kalerkantho

শনিবার । ২১ জানুয়ারি ২০১৭ । ৮ মাঘ ১৪২৩। ২২ রবিউস সানি ১৪৩৮।


‘বাদ দাও’ শোনার আগেই সরে দাঁড়াব

শহীদ আফ্রিদিকে নিয়ে সমালোচনার ঝড়ই বইছে। বিশ্ব টি-টোয়েন্টির মাঝপথে পিসিবি প্রধান শাহরিয়ার খান জানিয়ে দিয়েছেন টুর্নামেন্ট শেষে শহীদ আফ্রিদি আর অধিনায়ক থাকছেন না। তাই বলা যায়, ২০ বছরের ক্যারিয়ার হয়তো শেষ হতে যাচ্ছে এবারের আসর শেষে। এর আগে জনপ্রিয় একটি ক্রিকেট সাইটে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পাওয়া গেল আক্রমণাত্মক আফ্রিদিকেই।

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘বাদ দাও’ শোনার আগেই সরে দাঁড়াব

প্রশ্ন : ২০ বছর হয়ে গেল আপনার ক্যারিয়ারের। দুই দশক খেলতে পারবেন ভেবেছিলেন কখনো?

শহীদ আফ্রিদি : কখনই ভাবিনি এত দিন খেলতে পারব। শুরুতে ওয়াসিম আকরাম, মঈন খানের মতো সিনিয়ররা অনেক সাহায্য করেছেন।

প্রশ্ন : আপনি মূলত স্লগার ছিলেন বলে অনেকে ভেবেছিল টিকবেন না বেশি দিন?

আফ্রিদি : আমি শুরু করেছিলাম বোলার হিসেবে আর অনূর্ধ্ব-১৪ ও ১৬ ক্রিকেটে ব্যাট করতাম ৮ বা ৯ নম্বরে। এরপর তো হয়ে গেল ওয়ানডের দ্রুততম সেঞ্চুরির বিশ্বরেকর্ডটা। এরপর সবাই ব্যাটিংই দেখতে চাইত আমার। তাই খুব কঠিন ছিল নিজেকে বদলানো। মাঝেমধ্যে মনে হয়, সে সময়ের কোচরা আমাকে বদলানোর চেষ্টা না করে যদি স্কিলের উন্নতি করাতেন তা হলে বেশি লাভবান হতাম। পাকিস্তানি কোচরা চাইতেন তাঁদের খেলার সময়ের মতো ব্যাট করি আমি, যা সম্ভব ছিল না আমার পক্ষে। কেননা একেকজনের প্রতিভা একেক রকম। কেবল বব উলমারই কোনো কিছু পরিবর্তন করতে চাননি আমার।

প্রশ্ন : কিভাবে কোচরা আপনাকে বদলাতে চেয়েছিলেন?

আফ্রিদি : ওয়ানডেতে প্রথম ১৫ ওভারে বৃত্তের বাইরে থাকত দুজন, কিন্তু তাদের পরামর্শ সে সময় সিঙ্গেলস আর ডাবলসে জোর দিয়ে মাঝেমধ্যে বাউন্ডারির চেষ্টা করতে হবে। উড়িয়ে ছক্কা মারাতে বারণ ছিল তাদের! আমি তখন বোলার থেকে ব্যাটসম্যান হওয়ার চেষ্টা করছিলাম, এখনো হয়তো করছি। কিন্তু কোচরা আরো একটু সমর্থন দিলে হয়তো বদলাতাম অনেক বেশি।

প্রশ্ন : বব উলমার কি কখনো আপনার টেকনিক নিয়ে কাজ করেছেন?

