kalerkantho


ব্যাটিং বীরত্বের গল্প

মাজহারুল ইসলাম   

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ব্যাটিং বীরত্বের গল্প

বিস্ময়কর! অবিশ্বাস্য! দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ইংলিশদের কীর্তিগাথা বর্ণনায় এসব বিশেষণও যেন খানিকটা কম হয়ে যায়। আক্ষরিক অর্থে ওয়াংখেড়ের ২২ গজের মঞ্চে অবিস্মরণীয় বীরত্বের কাব্য রচনা করেছেন জো রুট-জেসন রয়রা। টি-টোয়েন্টির বৈশ্বিক মঞ্চে সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে অবিস্মরণীয় জয়ের কীর্তি।

টি-টোয়েন্টিতে টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে সেরা ১০টি দলীয় স্কোরের পাঁচটিই কিন্তু এই ইংলিশদের বিপক্ষে। সেই তারাই কিনা টি-টোয়েন্টির বৈশ্বিক মঞ্চে রচনা করল অমন বীরত্বের গল্প! তাও আবার দক্ষিণ আফ্রিকার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ২২৯ রানের পাহাড় ডিঙানো। ক্রিকেটের এই সংস্করণেই যেটি আবার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড। এউইন মরগানের দলের কীর্তিটা তাই এতটা তাৎপর্যমণ্ডিত! 

বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে ২০০ ছাড়ানো স্কোর তাড়া করে এত দিন জয়ের নজির ছিলই মাত্র একটি। ২০০৭ সালের আসরে নিজেদের মাটিতে গৌরবের ওই কাব্য রচনা করেছিল প্রোটিয়ারা। জোহানেসবার্গের নিউ ওয়ান্ডারার্স স্টেডিয়ামে সেদিন গেইল ‘ঝড়ে’ ২০৫ রানের বড়সড় স্কোরই গড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ৫৭ বলে বিধ্বংসী শতরান করেছিলেন ক্যারিবীয় ব্যাটিংদানব। তবুও দিন শেষ গেইলের সঙ্গী ছিল একরাশ হতাশা। হার্শেল গিবসের বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ে ওই রানও প্রোটিয়া টপকে গিয়েছিল ১৪ বল হাতে রেখে মাত্র ২ উইকেট হারিয়েই। দক্ষিণ আফ্রিকার সেই রেকর্ডটা রাজসিকভাবেই না গুঁড়িয়ে দিল ইংলিশরা।

সাম্প্রতিক সময়ে ইংলিশদের ব্যাটিং অ্যাপ্রোচে ইতিবাচক এই পরিবর্তনটা এসেছে। লক্ষ্যটা যতই পাহাড় ডিঙানোর হোক, মাঠে নামার আগেই চাপে পড়ে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে পড়ছে না তারা। চেষ্টা করে দেখি না কী হয়—এই মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামছে তারা! ভাগ্যও নাকি থাকে সাহসীদের পক্ষে। মুম্বাইয়ে এই সাহসিক ব্যাটিংটাই কিন্তু অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে এউইন মরগানের দলকে।

জেসন রয়-অ্যালেক্স হেলসরা সেদিন সাহস নয় দেখিয়েছেন রীতিমতো দুঃসাহস! কাগিসো রাবাদা-ডেল স্টেইনের করা প্রথম দুই ওভার থেকে তুলে নেন তাঁরা ৪৪ রান। রাবাদা প্রথম ওভারে ২১ দেওয়ার পর স্পিডস্টার স্টেইনের করা দ্বিতীয় ওভার থেকে আসে ২৩! শুরুর ওই ঝড়টাই প্রায় অসম্ভবকে জয় করার আত্মবিশ্বাসে ভরপুর জ্বালানি ভরে দেয় ইংলিশদের মনে। এরপর বোলারের নাম পরিবর্তন হয়েছে নিয়মিতিভাবে, কিন্তু ঝড়টা আর থামেনি কখনো ওয়াংখেড়েতে। রুটদের রূপকথার ব্যাটিংয়ে ধীরে ধীরে ম্যাচটা মুঠোয় পুরে নিয়েছে ইংল্যান্ড।

