kalerkantho


যেভাবে আমেরিকায় মুসলমানদের আগমন

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আমেরিকায় ইসলাম সম্পর্কে গবেষণা ও ধারণা খুবই সীমিত। আক্ষরিক অর্থে আমেরিকা আবিষ্কার না হলেও, অবাক করার মতো বিষয় হলো—কলম্বাসের আগেই কিছু মুসলমান সেখানে পৌঁছেছিলেন। তবে এ কথাও সত্য যে আফ্রিকা থেকে ধরে নিয়ে আসা অনেক মুসলিম দাস-দাসীরও আমেরিকায় ইসলাম প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক অবদান রয়েছে। ভাগ্যবিড়ম্বিত এসব মানুষের একাগ্র প্রচেষ্টার সুবাদেই আমেরিকায় ইসলাম স্বমহিমায় স্বল্প পরিসরে নিজেকে মেলে ধরেছে ঐতিহ্যের অলংকরণে।

১১৭৮ সালে সং শাসনামলের (Song Dynasty) সারকা (Circa) নামক একজন চায়নিজ রচিত একটি দলিল সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে, যা সুং দলিল (Sung Document) নামে বহুল পরিচিত। এ দলিল থেকে জানা যায়, ১১৭৮ সালে চীন থেকে যাত্রা করে একদল মুসলিম নাবিক Mu-Lan-Pi বা বর্তমান আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া এলাকায় পৌঁছে যান। এতে প্রমাণিত হয় যে কলম্বাসের আগেই মুসলমানরা আমেরিকায় পা রেখেছিলেন।

ব্রিটিশ নৌ ইতিহাস গবেষক গ্যাভিন মানজিস (Gavin Manzies) তাঁর ‘১৪২১’ শিরোনামের গ্রন্থে লিখেছেন, ১৪২১ সালে ঝেং হি (Zheng He) নামের একজন চায়নিজ মুসলমান কলম্বাসের ৭১ বছর আগেই আমেরিকায় গিয়েছিলেন।

ষোড়শ শতাব্দীতে আমেরিকায় মুসলমানের অস্তিত্বের প্রমাণ এস্তেফানিকো নামের এক ব্যক্তি। তাঁর মূল নাম মুস্তফা আজ-জামুরি। ১৫৩৯-এর দিকে তিনি মারা যান। মরক্কোর অধিবাসী মুস্তফা আজ-জামুরিকে ১৫২৭-এ আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আনা হয়। তাঁকে দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি করা হয়। একজন মুসলিম চিকিৎসক ও ওষুধবিশারদ মুস্তফা আজ-জামুরি ইসলাম প্রচার ও ঈমান রক্ষার সংগ্রামে আমৃত্যু সচেষ্ট ছিলেন।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে অসংখ্য মানুষকে অপহরণ করে আমেরিকায় আনা হয় দাসবৃত্তির জন্য। এদের ১০ শতাংশ ছিল মুসলমান। তাদের অনেকেই বেশ শিক্ষিত ছিল। ১৭৩১-এ গাম্বিয়া থেকে অপহরণ করে আনা হয় আইয়ুব বিন সোলাইমানকে। তিনি ছিলেন অধিকারসচেতন, বিচক্ষণ ও শিক্ষিত। অনেক ত্যাগ-সংগ্রামের পর তিনি দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে ১৭৩৪-এ নিজ দেশে ফিরে যান। থমাস ব্লুয়েট (Thomas Bluett) নামের একজন আইনজীবী বিন সোলাইমান সম্পর্কে বলেন, “...তিনি ‘আল্লাহ’ ও ‘মুহাম্মদ’ শব্দ উচ্চারণ করলেন। তিনি এক গ্লাস মদ গ্রহণে অস্বীকার করলেন, যা আমরা দিয়েছিলাম। আমরা বুঝলাম, তিনি সাধারণ কেউ নন; বরং তিনি ‘মুহাম্মাডান’।”

বিলালি মুহাম্মদ ছিলেন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মুসলমান। জর্জিয়ার স্যাপেলো দ্বীপে (Sapelo Island) আঠারো শতকে এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয় বিলালি মুহাম্মদকে। তিনি ১৭৭০-এ সিয়েরা লিওনের এক শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁকে কিশোর বয়সে অপহরণ করা হয়। তিনি পবিত্র কোরআন ও ইসলাম বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্বের অধিকারী ছিলেন। বিলালি মুহাম্মদের প্রভু ছিলেন উদার ও সহিষ্ণু, তিনিও দাসপ্রথা বিলুপ্তির জন্য কাজ করেন। দাসত্বের মধ্যে থেকেও বিলালি মুহাম্মদ আমেরিকায় ইসলাম প্রচারে অবদান রাখেন। ইসলামী আইন-কানুন তিনি সংকলন করেন। বর্তমানে এগুলো বিলালি দলিল (Bilali Document) নামে খ্যাত। তাঁর মৃত্যুর পর ১৩ পৃষ্ঠার একটি আরবি পাণ্ডুলিপি তাঁর ঘরে পাওয়া যায়। জাদুঘরে সংরক্ষিত এ অমূল্য সম্পদে ইসলামী শরিয়ার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এ জন্যই বিশেষজ্ঞরা Bilali Document-কে প্রথম ‘ফিকহ’ বা মুসলিম আইনগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

