kalerkantho

শুক্রবার । ২০ জানুয়ারি ২০১৭ । ৭ মাঘ ১৪২৩। ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮।


তাঁরাও তারা

ক্রিস গেইল, এবি ডি ভিলিয়ার্স, মহেন্দ্র সিং ধোনিদের মতো মেয়েদের ক্রিকেটে তাঁরাও বড় তারকা। এবারের বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে আলো ছড়াতেই এসেছেন মেগ ল্যানিং, সারাহ টেলররা। জানাচ্ছেন মাজহারুল ইসলাম

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তাঁরাও তারা

মেগ ল্যানিং : অস্ট্রেলিয়ার ২০১৪ সালের বিশ্ব টি-টোয়েন্টি জয়ে অন্যতম সারথী ছিলেন তিনি। দুই বছর আগে বাংলাদেশের আসরে ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও খেলেছিলেন ৪৪ রানের কার্যকর এক ইনিংস। ৬ উইকেটের বিশাল জয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো শিরোপা উৎসব করেছিল অস্ট্রেলিয়া। তাদের শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্নে প্রধান ভরসার নামও কিন্তু মেগ ল্যানিং।   ভারতে আসার আগে আছেন তুখোড় ছন্দে। এ বছর মেয়েদের বিগ ব্যাশে নিজের প্রথম তিন ম্যাচেই ছুঁয়েছিলেন পঞ্চাশের ঘর। ল্যানিংয়ের ব্যাটিংঝড়ে মেলবোর্ন স্টারস তাদের প্রথম পাঁচ ম্যাচের চারটিতেই করেছিল বিজয় উচ্ছ্বাস। গড়টা কাছাকাছি ৩২। ব্যাটে ঝড় তুলে যেকোনো পরিস্থিতিতে পারেন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে।   কয়েক বছর আগে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৬৫ বলে ১২৬ রানের টর্নেডো ইনিংসটি ছিল রীতিমতো চোখ ধাঁধানো। এ বছর আইসিসির বর্ষসেরা মহিলা ক্রিকেটারের ট্রফিটা কিন্তু উঠেছে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়কের হাতেই। গত বছর জিতেছিলেন ওয়ানডের বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। এর আগের বছর ২০১৪ সালের টি-টোয়েন্টির বর্ষসেরার ট্রফিটাও ওঠে তাঁর হাতে। টপ অর্ডারে ল্যানিংয়ের দুর্দান্ত ব্যাটিং ও অ্যাক্রোবেটিং ফিল্ডিংই অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি। শিরোপা নিজেদের কাছে রেখে দিতে হলে আবারও অমন দুর্দান্ত ল্যানিংয়ের প্রত্যাশায় থাকবে অস্ট্রেলিয়ানরা।

সারাহ টেলর : গত বছরের মেয়েদের বর্ষসেরা খেলোয়াড় সারাহ টেলর এবার অস্ট্রেলিয়ার ছেলেদের বিগ ব্যাশে অংশ নিয়ে রীতিমতো হৈচৈ ফেলে দেন ক্রিকেট দুনিয়ায়। ইংলিশদের শিরোপা পুনরুদ্ধারের স্বপ্নও অনেকাংশে নির্ভর করবে ৯৮ ওয়ানডে ও ৭৩টি টি-টোয়েন্টি খেলা এই উইকেটরক্ষকের সাফল্যের ওপর। টেলরের ব্যাটিং গড়টাও কিন্তু ৩০ ছোঁয়া (৩১.৮২)। পাশাপাশি উইকেটের পেছনে দারুণ সফল। টি-টোয়েন্টিতে ৬২টি ডিসমিসালের অনন্যসাধারণ কীর্তি তাঁর।   এমন একজন খেলোয়াড়ের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে অনেকটুকু বাড়িয়ে দিয়েছে ইংলিশদের ব্যাটিংয়ের গভীরতা। সত্যিকারের ম্যাচ উইনার বলতে যা বোঝায়, তিনি তেমন একজন খেলোয়াড়। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ৯ বার জিতেছেন তিনি ম্যাচেসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। ভারতে আসার আগে বিগ ব্যাশে অবশ্য অসাধারণ কোনো কাব্য রচনা করতে পারেননি টেলর। একটি পঞ্চাশের সঙ্গে গোটা কয়েক ৩০ ছোঁয়া স্কোর। তবে বিশ্ব টি-টোয়েন্টি শুরুর আগে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন ইংলিশ উইকেটরক্ষক। নিজের সর্বশেষ চার ম্যাচেই করেছেন হাফসেঞ্চুরি। অমন ধারাবাহিকতা যদি বিশ্ব আসরেও অনুবাদ করতে পারেন তাহলে ট্রফি পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন হয়তো পূরণও হয়ে যেতে পারে ইংলিশদের।

