kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ক্যান্সারের কালো থাবা

আধুনিক ক্রিকেটের সেরা উদ্ভাবক মার্টিন ক্রো। সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এই কিউই কিংবদন্তির জীবন প্রদীপ নিভে গেছে ক্যান্সার নামের নীরব ঘাতকের কাছে হার মেনে। তাঁর মতো আরো অনেক ক্রিকেট তারকাই হার মেনেছেন ক্যান্সারের কাছে। অনেকে আবার ক্যান্সার জয় করে খেলে চলেছেন এখনো। জানাচ্ছেন রাহেনুর ইসলাম

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ক্যান্সারের কালো থাবা

ক্রিকেটের রূপকথা হয়েই আছে ‘থ্রি ডাব্লিউ’—এভারটন উইকস, ক্লাইড ওয়ালকট ও ফ্রাঙ্ক ওরেলের নাম। ষাটের দশক থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-অস্ট্রেলিয়ার দ্বিপক্ষীয় সিরিজের শিরোপার নামকরণও করা হয়েছে ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি স্যার ফ্রাঙ্ক ওরেলের নামে।

৫১ টেস্টে ৪৯.৪৮ গড়ে তিন হাজার ৮৬০ রান ও ৬৯ উইকেট নেওয়া ওরেল অবসর নেন ১৯৬৩ সালে। ১৯৬২ সালে ভারত সফর থেকে ফিরে তাঁর লিউকোমিয়া ধরা পড়ে। এরপর খেলেছেন কেবল ইংল্যান্ড সফরে পাঁচ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ। চার বছর ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে হার মানেন ১৯৬৭ সালে। মাত্র ৪২ বছর বয়সেই এই কিংবদন্তি পাড়ি জমান পৃথিবীর ওপারে।

ওরেলের মতো মাত্র ৪১ বছর বয়সে ক্যান্সারের থাবায় মারা যান আরেক ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি ম্যালকম মার্শাল। ৮১ টেস্টে ২০.৯৪ গড়ে এই ফাস্ট বোলার নিয়েছেন ৩৭৬ উইকেট। ২০০ বা এর বেশি উইকেট নেওয়া বোলারদের মধ্যে মার্শালের গড়টাই সেরা। সে সময়ের ক্যারিবিয়ান পেসারদের তুলনায় তাঁর ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতা ছিল সবচেয়ে কম। অথচ জোয়েল গার্নার, কার্টলি অ্যামব্রোস, কুর্টনি ওয়ালশদের উচ্চতা ৬ ফুট ৬ ইঞ্চির বেশি। ১৯৯২ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ম্যাচ খেলা মার্শাল ১৩৬ ওয়ানডেতে নিয়েছিলেন ১৫৭ উইকেটও। লোয়ার অর্ডারে ব্যাটিংটা মন্দ করতেন না। টেস্টে ১০টি ফিফটিস এক হাজার ৮১০ ও ওয়ানডেতে দুই ফিফটিসহ ৯৫৫ রান করা মার্শাল পৃথিবী ছেড়ে যান ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে।

১৯৭৫-৭৬ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাত্র ৭১ বলে সেঞ্চুরি করেছিলেন ক্যারিবিয়ান ওপেনার রয় ফ্রেডরিকস। সেটা ছিল সে সময়ে টেস্টের দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড। ৫৯ টেস্টে চার হাজার ৩৩৪ রান করা সেই ফ্রেডরিকসও আক্রান্ত হয়েছিলেন গলার ক্যান্সারে। ৫৭ বছর বয়সে ২০০০ সালে মারা যান তিনি। সত্তরের দশকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ১২ টেস্ট খেলেছিলেন ইনসান আলী। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাঁ-হাতি এই স্পিনারের অভিষেক ১৯৬৬ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে। ১২ টেস্টে ৩৪ উইকেট নেওয়া ইনসান আলী আক্রান্ত হয়েছিলেন গলার ক্যান্সারে। ১৯৯৫ সালে তিনি মারা যান ৪৫ বছর বয়সে।

