kalerkantho


তাসকিনদের খোঁজে

সামীউর রহমান   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তাসকিনদের খোঁজে

আকাশ থেকেই নেমে এলেন গতির রাজা! গল্পের মতো শোনালেও এটাই সত্যি। আসলে ফাস্ট বোলার খুঁজে বের করার জন্য দেশজুড়ে যে প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, সেখানে সবচেয়ে গতিশীল যে বোলারকে পাওয়া গেছে সেই এবাদত হোসেন বিমানবাহিনীর চাকুরে! বাংলাদেশ ক্রিকেট একাডেমি ও মুঠোফোন সেবাদাতা সংস্থা রবির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ফাস্ট বোলার হান্ট’ কর্মসূচি থেকে পাওয়া সবচেয়ে গতিশীল বোলার এবাদত হোসেনের বলের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৩৯ কিলোমিটার। রবিবার বিসিবি ক্রিকেট একাডেমি মাঠে হয়ে যাওয়া চূড়ান্ত গতি পরীক্ষায় মৌলভীবাজারের বড়লেখার এই তরুণই পেছনে ফেলেছেন বাকি সবাইকে।

গ্রামীণফোনের সহায়তায় বিসিবির প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম ‘পেসার হান্ট’ থেকেই সন্ধান পাওয়া যায় রুবেল হোসেনের। গত বছর ওয়ানডে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের নায়ক রুবেলও এসেছিলেন একাডেমি মাঠে। জীবনের গল্প শুনিয়ে উৎসাহ ও উদ্দীপনা জুগিয়েছেন তরুণ পেসারদের। গোটা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছেন বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে কোচের দায়িত্ব পালন করা ও ঘরোয়া ক্রিকেটে কোচিংয়ের পরিচিত মুখ সারওয়ার ইমরান। বোলিং অ্যাকশনের শুদ্ধতার বেলায় শুরু থেকেই খুব কঠোর ছিল বিসিবি। শারীরিক সক্ষমতা, ফিটনেস এমন অনেক ব্যপারেও জোর দেওয়া হয় প্রথম থেকে, ফলে ৩০ হাজারের বেশি নিবন্ধন করার পরও প্রাথমিকভাবে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান মাত্র ১৪ হাজার ৬১১ জন। তাদের মধ্য থেকে বেছে নেওয়া হয় ১০০ জনকে, তারপর ধাপে ধাপে সংখ্যাটা কমিয়ে আনার পর চূড়ান্ত পরীক্ষায় বেছে নেওয়া হয় বিজয়ীদের। সবচেয়ে গতিশীল বোলার এবাদত পেয়েছেন ট্রফি, সনদ ও ৫০ হাজার টাকা।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের হাই পারফরমেন্স স্কোয়াডের অধীনে ৪৫ দিন অনুশীলনের সুযোগ পাবেন এবাদতসহ ফাস্ট বোলার হান্টের শীর্ষ দশ বোলার। এ ছাড়া বলের বৈচিত্র্যের জন্য বেস্ট ভেরিয়েশন বোলার ও  ধারাবাহিকতার জন্য বেস্ট কন্সিস্ট্যান্ট বোলারের পুরস্কারও দেওয়া হয়। একই কার্যক্রম থেমে মেয়েদের ক্রিকেটে সেরা বোলার হিসেবে বেছে নেওয়া হয় গোপালগঞ্জের পূজা চক্রবর্তীকে। এ ছাড়া ভিন্নভাবে সক্ষম দুজন বোলারকেও পুরস্কার ও সনদ দেওয়া হয়। পুরস্কারপ্রাপ্তরা রবির তরফ থেকে আগামী পাঁচ বছর প্রত্যেকে মাসে পাঁচ হাজার করে টাকা পাবেন, মোবাইল বিল পাবেন এক হাজার টাকার আর দুটি হ্যান্ডসেট পাবেন। এই পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে যাঁরা বিভাগীয় দলে, বিপিএলে ডাক পাবেন তাঁদের মাসিক ভাতা দ্বিগুণ হয়ে যাবে; আর জাতীয় দলে ডাক পেলে সেটা বেড়ে দাঁড়াবে পাঁচ গুণে।

