স্বপ্ন নিয়ে-334460 | খেলারঘর | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৫ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৭ জিলহজ ১৪৩৭


স্বপ্ন নিয়ে

বিশ্ব টি-টোয়েন্টির আগে এশিয়া কাপ হওয়াটা আসলে বাংলাদেশের জন্য খুবই দরকার ছিল। না হলে অনেক কিছুই জানা হতো না। জানা হতো না এই ফরম্যাটেও পারফরম্যান্সে উজ্জ্বল হতে জানে বাংলাদেশ। বিশ্ব টি-টোয়েন্টির ঠিক আগে আগে আসরটি না হলে তাই এই ফরম্যাটে পুরনো ব্যর্থতার নিক্তিতেই মাপা হতো বাংলাদেশকে। খেলোয়াড়রা নিজেরাও হয়তো নিজেদের নতুনভাবে আবিষ্কারের আনন্দ নিয়ে ভারতে যেতে পারতেন না। এশিয়া কাপের ফাইনালে উঠে যাওয়ার সাফল্যে অন্য মর্যাদা নিয়েই ভারতে যাওয়া মাশরাফি বিন মর্তুজাদের নিয়ে লিখেছেন মাসুদ পারভেজ

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



স্বপ্ন নিয়ে

যাওয়ার কথা ছিল খালি হাতে, কিন্তু বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ গেল কিনা মুঠোভরা সাফল্য নিয়েই। সাফল্যের এই সোনারোদ আবার ঝক্কি-ঝামেলার মেঘও কম উড়িয়ে আনেনি। ‘প্রথম পর্ব’ নাম নেওয়া আসরের মূল পর্বের বাছাই খেলতে ধর্মশালায় গিয়ে কয়েকটি দিন বিশ্রামের ফুরসত মেলার কথা ছিল মাশরাফি বিন মর্তুজাদের। কিন্তু গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় না নিয়ে এশিয়া কাপ ফাইনালে পৌঁছে যাওয়াটা তাঁদের শারীরিক সামর্থ্যের চূড়ান্ত পরীক্ষাও নিয়ে ছেড়েছে। যাকে বলে একেবারে ‘গায়ের ওপর দিয়ে যাওয়া’। মধ্যরাত অবধি এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলে গভীর রাতে হোটেলে ফিরেই পরদিন সকালের উড়ান ধরার জন্য গোছগাছ করতে গিয়ে রাতের ঘুম মাটি। দিল্লি হয়ে বিশেষ উড়ানে বিকেল নাগাদ ধর্মশালায় পৌঁছেই আবার পরদিন সকালে অনুশীলনে নেমে পড়া বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচের আগে পেয়েছে ওই একটি সেশনই।

নিশ্চিত করেই বলা যায় যে এমন শারীরিক ধকলও ‘মধুর’ মনে করেই মেনে নিয়েছেন মাশরাফিরা। কারণ দুই বছর আগে ঘরের মাঠে টি-টোয়েন্টির বিশ্ব আসরে হাবুডুবু খাওয়া স্বাগতিক দলের সঙ্গে এবারের দলের বিস্তর ফারাকটা যে তাঁরা এশিয়া কাপ থেকেই আবিষ্কার করে যেতে পেরেছেন! বিশ্বকাপের আগে এশিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের আসরটির সূচি নির্ধারিত না হলে যা জানাই হতো না কারোরই। টি-টোয়েন্টির বাংলাদেশকে নিয়ে বাকি বিশ্বের ধারণাও থেকে যেত আগের মতোই। এশিয়া কাপের আগে স্বাগতিকদের নিজেদেরও কি তাই ধারণা ছিল না? অবশ্যই ছিল। না হলে এশিয়া কাপের ফাইনাল যেখানে ৬ মার্চ, সেখানে ৫ মার্চ ধর্মশালায় হংকংয়ের বিপক্ষে ওয়ার্ম আপ ম্যাচ খেলার সূচিতে অনাপত্তি জানায় কী করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)? যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সমালোচনার ঝড়ও কম বয়ে যায়নি। বিশেষ করে সেই সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসিই! সাধারণ্যে ছড়িয়ে পড়া ধারণাটি এমন ছিল যে ৫ মার্চ ওয়ার্ম আপ ম্যাচ খেলার সূচি তারাই চাপিয়ে দিয়েছিল এবং বিসিবিকে তা মেনেও নিতে হয়েছিল।

কিন্তু আসল ঘটনা কিছুতেই তা নয়। সংশ্লিষ্ট বোর্ডের অনুমোদন না নিয়ে আইসিসি কখনো কোনো সূচিই চূড়ান্ত করে না। তাদের একটি প্রস্তাবনা অবশ্যই থাকে। আর এশিয়া কাপের আগে টি-টোয়েন্টির বাংলাদেশ যেমন ছিল, তার ভিত্তিতেই তৈরি হচ্ছিল আইসিসির সূচিও। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের মতো দলকে টপকে মাশরাফিদের ফাইনাল খেলার সম্ভাবনাও তাই ছিল ধারণাতীত। সে জন্যই ৫ মার্চের ওয়ার্ম আপ সূচিতে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল আইসিসিও। এটি যেমন ঠিক, তেমনি এও ঠিক যে সেই সূচি হাতে পেয়ে উচ্চবাচ্য করেনি বিসিবিও। বিনা বাক্যেই সায় দিয়ে দেয় তারা। কারণ এশিয়া কাপে যে মাশরাফিরা এতটা বদলে যাওয়া এক দল হয়ে উঠবেন, সেটি তো বিসিবিরও ধারণার বাইরে ছিল। তা ছাড়া জানুয়ারিতে দেশের মাটিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চার ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ থেকেও ধারণা পালটে যাওয়ার কোনো কারণ ছিল না। চার ম্যাচের সিরিজে দুই ম্যাচ জেতা বাংলাদেশকে সমানসংখ্যক ম্যাচে হারতেও তো হয়েছিল। তাই বিসিবিও নিশ্চিতভাবেই ধরে নেয় যে ২ মার্চের ম্যাচটিই এশিয়া কাপে বাংলাদেশের শেষ ম্যাচ হতে চলেছে।