১৭৯০ সালে সাউথ ক্যারোলাইনার legislative body মরক্কোর একটি সম্প্রদায়ের জন্য সর্বপ্রথম বিশেষ আইনগত মর্যাদা Special legal status অনুমোদন করে। পরবর্তী সময়ে ১৭৯৬ সালে Moors sundry acts স্বাক্ষরিত হয়। সেখানে বলা হয়, ‘মুসলমানদের আইন, ধর্ম ও প্রশান্তির বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো বিরুদ্ধবাদী চরিত্র যুক্তরাষ্ট্রের নেই।’ (The United states had no character of enmity against the laws, religion or tranquility of Musalman)।

ঐতিহাসিকদের মতে, এডওয়ার্ড উইলমোট ব্লাইডেন (Edward Wilmot Blyden) আধুনিককালের অন্যতম ধর্মান্তরিত মুসলিম। নাইজেরিয়ান বংশোদ্ভূত ব্লাইডেন ১৮৮৯ সালে ধর্মান্তরিত হন। তাঁর জ্ঞান ও দক্ষতার কারণে তিনি লাইবেরিয়ার ইসলাম শিক্ষা বিষয়ক মন্ত্রী মনোনীত হন।

ব্লাইডেনের ইসলামে দীক্ষা লাভের পর ১৮৮৮ সালে মুহাম্মদ আলেকজান্ডার রাসেল ওয়েব (Muhammad Alexandar Russel webb) ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন। অত্যন্ত সুদক্ষ এই নওমুসলিম ছিলেন লেখক, প্রকাশক ও স্বনামধন্য সাংবাদিক। তিনি আমৃত্যু ইসলামের জন্য নিবেদিত ছিলেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় গঠিত হয় আমেরিকায় মুসলমানদের মুখপাত্র ও সংগঠন American Muslim Brotherhood।

উনিশ শতকের প্রথম দিকে আমেরিকায় অভিবাসন আইন ছিল না। ৫০ সেন্টের বিনিময়ে পাওয়া যেত নাগরিকত্ব। তখন থেকেই আমেরিকার মুসলমানরা নিজস্ব কমিউনিটি গড়ে তোলে। ১৮৯৯ সালে হাসান জুমআর নেতৃত্বে আরবের বিভিন্ন দেশের অভিবাসী ত্রিশটি পরিবারের সমন্বয়ে নর্থ ডাকোটা (North Dakota) অঙ্গরাজ্যে একটি কমিউনিটি গঠিত হয়। তাদের প্রচেষ্টায় একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। এটি আমেরিকার অন্যতম প্রাচীন মসজিদ। যদিও এর আগেই লেবানন, জর্দান, সিরিয়াসহ বিভিন্ন আরব দেশের অভিবাসীদের প্রচেষ্টায় ১৯০৮ সালে আমেরিকায় প্রথম মসজিদ নির্মিত হয়। এভাবেই আলবেনিয়া, তুরস্কসহ অন্যান্য দেশ থেকে অভিবাসী মুসলমানরা আমেরিকায় মসজিদ নির্মাণ ও ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করে। ১৯৫৫ সালে শেখ দাউদ আহমদ ফয়সাল নিউ ইয়র্কে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৬৫ সালে The immigration and Nationality act-এর মাধ্যমে আমেরিকায় কোটাভিত্তিক অভিবাসনপ্রক্রিয়া শুরু হয়। তখন থেকে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের আমেরিকা গমনের ধারা শুরু হয়। সেটি এখনো অব্যাহত আছে।

পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমেরিকায় মুসলমানরা বেশি নিরাপদ। একই সঙ্গে সেখানকার মুসলমানরা খুবই সতর্ক। মুসলমানরা এখন কংগ্রেস সদস্য হচ্ছেন, পাচ্ছেন মিস ইউএসএ সম্মাননা। এ জন্য ইউরোপের অন্য দেশের চেয়ে আমেরিকায় মুসলমানরা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা :

1) African Muslims in Antebellum America by Allan D. Austin.

2) African Muslims in America : A Rich Legacy.

3) Berlin (1998). Many Thousands Gone : The First Two Centuries of Slavery in North

4) Ball, Edward (1999). Slaves in the Family. New York and Canada : Ballantine Books, Random House.

5) History of Islam in America : Whither and Where-Yasir Qadhi.

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর।



মন্তব্য