kalerkantho


ফাইনালের রোমাঞ্চ

বিশ্ব টি-টোয়েন্টির প্রথম ফাইনালেই রুদ্ধশ্বাস লড়াই। জোহানেসবার্গে রোলার কোস্টারের মতো ওঠানামার ম্যাচটিতে পাকিস্তানকে ৫ রানে হারিয়েছিল ভারত। এর পরের চারটি ফাইনাল অবশ্য জমেনি। একতরফা জয়ই পেয়েছে সবাই। ৩ এপ্রিল হতে যাওয়া এবারের ফাইনালে জমজমাট লড়াই দেখতে মুখিয়ে সবাই। এর আগে আগের পাঁচ ফাইনালের স্মৃতিচারণা করেছেন রাহেনুর ইসলাম

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



ফাইনালের রোমাঞ্চ

২০০৭ : ভারত-পাকিস্তান

রুদ্ধশ্বাস। স্নায়ুক্ষয়ী।

জমজমাট। সব বিশেষণের সংমিশ্রণই ছিল ২০০৭ বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ফাইনাল। ম্যাচের উত্তেজনা এমনিতেই আকাশ ছুঁয়েছিল ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি হওয়ায়। ভারতের ১৫৭ রানের জবাবে ডুবতে ডুবতেও পাকিস্তান প্রায় তীরে এসে যাওয়ায় উত্তেজনার ষোলোকলা পূর্ণ একেবারে। তবে পাকিস্তান বলেই শেষ পর্যন্ত হাতের মুঠোর ফাইনালটা হেরে যায় ৫ রানে! শেষ ওভারে জয়ের জন্য দরকার ১৩ রান। অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি বল তুলে দেন অখ্যাত যোগিন্দর শর্মার হাতে। প্রথম বলটাই ওয়াইড। পরের বলে ব্যাটে লাগেনি মিসবাহ উল হকের। তবে দ্বিতীয় বলে ছক্কা মেরে লক্ষ্যটা নামিয়ে আনেন ৪ বলে ৬-এ। কিন্তু পরের বলটা স্কুপ করতে গিয়ে শর্ট ফাইন লেগে শ্রীশান্থের তালুবন্দি মিসবাহ। ৫ রানের জয়ে প্রথম আসরের শিরোপা উল্লাসে মাতে ভারত।

টানা পঞ্চম ম্যাচে টস জিতে জোহানেসবার্গে ব্যাটিং নিয়েছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। বীরেন্দর শেবাগের চোটে অভিষেক হয় ইউসুফ পাঠানের। তিনি ৮ বলে মাত্র ১২ করলেও ম্যাচ সেরা অন্য ওপেনার গৌতম গম্ভীরের ৫৪ বলে ৮ বাউন্ডারি ২ ছক্কায় ৭৫, রোহিত শর্মার ১৬ বলে ৩০ আর যুবরাজ সিংয়ের ১৯ বলে ১৪তে ৫ উইকেটে ১৫৭ করেছিল ভারত। জবাবে ৭৭ রানে ৬ উইকেট হারালেও মিসবাহর ৪৩, ইমরান নাজিরের ৩৩, ইউনিস খানের ২৪, ইয়াসির আরাফাতের ১৫তে ম্যাচের উত্তেজনা ছিল শেষ ওভারেও। মিসবাহর পাগুলে স্কুপে নেভে পাকিস্তানের আশার প্রদীপ।

২০০৯ : পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা

এবার আর স্নায়ুবিনাশী কোনো ম্যাচ নয়। বরং যাঁর কাঁধে চড়ে লর্ডসের ফাইনালে এসেছিল লঙ্কানরা সেই তিলকরত্নে দিলশানকে (০) প্রথম ওভারেই ফিরিয়ে ম্যাচের নিয়তি ঠিক করে দেন মোহাম্মদ আমির। ১৭ বছর বয়সী আমিরের শর্ট বলে স্কুপ করতে যেয়ে শর্ট ফাইন লেগে শাহজাইব হাসানের হাতে ধরা পড়েন দিলশান। দ্বিতীয় ওভারেই জেহান মোবারক (০) ফেরায় আরো চাপে পড়ে লঙ্কানরা। তাতেই চ্যাপ্টা হয়ে ৩২ রানে হারিয়ে ফেলে ৪ উইকেট। তার পরও স্কোরটা ৬ উইকেটে ১৩৮-এ পৌঁছে কুমার সাঙ্গাকারা আর অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজের কল্যাণে। সাঙ্গাকারা ৫২ বলে ৭ বাউন্ডারিতে ৬৪ আর ম্যাথুজ অপরাজিত ছিলেন ২৪ বলে ৩ বাউন্ডারি ১ ছক্কায় ৩৫ রানে। আব্দুল রাজ্জাক নেন ৩ উইকেট।