ষাটের দশকে টেস্টে সবচেয়ে বেশি ২৫২ উইকেটের রেকর্ডটা ছিল ইংল্যান্ডের ব্রায়ান স্ট্যাথামের। তাঁরই সতীর্থ ফ্রেড ট্রুম্যান ভাঙেন রেকর্ডটি। এরপর প্রথম বোলার হিসেবে পা রাখেন টেস্টে ৩০০ উইকেটের মাইলফলকেও। স্ট্যাথাম আর ট্রুম্যান দুটি প্রান্ত থেকে গতির ঝড়ে কাঁপনই ধরাতেন প্রতিপক্ষ ব্যাটিংয়ে। মাঠে আর মাঠের বাইরে চমৎকার সম্পর্ক ছিল দুজনের। তাই হয়তো ক্যান্সার নামের মারণব্যধি বাসা বাঁধে দুই সতীর্থের শরীরেই। স্ট্যাথাম ২০০০ সালে ৬৯ বছর বয়সে আর ট্রুম্যান ২০০৬ সালে মারা যান ৭৫ বছর বয়সে। আগুন ঝরানো বোলিংয়ের মতো ট্রুম্যানের পরিচিতি ছিল ‘পাইপ স্মোকার’ হিসেবেও। ১৯৭৪ সালে ‘পাইপ স্মোকার অব দ্য ইয়ার’-এর পুরস্কারও পান তিনি! মৃত্যুর চার বছর বাদে ইয়র্কশায়ারে ব্রোঞ্জের একটা মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে তাঁর। বল করার সেই ঔদ্ধত্যের ভঙ্গি। একই সঙ্গে মূর্তিটা স্মরণ করিয়ে দেয় ধূমপানের কুফলও। ক্রিকেটের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন টনি গ্রেগ। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হিসেবে যতটা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তার চেয়েও বেশি হয়তো মাইক্রোফোন হাতে! সেই কণ্ঠস্বরও থেমে যায় ক্যান্সারের থাবায়। ২০১২ সালে ফুসফুসের ক্যান্সার ধরে পড়ে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডকে নেতৃত্ব দেওয়া গ্রেগের। সে বছরই জীবন প্রদীপ নিভে তাঁর। ৫৮ টেস্টে তিন হাজার ৫৯৯ রানের পাশাপাশি ১৪১ উইকেটও নিয়েছিলেন তিনি।

গ্লুসটারশায়ারের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলা ডেভিড শেফার্ড জনপ্রিয় হয়েছিলেন আম্পায়ার হিসেবে। ৯২ টেস্ট আর ১৭২ ওয়ানডেতে আম্পায়ারিং করা এই ইংলিশও মারা গেছেন ফুসফুসের ক্যান্সারে।

ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে ক্রিকেট খেলা খেলোয়াড়ের সংখ্যাও কম নয় একেবারে। যুবরাজ সিং যেমন। ভারতকে ২০১১ সালে বিশ্বকাপ জেতানোর নায়ক তিনি। টুর্নামেন্ট শেষে কোথায় হৈ-হুল্লোড় করবেন তা নয়, যুবরাজকে ভর্তি হতে হলো হাসপাতালে। ধরা পড়ল মিডিয়াস্টাইনাল সেমিনোমো। ফুসফুসের মাঝামাঝি জায়গায় ক্যান্সার। ক্যান্সারকে হার মানিয়ে যুবরাজ ক্রিকেটে ফেরেন এক বছর পর। অনেকের শঙ্কা ছিল যুবরাজ হয়তো জাতীয় দলে ফিরতে পারবেন না আর। সেই শঙ্কাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঠিকই জাতীয় দলে ফেরেন তিনি। সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়েছেন আইপিএলেও। ২০০৭ বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে স্টুয়ার্ট ব্রডকে ছয় বলে ছয় ছক্কা হাঁকানো সেই ছন্দে হয়তো নেই। তবে এশিয়া কাপের পর এবারের বিশ্ব টি-টোয়েন্টিও কিন্তু খেলতে যাচ্ছেন তিনি।

অস্ট্রেলিয়ান সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্কেরও ধরা পড়েছিল ত্বকে ক্যান্সার। হার মানেননি তিনিও। সেই ক্লার্কের হাত ধরেই গত বছর ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতেছে অস্ট্রেলিয়া। ১০৮ টেস্টে আট হাজার ১১৪ রান করা জিওফ্রি বয়কট সর্বকালের অন্যতম সেরা ওপেনার ইংল্যান্ডের। ২০০২ সালে গলার ক্যান্সার ধরা পড়ে খেলা ছাড়ার পর জনপ্রিয় ধারা ভাষ্যকার হয়ে ওঠা বয়কটের। এক বছরে ৩৫টি রেডওিথেরাপি দেওয়ার পর সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। বয়কটের মতো ৬৫ বছর বয়সে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক অলরাউন্ডার বার্নার্ড জুলিয়েন। ২৪ টেস্টে ২ সেঞ্চুরিসহ ৮৬৬ রান করেছেন জুলিয়েন। ১৯৭৩ সালে লর্ডসে সপ্তম উইকেটে ২৩১ রানের জুটি গড়া ম্যাচটিতে পেয়েছিলেন প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। পাশাপাশি আছে ৫০ উইকেট। ওয়ানডেতে অবশ্য ব্যাট হাসেনি সেভাবে। ১২ ম্যাচে করেছেন ৮৬, উইকেট ১৮টি। ১৯৭৭ সালে অবসর নেওয়া এই ক্যারিবিয়ান ভুগছেন গলার ক্যান্সারে। এই ৬৫ বছর বয়সেও ক্যান্সারের বিপক্ষে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১০৩টি সেঞ্চুরি ইংল্যান্ডের জন এডরিচের। ১৯৬৩ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত ৭৭ টেস্ট খেলে করেছেন ১২ সেঞ্চুরিসহ করেছেন পাঁচ হাজার ১৩৮ রান। টেস্টে আছে ট্রিপল সেঞ্চুরিও। বয়স ৭৯ বছর ছুঁই ছুঁই। তবে মনের জোর হারাননি এখনো। দীর্ঘদিন ক্যান্সারে ভুগলেও হাল না ছেড়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এখনো।


মন্তব্য