kalerkantho


ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যাংকিং সুদ

মাহফুয আহমদ   

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যাংকিং সুদ

আল্লাহ তাআলা ব্যবসাকে হালাল করেছেন ও সুদকে হারাম করেছেন—এ কথা কে না জানে! কোরআনে কারিমের বিভিন্ন আয়াতে ও হাদিসে নববীর অসংখ্য বর্ণনায় স্পষ্ট ভাষায় সুদ হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। সুদের কুফল, বিষফল ও অনিষ্ট সম্পর্কে সবাই কমবেশি অবগত।

সম্প্রতি কিছু মহলে ব্যাংকিং সুদের শরয়ি বিধান নিয়ে নতুনভাবে আলোচনা শুরু হয়েছে। পশ্চিমাদের চিন্তায় প্রভাবিত ও আধুনিকতার চেতনায় উজ্জীবিত একটি মহল ব্যাংকিং সুদকে বৈধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কতক খোঁড়া যুক্তির মাধ্যমে ব্যাংকিং সুদের বৈধতার ফতোয়া দিয়ে বেড়াচ্ছে। এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে উল্লেখ করার প্রয়াস পাব, ইনশাআল্লাহ।

এক. ব্যাংকিং সুদকে যাঁরা বৈধ বলেন, তাঁদের দাবি হলো, মহাজনি সুদের দ্বারা গরিব শ্রেণির ওপর জুলুম ও বেইনসাফি হয়, সে জন্য তা হারাম হওয়াই বাঞ্ছনীয়। পক্ষান্তরে ব্যাংকিং সুদের দ্বারা কারো ওপর কোনো রকম অত্যাচার-অনাচার হয় না। কেননা সাধারণত ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা ঋণ এনে ধনীরা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক খাতে ব্যবহার করে লাভবান হয়। সুতরাং তাদের থেকে সুদ গ্রহণ করা কখনো জুলুমের আওতায় পড়ে না! তাই ব্যাংকিং সুদ বৈধ হওয়াটাই যুক্তিযুক্ত!

উপরোক্ত যুক্তি দুটি কারণে অগ্রহণযোগ্য। এক. তাঁরা ইসলামী শরিয়তে সুদ হারাম হওয়ার ইল্লত (কারণ) ও হেকমত (রহস্য) উভয়কে এক মনে করেছেন। শরিয়তের বিধান ইল্লতের ওপর নির্ভরশীল। যেখানেই ইল্লত পাওয়া যাবে, সেখানেই বিধান কার্যকর হবে। পক্ষান্তরে হেকমতের ওপর শরয়ি বিধান নির্ভরশীল নয়। ফলে হেকমতের অনুপস্থিতিতেও বিধান বলবৎ থাকবে। (উসুলুল ইফতা; তাকি উসমানি, পৃষ্ঠা ১২৬)

ইসলামী শরিয়তে সুদ হারাম হওয়ার ইল্লত হলো, মূল্যের ওপর শর্তসাপেক্ষে বিনা বিনিময়ে নির্ধারিত মুনাফা লাভ করা। অন্যদিকে হেকমত হচ্ছে, সব সম্পদ যেন ধনীদের হাতে পুঞ্জীভূত না হয়ে যায় এবং গরিবরা নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর না হয়ে পড়ে। অর্থাৎ একজন অপরজনের ওপর যেন জুলুম ও বেইনসাফি না করে। অতএব, আমরা যদি সাময়িকভাবে তাদের কথা মেনেও নিই, তবু বলব, যেহেতু ব্যাংকিং সুদে সুদ হারাম হওয়ার ইল্লত বিদ্যমান। তাই হেকমতের অবর্তমানেও তা হারাম হওয়াটাই ইসলামী মূলনীতির দাবি।

