kalerkantho


ওয়াক্ফ কী ও কেন

ইকবাল কবীর মোহন   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইসলাম পরিপূর্ণ জীবন বিধান। এতে মানবজীবনের জন্য দরকারি যাবতীয় বিষয় সন্নিবেশিত হয়েছে। মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক—সব বিষয়ই ইসলামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ব্যতীত কি ব্যক্তিজীবন কি সামষ্টিক জীবন, এমনকি রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডও সচল রাখা সম্ভব নয়। জীবন পরিচালনার পরতে পরতে অর্থনীতি ও অর্থব্যবস্থাপনার বিষয়টি সবাইকে ভাবতে হচ্ছে। আর এই কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য ইসলাম প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে আছে জাকাত, মিরাস ও নানা ধরনের কর যেমন—ফাই, খারাজ ইত্যাদি। তা ছাড়া আছে ওয়াক্ফ। মুসলিম সমাজ ও জাতির আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অন্যতম বিধান এই ওয়াক্ফব্যবস্থা। ইসলামের এই বিধান সমাজসেবা ও জনকল্যাণের অন্যতম হাতিয়ার। ওয়াক্ফ এমন একটি স্থায়ী ব্যবস্থা, যার কল্যাণ ওয়াক্ফকারী মৃত্যুর পরও অনন্তকাল পর্যন্ত লাভ করতে পারে। মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার আমল ও পুণ্যের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন ওয়াকেফর পুণ্যই একমাত্র তার জন্য খোলা থাকে। এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মৃত্যুর পর তিনটি আমল ছাড়া তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। ওই তিনটি আমল হলো : ১. অব্যাহত দান (সদকায়ে জারিয়াহ), ২. কল্যাণধর্মী বা উপকারী ইলম (জ্ঞান), ৩. এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৯৯২)

ওয়াক্ফ পরিচিতি

ওয়াক্ফ একটি স্বেচ্ছাধীন ও স্থায়ী প্রকৃতির দান। ইসলামী শরিয়াহর পরিভাষায় ওয়াক্ফ অর্থ হলো, কোনো বস্তু মালিকের মালিকানায় আবদ্ধ করে তার মুনাফা নির্দিষ্ট সুবিধাভোগীকে সদকাহ করে দেওয়া। মানে ওয়াক্ফর মূল সম্পদ সংরক্ষিত রেখে এর আয় মানবতার জন্য ব্যয় করা হয়। আরবি শব্দ ‘ওয়াক্ফ’ অর্থ স্থগিত রাখা, আটকে রাখা, আবদ্ধ রাখা, নিবৃত্ত রাখা ইত্যাদি। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ‘কোনো বস্তু ওয়াক্ফকারীর মালিকানায় রেখে এর উৎপাদন ও উপযোগ গরিবদের মধ্যে কিংবা যেকোনো কল্যাণজনক খাতে দান করে দেওয়াকে ওয়াক্ফ বলে।’

এই সংজ্ঞার আলোকে ওয়াক্ফ হলো, কোনো সম্পদ নিজের মালিকানা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর উদ্দেশে জনকল্যাণ বা জনসেবার জন্য সোপর্দ করা। তার মানে স্বেচ্ছায় সম্পদের মালিকানা হস্তান্তর করার একটি পদ্ধতি হলো ওয়াক্ফ। এই হস্তান্তর চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তনীয়।

ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) ওয়াক্ফ সম্পর্কে বলেছেন, ‘কোনো বস্তু আল্লাহর মালিকানায় এমনভাবে দিয়ে দেওয়া যে এর উৎপাদন ও উপযোগ বান্দাদের কাছেই প্রত্যাগত হবে—অর্থাৎ এর উৎপাদন ও উপযোগ দ্বারা তারাই উপকৃত হবে। তাঁদের মতে, ওয়াক্ফ সম্পাদন করার পর তা আর বিক্রি করা যায় না। এটি হিবা করা যায় না। এমনকি উত্তরাধিকার হিসেবেও তা বণ্টন করা যায় না।’ (ফতোয়ায়ে আলমগীরী, দ্বিতীয় খণ্ড)

বাংলাদেশ ওয়াক্ফ আইন ১৯৬২-এর ২ নম্বর ধারার ১০ উপধারায় ওয়াকেফর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে—

‘ওয়াক্ফ বলতে কোনো ব্যক্তির দ্বারা স্থাবর কিংবা অস্থাবর সম্পত্তি মুসলিম আইনে স্বীকৃত যেকোনো ধর্মীয়, ধর্মসম্পর্কীয় অথবা দাতব্য উদ্দেশ্যে চিরতরে সোপর্দ করাকে বোঝাবে।’

