kalerkantho


মসজিদুল হারামের অত্যাধুনিক গ্রন্থাগার

মুহাম্মাদ মিনহাজ উদ্দিন

১০ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



মসজিদুল হারামের অত্যাধুনিক গ্রন্থাগার

পবিত্র হজ পালনার্থী ও জিয়ারতকারীদের জন্য মসজিদুল হারামে রয়েছে সুবিশাল ও অত্যাধুনিক গ্রন্থাগার। বিন্যাস, সাজসজ্জা, ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলায় গ্রন্থাগারটি বেশ মনোরম। যাবতীয় কার্যপদ্ধতিও অত্যন্ত সুচারুরূপে গোছালো। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন গ্রন্থাগার হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে ‘মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর কার্যপরিচালনা পর্ষদের তত্ত্বাবধানে গ্রন্থাগারটি পরিচালিত হয়ে থাকে।

যুগের পরম্পরায় গ্রন্থাগারটি বেশ যত্ন ও গুরুত্ব পেয়েছে। আগে মসজিদুল হারামের বাইরে আলাদা ভবনে থাকলেও বর্তমানে হজযাত্রী ও মুসল্লিদের সুবিধার্থে মসজিদের অভ্যন্তরে দ্বিতীয় তলায় নিয়ে আসা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাস মতে এটি মক্কার অন্যতম গুরুত্ববহ সভ্যতাকেন্দ্র। প্রায় ৪০ লাখ মৌলিক গ্রন্থ ও বিরল-প্রাচীন হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি রয়েছে।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস : ১৬০ হিজরিতে আব্বাসীয় খলিফা মুহাম্মদ আল-মাহদি গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময় আধুনিক সৌদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আব্দুল আজিজ ‘পবিত্র হারামে মক্কা গ্রন্থাগার’ হিসেবে এর নামকরণ করেন। পাশাপাশি মক্কার আলেমদের সমন্বয়ে গঠিত দক্ষ বোর্ডকে তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেন। ১৩৫৭ হিজরিতে যখন বাদশাহ আব্দুল আজিজ গ্রন্থাগারটি সংস্কারের ব্যবস্থা করেন, তখন গ্রন্থাগারটি মসজিদুল হারামের একটি গম্বুজে ছিল। পবিত্র কোরআন ও বিভিন্ন কিতাব সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। সময়ের পরিক্রমায় সংগ্রহশালা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে ওঠে।

১৩৭৫ হিজরি থেকে ১৩৮৫ হিজরি পর্যন্ত গ্রন্থাগারটি সৌদি হজ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ছিল। এরপর ‘মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর কার্যপরিচালনা পর্ষদকে এর দায়িত্ব দেওয়া হয়। বর্তমানে এটি একটি জেনারেল লাইব্রেরিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক লেখক-পাঠক, গবেষক ও দর্শনার্থী আগমনে মুখরিত এর অঙ্গন।

১২৭৮ হিজরিতে প্রলয়ঙ্করী এক ঝড়ে মসজিদুল হারামের বাইরে অবস্থিত গ্রন্থাগারটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। কাবার পার্শ্ববর্তী পাহাড়গুলো থেকে নেমে আসা ঢলে লক্ষাধিক গুরুত্বপূর্ণ কিতাব ও পাণ্ডুলিপি ক্ষতির শিকার হয়। স্থানান্তরের বেশ চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এখন গ্রন্থাগারটি স্থায়ীভাবে মসজিদুল হারামের নির্ধারিত স্থানে জায়গা করে নিয়েছে। দৃষ্টিনন্দন ও নান্দনিক অবকাঠামো গ্রন্থাগারটিকে বেশ বিভাময় করে তুলেছে। অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক সহজতা আগতদের জন্য উপাদেয় হয়ে উঠেছে। মূলত বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আব্দুল আজিজ উন্নত ব্যবস্থাপনার এ নির্দেশনা দিয়েছিলেন। (সূত্র : আল-বায়ান অনলাইন নিউজ)

গ্রন্থাগারের বিভাগ ও ব্যবস্থাপনা : মসজিদুল হারামের গ্রন্থাগারটিতে বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার গ্রন্থ রয়েছে। ১০টি মৌলিক ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে কিতাবগুলো রাখা হলেও পাঁচ হাজার ৬০০ উপক্যাটাগরিতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ৩৬ জন কর্মকর্তা নিরলসভাবে পাঠক-গবেষক ও আগত দর্শনার্থীদের সেবায় নিয়োজিত আছেন।

উল্লেখ্য, গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু বিভাগের তত্ত্বাবধান করে থাকে। তন্মধ্যে একটি হলো, গ্রন্থবিষয়ক সেবাব্যবস্থা। এ বিভাগের দায়িত্বশীলরা অধ্যয়ন হল পরিচালনা করে থাকেন। পাঠকদের জন্য কিতাবগুলো বিভিন্ন আলমারিতে সুবিন্যস্ত আছে। সেগুলো থেকে কিতাব-বই নির্বাচন করা ছাড়াও যাবতীয় সহযোগিতা করেন। নাশতা ও আতিথেয়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। গবেষক ও প্রাচীন পাণ্ডুলিপির পাঠোদ্ধারকারীদের জন্য রয়েছে অজস্র পাণ্ডুলিপির গোছালো উপস্থাপনা।

