kalerkantho


টি-টোয়েন্টির রাজা

রাহেনুর ইসলাম   

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



টি-টোয়েন্টির রাজা

বিস্ফোরক। ধ্বংসাত্মক।

খুনে। ড্যারেন সামি এসব বলে তাতান ক্রিস গেইলকে। অবশ্য সামির বলার দরকার নেই। দুনিয়াজোড়া মানুষ এভাবেই চেনে এই ক্যারিবিয়ানকে। কিন্তু খোদ গেইল কী ভাবেন নিজেকে নিয়ে? তাঁর সরল স্বীকারোক্তি, ‘আমি বিনোদনের ফেরিওয়ালা। চেষ্টা করি সবাইকে আনন্দ দিতে। ’ বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে নিজেদের প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরি করে সেই আনন্দই দিয়েছেন গেইল। ২০০৭ সালে বিশ্ব টি-টোয়েন্টির প্রথম মাচে সেঞ্চুরি ছিল তাঁর। ৫৭ বলে ১১৭ রানের বিস্ফোরণে বুঝিয়েছিলেন এই ফরম্যাট কতটা পছন্দ তাঁর। ভালোবাসাটা একই আছে ৯ বছর পরও। এবার ৪৭ বলের সেঞ্চুরিতে রেকর্ড গড়েছেন বিশ্ব টি-টোয়েন্টির দ্রুততম সেঞ্চুরির।

বিনোদনের এই ফেরিওয়ালা ক্যারিবিয়ান ড্রেসিংরুমে কাটিয়ে দিয়েছেন গুমোটভাব। একবার ভাবুন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক ড্যারেন সামি, অথচ তিনিই কি না বোর্ডের চুক্তিতেই নেই! চুক্তি থেকে নিজেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন গেইলও। এমন আরো অনেক অসংগতি আছে দলটিতে। কিন্তু গেইলের ড্রেসিংরুমে থাকা মানে সবার মান-অভিমান ভুলে এক সূতায় গাঁথা থাকা। সবাইকে খুঁটসুটিতে মাতিয়ে রাখেন তিনি। তাই রামনরেশ সারওয়ান একবার বলেছিলেন, ‘গেইল চাইলে কমেডিয়ানও হতে পারত!’

সেই গেইল জাতীয় দলের হয়ে সর্বশেষ টেস্ট খেলেছেন ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে। এক বছরের বেশি খেলেন না ওয়ানডেও। তবে বিশ্বব্যাপী ঠিকই বিনোদন বিলিয়ে চলেছেন টি-টায়েন্টিতে। পরিসংখ্যানের পাতাও বলছে এই খেলায় গেইলের চেয়ে ভালো ব্যাটিং করতে পারেননি আর কেউই। ২০১০ সালের পর গত ছয় বছরে নিজেকে আরো পরিণত করেছেন ৩৬ বছর বয়সী এই জ্যামাইকান। সেই পরিসংখ্যানে চোখ বোলানো যাক। ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত টি-টোয়েন্টিতে ৫১ ইনিংসে গেইলের রান ২৯.৯৭ গড়ে ১৩৭৯ (এটা শুধু আন্তর্জাতিক নয়, বিশ্বজুড়ে হওয়া ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি ম্যাচসহ)। সেঞ্চুরি একটি, ফিফটি আটটি। ২০১১ সালের পর সেই গেইল নিজের ব্যাট শানিয়েছেন আরো। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্ব টি-টোয়েন্টির ম্যাচটি পর্যন্ত এই সময়ে খেলেছেন ১৮৫ ইনিংস। গড়টা ২৯.৯৭ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭.৭৩। স্ট্রাইক রেটও ১৩৪.৭৯ থেকে ১৫৩.৩৮। সেঞ্চুরি ১৬টি, ফিফটি ৪৭টি। সব মিলিয়ে গেইল খেলেছেন ২৩৬টি টি-টোয়েন্টি ইনিংস। ৪৩.৬৯ গড়ে ১৫০.১৫ স্ট্রাইক রেটে রান ৮৮২৬। টি-টোয়েন্টিতে এত বেশি রান নেই আর কারো। ৪০০০-এর বেশি রান করা কোনো ব্যাটসম্যানের গড়ও তাঁর ধারেকাছে নেই। সেই তুলনাটাই করা যাক এবার।