যে ম্যাচের প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তান এবং তাদের হারিয়েই ফাইনাল নিশ্চিত করে মাশরাফিরা এলোমেলো করে দেন পূর্বনির্ধারিত সব সূচিই। এর আগে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে ভারতের কাছে হারার পরও কিন্তু এমন কিছু কল্পনা করা যায়নি। ‘ভারতের কাছে হারার পরও বিশ্বাস করেছি যে এখান থেকেও আমাদের পক্ষে ফাইনাল খেলা সম্ভব। ছেলেদের সে কথা আমি বলেওছিলাম’—টিম মিটিংয়ে সতীর্থদের বলা এ কথাটি অধিনায়ক মাশরাফি তখনই প্রকাশ্যে বললে কতজন বিশ্বাস করতেন, তাও অনুমান করা যায় খুব সহজেই। হেরে শুরু করা বাংলাদেশ যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ম্যাচ দিয়েই জয়ের ছন্দ ধরে ফেলবে, সেটিই-বা ভেবেছিলেন কয়জন! কিন্তু শ্রীলঙ্কা ম্যাচ দিয়েই পূর্বানুমান ভুল প্রমাণ করে এগিয়ে যাওয়ার শুরু। এরপর পাকিস্তানের কাছে ২০১২-র এশিয়া কাপ ফাইনালে হারের বদলা নিয়ে ফাইনালের মঞ্চও আলো করেছেন মাশরাফিরা।

সেই মঞ্চে চূড়ান্ত সাফল্যের ফুল ফোটাতে না পারলেও ‘কাজের কাজ’ কিন্তু ঠিক একটি হয়েছে। এই ফরম্যাটের সমীহ জাগানো এক দলের স্বীকৃতি নিয়েই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে গেছে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে সহযোগী সদস্য দেশগুলোকে নিয়ে ভয়ও তাড়ানো গেছে। বিশ্বকাপের আগে এশিয়া কাপটি না হলে এর কিছুই হতো না। তাতে বরং দেশের মাটিতে দুই বছর আগে হয়ে যাওয়া বিশ্বকাপের বাছাই পর্বের পারফরম্যান্সই টুর্নামেন্ট পূর্ব আলোচনায় উঁকি দিয়ে যেত বেশি। ২০১৪ বিশ্বকাপের কথা একবার ভাবুন তো। শুরুর আগে কেমন গা শিউরে ওঠা অনুভূতি! কারণ এর আগেই তো দেশের মাঠে ওয়ানডে ফরম্যাটে হওয়া এশিয়া কাপে আফগানিস্তানের কাছে হারের বিষাদে নীল হয়েছিল বাংলাদেশ। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ সেই আফগানদের বিপক্ষে ছিল বলেই ভীতিকর নানা সম্ভাবনা অপ্রস্তুতও করে দিচ্ছিল স্বাগতিক শিবিরকে। ভয় তাড়িয়ে আফগানদের রীতিমতো বিধ্বস্ত করে বিশ্বকাপ শুরু করেও ঠিক সাবলীল ছিল না সেবারের বাংলাদেশ। নেপালের বিপক্ষে কোনোমতে জিতলেও হেরেই বসেছিল হংকংয়ের কাছে। এবার এশিয়া কাপটা না হলে সেবার কষ্টে-সৃষ্টে মূল পর্বে যাওয়ার স্মৃতিটাই মনে থাকত সবার।

এই এশিয়া কাপ তাই হয়ে থাকল সেই স্মৃতি মুছে দেওয়া আসরও। কোনো অঘটন না ঘটলে এবার মূল পর্বেও ভালো কিছু করার বিশ্বাস নিয়েই ভারতে গেছে বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশের এখন নির্দিষ্ট কয়েকজনের দিকে তাকিয়ে না থাকলেও চলে। বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ক্রিকেটে চুটিয়ে খেলে আসা সাকিব আল হাসান ছাড়া বাংলাদেশের আর কারোরই সেভাবে নিয়মিত টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার সুযোগ হয় না। তা এই ফরম্যাটের অভিজ্ঞতম ক্রিকেটার এবারের এশিয়া কাপে অনেকটাই নিষ্প্রভ ছিলেন। ব্যাটে-বলে তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স অন্তত পাওয়া যায়নি। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য পারফরমার মুশফিকুর রহিমের ব্যাটেও তেমন নির্ভরতার খোঁজ মেলেনি। তবু এশিয়া কাপ থেকে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ঠিক পথের দেখা পাওয়া গেছে। যে পথ টুর্নামেন্টের ফাইনালের মোহনায় নিয়েও মিশিয়েছে দলকে। সেই সূত্রে উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস আর মুঠোভরা সাফল্য নিয়েই বিশ্বকাপ অভিযানে বাংলাদেশ!

মন্তব্য