আফ্রিদি : আমার মনে হয় না জাতীয় দলে কোনো কোচের দরকার আছে। আসল কোচিংটা হচ্ছে আপনার খেলোয়াড়ের দুর্বলতা আর শক্তির জায়গাটা চেনা। খেলোয়াড়দের নিয়ে ইতিবাচক থাকতে হবে সব সময়। পাকিস্তানে কী হয়, কোনো ব্যাটসম্যান দুই ম্যাচে রান না পেলে কোচরা সালাম পর্যন্ত নেন না। উলমার একেবারেই বিপরীত ছিলেন। কেউ ভালো না খেললে তাদের সঙ্গেই কথা বলতেন বেশি। তাঁদের পুরনো ভালো ইনিংসগুলো মনে করিয়ে উদ্বুদ্ধ করতেন। আমাকেও ভালো ইনিংসগুলো মনে করিয়ে খেলতে বলতেন কোনো চাপ ছাড়া নিজের মতো।

প্রশ্ন : তাহলে বলতে চাচ্ছেন ক্রিকেটের কোনো ফরম্যাটেই কোচের দরকার নেই আপনার?

আফ্রিদি : আমার মনে হয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিম ম্যানেজমেন্টই অনুপ্রাণিত করবে আপনাকে। আপনার কোচের দরকার অনূর্ধ্ব-১৪, ১৬, ১৯ আর ‘এ’ দলে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দরকার পারফর্ম করা খেলোয়াড়। আমাদের আর পশ্চিমের সংস্কৃতিতে আকাশ-পাতাল তফাত। ওরা কোনো ম্যাচ খেলার পর ভাবতে বসে পরের দিন নিয়ে। আর আমাদের সমস্যা হলো মিডিয়ার চাপ, দর্শকদের চাপ, দলে জায়গা ধরে রাখা নিয়ে নিজের ওপর চাপ সামলানো। এসবই হয় এশিয়ায়। আমার জীবনের অন্যতম কঠিন সময় ছিল ২০০৮ সালে। ব্যাটে রান পাচ্ছিলাম না। উইকেটেরও দেখা নেই। নিজের সমস্যা নিয়ে কথা বলি তখনকার অধিনায়ক শোয়েব মালিকের সঙ্গে। ও আমাকে বোঝাতে গিয়ে উদাহরণ হিসেবে বলল আমাদের রাসুল হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর কথা। তিনি সারাজীবন যে কষ্ট করেছেন সে তুলনায় আমারটা কোনো সমস্যাই না। মন শান্ত হয়ে গেল। এরপর ফিরে পাই নিজেকে।

প্রশ্ন : বিতর্ক, দ্বন্দ্ব, পাকিস্তান ক্রিকেটে দুর্নীতি, ঘরের মাঠে খেলতে না পারা, ম্যাচ পাতানোর মতো কেলেঙ্কারি সামলে ২০ বছর খেললেন কিভাবে? এমনকি নিষিদ্ধ হয়েছিলেন আপনিও!

আফ্রিদি : আমাকে আদালতেও যেতে হয়েছিল (হাসি)। হৃদয় থেকেই বলছি আমার বাবা আর পরিবারের সদস্যরা ভীষণ সমর্থন জুগিয়ে গেছেন ক্যারিয়ারজুড়ে। আমার আসল শক্তি জনগণ। তারা সমর্থন করে গেছে সব সময়, যা ভুলব না কখনই। তবে ১৯৯৬-এর বদলে ২০০৬ সালে অভিষেক হলে ২০ বছর খেলতে পারতাম না নিশ্চিতভাবে। এখন ক্রিকেট বদলে গেছে। নানা ফরম্যাটের চাপের কারণেই ইনজুরি বেড়ে গেছে, তাই এই সময়ের কারো পক্ষে ২০ বছর খেলা কঠিন। ফেসবুক, টুইটার ছাড়া সে সময়ের দিনগুলো আর নেই। তখন তারকা ছিলেন ১৫-১৬ জন, এখন আছে দুই থেকে তিনজন। তবে এটা ঠিক যে ক্রিকেটকেই বদলে দিয়েছে টি-টোয়েন্টি। এখন টেস্টের ফল হয়ে যাচ্ছে চার বা সাড়ে তিন দিনে। টি-টোয়েন্টিতে এখন যে দর্শক, তা ওয়ানডেতেও সম্ভব নয়। পাগলাটে শট খেলতে এখন স্কিলটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ফাস্ট বোলারদের বলও রিভার্স সুইপ করছে ব্যাটসম্যানরা, যা আগে ভাবাই যেত না।

প্রশ্ন : আপনাকে তো রিভার্স সুইপ করতে দেখা যায় না?

