kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নীল দংশনের শিকার

সামীউর রহমান   

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নীল দংশনের শিকার

কেউ জানতেন, কেউ জেনেও না জানার ভান করেছেন। কিন্তু লাভ হয়নি।

পারফরম্যান্সবর্ধক মাদক নিয়ে খেলছেন অনেক ক্রীড়াবিদই। ধরা পড়ার পর মানসম্মান, কীর্তি ও পদক সবই গেছে তাঁদের। ডোপ টেস্টে ‘পজিটিভ’ প্রমাণিত হওয়া মারিয়া শারাপোভাকে নিয়ে এই সময়ে উত্তাল ক্রীড়াঙ্গন। দেখে নেওয়া যাক এমন আরো কয়েকজনকে, নিষিদ্ধ মাদক গ্রহণের দায়ে যাঁদের অনেক কীর্তিই মুছে গেছে রেকর্ড বই থেকেও।

 

মারিওন জোনস, মার্কিন স্প্রিন্টার

সিডনি অলিম্পিকে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে সোনা জিতে হাসছেন মারিওন জোনস, ছবিটা ক্রীড়াপ্রেমীদের বোধ হয় এখনো মনে পড়বে। মার্কিন এই অ্যাথলেট সিডনিতে তিনটি সোনা ও দুটি ব্রোঞ্জসহ মোট পাঁচটি পদক জিতেছিলেন। স্টেরয়েড গ্রহণের স্বীকারোক্তির পর তাঁর সবগুলো পদকই কেড়ে নেয় অলিম্পিক কাউন্সিল। ভাঙা পরিবারের মেয়ে মারিওন ছোটবেলায় জীবনের কষ্ট ভুলতেন অ্যাথলেটিকসে অংশ নিয়ে। ১৫ বছর বয়সের মাথাতেই ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সেরা দৌড়বিদ হয়ে গেলেন আর ২২ বছর বয়সে মার্কিন কলেজ অ্যাথলেটিকসের কল্যাণে ক্রীড়াবিদদের উন্নত প্রশিক্ষণ আর পড়ালেখার সুযোগটা পেয়ে পড়তে এলেন ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা অ্যাট চ্যাপেল হিলে। খেলাধুলায় এই প্রতিষ্ঠানের দারুণ সুনাম। জীবনের ২২তম বসন্তে প্রেমে পড়েছিলেন কোচ ও শটপুটার সিজে হান্টারের। কর্তৃপক্ষের নিয়ম, কোচ আর অ্যাথলেটের প্রেম চলবে না। হান্টার তাই স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়লেন, ১৯৯৮তে বিয়ে করলেন দুজনে। এ যেন হংসপাখায় লেখা রূপকথা। কে জানত, ঝাড়বাতির নিচেই এমন অন্ধকার। এই হান্টারই শপথ নিয়ে বলেন আরো বেশ কয়েকজন ক্রীড়াবিদের সঙ্গে অলিম্পিক ভিলেজে নিজের স্ত্রীকে পেটে ইনজেকশনের মাধ্যমে স্টেরয়েড নিতে দেখেছেন। দুজনের মধ্যে তখন ঝামেলা চলছে, হান্টার নিজে ডোপপাপে ধরা খেয়েছেন, মারিওনের গর্ভে আরেক স্প্রিন্টার টিম মন্টগোমরির সন্তান—এমন অনেক কেচ্ছাই বেরিয়ে আসছে। তবু নিজের পারফরম্যান্সবর্ধক মাদক গ্রহণের কথা স্বীকার করেননি মারিওন। করলেন কান্নাভেজা এক সংবাদ সম্মেলনে, ২০০৭ সালে এসে। কুখ্যাত বালকো কেলেঙ্কারির নায়ক ডেভিড কন্টেই তাঁকে দিতেন ‘ডিজাইনার স্টেরয়েড’। ন্যানোড্রলেন নিয়েই সিডনি অলিম্পিকে দৌড়েছিলেন মারিওন।