গ্রন্থাগারটিতে সাত হাজার ৮৪৭টি মৌলিক আরবি পাণ্ডুলিপি রয়েছে। ৩৭৮টি অনারবীয় পাণ্ডুলিপি রয়েছে। ফটোকপি করা পাণ্ডুলিপি রয়েছে আড়াই হাজারের মতো। এ ছাড়া অসংখ্য গবেষণা ও তথ্য-পুস্তিকা রয়েছে। (সূত্র : আল-উয়াম ডটকম)

পত্রিকা বিভাগে আধুনিক-প্রাচীন প্রচুর পত্রিকা রয়েছে। সমকালীন প্রকাশিত আরবি ও অন্যান্য ভাষার পত্রিকার পাশাপাশি বিশ্বের নানা দেশের পত্রিকা ও সাময়িকীও রয়েছে।

পাঠকদের জন্য আরেকটি সুন্দর ও মননশীল ব্যবস্থা হচ্ছে অডিও লাইব্রেরি। এতে বিখ্যাত আলেম-মনীষী, ইমাম-খতিব ও গবেষকদের বক্তব্যের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে। প্রায় ১২ হাজার অডিও সিডি ক্যাসেট ও ডাটা রয়েছে।

হারামাইন স্যুটব্যবস্থা : হারামাইনের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রাচীন ও আধুনিক স্থিরচিত্র, মানচিত্র—ম্যাপ, কিতাবপত্র ও পাণ্ডুলিপি ইত্যাদি এখানে দর্শনার্থী ও আগতদের কাছে উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি মাইক্রোফিল্ম বিভাগ ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পাণ্ডুলিপি, প্রাচীন কিতাবাদি ও পত্রিকার ইতিহাস তুলে ধরে।

কিতাবপত্র ও পাণ্ডুলিপির ইতিহাসনির্ভর ছয় হাজার ৭১টি খুদে ফিল্ম রয়েছে। এ বিভাগটি খুদে ফিল্মগুলোর ভিডিও ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্থিরচিত্রের ব্যবস্থাও রেখেছে। যাতে করে গবেষক-পাঠক ও শিক্ষার্থীরা চাইলে নিয়ে যেতে পারে। প্রতিটি কিতাব, পাণ্ডুলিপি, পুস্তিকা, স্থিরচিত্র ও অন্য গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো ফটোকপি করে আলাদাভাবে সংরক্ষণে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি স্ক্যানিং করে কম্পিউটারেও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

গ্রন্থাগারটিতে নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা রয়েছে। সকাল-সন্ধ্যা দুই সময়ে তাদের জন্য নির্ধারিত সময়ে গ্রন্থাগারে প্রবেশ ও গবেষণার সুযোগ আছে। (সূত্র : আল-আরাবিয়া ডটনেট)

অন্ধ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্যবস্থাপনা : গ্রন্থাগারের ই-লাইব্রেরি বিভাগের দায়িত্বশীলরা বই, পাণ্ডুলিপি ও অন্যান্য পুস্তকসমৃদ্ধ সিডিগুলো কেউ চাইলে তাদের সানন্দে উপহার হিসেবে দিয়ে দেন। এ ছাড়া অন্ধ ও প্রতিবন্ধীর জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থাপনা। প্রচুর পরিমাণে ব্রেইল বই ও ব্রোশার রয়েছে তাদের জন্য। দুই হাজর ৩০০টির বেশি অডিও টেপ এবং ৭০০টিরও বেশি বিশেষ বই রয়েছে।

দর্শনার্থী ও পাঠকদের জন্য বিভিন্ন উপহারের ব্যবস্থা : মসজিদুল হারাম গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ দর্শনার্থী ও পাঠকদের জন্য বিভিন্ন উপহারসামগ্রীর ব্যবস্থা রেখেছে। প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও বিভিন্ন কিতাবের ফটোকপির পাশাপাশি আরো নিত্যনতুন কিতাবও উপহারস্বরূপ দেওয়া হয়। শরয়ি ও হজ-ওমরাহর আহকাম সম্পর্কিত বইপত্রও চাইলে কেউ নিতে পারে। এ ছাড়া উপহার দেওয়ার জন্য উন্নত বোতলভর্তি পবিত্র জমজমের পানির ব্যবস্থাও রয়েছে। (সূত্র : সৌদি প্রেস এজেন্সি)

মসজিদুল হারামের গ্রন্থাগারটির মতো উন্নত ও অত্যাধুনিক সুবিধাসমৃদ্ধ গ্রন্থাগার মুসলিম দেশগুলোর সব মসজিদে না হলেও অন্তত জাতীয় মসজিদে থাকা উচিত। আমাদের দেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একটি গ্রন্থাগার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে থাকলেও সেটি সমৃদ্ধ ও মানসম্মত নয়। তাই একটি অত্যাধুনিক ও সমৃদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থাগারের প্রয়োজন অত্যন্ত বেশি।

 লেখক :  প্রাবন্ধিক ও গবেষক

 



মন্তব্য