kalerkantho


দায় নিজেদেরও

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব উপমহাদেশে বরাবরই বেশ জনপ্রিয়। তাসকিন আহমেদ আর আরাফাত সানির বোলিংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পর জনপ্রিয়তার চূড়ায় এ তত্ত্ব। তবে বাংলাদেশি বোলারদ্বয়ের দুর্ভাগ্যের পেছনে নিছকই ষড়যন্ত্র নাকি দল গঠন প্রক্রিয়াতেও ভুলে মিশে, খোঁজা হয়েছে সে প্রশ্নেরই উত্তর।

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দায় নিজেদেরও

ই-মেইল! একটি মাত্র ই-মেইলের কী আশ্চর্য ক্ষমতা! আইসিসির পাঠানো এক অন্তর্জাতিক বার্তায় যে একেবারে মুখথুবড়ে পড়ে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অভিযান! ঠিক যেন রাজপথের রূপসী মিছিল স্তব্ধ হয়ে যায় স্বৈরাচারের এক গুলিতে।

আইসিসির সম্প্রসারণ তো ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল’।

কিন্তু চালু রসিকতায় সেটি ‘ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল’ হয়ে আছে অনেক আগে থেকে। ক্রিকেট-স্বৈরাচার কেউ থেকে থাকলে তা ওই পরেরটিই। মতান্তরের যা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। বিশ্বক্রিকেটে ছড়ি ঘোরানোর যাবতীয় কর্মকাণ্ড তাদের। বাংলাদেশের ক্রিকেট-মিছিল ওই এক ই-মেইলে থামিয়ে দেওয়ায় ‘ঠুটো জগন্নাথ’ আইসিসি বাহনমাত্র, পর্দার পেছনের কলকাঠি নাড়ছে ভারতীয় বোর্ড—বাংলাদেশের ১৬ কোটি ক্রিকেটপ্রাণে অন্তত ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত এই বিশ্বাস।

এই ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব সঠিক নাকি আবেগের আতিশয্যপ্রসূত—এর মীমাংসা হবে না এখন। কিন্তু তাসকিন আহমেদের নিষেধাজ্ঞায় বাংলাদেশের ক্রিকেটরথ যে থমকে গেছে, এ নিয়ে দ্বিমত সামান্যই।

আরাফাত সানির বোলিং অ্যাকশনের ব্যাপারে গুঞ্জন ছিল আগে থেকে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অনেক দিন ধরেই এই বাঁ-হাতি স্পিনারকে ‘আগলে’ রেখে খেলাচ্ছিল বাংলাদেশ।

উদ্দেশ্য একটাই—কোনোক্রমে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্টের ভাবখানা এমন যে বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে কনুই ১৫ ডিগ্রির চেয়ে বেশি বেঁকে যাওয়াটা জায়েজ। আর শুধু আরাফাত তো না, বাংলাদেশ দলের অন্য আরেক পেসারের অ্যাকশন নিয়েও বিস্তর সংশয় রয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্দর মহলে। বাঁ-হাতি স্পিনারের সঙ্গে ওই ডান-হাতি পেসারের নাম যদি উঠত আইসিসির সন্দেহের তালিকায়, তাহলে কারো কিছু বলার ছিল না। বরং জেনেশুনে কেন অমন দুজন বোলার নিয়ে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ, এ নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টকে উঠানো হতো কাঠগড়ায়।

কিন্তু তাসকিন আহমেদের অ্যাকশন অবৈধ ঘোষিত হওয়াতেই না ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব বাজার পায় এমন প্রবলভাবে!