২০১১ সালের পর থেকে ১৮৫ ইনিংসে গেইলের টি-টোয়েন্টিতে রান ৭৪৪৭। এই সময়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৪২২ রান ওয়েস্ট ইন্ডিজেরই ডোয়াইন স্মিথের। তিনি খেলেছেন ১৬৬ ইনিংস। অর্থাৎ ব্যবধান ৩০২৫ রান। এই সময়ে গেইলের চেয়ে ৯ ম্যাচ বেশি খেলেও কিয়েরন পোলার্ডের রান ৪৩৬৯। এ ছাড়া ১৫৫ ইনিংসে ইংল্যান্ডের লুক রাইটের রান ৪৩৫১, পাকিস্তানের শোয়েব মালিকের ১৫৩ ইনিংসে ৪১৯২ ও ভারতের বিরাট কোহলির ১২০ ইনিংসে ৪১০৭।

টি-টোয়েন্টির সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটিও গেইলের। ২০১৩ সালের আইপিএলে পুনে ওয়ারিয়র্সের বিপক্ষে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর হয়ে মাত্র ৬৬ বলে খেলেছিলেন অপরাজিত ১৭৫ রানের ইনিংস। বাউন্ডারি ১৩ আর ছক্কা ছিল ১৭টি। বেঙ্গালুরু থামে ৫ উইকেটে ২৬৩ রানে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অপরাজিত ১৬২ রানের ইনিংস জিম্বাবুয়ের হ্যামিল্টন মাসাকাদজার।

ছক্কার খেলা টি-টোয়েন্টি। আর ছক্কা হাঁকানোতেও অন্যদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে গেইল। ক্যারিয়ারজুড়ে গেইলের ছক্কা ৬৩৭টি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা কিয়েরন পোলার্ডের ছক্কা ৩৮৮টি। ২০১১ সালের পর গেইলের তাণ্ডবটা বেশি আরো। ৬৩৭ ছক্কার ৫৬৩টিই হাঁকিয়েছেন এই সময়ে। স্বাভাবিকভাবেই বলপ্রতি ছক্কা মারার হারেও এগিয়ে তিনি। ২০১১ সালের পর প্রতি ৮.৬২ বলে একটি করে ছক্কা গেইলের। দ্বিতীয় স্থানে থাকা কিয়েরন পোলার্ড ছক্কা মেরেছেন ১০.৭০ বল পরপর। বিরাট কোহলি ২৫.৪৩, ডেভিড ওয়ার্নার ১৬.৬৪, ডেভিড মিলার ১৬.৯৬ আর ডোয়াইন স্মিথ ছক্কা মেরেছেন ১৬.৪৯ বল পর।

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরি মাত্র ২০টি। সেখানেও চার-ছক্কায় বেশি রানের কৃতিত্বটা গেইলের। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলেন ১১ ছক্কা আর ৫ বাউন্ডারিতে। অর্থাৎ ১০০-র মধ্যে ৮৬ রানই এসেছে বাউন্ডারিতে। রান তোলার বেলায় বাউন্ডারির হারটাও ৮৬ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮৩.৭৬ শতাংশ হারে সেঞ্চুরি ছড়ানো ইনিংসে বাউন্ডারির কীর্তি দক্ষিণ আফ্রিকান রিচার্ড লেভির। ২০১২ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১১৭ রানের ইনিংসে ১৩ ছক্কা আর ৫টি বাউন্ডারি ছিল তাঁর। ২০১১ সালের পর সব ধরনের টি-টোয়েন্টি ইনিংসে বাউন্ডারি বা ছক্কায় রান নেওয়াতেও এগিয়ে গেইল। এই সময়ে তিনি ৭৪১৩ করার পথে বাউন্ডারি থেকেই করেছেন ৭৪.৯০ শতাংশ রান। এই সময়ে বাউন্ডারি থেকে রান নেওয়ার বেলায় এগিয়ে রিচার্ড লেভি (৭০.৬৬ শতাংশ), ডোয়াইন স্মিথ (৬৮.৬৩ শতাংশ),শেন ওয়াটসন (৬৭.১৩ শতাংশ) ও ব্রেন্ডন ম্যাককালাম (৬৬.১৫ শতাংশ)।