জবাবে কামরান আকমল (৩৭) ও শাহজাইব হাসানের (১৯) ৪৮ রানের উদ্বোধনী জুটিতে দুরন্ত শুরুই পায় পাকিস্তান। এরপর শহীদ আফ্রিদির ৪০ বলে ২ বাউন্ডারি ২ ছক্কায় অপরাজিত ৫৪ রানে ৮ বল হাতে রেখে ৮ উইকেটের সহজ জয়ই পায় ইউনিস খানের দল। শোয়েব মালিক অপরাজিত ছিলেন ২৪ রানে। ফিফটির পাশাপাশি ৪ ওভারে ২০ রানে ১ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরা হয়েছিলেন আফ্রিদি। শিরোপাটা পাকিস্তানি অধিনায়ক ইউনিস খান উৎসর্গ করেন ২০০৭ বিশ্বকাপে হোটেল রুমে মারা যাওয়া কোচ বব উলমারকে।

 

২০১০ : ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া

সেবারই এশিয়ার কোনো দল পৌঁছতে পারেনি ফাইনালে। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া মুখোমুখি হওয়ায় বার্বাডোজের ফাইনালটা পরিণত হয়েছিল এক টুকরো অ্যাশেজে। তবে ফাইনালের গতিপথ নির্ধারিত হয়ে যায় প্রথম তিন ওভারেই অস্ট্রেলিয়ার তিন ব্যাটসম্যানের বিদায়ে। প্রথম ওভারেরই তৃতীয় বলে রায়ান সাইডবটম ফেরান শেন ওয়াটসনকে (২)। পরের ওভারে রান আউটে কাটা পড়েন ডেভিড ওয়ার্নার (২)। তৃতীয় ওভারের প্রথম বলে উইকেটরক্ষক ব্র্যাড হাডিনকে (১) ফেরান সাইডবটম। ডেভিড হাসি ও ক্যামেরন হোয়াইটের পঞ্চম উইকেটে ৫০ রানের জুটিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। ১৯ বলে ৩০ করে ফিরেছিলেন হোয়াইট। আর হাসি একেবারে শেষ ওভারে ফেরেন ৫৪ বলে ৫৯ করে। ৬ উইকেটে ১৪৭ রানের স্কোর গড়ে মাইকেল ক্লার্কের দল।

লড়াই করা গেলেও এই স্কোর শিরোপা জেতার মতো ছিল না অস্ট্রেলিয়ার। দ্বিতীয় উইকেটে কেভিন পিটারসেন ও ক্রেগ কিসওয়েটারের ১১১ রানের জুটিতে ৩ ওভার হাতে রেখে ৭ উইকেটের ঐতিহাসিক জয়ই পায় ইংল্যান্ড। আইসিসি আয়োজিত কোনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে এটাই ইংল্যান্ডের প্রথম শিরোপা। ফুটবল বিশ্বকাপ এনে দেওয়া অধিনায়ক ববি মুর আর রাগবি বিশ্বকাপ জেতানো মার্টিন জনসনের পাশে তাই নাম লেখান ইংলিশ অধিনায়ক পল কলিংউড। ম্যাচসেরা কিসওয়েটার ৪৯ বলে ৬৩ আর সিরিজ সেরা পিটারসেন করেছিলেন ৪১ বলে ৪৭।