চূড়ান্ত পর্ব শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার ও সনদ তুলে দেন রবির সিওও মাহতাব উদ্দিন আহমেদ ও বিসিবির পরিচালক ও হাই পারফরমেন্স বিভাগের প্রধান মাহবুব আনাম। মাহতাব উদ্দিন আশ্বাস দিয়েছেন, এখানেই থেমে থাকবে না এই প্রয়াস। ‘ভবিষ্যতে ব্যাটিং প্রতিভা, স্পিন বোলিং প্রতিভা খুঁজে আনার লক্ষ্যেও কাজ করবে রবি। ’ মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, বিজয়ীদের নিয়ে বিসিবির পরিকল্পনার কথা, ‘যাদের আমরা পেয়েছি, তাদের অনেকেই কাঠামোগতভাবে ক্রিকেট খেলে আসেনি। আমাদের কাজ হবে এই আনকোরা প্রতিভাদের ঘষেমেজে তৈরি করা। এখান থেকে দুজন বোলারকেও যদি বছরদুয়েক পর জাতীয় দলে দেখা যায়, সেটাই হবে বড় সাফল্য। ’ প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত নির্বাচিত ১০ জন বোলারকে এইচপি প্রোগ্রামে বছরে ৪৫ দিন অনুশীলন করাবে বিসিবি, এ ছাড়া তাদের উন্নত প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হবে।

ফাস্ট বোলার হান্ট জিতে যাওয়াতে বিমানবাহিনীর সদস্য এবাদত হোসেনের অবশ্য একটু ‘মধুর সমস্যা’ই হয়ে যায়োর কথা। সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনের সঙ্গে যে ঠিক মিশ খাবে না পেশাদার ক্রিকেটারের জীবন। সামরিক বাহিনীর চাকরিতে এত ধরনের আর্থিক নিশ্চয়তা আছে অথচ পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে এবাদত যে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছাবেন সেই নিশ্চয়তাই বা কোথায়? এবাদত অবশ্য মনে করেন, চাকরি টিকিয়ে রেখেই ক্রিকেট খেলা সম্ভব। কারণ স্বয়ং বিমানবাহিনীপ্রধান থেকে শুরু করে অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাই তাঁকে আশা জুগিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন খেলে যাওয়ার। তাঁদের অনুমতি নিয়েই সিটি ক্লাবে খেলার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সুযোগ মেলেনি। জানালেন, বিসিবি থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বিমানবাহিনীতে। দুই পক্ষের উৎসাহে হয়তো খুলে যাবে লাল ফিতের গেরো।

এবাদতের কাছ থেকেই জানা গেল, পেশাগত কারণে ভলিবল খেলোয়াড় হলেও ক্রিকেটই তাঁর ভালোবাসা, ‘বিমানবাহিনীর চাকরিটা আমার হয়েছে ভলিবল খেলার সুবাদে, তবে ক্রিকেট খেলতে ছোটবেলা থেকেই বেশি ভালোবাসতাম। ছুটিতে বাড়িতে গেলে ক্রিকেট খেলতাম। ’ ফরিদপুরে গিয়ে ট্রায়ালে অংশ নিয়েছিলেন এবাদত, তখন সিটি ক্লাবে খেলতে পারলেই মিলত সন্তুষ্টি। আর এখন স্বপ্ন দেখেন জাতীয় দলের জার্সিটা গায়ে চাপানোর, ‘স্বপ্ন তো অবশ্যই জাতীয় দলে খেলা। বছরদুয়েকের ভেতর জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে চাই। ’ এবাদত বাংলাদেশের সীমিত ওভার দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার খুব ভক্ত। তবে বোলিং অ্যাকশন পছন্দ ব্রেট লির, ‘অস্ট্রেলিয়ার ব্রেট লির বোলিং অ্যাকশন আমার খুব ভালো লাগে। তাঁর মতো করেই বল করতে চাইতাম। ’ মাশরাফি-ব্রেট লিদের মতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হওয়ার একটা পথের দিশা তো পেলেন এবাদত, এবার বোলার হান্টের সেরা বোলার হিসেবে পাওয়া সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে বাড়িয়ে নিতে চান বোলিংের ধার। ভালো করেই জানেন, এ তো শুধু সিঁড়িতে প্রথম পা টা রাখা, সাফল্যের চূড়া যে এখনো অনেক দূর। তার জন্য যে আরো কঠোর প্রস্তুতি প্রয়োজন!


মন্তব্য