিত। যার ৬টিই আবার পঞ্চাশছোঁয়া ইনিংস। সেরা অবশ্যই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মোহালির ৮২। টি-টোয়েন্টিতে পরে ব্যাট করে দলকে জেতানোর ক্ষেত্রে তাঁর ব্যাটিং গড়টাও তাই অবিশ্বাস্য ১২২.৮৩। স্ট্রাইকরেট ১৩১। গণ্ডিটা আরেকটু ছোট্ট করে, শুধু বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে নামিয়ে আনা হয় তাহলে তাঁর গড়টা আরো বিস্ময় ছড়ায়। রান তাড়ায় শুধু বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে কোহলির রানের গড় কত অনুমান করুন তো! ২২৮.৫০। বিস্ময়কর!

টি-টোয়েন্টিতে পরে ব্যাট করা ব্যাটসম্যানদের রানের গড়েও তাঁর ধারেকাছেও নেই কেউ। কোহলি ছাড়া আর একজনেরই এই ক্যাটাগরিতে রানের গড় পঞ্চাশ ছুঁয়েছে। মাইক হাসির। তবে কোহলির ৯১.৮০ গড়ের চেয়ে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এই ব্যাটসম্যানের গড়টা (৫২.৬২) অনেক পেছনে। টি-টোয়েন্টিতে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করে হাজার রানের মাইলফলক ছোঁয়ার নজির আছে শুধু ব্রেন্ডন ম্যাককালামের। নিউজিল্যান্ডের সাবেক এই অধিনায়ক টি-টোয়েন্টিতে পরে ব্যাট করে রান করেছেন মোট ১০০৬। গড় ৩৩.৫৩। শতরান নেই একটিও, পঞ্চাশ আছে ৭টি। ব্রেন্ডন ম্যাককালামের পরের নামটিই কিন্তু কোহলির। পরে ব্যাট করে টি-টোয়েন্টিতে তাঁর মোট রান ৯১৮। আর ৮৯ রান করলেই তিনি পেছনে ফেলবেন কিউই সাবেক অধিনায়ককে। ইনিংসের হিসাবে অবশ্য ম্যাককালামের চেয়ে তিনি অনেক অনেক এগিয়ে। কোহলি তাঁর রানগুলো করেছেন মাত্র ১৯ ইনিংস খেলে, সেখানে ম্যাককালামের রানগুলো করতে লেগেছে ৩৮ ইনিংস।

রান তাড়া করায় এই মুহূর্তে আক্ষরিক অর্থে কোহলিই রাজা! অদ্বিতীয়!


মন্তব্য