উল্লিখিত ধারায় বলা হয়েছে, যিনি সম্পত্তি ওয়াক্ফ করেন, তাকে বলা হয় ‘ওয়াকিফ’। আর যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের অনুকূলে ওয়াক্ফ করা হয়, তাকে বা তাদের বলা হয়, ‘মাওকুফ আলাইহি’। যে দলিলের মাধ্যমে ওয়াক্ফ করা হয়, তাকে বলা হয় ‘ওয়াক্ফনামা’।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বিধিবদ্ধ ইসলামী আইনের ৪৯৭ ধারায় ওয়াকেফর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে : ‘কোনো ব্যক্তি কর্তৃক নিজ সম্পত্তি আল্লাহর মালিকানায় সোপর্দ করে, তা থেকে প্রাপ্ত আয় কোনো ধর্মীয় বা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার নির্দেশ দেওয়াকে ওয়াক্ফ বলে।’

ওয়াকেফর শর্ত হলো, কারো এমন ঘোষণা দেওয়া যে তার ঘোষণা দ্বারা ওয়াকেফর অর্থ বোঝাবে। যেমন কেউ বলল, আমার এই ভূমি আমার জীবদ্দশায় ও ইন্তেকালের পর—অর্থাৎ চিরদিনের জন্য সদকা করে দিলাম, ওয়াক্ফ করে দিলাম। এতে ওয়াক্ফ সম্পন্ন হয়ে যাবে।

কোরআন ও হাদিসের আলোকে ওয়াকেফর গুরুত্ব

ওয়াক্ফ অফুরন্ত সওয়াবের কাজ। এর মাধ্যমে সমাজ ও জনসেবা নিশ্চিত করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। কোরআন ও হাদিসে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর নবী মুহাম্মদ (সা.) ধন-সম্পদ ওয়াক্ফ করার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। পরোপকার বা জনহিতে সম্পদের একটি অংশ দান করার বিষয়ে কোরআনে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা করো, জাকাত আদায় করো এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ (দান করার মাধ্যমে) দিতে থাকো, (মনে রাখবে) যা কিছু ভালো ও উত্তম কাজ, তোমরা আগেভাগেই নিজেদের জন্য আল্লাহর কাছে পাঠিয়ে রাখবে, তাই তোমরা আল্লাহর কাছে (সংরক্ষিত দেখতে) পাবে, পুরস্কার ও এর বর্ধিত পরিণাম হিসেবে তা হবে অতি উত্তম।’ (সুরা : মুজাম্মিল, আয়াত : ২০)

উক্ত আয়াতে উত্তম ঋণ বা করজে হাসানা বলতে আল্লাহর উদ্দেশে দান করাকে বোঝায়। এর দ্বারা ওয়াক্ফও নির্দেশ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির সম্পদের অর্জিত বা প্রাপ্ত একটি অংশ দান বা ওয়াক্ফ করার বিষয়ে আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা নিজেরা যা উপার্জন করেছ, সে পবিত্র (সম্পদ) এবং যা আমি জমিনের ভেতর থেকে তোমাদের জন্য বের করে এনেছি তার থেকে (একটি) উত্কৃষ্ট অংশ (আল্লাহর পথে) ব্যয় করো।’ (সুরা : আল-বাকারা, আয়াত : ২৬৭)

সম্পদ থেকে দান করার বিষয়ে বিশ্বাসীদের তাগিদ দিয়ে আল্লাহ কোরআনের অন্যত্র আরো বলেন, ‘যারা স্বীয় ধন-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, অতঃপর ব্যয় করার পর সে অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে না এবং কষ্টও দেয় না, তাদেরই জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে পুরস্কার এবং তাদের কোনো ভয় নেই, তারা চিন্তিতও হবে না।’ (সুরা : আল-বাকারা, আয়াত : ২৬২)

এখানে উল্লেখ্য যে এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর নবীজির অন্যতম আনসার সাহাবি হজরত আবু তালহা (রা.) তাঁর সম্পদের কিছু অংশ ওয়াক্ফ করতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। মসজিদে নববীসংলগ্ন বিপরীত দিকে ‘বিরুহা’ নামক তাঁর একটি কূপ ছিল। তিনি এটি আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেন। আল্লাহর রাসুলের পরামর্শে আবু তালহা (রা.) বাগানটি স্বীয় আত্মীয়-স্বজন ও চাচাতো ভাইদের মধ্যে বণ্টন করে দেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)

আল্লাহ পাক দান করার ব্যাপারে যেমন তাগিদ দিয়েছেন, তেমনি সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও যথাসময়ে দান বা ওয়াক্ফ না করার পরিণাম সম্পর্কেও সতর্ক করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয়, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। আমি তোমাদের যে রিজিক (ধন-সম্পদ) দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় করো; অন্যথায় সে বলবে, হে আমার রব, আমাকে আরো কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তা হলে আমি সদকাহ করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। প্রত্যেক ব্যক্তির নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন।’ (সুরা : আল-মুনাফিকুন, আয়াত : ৯-১১)

লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও উপপরিচালক, ইসলামী ব্যাংক


মন্তব্য