kalerkantho


নির্বাচিত কলাম

ক্রিকেটের বাইরেও জীবন আছে

গ্র্যান্ট এলিয়ট   

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ক্রিকেটের বাইরেও জীবন আছে

জেমস নিশামকে বিশ্বকাপের দলে না নিয়ে আমাকে কেন নেওয়া হয়েছিল, এই প্রশ্নটা অনেকবারই এসেছিল নানাভাবে। এমনকি নিশামও টুইটারে আমাকে লিখেছিল, ‘বিশ্বকাপের জন্য শুভকামনা বন্ধু, ভালো করে খেলবে। ; আমিও তাকে  লিখেছিলাম, ‘ধন্যবাদ, তোমার কষ্টটা বুঝতে পারছি। তোমার সামনে অনেক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। ’ আসলে আমি কেমন মানুষ সেটা ক্রিকেট দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। আমি চাই না স্রেফ ক্রিকেটারই হোক আমার পরিচয়। আমি শুধু একজন সত্যিকারের ভালো, সৎ মানুষ হতে চাই। মানুষের সঙ্গে সেভাবেই মিশতে চাই, যেভাবে মেশা উচিত। কারো পক্ষে তো আর সারাজীবন ক্রিকেটার হয়ে থাকা সম্ভব নয়। ক্রিকেটার হিসেবে আমাদের খানিকটা নাম হয়েছে বটে, এটা একটা সুযোগ সত্যিকারের ভালো কাজ করার, যা ব্যবধান গড়ে দেবে। কোনো দাতব্য সংস্থার হয়ে কাজ করা, ভালো কিছু করা, যেমনটা স্টিভ ওয়াহ করছেন।

অলরাউন্ডার হিসেবে নিশাম ও কোরে আন্ডারসন, দুজনকেই ভবিষ্যতে নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটের জন্য বড় কিছু বলে মনে করা হচ্ছিল। আমার কথা বোধ হয় ভুলেই গিয়েছিল সবাই। তারপর বিশ্বকাপের আগে আগে আমি বোধ হয় খানিকটা ভালো কিছু করলাম, নিশামেরও কি যেন একটা ছোটখাটো চোট ছিল। এসময় নির্বাচকরা চাইছিলেন এমন একজনকে, যে ব্যাটিং-বোলিং দুটি কাজই চালিয়ে নিতে পারবে, আর মিডল অর্ডারে খানিকটা অভিজ্ঞতাও যোগ করবে। আমার সৌভাগ্য যে পাঁচ নম্বরে ব্যাট করার সুযোগটা পেয়ে গেলাম। কারণ ব্রেন্ডন (ম্যাককালাম) সিদ্ধান্ত নেয় ইনিংস সূচনা করার, তাতেই সব পালটে যায়। নির্বাচকরা খুঁজছিলেন এমন একজনকে, যে মূলত ব্যাটসম্যান, তবে বোলিং সামর্থ্যটা বোনাস। ব্যস, আমি সেখানে ঢুকে পড়লাম। তবে আমার মনে হয়, নিশামের জায়গাটা আমি নিইনি, কারণ হয় নির্বাচকরা এখানে একজন পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যানকে নিতেন অথবা আমাকেই, যে ব্যাট করার সঙ্গে একটু বোলিংও পারে। কারণ প্রকৃত অলরাউন্ডার হিসেবে ছয়ে তো কোরে ছিলই।

সে সময় দিনকাল বেশ কষ্টেই যাচ্ছিল আমার। নিউজিল্যান্ডে পেশাদার ক্রিকেটে অর্থকড়ি তেমন নেই, তাই আমি বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজারের একটা চাকরি নিলাম। চার দিনের ক্রিকেট ছেড়ে দিলাম, শুধুই সাদা বলে খেলি। দীর্ঘদিন এভাবেই গেছে, সকালে ঘুম থেকে উঠে জিমে গিয়ে ফিটনেস ধরে রাখা, এরপর অফিসে যাওয়া। সেখান থেকে অনুশীলনে যাওয়া, তারপর আবার কাজে যাওয়া। আমার সহকর্মীদের অনেকেই ছিলেন মহিলা, তাঁদের ক্রিকেট নিয়ে খুব একটা জানাশোনা ছিল না। পুরুষ সহকর্মীরা জানতেন, ভালো খেলার খবর দেখলে পর দিন অফিসে এলে প্রশংসা করতেন। তাদের কাছ থেকে শুনে মহিলা সহকর্মীরা তার পর দিন আমার প্রশংসা করতেন! আমি কিন্তু ব্যাপারটা উপভোগই করতাম।

আমার মনে হয়, ক্রিকেটারদের জীবনের প্রতি একটা সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ক্রিকেটের ওপর ভরসা করা যায় না। আর সব কিছুতেই একটু হলেও ভাগ্য দরকার হয়। সঠিক সময়ে সঠিক জায়গাটায় থাকতে হয়। আমার বেলায় এটা অনেক হয়েছে। ২০০৯ সালের চ্যামিপয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে ভাঙা বুড়ো আঙুল নিয়ে খেলে চাপের মুখে ব্যাট করে দলকে জেতালাম। কিন্তু এরপর আরব আমিরাত সফরটায় সেই বুড়ো আঙুলের চোটের কারণে যেতে পারলাম না, স্কট স্টাইরিস তাতে করে দলে ফেরার সুযোগ পেল এবং তার যেন সে সময় পুনর্জন্ম হলো! পরের ম্যাচ খেলতে আমার লাগল ১০ মাস! ম্যাট হেনরির কথাই ধরা যাক না, সে তো বোধ হয় জীবনের সেরা ফর্মে আছে এখন। কিন্তু বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে তো আসতে পারল না।

তবে শেষ পর্যন্ত ক্রিকেট তো একটা খেলাই। একটা চামড়ার বলকে পিটিয়ে বাউন্ডারির বাইরে পাঠানো, এটা তো মজার জন্যই নাকি! আমরা যে কারণে এই খেলাটা খেলতে শুরু করি সেটা তো মজা পেয়েছিলাম বলেই, নয় কি! এই মূল ব্যপারটাকে দৃষ্টির আড়াল হতে দেওয়া যাবে না। পেশাদার ক্রিকেটারদের চোখের সামনে থেকে এই সত্যটা খুব সহজেই হারিয়ে যায়, সামনে চলে আসে আর্থিক ব্যাপারস্যাপার, চাপসহ নানা কিছু। আমার জন্য সবচেয়ে খারাপ এটাই হতে পারে যে আমি ক্রিকেট খেলছি না। তখন আমি একটা চাকরি খুঁজব এবং সম্ভবত আমার পরিবারকে আরেকটু বেশি সময় দেব। এতে সব কিছু শেষ হয়ে যায় না। এমনভাবে খেলে যেতে হবে যাতে মনে হয় খেলাটাকে খুব বেশি কিছু মনে না করা, তবে ভেতরে ভেতরে খেলাটাকে নিয়েই সবচেয়ে ভাবতে হবে।

ভাষান্তর : সামীউর রহমান


মন্তব্য