kalerkantho


বেলা শেষের গান

এবারের বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে দলগুলোর স্কোয়াডের দিকে নজর দিন না একবার। ক্যারিয়ারের অস্তলগ্নে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রিকেটাররাও আছেন দলে। যাঁদের অনেকের জন্য হয়তো বাজতে শুরু করেছে বেলা শেষের গান। লিখেছেন খালিদ রাজ

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বেলা শেষের গান

‘টি-টোয়েন্টি হলো তারুণ্যের ক্রিকেট’—২২ গজের সংক্ষিপ্ত সংস্করণের শুরুটা হয়েছিল এমন স্লোগানকে সঙ্গী করে। টেকনিক, খেলার ধরন মুখ্য কোন বিষয় নয়, চার-ছক্কার ফুলঝুরিই এখানে আসল কথা। সে অনুযায়ী অভিজ্ঞতার খুব বেশি দরকার নেই এখানে। যদিও খুব তাড়াতাড়িই ভুলটা ভাঙে দলগুলোর। তাই তারুণ্যের সঙ্গে অভিজ্ঞতার মিশেলে দল তৈরি করা বিষয়টি এখন স্পষ্ট লক্ষ করা যায়। এবারের বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে দলগুলোর স্কোয়াডের দিকে নজর দিন না একবার। ক্যারিয়ারের অস্তলগ্নে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রিকেটাররাও আছেন দলে। যাঁদের অনেকের জন্য হয়তো বাজতে শুরু করেছে বেলাশেষের গান।

একেবারে যে বুড়িয়ে গেছেন তা নয়। মহেন্দ্র সিং ধোনির বয়স এখন ৩৪। কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে কিংবা মিসবাহ-উল-হকের সঙ্গে তুলনা করলে আরো অনেক দিন খেলা চালিয়ে যেতে পারবেন তিনি। কিন্তু বয়স তো আর সব সময় অবসরের কারণ হয়ে দাঁড়ায় না, ফর্মটাও তো বড় বিষয়। ধোনির বেলায় ফর্মটাই চোখ রাঙাচ্ছে বেশি করে। বিশেষ করে অধিনায়ক হিসেবে সময়টা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না তাঁর। তাই অবসরের চেয়ে সমালোচকরা বেশি করে চেপে ধরেছে তাঁকে অধিনায়াকত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য। কিন্তু ‘ক্যাপ্টেন কুল’ শুধু খেলোয়াড় হিসেবে কি খেলবেন? ভারতীয় মিডিয়ার যা খবর, তাতে ধোনি অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিলে একেবারে অবসরে যাবেন। তাঁর টেস্ট ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়াটাই বড় উদাহরণ। তাই বিশ্ব টি-টোয়েন্টির পর তাঁর কাছ থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় দেওয়ার ঘোষণা আসতেও পারে। যদি তাই হয়, তা হলে নিশ্চয় ঘরের মাঠের টুর্নামেন্ট জিতে শেষটা রাঙিয়ে নিতে চাইবেন ‘ক্যাপ্টেন কুল’।

শহীদ আফ্রিদি তো একরকম অবসরের ঘোষণা দিয়েই রেখেছেন। ইল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাজে পারফরম্যান্সের পর পাকিস্তানের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক বলেছিলেন, ‘এশিয়া কাপ ও বিশ্ব টি-টোয়েন্টির ফলাফল আমার অবসরের সিদ্ধান্তে সাহয্যা করবে। ’ এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টিতে পাকিস্তানের ভরাডুবির আগেই অবশ্য আবার সুর পাল্টে ফেলেছেন ‘বুম বুম’। অবসরের সিদ্ধান্তটা তিনি ছেড়ে দিয়েছেন পাকিস্তানের নির্বাচক ও বোর্ডের ওপর। কিন্তু তাঁর ফর্ম যে সায় দিচ্ছে না মোটেও। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড কিংবা নির্বাচকরাও হয়তো ৩৬ পেরিয়ে যাওয়া আফ্রিদির অবসরের সিদ্ধান্তেই দেবেন ভোট। আফ্রিদির সেই ঝড়ো ব্যাটিং ইদানীং দেখা যায় না একেবারেই, বোলিংয়েও নেই আগের মতো ধার। অধিনায়ক হিসেবেও সময়টা খারাপ যাচ্ছে তাঁর। বেলাশেষের গানটা হয়তো নিজেও শুনতে পাচ্ছেন ২০১৫ বিশ্বকাপের পর ওয়ানডে ক্রিকেটকে বিদায় জানানো আফ্রিদি।

