kalerkantho

তবু সেরা

নোমান মোহাম্মদ   

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



তবু সেরা

জোহানেসবার্গ থেকে কলকাতার দূরত্ব বিস্তর। অন্তত ‘ধর্মশালা থেকে ধর্মতলা’ যতটুকু পথ পাড়ি দিয়েছি, তার চেয়ে সেটি অনেক বেশি তো বটেই!

বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অভিযান শুরু ২০০৭ সালে, দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ থেকে। এরপর ২০০৯ সালের ইংল্যান্ড, ২০১০ সালের ওয়েস্ট ই্ন্ডিজ, ২০১২ সালের শ্রীলঙ্কা কিংবা ২০১৪ সালের নিজ দেশ বাংলাদেশ—মনে রাখর মতো অর্জন নেই কোথাও। বিচ্ছিন্ন কারণে ওই আসরগুলো মনে রয়েছে ঠিকই। কিন্তু বাঙালির ক্রিকেটপ্রেমের দীর্ঘশ্বাস কিংবা গর্ব মিশে নেই ওই টুর্নামেন্টগুলোর সঙ্গে।

২০১৬ সালের টুর্নামেন্টে রয়েছে যা। আগের চার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যতটুকু পথ পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটে, এই টুর্নামেন্টে তার চেয়ে ঢের বেশি পথ অতিক্রম করেছে তা।

শুরুটা ধর্মশালা থেকে। আর বাংলাদেশের ক্রিকেট সামর্থ্যের স্বীকৃতির সূচক হয়ে আছে হিমাচল প্রদেশের ছবির মতো ছিমছাম শহরটি। এশিয়া কাপ ক্রিকেটের ফাইনাল সদ্য খেলে আসে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল; তা-ও পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার মতো দলকে পেছনে ফেলে। সেই বাংলাদশকে কি না টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মূল পর্ব খেলার জন্য বাছাই পর্বের পরীক্ষায় নামতে হয়! ধর্মশালার প্রথম বিস্ময় ছিল সেখানেই। শহরের ঝিমধরা চায়ের দোকান কিংবা মন্দ্রসপ্তকে চলা ম্যাকলয়েডগঞ্জের দালাইলামার আশ্রম—বাংলাদেশি সাংবাদিক পরিচয় পেতে ওই সমীহ ঝরে পড়েছে সবার কণ্ঠে। আইপিএল খেলার সুবাদে সাকিব আল হাসান না হয় এখানে পরিচিত মুখ; পাশাপাশি মাশরাফি বিন মর্তুজার নেতৃত্ব গুণও প্রবল প্রশংসিত এখানকার আমজনতায়। তামিম ইকবালের ব্যাটিং বিস্ফোরণ বিমোহিত করে তাদের। সাব্বির রহমান কিংবা তাসকিন আহমেদদের সামর্থ্যও মুগ্ধ করে ক্রিকেট মানচিত্রে পিছিয়ে থাকা ওই শহরের ক্রিকেট-বাসিন্দাদের।

তবু তো সেটি নিতান্ত বাছাই পর্ব। এশিয়া কাপের ফাইনালে ওঠে যে দল, হারায় পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার মতো পরাশক্তিকে—তাদের কাছে নেদারল্যান্ডস-আয়ারল্যান্ড-ওমান কোন ছাড়! বাংলাদেশের আতঙ্ক হয়ে ছিল বরং ধর্মশালার প্রকৃতি। মুখ গোমরা করে রাখা আকাশ যে ওই মন খারাপের ছায়া ছড়িয়ে দিতে পারত এ দেশের ক্রিকেটকুলে! কিন্তু প্রতিপক্ষের পাশাপাশি এই আবহাওয়াও জয় করে মাশরাফির দল। হোক না সেটি ফুটবলের টাইব্রেকারে জেতার মতো, যেখানে জিতলে করতালির ঝড় ওঠে না। কিন্তু হারলে তো ঠিকই গালাগালির তুফান উঠত! বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি সামর্থ্যের ওপর পড়ে যেত বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন। ধর্মশালার অপরূপ পরিবেশে সেটি তো অন্তত হতে দেয়নি মাশরাফি-ব্রিগেড!

বাছাই পর্বের আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে মূল পর্বের লড়াই। সেখানে চার ম্যাচের একটিও জেতেনি বটে বাংলাদেশ; কিন্তু এই বিশ্বকাপকে চিরকালই সমর্থকরা মনে রাখবে আফসোসের সুরে। দীর্ঘশ্বাসের পঙিক্ততে। ভুতুড়ে এক ম্যাচ যে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ-অভিযাত্রাকে স্তব্ধ করে দেয় একেবারে! দুর্ভাগ্যের ছারপোকায় কাটা এই অভিযানকে কী করে ভুলবে ক্রিকেটপাগল বাঙালি!