দুই. ‘ব্যাংকিং সুদে কারো ওপর জুলুম হয় না’—তাঁদের এ কথাটি বাস্তবতাবিবর্জিত। সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালে ব্যাংকিং সুদেও অন্যায়-অত্যাচারের কোনো কমতি নেই। চলমান ব্যাংকিংব্যবস্থায় দেখা যায়, বড় বড় শিল্পপতিরা ব্যাংক থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন টাকা লোন (ঋণ) এনে বিরাট অঙ্কের মুনাফা অর্জন করেন। আর নামমাত্র কিছু সুদ দিয়ে থাকেন; যা প্রকৃত অর্থে ব্যাংক ডিপোজিটরদের ওপর স্পষ্ট বেইনসাফি। ধরুন, এক শিল্পপতির নিজের পুঁজি হলো ১০ মিলিয়ন, আর ব্যাংক থেকে লোন নিলেন ৯০ মিলিয়ন। মানে মূল প্রজেক্টের ১০ শতাংশ নিজের এবং বাকি ৯০ শতাংশ ব্যাংক ডিপোজিটরদের। যদি এই প্রজেক্ট বিরাট অঙ্কের মুনাফা অর্জন করে, তাহলে এর ন্যূনতম অংশ (২ থেকে ১০ শতাংশ স্থান-কাল ও পাত্রভেদে) ব্যাংক ডিপোজিটররা পেয়ে থাকেন। তো যারা মূল প্রজেক্টের ৯০ শতাংশ পুঁজি জোগান দিল, তারা পায় বেশির চেয়ে বেশি ১০ শতাংশ, আর যে প্রজেক্টের মাত্র ১০ শতাংশ বিনিয়োগ করল, সে পায় মুনাফার ৯০ শতাংশ! এটা অন্যায় ও বেইনসাফি নয় তো আর কী? তা ছাড়া অনেক সময় দেখা যায়, ঋণগ্রহীতা শিল্পপতি লাখো-কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করলেও ব্যাংক ডিপোজিটরদের ভাগ্যে কিছুই জোটে না! (সূত্র : সুদ পর তারিখি ফয়সালা (উর্দু), তাকি উসমানি, পৃষ্ঠা ৫০-৫১ ও ১১৫-১১৬)

দুই. তাঁরা বলে থাকেন, কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার যুগে বাণিজ্যিক ও ব্যাংকিং সুদের অস্তিত্বই ছিল না। সে সময় তা ছিল কল্পনাতীত। কেননা সে যুগে লোকজন নিত্যদিনের প্রয়োজনের তাগিদে ঋণ গ্রহণ করত আর কোরআন ও সুন্নায় সেই ধরনের ঋণের ওপর সুদ নেওয়া হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে ব্যাংকিং সুদ হচ্ছে ইউরোপীয় শিল্প বিপ্লবের পর নব-আবিষ্কৃত বিষয়। সুতরাং এটা কোরআন-হাদিসে নিষিদ্ধ সুদের আওতাভুক্ত নয়!

তাদের উপর্যুক্ত যুক্তিটিও বিভিন্ন কারণে ভুল সাব্যস্ত হয়। প্রথমত, তাদের ধারণা অনুযায়ী কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় বাণিজ্যিক ঋণের অস্তিত্ব ছিল না। দ্বিতীয়ত, কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার যুগে যে বস্তুর অস্তিত্ব ছিল না, পরবর্তীকালে কোরআন দ্বারা তা হারাম সাব্যস্ত হতে পারে না! অথচ এ দুটি কথাই প্রত্যাখ্যাত। কেননা কোরআন যখন কোনো জিনিস হারাম ঘোষণা করে, তখন তার মূল বিষয়টিই নিষিদ্ধ করে। পরবর্তী সময়ে তার আকার-আকৃতি ও গঠন-প্রকৃতিতে কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন এলেও তা হারাম বলেই বিবেচিত হবে। যেমন—পবিত্র কোরআন যখন মদ হারাম ঘোষণা দিয়েছে, তখনকার সমাজে মানুষ খেজুর, আঙুর ইত্যাদি থেকেই মদ তৈরি করত। বর্তমানে যদি ভিন্ন কোনো বস্তু থেকেও মদ তৈরি করা হয়, তবু সেটি কোরআনে নিষিদ্ধ মদের আওতাধীন হবে বলে সবাই একমত পোষণ করবেন।