নিয়মের মারপ্যাঁচে বোলারদের জন্য কাজটা এমনিতে কঠিন হয়ে পড়ছে দিন দিন। সেখানে ব্যাটসম্যানরা এতটা নির্দয়ভাবে পেটাতে থাকলে বোলারদের ঘুম হারাম হয়ে যেতে বাধ্য! জো রুট-জেসন রয়দের তাণ্ডবে নির্দিষ্ট জায়গায় বল ফেলতেই যেন সেদিন ভুলে গিয়েছিলেন স্টেইন-রাবাদারা। বিশ্বের বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানের বুকে কাঁপন ধরান স্টেইন। রুটদের বেদম প্রহারে সেই তাঁর হাতে দুই ওভার পর আর বলই তুলে দিতে সাহস পাননি ফাফ দু প্লেসিস! আর রাবাদা তো রান দেওয়ার হাফ সেঞ্চুরিই করে বসেন। আসলে দিনটা ছিল রুটদের। যেভাবে যেদিকে স্ট্রোক খেলতে চেয়েছেন সবই হয়েছে ঠিকঠাকমতো।

 ৪৪ বলে ছয়টি চার ও চারটি ছক্কায় ৮৩ রানের কাব্যিক হাফ সেঞ্চুরি করে যখন তিনি প্যাভিলিয়নে ফেরেন তখন ১০ বলে মোটে ১০ রান দরকার ইংল্যান্ডের। ওইটুকু পথ পাড়ি দিতে আর কী! অ্যাবটের করা ২০তম ওভারের প্রথম দুই বলে ২ উইকেট পড়লে নাটক খানিকটা জমে উঠেছিল অবশ্য একেবারে শেষ মুহূর্তে। ওইটুকুই সান্ত্বনা প্রোটিয়াদের। শেষ ৬ বলে ১ রান না নিতে পারার মতো কোনো বিয়োগান্তক গল্প তৈরির মতো তা মোটেও যথেষ্ট ছিল না।

এত বেশি রান করেও হেরে মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ার তেতো অভিজ্ঞতা দক্ষিণ আফ্রিকার এটাই কিন্তু প্রথম নয়। গতবছর তো এর চেয়েও বেশি স্কোর গড়ে কিন্তু হেরে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাদের। টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জয়ের সেরা দুটি রেকর্ডই তো তাদের বিপক্ষে। জোহানেসবার্গে গতবছর ১১ জানুয়ারি প্রথমে ব্যাট করে ২৩১ রানের বিশাল স্কোর গড়েছিল তারা। চার-ছক্কার ফুলঝুরিতে সেদিন মাত্র ৫৬ বলে ১১৯ রানের সাইক্লোন ইনিংস খেলেছিলেন প্রোটিয়া অধিনায়ক ফাফ দু প্লেসিস। তবুও দিন শেষে তাঁর সঙ্গী ছিল হতাশা। ক্রিস গেইল-মারলন স্যামুয়েলসদের বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ে ওই রানটাও যে ৪ বল বাকি থাকতে ৬ উইকেট হারিয়ে টপকে গিয়ে উচ্ছ্বাস করেছিলেন ক্যারিবীয়রা। এবার বিশ্বকাপে ২২৯ রান করেও সেই হতাশাই হয়েছে প্রোটিয়াদের সঙ্গী।

২০০ রান অনায়াসে টপকে বিজয় উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠার দৃশ্যটা অবশ্য এখন খুব পরিচিত দৃশ্যই ক্রিকেটের এই ফরম্যাটে। দ্বিতীয় ইনিংসে ২০০ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড টি-টোয়েন্টিতে আছে ৯টি। সর্বোচ্চ তিনবার জিতেছে ভারত। সবচেয়ে বেশি রান করে যাদের বিপক্ষে জয়ের রেকর্ড সেই দক্ষিণ আফ্রিকাও পরে ব্যাট করে ২০০ করে জিতেছে দুবার। অস্ট্রেলিয়াও একবার ২০০ তাড়া করে জিতেছে আবার ২১৪ রান করে টাই করেছে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে। পরে ব্যাট করে ২০০ রান করে একটি করে জয় আছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডেরও।

১২০ বলের খেলা টি-টোয়েন্টিতে তাহলে ঠিক কত রান নিরাপদ? রুট-হেলসদের মতো অমন দুঃসাহসিক ব্যাটিংয়ের দিনে আসলে হয়তো নিরাপদ থাকবে না কোনো রানই!


মন্তব্য