আফ্রিদি : আমি ‘স্ট্রেইট শট’ খেলতে পছন্দ করি। কখনো কখনো সুইপও খেলি। ফাস্ট বোলার তো বটেই স্পিনারদেরও রিভার্স সুইপ খেলিনি। অনেকে শটটা ভালো খেলে, মিসবাহ তো রানের খাতাই খোলে এভাবে। তবে আমি বিশ্বাস করি, শক্তি দিয়ে বলটা বাউন্ডারিতে পাঠাতে পারলে খামোখা ঝুঁকি নেওয়ার দরকার নেই। এখন অবশ্য পিচগুলো চরিত্র বদলে ব্যাটিংবান্ধব হয়ে যাচ্ছে। এ বছরের জানুয়ারিতে পার্থের মতো গতিময় পিচে অস্ট্রেলিয়া-ভারতের ম্যাচে অনায়াসে ৩০০ রান হয়েছে।

প্রশ্ন : আপনি কি কখনো ফাস্ট বল করতেন?

আফ্রিদি : রাস্তার ক্রিকেটে আমার শুরুটা ফাস্ট বোলার হিসেবেই। বয়স যখন ১১ কি ১২ বছর, তখন একদিন অনুশীলনের সময় আমার ফাস্ট বলে ব্যথা পেয়েছিল আমারই বয়সী এক ব্যাটসম্যান। মোহতাসিম রশিদ (প্রথম শ্রেণির সাবেক স্পিনার) বলল, তুমি স্পিন করছো না কেন? সে সময় আব্দুল কাদির দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন। আমিও তাঁর মতো লেগ স্পিন করলাম। বোলিং দেখে রশিদ বলল, ‘আজ থেকে তুমি শুধু স্পিন বলই করবে। ’

প্রশ্ন : পাকিস্তানে কেন পাওয়ার হিটিং ব্যাটসম্যান উঠে আসছে না?

আফ্রিদি : ক্রিকেট এখন আধুনিক হয়ে গেছে; অথচ আমাদের বোর্ড কর্তারা পড়ে আছেন পুরনো আমলে। নতুন ভাবনা নিয়ে শুরু করতে হবে আমাদের। তা ছাড়া স্কুলক্রিকেটেরও মৃত্যু হয়েছে পাকিস্তানে। প্রতিভাবানরা বেরিয়ে আসে সেখান থেকেই।

প্রশ্ন : অতীতে আপনি আউট হয়ে গেলে ফাঁকা হয়ে যেত গ্যালারি!

আফ্রিদি : বাউন্ডারি না মারা পর্যন্ত অস্থির হয়ে পড়তাম। কারো কারো উইকেটে থিতু হতে শুরুতে সিঙ্গেলস বা ডাবলস লাগে। কিন্তু আমার লাগত বাউন্ডারি বা ছক্কা। বীরেন্দর শেবাগকে এ নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। জবাবে শেবাগ জানিয়েছিল, বাউন্ডারি না মারলে ও নিজেও থিতু হতে পারে না। আসলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সমর্থকদের চাপটা অনেক বেশি। আমি আসলে ব্যাটিং, বোলিং বা ফিল্ডিংয়ে কখনো দলের বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। সমর্থকরা আমাকে বাদ দাও বলার আগেই সরে দাঁড়াব।

প্রশ্ন : মিসবাহ উল হক আর আপনার দর্শনের পার্থক্য কোথায়?

আফ্রিদি : মিসবাহর কথা আর চিন্তাধারা একেবারে বিশুদ্ধ ক্রিকেটের। আমি একটু বেশি আক্রমণাত্মক। মাঠে নিজেদের শতভাগ উজাড় করে খেলার পক্ষে আমি, যেন হারলেও লোকে বলতে না পারে আমরা লড়াই করিনি। অধিনায়ক হিসেবে আমি খুব কম সময়ই একা কোনো সিদ্ধান্ত নিই। সিনিয়রদের পরামর্শ নিই সব সময়, কেননা এটা দলীয় খেলা। আমার সিনিয়ররাও একসময় অধিনায়ক ছিলেন।

প্রশ্ন : খুব বেশি টেস্ট না খেলাটা আপনার ক্যারিয়ারে কতটা প্রভাব ফেলেছে?