তা ছাড়া ‘কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার যুগে বাণিজ্যিক ঋণ ও তার ওপর সুদ নেওয়ার প্রথা ছিল না’—এ ধারণা মূলত হাদিস ও ইসলামী ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না থাকার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে। সেই সময়ও এমন ব্যবস্থা চালু থাকার কয়েকটি দৃষ্টান্ত এখানে উপস্থাপন করা হলো—

ক. জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) সুরা বাকারার ২৭৮ নম্বর আয়াতের তাফসিরে লেখেন, এই আয়াত হজরত আব্বাস (রা.) ও বনু মুগিরা গোত্রের এক ব্যক্তির ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁরা উভয়ে প্রাক-ইসলামী যুগে যৌথ কারবার করতেন ও সকিফ গোত্রের লোকদের সুদের ওপর ঋণ দিতেন। (আদ্দুররুল মানসুর : ১/৩৬৬) সুয়ুতি আরো লেখেন, প্রাক-ইসলামী যুগে বনু আমর ও বনু মুগিরা সুদের ভিত্তিতে পরস্পর ঋণ আদান-প্রদান করত। (প্রাগুক্ত)

খ. বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কোরাইশের একটি বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়ায় গিয়েছিল। এতে এক হাজার উট তাদের সঙ্গে ছিল। ওই বাণিজ্যিক সফরে তারা শতভাগ লাভবান হয়েছিল। (সুদ পর তারিখি ফয়সালা, পৃষ্ঠা ৬২) বলা বাহুল্য যে এত বড় কাফেলা কোনো ব্যক্তিবিশেষের মালিকানায় হওয়া সম্ভব বা স্বাভাবিক নয়। বরং পুরো গোত্রের মানুষ এতে পুঁজি বিনিয়োগ করেছিল। এ জন্য সেটিকে আধুনিক পরিভাষায় ‘জয়েন্ট স্টক কম্পানি’ বলা যেতে পারে। ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, কোনো কোরাইশ পুরুষ ও নারী এমন ছিল না, যার কাছে এক মিসকাল বা তার চেয়ে বেশি সোনা ছিল, আর সে তা কাফেলায় বিনিয়োগ করেনি। (তাফসিরে মাজহারি : ৪/১১)

গ. এ বিষয়ে হজরত জুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.)-এর যে কর্মধারা হাদিস ও সিরাতের গ্রন্থাদিতে পাওয়া যায়, তা অধুনা বিশ্বের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জ্যশীল। হজরত জুবাইর (রা.) তাঁর আমানত ও দ্বিনদারির কারণে সর্বমহলে প্রসিদ্ধ ছিলেন। বড় বড় ধনীরা তাঁর কাছে নিজ আমানত জমা রাখত ও প্রয়োজনবশত নিজের আংশিক কিংবা পূর্ণ মুদ্রা নিতে থাকত। তবে জুবাইর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি লোকদের এ মুদ্রাগুলো আমানত হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি হতেন না। উল্টো তখন তিনি বলে দিতেন, এটা আমানত নয়, বরং কর্জ বা ঋণ। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩১২৯)

ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) লেখেন, হজরত জুবাইর (রা.)-এর সেই কথা দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল এই যে তিনি আশঙ্কা করতেন, কখন জানি সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাবে, আর লোকেরা ধারণা করবে, তিনি সংরক্ষণ করে রাখতে ত্রুটি করেছেন। তাই তিনি সমীচীন মনে করেন, আমানতকে কর্জ বানিয়ে রাখলে সম্পদওয়ালা বেশি আশ্বস্ত হবে। মুহাদ্দিস ইবনে বাত্তাল (রহ.) এ-ও বলেছেন যে জুবাইর (রা.) এমনটা করতেন, যাতে এ সম্পদ দ্বারা ব্যবসা করা এবং মুনাফা অর্জন করা তার জন্য বৈধ হয়ে যায়। (ফাতহুল বারি, ৬/২৩০)