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই ম্যাচ অফিসিয়ালদের সন্দেহের খাতায় লাল কালিতে উঠে যায় তাসকিন-আরাফাতের নাম। চেন্নাইতে আইসিসি অনুমোদিত ল্যাবে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসেন দুজন। সেখান থেকে ফেরার পর আত্মবিশ্বাসী শুনিয়েছে তাঁদের কণ্ঠ। আরাফাতকে নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের সংশয়টা ছিল যদিও। বোলিংয়ের সময় তাঁর কনুই অনুমোদিত ১৫ ডিগ্রির চেয়ে ৭-৮ ডিগ্রি বেশি বেঁকে যায় বলে আসে প্রতিবেদন। বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে সতীর্থদের সহানুভূতি পেয়েছেন বটে আরাফাত। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব বলে আলোচিত হয়নি।

হয়েছে তাসকিনের ক্ষেত্রে। আকাশের কোনো কোণে কোনো মেঘ নেই, হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টির মতো যে তা। ঘুণাক্ষরেও কেউ ভাবেননি, এই ডান-হাতি পেসারের অ্যাকশন অবৈধ বলে বিবেচিত হতে পারে। ১৮ মার্চ সন্ধ্যায় আইসিসি ই-মেইল দিয়ে যখন জানায় এই সংবাদ, দাবানলের মতো তা গ্রাস করে পুরো দলকে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তাসকিন, তাঁর সঙ্গে হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ে পুরো দল। পর দিন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার সংবাদ সম্মেলন হয়ে থাকে এর এক প্রস্থ প্রমাণ।

এরপর থেকে শুরু সবার নিরন্তর ছোটাছুটি। এদিকে মাশরাফির পাশাপাশি কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে ফোনে ব্যস্ত রাখেন বিসিবির ঢাকা অফিসের কর্তাদের। ওদিকে তাঁদের দৌড়াদৌড়ি আইসিসি বরাবর। আপিল হয়। এর শুনানি শেষে আইসিসির দেওয়া সিদ্ধান্ত থাকে বহাল। এই ডামাডোলের খবর সংগ্রহে গণমাধ্যমকর্মীরা ঢাকায় ছুটছেন, ছুটছেন বেঙ্গালুরুতে। ভারতের ষড়যন্ত্রে তাসকিনকে পরানো হয়েছে নিষেধাজ্ঞার ডাণ্ডাবোড়—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সয়লাব হয়ে যায় এই দুয়ে দুয়ে চার মেলানো সমীকরণে। এখানকার ভারতীয় সাংবাদিকরাও বাংলাদেশের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখে হতবাক। গণমাধ্যমে আলোচিত হতে শুরু করে, তবে কী ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেট দ্বৈরথ প্রতিস্থাপিত হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত লড়াই দিয়ে!

সেটি হলে তো ভালো। বাংলাদেশ ক্রিকেটের এগিয়ে চলার স্বীকৃতি হবে তা। ‘ছোট ভাই’ যখন বড় হয়ে উঠতে শুরু করে, তখন ‘বড় ভাই’ একটু-আধটু কর্তৃত্ব দেখায়ই। ক্রিকেটীয় পরিবারে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের আচরণও হয়তো বা এমন। ২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে মহেন্দ্র সিং ধোনির দলকে কাঁপিয়ে দেয় মাশরাফি-ব্রিগেড। এরপর দেশের মাটিতে জেতে ওয়ানডে সিরিজ। সে কারণে তো বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচে এখন আর জয় নিশ্চিত ধরে খেলতে নামার সাহস পায় না ভারত। লাল-সবুজের পতাকাধারীরা যদি এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখেন, তাহলেই দ্বৈরথটা জমজমাট হয়ে উঠবে ক্রমশ।

আর যদি আবার সেই আগের মতো জিততে শুরু করে ভারত, তাহলে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের আবেগের স্রোত থিতিয়ে যাবে ক্রমশ। দ্বৈরথটা আর ভারত-পাকিস্তানের মতো হয়ে উঠবে না। ষড়যন্ত্র-তত্ত্বকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে বড় দায় এখন ক্রিকেটারদের। তাঁরা সেই কাজটুকু করতে পারলে ১৬ কোটি ক্রিকেটপ্রাণকে সঙ্গে তো পাবেনই সব সময়!


মন্তব্য