আফ্রিদি : শুরু থেকে টেস্ট খেললে উন্নতির প্রচুর সুযোগ ছিল। কিন্তু ৬০-৭০ ম্যাচ পর টেস্ট অভিষেক আমার। ভাবতাম যদি কোনো সিরিজে খারাপ করি, তাহলে বাদ পড়ব টেস্ট দল থেকে। তারপর হয়তো লড়াই করতাম, পারফর্ম না করলে আবারও বাদ। তাই টেস্ট থেকে কেটে পড়াই ভালো ভেবেছিলাম। আসলে টেস্ট ক্রিকেট টানত না আমাকে। নিজেকে অবশ্যই টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে ভাবতাম, তবে কখনোই দীর্ঘদিন খেলতে চাইনি এটা। ২০১০ সালে ফিরেছিলাম তখনকার বোর্ড প্রধান ইজাজ বাটের অনুরোধে। প্রথমে রাজি হইনি; তাই বোর্ডপ্রধান বলে রেখেছিলেন, উপভোগ না করলে সরে যেয়ো। সে সময় দলের ভেতর অনেক রাজনীতি ছিল। আমরা ইংল্যান্ড গেলাম আর ঘটল স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারি। আমি পিসিবি কর্তাদের বোঝাচ্ছিলাম, কয়েকজনকে দলের বাইরে রাখা উচিত। ওরা পরিবেশ নষ্ট করছে। পিসিবি সেটা শুনল না, আমিও টেস্ট থেকে অবসর নিয়ে ফেললাম সিরিজের মাঝপথে। কি দুর্ভাগ্য দেখুন, আমার টেস্ট থেকে অবসরের পরই লর্ডস টেস্টে ঘটল সেই স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারি।

প্রশ্ন : এবারের বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে ভারতের কাছে হারার পর পাকিস্তানজুড়ে সমালোচনা চলছে আপনাদের। খোদ পিসিবিপ্রধান শাহরিয়ার খান পর্যন্ত বলে দিয়েছেন টুর্নামেন্ট শেষে আপনি আর অধিনায়ক থাকছেন না?

আফ্রিদি : পাকিস্তানের সমর্থকরা আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ। তবে ওরা কিন্তু ভালোওবাসে আমাদের। উপমহাদেশে ক্রিকেট অনেক বড় ব্যাপার। এমন সমালোচনা ইতিবাচক হিসেবে নিয়ে পারফর্ম করতে হবে আমাদের। যারা ভালোবাসে তারা সমালোচনা করতেই পারে। সমর্থকরা কিছু বলে থাকলে সেসব নিয়ে মন খারাপ করার কিছু নেই। আমার ফেসবুক, টুইটার সবই বন্ধ এখন। বাইরের কিছু নিয়ে মাথাই ঘামাচ্ছি না।

প্রশ্ন : ভারতের সঙ্গে ম্যাচটা সব সময়ই মর্যাদার। অথচ সম্প্রতি এশিয়া কাপের পর বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতেও হারলেন ওদের কাছে!

আফ্রিদি : দুই দলের মধ্যে যারা কম ভুল করে তারাই জেতে। আমরা ইডেনের পিচ বুঝতে না পেরে চার পেসার খেলিয়েছিলাম। তা ছাড়া টসও হেরে গিয়েছিলাম। বৃষ্টিস্নাত কন্ডিশনে টস জিতলে বোলিং নিতাম, তখন অন্য রকম হতে পারত ম্যাচটা। কোনো অজুহাত দিতে চাচ্ছি না। কিন্তু বিরাট কোহলি এশিয়া কাপের পর বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতেও দারুণ ব্যাট করেছে, আমরা হেরে গেছি ওর কাছেই।


মন্তব্য