ইতিহাসবিদ ইবনে সাদ (রহ.) লিখেছেন, জুবাইর (রা.)-এর ছেলে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, আব্বার শাহাদাতের পর আমি হিসাব করে দেখলাম, তাঁর জিম্মায় ২২ লাখ দিরহাম ঋণ ছিল। (আততাবাকাতুল কুবরা : ৩/১০৯)

এবার একটু ভেবে দেখুন, এত বড় অঙ্কের টাকা কি শুধু নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় ঋণ ছিল! দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা যায়, সেটা ছিল বাণিজ্যিক ঋণ। এজাতীয় বহু বর্ণনা থেকে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময়ও বাণিজ্যিক ঋণ ও সুদের অস্তিত্ব বা প্রচলন ছিল। অতএব, তাঁদের এই যুক্তিটিও অসার প্রমাণিত হলো। [বিস্তারিত দেখুন : তাকমিলায়ে ফাতহুল মুলহিম (আরবি), ১/৫৬৯-৬৭৫]

তিন. কখনো তাঁরা বলে থাকেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সুদমুক্ত করলে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো আর ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান থাকবে না। উপরন্তু সেগুলো সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। যার উদ্দেশ্য বিনা লাভে আর্থিক সেবা প্রদান করা।

প্রকৃতপক্ষে এ ধারণাটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। শরিয়তের দৃষ্টিতে সুদবিহীন ঋণ একটি নির্দিষ্ট পরিমণ্ডলের জন্য; ব্যাপকভাবে ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য নয়। বরং তা পারস্পরিক সহযোগিতা ও কল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডের জন্য হয়ে থাকে। তবে যেখানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পুঁজি সরবরাহের প্রশ্ন জড়িত, সেখানে ইসলামী শরিয়তের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দিকনির্দেশনা বা নীতিমালা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি হলো, যে ব্যক্তি অন্যকে ঋণ দিয়েছে, তাকে প্রথমে এ সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তিনি কী এ ঋণ দ্বারা শুধু দ্বিতীয় পক্ষকে সাহায্য করতে চান, নাকি তাঁর মুনাফার অংশীদার হতে চান? যদি তিনি এ ঋণ প্রদানের মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাকে শুধু সাহায্য করতে চান, তাহলে তাঁর কাছ থেকে ঋণের পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত দাবি করতে পারবেন না। তাঁর মূল পুঁজি নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকবে। কিন্তু তিনি যদি এই উদ্দেশ্যে পুঁজি সরবরাহ করেন যে তাঁর ব্যবসায় অর্জিত মুনাফার অংশ নেবেন, এমতাবস্থায় তিনি পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী আনুপাতিক হারে অর্জিত মুনাফার অংশ দাবি করতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে যদি লোকসান হয়ে যায়, তাহলে তাঁকে ওই লোকসানেরও দায় বহন করতে হবে।

সুতরাং এসব থেকে প্রতীয়মান হয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সুদের পরিসমাপ্তির অর্থ এই নয় যে পুঁজির যোগানদাতা কোনো মুনাফা অর্জন করতে পারবেন না। বরং যদি ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে পুঁজি জোগান দেওয়া হয়, তাহলে লাভ-লোকসানে অংশীদারির ভিত্তিতে এ লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে। এ জন্যই ইসলামী বাণিজ্য আইনের শুরুতেই মুশারাকা ও মুদারাবা পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। (বিস্তারিত দেখুন : ইসলামী ব্যাংকিং ও অর্থায়ন পদ্ধতি; তাকি উসমানি, পৃষ্ঠা ১৪-১৫)

তা-ই যদি হয়, তাহলে কেন ব্যাংকিং সুদকে বৈধ আখ্যায়িত করে দ্বিনের একটি অকাট্য বিধানকে লঙ্ঘন করা হবে? এটা কি দ্বিন তাহরিফ বা পরিবর্তন করার নামান্তর নয়?

লেখক : আলোচক, ইকরা টিভি, লন্ডন।


মন্তব্য