স্টেফানি টেলর : ব্যাট হাতে যেমন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে তাঁর জুড়ি নেই, আবার বল হাতেও ম্যাচ করায়ত্ত করায় তিনি সমান দক্ষ। জেনুইন একজন অলরাউন্ডের প্রতিচ্ছবি স্টেফানি টেলর। ৬৮ ম্যাচে ১৭টি হাফসেঞ্চুরিসহ ব্যাটিং গড় ৩৫.৬৭। বোলিং গড়টাও ঈর্ষণীয় ১৬.২২ গড়ে ৫৯ উইকেট। স্ট্রাইকরেট ১৮.৩। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে তিনটি বিধ্বংসী হাফসেঞ্চুরির সঙ্গে আটটি উইকেট নিয়ে ক্যারিবীয় মেয়েদের ভাসিয়েছেন সিরিজ জয়ের উৎসবে। আর নিজের হাতে তুলেছেন সিরিজের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। অস্ট্রেলিয়ার যেমন এলিসা পেরি ক্যারিবীয়দের তেমনি স্টেফানি টেলর! এ বছরের মেয়েদের টি-টোয়েন্টির সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার তো আর এমনি এমনি জিতেননি ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক। উজ্জ্বল এ পারফরম্যান্স তিনি টেনে নেন বিগ ব্যাশেও। ব্যাটিংয়ে ছিল দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা। একটি ৫০-ছোঁয়া ইনিংস খেললেও প্রায় প্রতিম্যাচেই রান করেছেন ত্রিশের বেশি। আর বল হাতে তাঁর কৃপণ বোলিং ছিল সিডনি থান্ডারের সাফল্যের সেরা অস্ত্র। ভারতের আসরে ওই ছন্দ ধরে রেখে গত বছরের সেমিফাইনালের সাফল্যকে ছাড়িয়ে এবার আরো বড় কিছুর স্বপ্নই দেখছেন স্টেফানি টেলরের ওয়েস্ট ইন্ডিজ।  

এলিসা পেরি : ব্যাট-বলে সমান পারদর্শিতায় ম্যাচ বের করে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর। বড় মঞ্চে আলো ছড়িয়ে শিরোপা উল্লাস করাটা তো তিনি একেবারে অভ্যাসে পরিণত করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে জিতেছেন টানা তিন তিনটি বিশ্বকাপ। যার সর্বশেষটি দু্ই বছর আগে বাংলাদেশের মাটিতে। এবারও ভারতে এসেছেন শিরোপায় চুমু আঁকতে। ওই স্বপ্নতরীতে ভেসে বেড়াতে নিজেকে আরো একবার মেলে ধরতে হবে এলিসাকে। পরিসংখ্যান যদি শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হয় তা হলে অন্য অনেকের চেয়ে কয়েক ক্রোশ এগিয়ে থাকবেন এলিসা পেরি। ব্যাটিং গড়টা ত্রিশের নিচে হলেও স্ট্রাইকরেট ১০০ পেরিয়ে। সঙ্গে অনন্য বোলিং পারফরম্যান্স। ১৯.১২ গড়ে ৭৫ ম্যাচে ৭৩ উইকেট। স্ট্রাইকরেট ২০। এবারের বিগ ব্যাশে পারফরম্যান্সের পারদটা অবশ্য অনেক ওপরে তুলতে পারেননি তিনি। তাতে কী! এলিসা পেরির মতো জাত ম্যাচ উইনারদের জ্বলে উঠতে আর কতক্ষণ। হয়তো বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়ানোর জন্যই সব জমিয়ে রেখেছেন তিনি। আরেকটা শিরোপা জয়ে অস্ট্রেলিয়াকে সামনে থেকে পারফরর্ম করতে চান এলিসা পেরি।

সুজি বেটস : ক্রিকেটের পাশাপাশি বাস্কেটবলেও ছিলেন সমান পারদর্শী। অলিম্পিকের মতো বড় মঞ্চেও খেলেছেন তিনি নিউজিল্যান্ডের হয়ে। এখন ব্যাট-বলের তুলিতে আলপনা আঁকছেন ক্রিকেটের ২২ গজের মঞ্চে। দুর্দান্ত একজন অলরাউন্ডার। ৭৮ ম্যাচে ১২টি হাফসেঞ্চুরিসহ রান করেছেন এক হাজার ৯৪৪। বল হাতেও কম যান না। ঝুলিতে আছে ৪৩টি উইকেট। গড় ২২.৪৮ আর ইকনোমি ৬.৬৪। ওপরের দিকে কার্যকর ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি মিডিয়াম পেসে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার দক্ষতায় কিউই মহিলা দলে এনে দিয়েছে দারুণ ভারসাম্য। বেটসের সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে স্ট্রোক খেলার দারুণ দক্ষতা। বিপদে দক্ষ কাণ্ডারি হয়ে দলকে বাঁচিয়েছেন অনেকবার। ২০০৯ ও ২০১০ সালে মেয়েদের বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে যে দুবার নিউজিল্যান্ড ফাইনাল খেলেছে, দুটিতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সুজি বেটসের। দেশের হয়ে টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে বেশি রানের মালিক তিনি। ২০১৪ সালের বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতেও ছড়িয়েছেন উজ্জ্বল আলো। পাঁচ ম্যাচের তিনটিতেই খেলেছিলেন ৫০ ছাড়ানো ইনিংস। বর্ণিল ওই সাফল্য অনুবাদ করতে পারলে ভারতেও ভালো কিছুর প্রত্যাশার প্রহর গুনতে পারেন কিউইরা।