ল্যান্স আর্মস্ট্রং, মার্কিন সাইক্লিস্ট

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্যান্সারের চিকিৎসা নেওয়ার সময় যুবরাজ সিং ও তিতো ভিলানোভা—দুজনেই একটা বই খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তেন। বইটার নাম ‘ইটস নট অ্যাবাউট দ্য বাইক, মাই জার্নি ব্যাক টু লাইফ’। লেখক ল্যান্স আর্মস্ট্রং। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোড রানার সাইক্লিস্ট। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই ক্যান্সার ধরা পড়েছিল, ডাক্তাররা বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। স্টেজ থ্রি ক্যান্সার ধরা পড়েছিল তাঁর, রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল মগজ, অন্ত্র ও ফুসফুসে। সেখান থেকে ফিরে এসেছিলেন সাইকেলের পিঠে, জিতেছিলেন টানা সাতবারের ট্যুর ডি ফ্রান্স। কিন্তু ২০১২তে এসে জানা গেল, শুধুই মনের জোরে নয় মাদকের সাহায্য নিয়েই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন আর্মস্ট্রং। কেড়ে নেওয়া হয় তাঁর ১৯৯৫ সালের পরের সব শিরোপা, সিডনি অলিম্পিকের মেডেল। অপরাহ উইনফ্রের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে আর্মস্ট্রং স্বীকার করেন, ‘সীমা অতিক্রম করেছিলাম আমি। ’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্টি ডোপিং এজেন্সিও তাঁর বিরুদ্ধে মাদক গ্রহণের অভিযোগ আনে। একে একে মুখ ফেরাতে থাকে স্পন্সররা। এক দিনে ৭ কোটি ৫০ লক্ষ মার্কিন ডলারের স্পন্সরশিপ চুক্তি হারান আর্মস্ট্রং, তারিখটা ছিল ৮ মে ২০১৩। নন্দিত নায়ক থেকে মুহৃর্তেই নিন্দিত প্রতারকে পরিণত হন আর্মস্ট্রং, হারান মানুষের শ্রদ্ধাও।

ডিয়েগো ম্যারাডোনা, আর্জেন্টাইন ফুটবলার

১৯৮২তে আগমন, ১৯৮৬-র মহানায়ক, ১৯৯০তে বিয়োগগাথার নায়ক আর ১৯৯৪তে খলনায়ক। ডিয়েগো ম্যারাডোনার খেলা চারটি বিশ্বকাপকে বর্ণনা করা যায় এভাবেই। মেক্সিকোয় কাপ জেতালেন, ইতালিতে ফাইনালে হারলেন রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্তে আর আমেরিকায় বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেন মাদকের কলঙ্ক মাথায়। গ্রিসকে হারিয়ে বিশ্বকাপে দারুণ শুরু আর্জেন্টিনার, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার হ্যাটট্রিকের পরও ৪-০ গোলের জয়ে লোকে কথা বলেছে ম্যারাডোনার গোল নিয়েই। নাইজেরিয়ার সঙ্গেও ২-১ গোলে জেতে আর্জেন্টিনা। এমন সময় দুঃসংবাদ হিসেবে আবির্ভূত হয় ম্যারাডোনার নিষিদ্ধ মাদক এফিডেরিন গ্রহণের খবর। ম্যারাডোনার দাবি ছিল, শক্তিবর্ধক পানীয় রিপ ফুয়েলের মার্কিনি সংস্করণেই ছিল সেই নিষিদ্ধ রাসায়নিক। এ জন্য ট্রেনার দায়ী, তাঁর আর্জেন্টিনা থেকে আনা এনার্জি ড্রিংক পাউডার ফুরিয়ে যাওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা পানীয় খেতে দেওয়াতেই এই বিপত্তি। কিন্তু ধোপে টেকেনি এই অজুহাত। ফেরত পাঠানো হয় ম্যারাডোনাকে। এভাবেই কলঙ্ক দিয়ে শেষ হয় বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।

বেন জনসন, কানাডিয়ান স্প্রিন্টার

জ্যামাইকায় জন্ম নিলেও অভিবাসন করেছিলেন কানাডায়। সিউল অলিম্পিকে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে সোনা জিতেছিলেন জনসন, ৯.৭৯ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে গড়েছিলেন বিশ্বরেকর্ড, হয়েছিলেন দ্রুততম মানব। তাঁর নমুনায় পাওয়া যায় নিষিদ্ধ মাদক স্ট্যানোজোলল। অলিম্পিক পদক, আগের বছরের ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের রেকর্ড ও বিশ্বরেকর্ড—সবই কেড়ে নেওয়া হয় জনসনের কাছ থেকে। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ১৯৯২ অলিম্পিকে ট্র্যাকে ফিরেছিলেন, সেমিফাইনাল হিটে বাদ পড়ে যান। পরে আবার মাদক গ্রহণ করে ধরা পড়ায় (এবার টেস্টোস্টেরন) আজীবন নিষিদ্ধ করা হয় তাঁকে।


মন্তব্য