kalerkantho


শেষ বেলার নাটক

ম্যাচের অন্তিমলগ্নে এক পক্ষে জয়ের জন্য মুহূর্ত গুনছে আর অন্য পক্ষ হার এড়াতে মরিয়া। এমনই রুদ্ধশ্বাস কিছু ম্যাচে শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় বদলে গেছে ফল। জয়ের আনন্দ উদ্যাপনের ক্ষণ গোনা দলটিই ভেঙে পড়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত হারের বেদনায় আর কোণঠাসা দলটিই হারের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিতে নিয়েছে জয়মাল্য। বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচটিই যার জ্বলজ্বলে উদাহরণ হলেও এমন নাটকীয়তা কিন্তু নতুন নয়। শেষ মুহূর্তে রং বদলে যাওয়া এমনই কিছু ম্যাচের কথা শোনাচ্ছেন সামীউর রহমান

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



শেষ বেলার নাটক

ভারতের কাছে হারের পর সাকিব-তামিমের হতাশা

অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা, এজবাস্টন

সেমিফাইনাল, ১৯৯৯ বিশ্বকাপ

স্টিভ ওয়াহর অদম্য সেঞ্চুরিতে ভর করে সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে সুপার সিক্স পর্বের দ্বিতীয় দল হিসেবে শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। সেমিফাইনালেও তাদের প্রতিপক্ষ সেই প্রোটিয়ারাই, যারা সেমিফাইনালে উঠেছিল সুপার সিক্স পর্বে তৃতীয় হয়ে। টস জিতে প্রতিপক্ষকে ব্যাট করতে পাঠিয়েছিলেন প্রোটিয়া অধিনায়ক হ্যানসি ক্রোনিয়ে। প্রথম ওভারেই ওপেনার মার্ক ওয়াহকে হারায় অস্ট্রেলিয়া, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট এবং রিকি পন্টিংও খুব বেশি রান জুড়তে পারেননি স্কোরবোর্ডে। মিডল অর্ডারে স্টিভ ওয়াহ ও মাইকেল বেভানের ৯০ রানের একটা জুটিই ভদ্রস্থ একটা সংগ্রহের দিকে এগিয়ে দেয় অস্ট্রেলিয়াকে। ইনিংস শেষের ৪ বল আগে অস্ট্রেলিয়া অলআউট হয় ২১৩ রানে। রান তাড়ায় হার্শেল গিবস আর গ্যারি কারস্টেনের উদ্বোধনী জুটিতেই আসে ৪৮ রান, এরপর শেন ওয়ার্ন ৫ রানের ভেতর দুজনকেই ফিরিয়ে প্রাণ ফেরান ম্যাচেও। মিডল অর্ডারে জ্যাক ক্যালিস আর জন্টি রোডস ৮৪ রানের জুটি গড়ে দলকে জয়ের কাছাকাছি নিয়ে আউট হয়ে গেলেও ভরসা হয়ে ছিলেন ল্যান্স ক্লুজনার। তাই শেষ ওভারে জয়ের জন্য ৬ বলে ৯ রান দরকার হলেও প্রোটিয়া সমর্থকদের কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না, কারণ ক্লুজনার যে ক্রিজে আছেন! ড্যানিয়েল ফ্লেমিংয়ের প্রথম বলটায় সপাটে ব্যাট চালিয়ে বল পাঠিয়ে দিলেন বাউন্ডারির বাইরে। পরের বলটাও চার! ওভারের প্রথম দুই বলেই সমতায় দক্ষিণ আফ্রিকা। জয়ের জন্য আর ১ রান লাগে, হাতে ১ উইকেট; এমন সময় স্টিভ ওয়াহ সব ফিল্ডারকে ভেতরের বৃত্তে জড়ো করলেন। ফ্লেমিংয়ের পরের বলটা ক্লুজনার পুল করলেও বল যায় ড্যারেন লেহম্যানের হাতে, দুই প্রান্তের দুই ব্যাটসম্যানের ভুল বোঝাবুঝির একটা আভাস পাওয়া যায় এই বলেই। পরের বলটাতেই যা হলো, সেটা সেদিন মাঠে উপস্থিত থাকা দর্শক, টিভি দর্শক সবার বোধ হয় আজীবন মনে থাকবে! ক্লুজনাররের কলে ডোনাল্ড দৌড়ালেন না, ব্যাট ফেলে দাঁড়িয়ে থাকলেন...দুই ব্যাটসম্যানই তখন বোলারের প্রান্তে, তারপর ব্যাট ছাড়াই ডোনাল্ড দিলেন দৌড়! ওদিকে মিড অফ থেকে ফিল্ডার বল কুড়িয়ে দিলেন ফ্লেমিংকে, তাঁর হাত থেকে গিলক্রিস্টের গ্লাভসে এবং গিলক্রিস্ট যখন স্টাম্প ভাঙলেন তখন ডোনাল্ড মাঝপিচ ছাড়িয়েছেন!