ক্যাথেরিন ব্রান্ট এবং চার্ললোট্টে এডওয়ার্ডস : ইংলিশ বোলিংয়ের অন্যতম প্রাণভোমরা ক্যাথেরিন ব্রান্ট। বোলিং গড় ১৮.৯১ আর স্ট্রাইকরেট ২৩.৩। মহিলাদের ওয়ানডের বিশ্ব বোলিং র্যাংকিংয়ে ভারতের ঝুলন গোস্বামীর পরই দুই নম্বরে তাঁর অবস্থান। ওয়ানডে বিশ্বকাপের দলে ছিলেন, পাঁচ ম্যাচে উইকেট নিয়েছিলেন সাকুল্যে ৬টি। বিশ্ব-টোয়েন্টিতে তাঁকে দলের না রাখার কথাও ভাবেননি নির্বাচকরা। বোলিংয়ের পাশাপাশি শেষদিকে ঝড়ো ব্যাটিংয়ে ব্রান্ট নাকি অ্যান্ড্র ফ্লিনটফের কথা মনে করিয়ে দেন ইংলিশদের। দক্ষ্য একজন অলরাউন্ডার হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠার সব রসদ আছে তাঁর মাঝে। স্কর্চার্সের হয়ে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে আরেকবার প্রমাণ করেছেন তিনি তা।   ঠাণ্ডা মাথায় ইনিংস বিনির্মাণ করতে পারেন আবার প্রয়োজনে রক্ষণের খোলস ছেড়ে হাত খুলে বলকে পেটাতেও পারেন বেশ। সর্বশেষ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের ২-০ ব্যবধানে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়ের সুখস্মৃতি সঙ্গে নিয়েই কিন্তু তিনি এসেছেন ভারতে বিশ্ব টি-টোয়েন্টি খেলতে। হার্ড হিটিং ব্যাটসম্যান চার্ললোট্টে এডওয়ার্ডস রেকর্ডটা আরও বর্ণীল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সবচেয়ে কমবয়সে খেলার রেকর্ড গড়ার পর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে সবচেয়ে বেশি রানের মালিক তিনি। প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টি-টোয়েন্টিতে ছুঁয়েছেন দুই হাজার রানের মাইলফলক। ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ধারাবাহিকতায় ১০টি হাফসেঞ্চুরিসহ ৩২.০৪ গড়ে করেছেন ২৪০৩ রান। ২০০৮ সালে মেয়েদের বর্ষসেরা খেলোয়াড় এবং গতবছর নির্বাচিত হয়েছেন উইজডেনের বর্ষসেরা ক্রিকেটার। সাত বছর আগে ইংলিশরা মেয়েদের প্রথম বিশ্ব টি-টোয়েন্টির শিরোপা উৎসব করেছিল কিন্তু তাঁর নেতৃত্বেই। ভারতের আসরেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে চান এডওয়ার্ডস।

মিতালি রাজ, ঝুলন গোস্বামী : ২০০৭ সালের বর্ষসেরা ক্রিকেটার ঝুলন গোস্বামী ৩৪ ছুঁয়েও ভারতের বোলিংয়ের সবচেয়ে ভরসার নাম। ওয়ানডে বোলারদের বিশ্ব র্যাংকিংয়ে সবার ওপরে ঝলমল করছে কিন্তু এই পেসারের নামটিই। বল হাতে গতির ঝড়ে প্রতিপক্ষকে যেমন কাবু করতে পারেন, আবার ব্যাটিংয়ে দলের দরকারে শক্ত হাতে হাল ধরাতেও আছে সুখ্যাতি। অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার বেশ সমৃদ্ধ। তিন ধরনের ফরম্যাট মিলিয়ে ভারতের হয়ে খেলেছেন ২০০র বেশি ম্যাচ। বয়সে তাঁর চেয়ে আট দিনের ছোট্ট মিতালী রাজ ভারতের ব্যাটিংয়ের প্রধান স্তম্ভ। সঙ্গে চৌকস নেতৃত্ব ভরতনাট্যমের সাবেক ড্যান্সার ভারতের উঠতি ক্রিকেটারদের কাছে একজন আদর্শ রোল মডেল। ওয়ানডে অভিষেকে সেঞ্চুরি। টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ডটাও তাঁরই। ২০০৫ সালে মেয়েদের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারত ফাইনালে খেলেছে তো মিতালীর অধিনায়কত্বেই। দেশের মাটিতে বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতেও দেশকে কি অমন উৎসবের উপলক্ষ এনে দিতে পারেন মিতালী রাজ-ঝুলন গোস্বামীরা!


মন্তব্য