ধোনি কিংবা আফ্রিদির চেয়েও বয়স কম লাসিথ মালিঙ্গার। বয়স কিংবা ফর্ম—কোনোটাই সমস্যা নয় তাঁর। এর পরও শ্রীলঙ্কান পেসারের অবসর নেওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠছে তাঁর চোটের কারণে। গত কিছুদিন ধরে ইনজুরির সঙ্গে তাঁর সখ্য বেড়ে গেছে খুব! চোট কাটিয়ে মাঠের ফিরতে ফিরতেই চলে যেতে হচ্ছে বাইরে। এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টিই যেমন। দীর্ঘদিন পর মাঠে ফিরে নিজের পুরনো রূপ দেখিয়েই আবার ছিটকে গেছেন বাাইরে। বিশ্ব টি-টোয়েন্টি খেলতে পারবেন কি না, সেটা নিয়ে সংশয় কাটেনি এখনো। কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে সবচেয়ে সফল এই পেসার ২০১১ সালে বিদায় জানিয়েছেন টেস্ট ক্রিকেটকে। এর তিন বছর পর অ্যাঙ্কেলে অস্ত্রোপচার করা মালিঙ্গা এখন ভুগছেন হাঁটুর চোটে। এশিয়া কাপ চলার সময় জানিয়েছিলেন, চোটের কারণে যদি তাঁকে এক-দেড় বছর বিশ্রাম নিতে হয়, তাহলে এর চেয়ে অবসর নেওয়াই ভালো। বিশ্ব টি-টোয়েন্টির আগে এমন ইঙ্গিত দিয়ে রাখা মালিঙ্গা অবসরের চূড়ান্ত ঘোষণাও দিয়ে ফেলতে পারেন চোটের সঙ্গে যুদ্ধে হার মেনে। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কা আবার ক্রিকেট উৎসবে মেতেছিল এই মালিঙ্গার নেতৃত্বে বিশ্ব টি-টোয়েন্টি জিতে। বিদায় নেওয়ার আগে আবার হবে না!

বিশ্ব টি-টোয়েন্টির শিরোপা এখনো জেতা হয়নি শেন ওয়াটসনের। বিদায়ের আগে কি এই অপূর্ণতা পূর্ণ করতে পারবেন এই অলরাউন্ডার! না, অবসর নেওয়ার কোনো ইঙ্গিত এখনো দেননি ওয়াটসন। তবু অবসর নেওয়ার কথাটা উঠছে আসলে তাঁর ফর্ম ও দলের জায়গা হারানোর বিষয় দুটির কারণে। ৩৪ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডার গত বছর অ্যাশেজ হারের পর বিদায় জানিয়েছেন টেস্টকে। এর পর জায়গা হারিয়েছেন ওয়ানডে দলে। ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো করার পুরস্কার হিসেবে সুযোগ পেয়েছিলেন ভারতের বিপক্ষে সিরিজে। আছেন বিশ্ব টি-টোয়েন্টির স্কোয়াডেও। কিন্তু দলে থাকার স্থায়িত্বকাল কতটুকু হবে, সেটার নিশ্চয়তা দেওয়াটা খুব কঠিন ওয়াটসনের জন্য। কেননা এরই মধ্যে অনেকেই নিজেকে প্রমাণ করে জায়গা একরকম পাকা করে ফেলেছেন অস্ট্রেলিয়ার একাদশে। বিশ্ব টি-টোয়েন্টির পর তাই তাঁকে অবসরের ঘোষণা দিতে দেখলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

বয়স পেরিয়ে গেছে তাঁর ৩৯। অনেকের অবসরের কথা উঠলেও তিলকরত্নে দিলশানের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়া নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না। নীরবে খেলে চলেছেন শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যান। ২০১৩ সালে টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানানো দিলশান চালিয়ে যাচ্ছেন সীমিত ওভারের ক্রিকেট। সাঙ্গাকারা-জয়াবর্ধনে গত বিশ্বকাপের পর ক্রিকেটকে বিদায় জানালেও খেলাটাকে এখনো উপভোগ করছেন তিনি। ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ খেলাটা তাঁর জন্য প্রায় অসম্ভবই। ২২ গজের মঞ্চকে বিদায় জানানোর জন্য টি-টোয়েন্টির বিশ্ব আসরই তো উত্কৃষ্ট জায়গা!

এই তালিকায় যোগ হতে পারে যুবরাজ সিং, হরভজন সিং, মোহাম্মদ হাফিজ, আশীষ নেহরা, গ্র্যান্ট এলিয়ট, মোহাম্মদ সামির নাম। বেলা শেষের গান যে শুনছেন তাঁরাও!


মন্তব্য