অবিশ্বাস্যভাবে জয়ের দোরগোড়ায় এসে, চাপের কাছে নতি স্বীকার প্রোটিয়াদের। ম্যাচ হলো টাই আর সুপার সিক্সে দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে এগিয়ে থেকে শেষ করায় সেমিফাইনালে চলে যায় অস্ট্রেলিয়া, পরবর্তীতে লর্ডসের ফাইনালে পাকিস্তানকে হারিয়ে শিরোপা জেতেন স্টিভ ওয়াহ।

ম্যানইউ ২-১ বায়ার্ন মিউনিখ, ন্যু ক্যাম্প

চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল, ১৯৯৯

১৯৮০ সালের এপ্রিলে মারা যাওয়ার কারণে আলফ্রেড হিচককের পক্ষে ১৯৯৯-র চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল সশরীরে দেখা সম্ভব ছিল না। দেখতে পারলে হয়তো মনে করতেন, তাঁর সাসপেন্স ছবিগুলোর চেয়ে ঢের বেশি নাটকীয়তা থাকে একটা ৯০ মিনিটের ফুটবল ম্যাচেও! সেবার গ্রুপ পর্বে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, বায়ার্ন মিউনিখ, ড্যানিশ চ্যাম্পিয়ন ব্রন্ডবি আর স্প্যানিশ চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনা একই গ্রুপে! মৃত্যুকূপ তো বটেই, এর চেয়ে বড় কোনো বিশেষণ থাকলে এই গ্রুপকে বোধ হয় তা-ই বলা যেত। সেই গ্রুপ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বায়ার্ন উঠল নকআউটে, ম্যানইউও পরের রাউন্ডে গেল রানার্স-আপ হিসেবে। গ্রুপেই আগুন নদী সাঁতরে ফেলার পর কোয়ার্টার ফাইনালে ইন্টার মিলান আর সেমিফাইনালে জুভেন্টাস, ইতালির এই দুই সেরা ক্লাবের বাধাটাও ম্যানইউ উতরে গেল। বায়ার্ন সে তুলনায় কিছুটা সহজ পথেই এলো ন্যু ক্যাম্পে, কোয়ার্টার ফাইনালে কাইজারস্লটার্ন আর সেমিফাইনালে ডায়নামো কিয়েভকে হারিয়ে। ২৬ মে ১৯৯৯, ন্যু ক্যাম্পে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল। তার দুই দিন আগে, কনকর্ড বিমানে চেপে। সেদিন বিমান চালিয়েছিলেন বারবারা হারমার, শব্দের চেয়ে বেশি গতিসম্পন্ন কনকর্ড বিমানের একমাত্র নারী বৈমানিক। ‘রেড ডেভিল’রা স্পেনে এসেই শোনে, বায়ার্নের কোচ ওটমার হিজফেল্ড ফাইনালের একাদশও চূড়ান্ত করে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন। ওদিকে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ! নিষেধাজ্ঞার কারণে নিয়মিত অধিনায়ক রয় কিন ও মিডফিল্ডার পল স্কোলসকে পাওয়া যাবে না, এসব হিসাব মেলাতেই তাঁর ঘুম হারাম। অপেরা সংগীতের সংক্ষিপ্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে খেলা শুরু হলো এবং মিনিট ছয়েকের মাথাতেই মারিও ব্যাসলারের ফ্রি কিক থেকে গোল করে এগিয়ে গেল বায়ার্ন। লোথার ম্যাথাউজের নেতৃত্বে জার্মান রক্ষণ ভাঙার সাধ্য হয়ে ওঠেনি ম্যানইউর দুই ফরোয়ার্ড ডুইট ইয়র্ক ও অ্যান্ডি কোলের। মাঝমাঠে কিনের অভাবটা বোধ হচ্ছিল জোরালোভাবে। ওদিকে ব্যাসলার প্রায়ই ব্যস্ত রাখছিলেন পিটার স্মেইকেলকে। সব মিলিয়ে হারের তেতো স্বাদটা ক্রমশ দলা পাকিয়ে উঠছিল ম্যানইউ ফুটবলারদের গলার কাছে।