২০১২ : ওয়েস্ট ইন্ডিজ-শ্রীলঙ্কা

পাওয়ার প্লের ৬ ওভারে ২ উইকেটে ১৪ রান। ১০ ওভার শেষে স্কোর ২ উইকেটে ৩২। এমনকি ইনিংস শুরুর পর ব্যাট থেকে প্রথম রানটা আসে ১৭ বল পর! কলম্বোর ফাইনালটা ওয়েস্ট ইন্ডিজ একতরফা হারতে যাচ্ছে সবাই ধরেই নিয়েছিল ততক্ষণে। কিন্তু সেখান থেকেই লড়াই শুরু ক্যারিবিয়ানদের। দলের প্রাণভোমরা ক্রিস গেইল মাত্র ৩ রানে ফিরলেও হালটা ধরেন মারলন স্যামুয়েলস। তাঁর ৫৬ বলে ৩ বাউন্ডারি ৬ ছক্কায় ৭৮ রানের ইনিংসটিকে টি-টোয়েন্টির অন্যতম সেরার স্বীকৃতি দেন অনেকে। স্যামুয়েলস ফেরার পর ১৮তম ওভার শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ করেছিল ১১৮। অধিনায়ক ড্যারেন সামির ১৫ বলে অপরাজিত ২৬-এ শেষ পর্যন্ত স্কোরটা পৌঁছে ৬ উইকেটে ১৩৭-এ। অজন্থা মেন্ডিস ৪ ওভারে ১২ রানে ৪ উইকেট নিলেও টি-টোয়েন্টির সেরা বোলার লাসিথ মালিঙ্গা ৪ ওভারে দিয়েছিলেন ৫৪।

লঙ্কানরাও হয়তো আগাম শিরোপা উৎসবই করছিলেন ড্রেসিংরুমে। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই কাল হয় শেষ পর্যন্ত। দ্বিতীয় ওভারেই তিলকরত্নে দিলশানকে (০) বোল্ড করেন রবি রামপাল। মাহেলা জয়াবর্ধনে (৩৩) ও কুমার সাঙ্গাকারার (২২) দ্বিতীয় উইকেটে ৪২ রানের জুটির পরও ৯.৩ ওভারে স্কোরটা ছিল ৪৮। সুনীল নারিন জুটিটা ভাঙার পর ধস নামে মিডলঅর্ডারে। ১ উইকেটে ৪৮ থেকে ৬৯ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে বসেন লঙ্কানরা। সেই চাপটা কাটাতে না পেরে ৮ বল বাকি থাকতে ১০১-এ গুটিয়ে ৩৬ রানে হারেন লঙ্কানরা।

২০১৪ : শ্রীলঙ্কা-ভারত

আগের দুই ফাইনালে বুক ভাঙলেও মিরপুরের ফাইনালে আনন্দে ভাসেন লঙ্কানরা। দুই কিংবদন্তি কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনে আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন টুর্নামেন্ট শেষে টি-টোয়েন্টি ছাড়ার। এই দুই ক্রিকেটার এর আগে চার চারটি ফাইনালে হারায় সতীর্থরা মুখিয়ে ছিলেন অন্তত শেষবার শিরোপা জয়ে তাঁদের বিদায়ী উপহার দিতে। পেরেছিলও লাসিথ মালিঙ্গার দল। একতরফা ফাইনালে ভারতকে ১৩ বল বাকি থাকতে ৬ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্ব টি-টোয়েন্টির স্বাদ পায় শ্রীলঙ্কা।

টস হেরে ব্যাট করতে নেমে ১০.৩ ওভারে ২ উইকেটে ৬৪ করেছিল ভারত। যুবরাজ সিং উইকেটে আসার পর থেমে যায় রানের গতি। ২০০৭ বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে ছয় বলে টানা ছয়টি ছক্কা মারা যুবরাজ ফাইনালের মতো মঞ্চে করেন ২১ বলে ১১। তাতে বিফলে যায় বিরাট কোহলির ৫৮ বলে ৫ বাউন্ডারি ৪ ছক্কায় ৭৭ রানের অসাধারণ ইনিংসটি। কুলাসেকারার বল তুলে মারতে গিয়ে যুবরাজ ফেরার সময় ড্যারেন সামি টুইট করেছিলেন, ‘এই ক্যাচটা নেওয়ার দরকার ছিল না!’ ৪ উইকেট হারিয়ে ভারত করে মাত্র ১৩০ যা বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ফাইনালের সর্বনিম্ন স্কোর। জবাবে ম্যাচসেরা কুমার সাঙ্গাকারার ৩৫ বলে ৬ বাউন্ডারি ১ ছক্কায় অপরাজিত ৫২তে ৬ উইকেটের সহজ জয়ই পান লঙ্কানরা। মাহেলা জয়াবর্ধনে ২৪, থিসারা পেরেরা ২৩ ও তিলকরত্নে দিলশান করেছিলেন ১৮।


মন্তব্য