২০১১ সালের পর স্ট্রাইক রেটে অবশ্য সবাইকে পেছনে ফেলতে পারেননি গেইল। এই সময়ে আড়াই হাজারের বেশি রান করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে গেইলের ১৫৩.৩৮ স্ট্রাইক রেট তৃতীয় সর্বোচ্চ। তাঁকে ছাড়িয়ে গেছেন আন্দ্রে রাসেল (১৬৭.৪) ও গ্লেন ম্যাক্সওয়েল (১৫৫.০৮)। তবে দুজনেরই গড় ২৫-এর কম। অবশ্যই দ্রুত রান করতে গিয়েই গড়ের এমন হাল। এই সময়ে ১৫০-র বেশি স্ট্রাইক রেটে রান নেওয়া আরেক ব্যাটসম্যান এবি ডি ভিলিয়ার্স। তবে ১৫০.৫৯ স্ট্রাইক রেট হলেও তাঁর গড় ৩২.২৫। এ জন্যই গেইল নিজেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ‘বস’ দাবি করলেন। গেইলকে স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডসের সঙ্গে তুলনা করলেন ক্যারিবিয়ান কোচ ফিল সিমন্স। রিচার্ডসের সঙ্গে খেলা সিমন্সের মুগ্ধতা, ‘আমার সময়ের একটা লোকের সঙ্গেই তার তুলনা চলে, তিনি হচ্ছেন স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস। ভিভ যেমন মাঠে নেমে বিপক্ষকে তছনছ করে দিতেন, গেইলও ঠিক তা-ই করে। ও দাঁড়িয়ে গেলে কোনো লক্ষ্যই অসম্ভব থাকে না। ’ অথচ অনিয়মই কিন্তু নিয়মে পরিণত করে ফেলেছেন গেইল। শুনে অবাক হবেন বিশ্ব টি-টোয়েন্টি শুরুর আগে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার বদলে রাতভর পার্টি করেছেন গেইল। আরব সাগরতীরের মুম্বাইয়ের অভিজাত নাইট ক্লাবে বলিউডে দু-চারটি সিনেমা করা স্নেহা উল্লাল ছিলেন গেইলের নৈশ অভিযানের সঙ্গী। সতীর্থ ডোয়াইন ব্রাভো নিয়েছিলেন ডিজের ভূমিকা। তাই হয়তো সেঞ্চুরির পর গেইল জানালেন, ‘উৎসব হবে চ্যাম্পিয়ন হলে। ডিজে ব্রাভো আর ওর নতুন গানে। ’

ক্যারিয়ারজুড়ে অবশ্য ফাইনালেই অচেনা ছিলেন গেইল। ক্যারিয়ারের পাঁচটি ফাইনালে ১৫.২৫ গড়ে করেছেন মাত্র ৬১! ২০১৩ সালের সিপিএল ফাইনালে করেছিলেন সর্বোচ্চ ৪৭। এ ছাড়া ২০১২ সালের বিশ্ব টি-টোয়েন্টির ফাইনালে ১৬ বলে ৩ রান, ২০১১ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ১২ বলে ৫, আইপিএলের ২০১১ সালের ফাইনালে ৩ বলে ০ আর ২০০৮ সালে স্ট্যানফোর্ড টি-টোয়েন্টি ফাইনালে করেছিলেন ১০ বলে ৬। সেই ব্যর্থতাটা এবার কাটাতে মুখিয়ে গেইল। এখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফাইনালে পৌঁছলেই হয়।


মন্তব্য