পাকিস্তানের কাছে প্রথম ম্যাচে হারটা প্রত্যাশিত না হয়তো। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচে বাংলাদেশের বিজয় নিশান ওড়ানোয় স্বপ্নের আকাশ ছিল অনেক বড়। তবু ওই পরাশক্তির কাছে হার মেনে নেওয়াটা হয়তো অত কঠিনও না। কিন্তু এরপর? তাসকিন আহমেদ ও আরাফাত সানির বোলিং অ্যাকশনে সন্দেহ করা হয় আগেই। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে আগে নিষেধাজ্ঞার খড়্গ নেমে আসে তাদের ওপর। এর মধ্যে তাসকিনের অ্যাকশন অবৈধ হওয়াটা মানতেই পারে না বাংলাদেশ। সংবাদ সম্মেলনে এসে অধিনায়ক মাশরাফির আবেগের বিস্ফোরণে তারই প্রমাণ।

বাতাসে তখন উড়ে বেড়ায় কত ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব! অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভাঙাচোরা দল ওই স্রোতের বিপরীতে তরী বাইতে পারে না। ভারতের বিপক্ষে তো তীরে পৌঁছে যায় প্রায়। শেষ তিন বলে দুই রানের সহজ সমীকরণের সামনে এসে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। ফিসফাসের সব ষড়যন্ত্রের জবাব দেওয়ার, বিশ্বকাপের মঞ্চে ভারতের মাটিতে ভারতকে হারানোর সঙ্গে অমনই নিঃশ্বাস দূরত্বে চলে আসে মাশরাফির দল। কিন্তু ওই সামান্য দূরত্ব পেরিয়ে জয়ের সুবর্ণবন্দরে আর নোঙর করা হয় না তাদের। অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়ভাবে শেষ তিন বলে তিন উইকেট হারিয়ে ম্যাচটি হেরে যায়। তাতে হারিয়ে যায় বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ স্বপ্নের শেষ আশাও। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অসহায় আত্মসমর্পণের চিত্রনাট্য লেখা হয়ে যায় সেখানেই।

তবু ভারতের মাটিতে ভারতকে কাঁপিয়ে দিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটের সমীহ ঠিকই আদায় করে নেয় বাংলাদেশ। এখানকার আমজনতায় ‘বড় ভাই’সুলভ আচরণ যেমন রয়েছে, তেমনি নতুন উপলব্ধিও স্পষ্ট—বাংলাদেশকে অবহেলার দিন শেষ। কলকাতার বাঙালিরা তাই হয়তো আগেই রক্ষাকবজ নিয়ে রাখছেন ‘বাংলাদেশের জয় আমাদেরও জয়’ বলে। যদিও সর্বাংশে সেটিকে সত্য মনে করার কোনো কারণ নেই। অন্তত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় দুই দফা কলকাতা-অভিজ্ঞতা সেটিকে অনুমোদন করে না।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে চমকে দেয় বাংলাদেশ। ২০০৭ সালের ঘটনা সেটি। দক্ষিণ আফ্রিকার সেই আসরটি এ কারণেই স্মরণীয়। ২০০৯ সালের টুর্নামেন্ট হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে। আয়ারল্যান্ডের কাছে হারের ক্ষত এখনো খুঁচিয়ে চলে বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের। ২০১০ সালে অমন কেলেঙ্কারি কিছু হয়নি বটে; আবার স্মরণীয় কিছুও নয়। একই কথা বলা যায় ২০১২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সম্পর্কেও। ২০১৪ সালের টুর্নামেন্ট আবার একেবারে ভিন্ন রকম; ২০০৯ সালের চেয়ে বিব্রতকর উপাদান বেশি সেখানে। হংকংয়ের মতো ‘পুঁচকে’ দলের কাছে যে হারতে হয় সেবার। বছরদুয়েক আগে নিজ দেশে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টের কথা ভাবলে সবার আগে মনে পড়ে সেই কলঙ্কের কথা।

আর ২০১৬? বেঙ্গালুরু রূপকথা হতে হতেও যে হয়নি, সব ছাপিয়ে সেটিই সবার স্মৃতিতে জ্বলজ্বলে হয়ে থাকবে। আর সেটি শুধু এক-দুই দিন নয়, চিরদিনের জন্য! ২০০৩ সালের মুলতান টেস্ট কিংবা ২০১২ সালের এশিয়া কাপ ফাইনালের মতো এই আফসোসও যাওয়ার নয় বাঙালির। কখনোই না!


মন্তব্য