ছবিটা একটু বদলাল টেডি শেরিংহ্যাম ও ওলে গানার সোলস্কায়ারকে বদলি হিসেবে নামানোর পর। তাঁরা অলিভার কানকে শেষবেলায় কিছু ব্যস্ততাও উপহার দিলেন। এমন সময় জানান হলো, ইনজুরি সময় তিন মিনিট। এই তিন মিনিট প্রতিপক্ষকে ঠেকিয়ে রাখলেই বায়ার্ন চ্যাম্পিয়ন, আর ম্যানইউর জন্য এই ১৮০ সেকেন্ড হচ্ছে শেষ সুযোগের আয়ু। কর্নার পেল ম্যানইউ, শেষ চেষ্টা হিসেবে গোলরক্ষক স্মেইকেলও গোলবার ছেড়ে চলে এসেছেন প্রতিপক্ষের বক্সের ভেতর। বেকহ্যামের নেওয়া কর্নারটা ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলেন ফিঙ্ক, তাঁর দুর্বল শটে বল চলে যায় ফাঁকায় দাঁড়ানো শেরিংহ্যামের পায়ে, সেখান থেকে ভলিতে গোল! ম্যাচঘড়ির কাঁটা তখন ৯০ মিনিট ৩৬ সেকেন্ড। কিক অফের পর খেলা শুরু হলে আবার কর্নার পায় ম্যানইউ, কর্নার কিক নেন বেকহ্যামই। শেরিংহামের লাফিয়ে ওঠা হেডে সোলস্কায়ারের টোকায় বল যখন জালে ঢোকে, তখন ম্যাচের আয়ু ৯২ মিনিট ১৭ সেকেন্ড! অর্থাৎ আর মাত্র ৪৩ সেকেন্ড ম্যানইউকে রুখতে পারলেই ম্যাচটা অতিরিক্ত সময়ে নিতে পারত বায়ার্ন, তখন হয়তো গল্পটা হতে পারত অন্য রকমও। বিস্ময়ে বিমূঢ় বায়ার্ন খেলোয়াড়রা মাঠেই বসে পড়েন হতাশায়, কেউ বা শুয়ে পড়েন। তাদের বিশ্বাসই হচ্ছিল না, ৯০ মিনিট ১-০তে এগিয়ে থাকার পরও ফাইনালটা তারা হেরে গেছেন ২-১ গোলে।

ওদিকে পুরস্কার বিতরণের মঞ্চে অন্য নাটক! বায়ার্নকে সম্ভাব্য বিজয়ী ভেবে ট্রফিতে বায়ার্নের রিবন পরানো হয়ে গেছে! পুরস্কার দেওয়ার জন্য উয়েফার সেসময়কার সভাপতি লেনার্ত ইয়োহানসন প্রেসিডেন্সিয়াল বক্স ছেড়ে এসে মাঠে নামার জন্য টানেল দিয়ে বের হয়ে দেখে বলেছিলেন, ‘বিশ্বাস করতে পারছি না। এ কী হচ্ছে? জয়ীরা কাঁদছে আর হেরে যাওয়া দল আনন্দে নাচছে!’

ইউটাহ জ্যাজ ৮৬-৮৭ শিকাগো বুলস

এনবিএ ফাইনাল, গেম সিক্স, সল্ট লেক সিটি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেশাদার বাস্কেটবল প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ পর্যায় ‘এনবিএ’র শিরোপা নির্ধারণ হয় পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল—এই দুই অঞ্চলের সেরা দলের মধ্যে ৭ ম্যাচের সিরিজের মাধ্যমে। ‘এনবিএ ফাইনালস’ নামে পরিচিত ৭ ম্যাচের এই সিরিজে যে দল ৪টি ম্যাচ জেতে তারাই হয় চ্যাম্পিয়ন। ১৯৯৮ সালের এনবিএ ফাইনালসে, মুখোমুখি ইউটাহ জ্যাজ ও শিকাগো বুলস। সেবার প্রথম ম্যাচটি জিতেছে ইউটাহ জ্যাজ, এরপর টানা তিনটি জিতেছে শিকাগো বুলস আর ছয় নম্বরটাতেও তারা জয়ের খুব কাছাকাছি। প্রথমার্ধ শেষে ইউটাহ ৪৯-৪৫ পয়েন্টে এগিয়ে, থার্ড কোয়ার্টারে সেটা হয় ৬৬-৬১। খেলা যখন মাত্র ৫ সেকেন্ড বাকি, তখনো ৮৭-৮৬ পয়েন্টে এগিয়ে ইউটাহই। এমন সময়ে মাইকেল জর্ডানের সেই অবিস্মরণীয় কীর্তি! রিংয়ের বাইরে থেকে জর্ডানের ছোড়া বল গিয়ে পড়ে বাস্কেটে, ২ পয়েন্টে পিছিয়ে থাকা বুলস এগিয়ে যায় ১ পয়েন্টে। ইউটাহর নিজের মাঠে তাদের হারিয়েই ফাইনালের চতুর্থ ম্যাচটি জিতে নেয় শিকাগো বুলস, আর শূন্যে ভেসে জর্ডানের সেই শটটা তাঁকে পৌঁছে দেয় কিংবদন্তির আসনে।


মন্তব্য