kalerkantho


কোরআনের অনুবাদে সর্বাধিক সতর্কতা প্রয়োজন

রুকন রাশনান ইনআম   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কোরআন আল্লাহর কিতাব। সৃষ্টি রচিত বই নয়। আল্লাহর পাঠানো গ্রন্থ। আল্লাহ মানুষ ও জিন জাতির পথনির্দেশ হিসেবে এ মহান কিতাব অবতরণ করেছেন। কোরআন আমার জন্য এসেছে। কোরআন আপনার জন্য এসেছে। কোরআন মুসলিমের জন্য এসেছে। কোরআন অমুসলিমের জন্য এসেছে। পণ্ডিত ও মূর্খ উভয়ের জন্য কোরআন এসেছে। দ্বিনদার ও অদ্বিনদার দুজনের জন্য এসেছে কোরআন মজিদ। আলেম, গরআলেম ও জাহেল—সবার জন্য এসেছে কোরআন।

এটাই রবের শেষ চিঠি। এরপর আর কোনো বার্তা নিয়ে আসমানি গ্রন্থ আসবে না। পৃথিবীর মৃত্যু পর্যন্ত এ মহান পুস্তক একমাত্র বার্তাবাহক।

পৃথিবীর অন্য বই পড়ুন, না পড়ুন—এই ঐশী বাণী আপনার পড়া উচিত। এই বই পড়া কর্তব্য। কারণ এই বই আপনার, আমার ও সবার জন্য মেসেজ নিয়ে এসেছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবর ভরা এই কিতাব পড়া জরুরি নয় কি? আপনি দ্বিনদার হলে আপনার জন্য কোরআন। দ্বিনদার না হলে কোরআন আরো বেশি জরুরি। কেউ (আস্তাগফিরুল্লাহ) সংশয়ী বা অবিশ্বাসী হলে তার জন্য কোরআন তো পানির মতো জরুরি। কেউ কুফরে থাকলে তার জন্য এই বই বাতাসের মতো অনিবার্য। কেউ সুখ চাইলে তা আছে কোরআনে। কেউ জান্নাত চাইলে তা-ও আছে কোরআনে। জাগতিক সাফল্য চান? কোরআন পড়ুন। আখেরাতে সার্থকতা চান? কোরআনে আছে। উভয় ক্ষেত্রে কামিয়াবি চান? কোরআন পড়ুন, বুঝুন ও আমল করুন।

আল-কোরআন প্রয়োজনীয় সব আয়োজনের কথা বলে। কোরআন পড়লে বুঝবেন, কোরআন আপনার কথা বলছে। আপনার সুখ-দুঃখের গল্প করবে কোরআন আপনার সঙ্গে।

পৃথিবীতে হাজার হাজার ভাষা। বাংলাদেশেও অনেক ভাষা। পাহাড়ে গেলে বুঝবেন, ভাষার তরবেতর ও শব্দের বৈচিত্র্যময় বহুলতা। আমরা কেউ সব ভাষা জানি না, জানা সম্ভবও না। আসল কথা হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিজের ভাষাটাও জানে না। আমরা তো নিজের বাংলা ভাষাও জানি না। আমাদের ধর্মীয় ভাষা আরবি। সেটি তো একেবারেই অজানা। মরুভূমির মতো আমার কাছে আরবি রহস্যময় ও অনালোচিত-অনালোকিত।

ইসলামকে জানতে হলে আরবির বিকল্প নেই। ফরাসি সংস্কৃতি জানতে হলে ফরাসি আবশ্যক। ইংলিশ ছাড়া ইংরেজি বোঝা ও জানা অসম্ভব। স্প্যানিশ না জানলে আমাদের স্পেনীয়দের বোঝা দুঃসাধ্য। লাতিন না জানলে দক্ষিণ আমেরিকানদের বুঝব কিভাবে? তার মানে কি যে পৃথিবীর সব ভাষা জানতে হবে? না। এ রকম আস্ত পাগলাটে প্রস্তাব কিভাবে রাখি!

আমাদের যেকোনো এক ভাষায় নিয়মবদ্ধ চোস্ত দক্ষ হতে হবে। তারপর অন্যান্য ভাষা থেকে প্রশিক্ষিত ভাষায় অনুবাদিত বইপত্র পড়তে হবে। এটাই পৃথিবীর নানা জাতিপুঞ্জ ও ভাষাপুঞ্জ অধ্যয়নের তরিকা।

সমস্যা কোথায়, তা বলছি। আসলে ভাষার অনুবাদ হয় না। ভাবের অনুবাদ হয়। এক ভাষার বর্ণমালার উচ্চারণ আরেক ভাষার বর্ণমালায় সম্ভব? ইংরেজি (V) ভির উচ্চারণ আরবিতে ও বাংলায় সম্ভব? কস্মিনকালেও সম্ভবপর না। আরবি দ্বাত-এর উচ্চারণ পৃথিবীর কোনো ভাষায় সম্ভব না। দীর্ঘ আলোচনা করে বা আন্তর্জাতিক উচ্চারণবিধি মেনে উচ্চারণ শুদ্ধ করা যায়।

একেক ভাষার একেক বাগরীতি। ভাষার নিজস্ব রক্ত ও কলিজা থাকে। যা প্রতিটি ভাষায় স্পষ্টতই আলাদা।

উদাহরণ দিই—ধরুন, আরবি ভাষা চন্দ্রমল্লিকা, বাংলা ভাষা পদ্ম। এখন চন্দ্রমল্লিকাকে ভাষান্তর করলে পদ্ম হয়ে যায়। পদ্মকে ভাষানুবাদ করলে চন্দ্রমল্লিকা হয়ে পড়ে। আরো সমস্যা আছে। আরব্য চন্দ্রমল্লিকা বাংলা পদ্ম হুবহু হয় না। অচেনা এক পুষ্প হয়ে পড়ে। আবার বাংলার পদ্ম আরবি অনুবাদে অবিকল চন্দ্রমল্লিকা না হয়ে বিকৃত ফুল হয়ে ওঠে।

ভাষার অবিকৃত অনুবাদ হয় না। ভাষার ভাবের ভাবান্তর হয়। ভাবসম্পদ অক্ষুণ্ন রেখে তর্জমা হলে ওটাকে অনুবাদ ধরা হয়। ভাষা তো মানুষের কৃষ্টি, কালচার ও চিন্তাজগতের সমূল সৃষ্টি। পৃথিবীর লোকালয় ও জীবনবোধের বিশাল তফাতের সঙ্গে ভাষারা সংসার করে। তাকে আরেক অভিনব আজনবি মহলে নিয়ে ঘর-সংসার করানো সত্যি কষ্টকর। ভাষার এই দূরতা ও অপরিচয়কে যে অনুবাদক খাপ খাওয়াতে পারেন, তিনি সফল অনুবাদক। ভাষা ও সাহিত্যের ওপর ব্যাপক অবদান বিদ্যমান অনুবাদশাস্ত্রের। অনুবাদ না হলে সারা পৃথিবীর মানুষকে সেরা রচনাসম্ভার এভাবে মোহিত ও মুগ্ধ করতে পারত না। অনুবাদ না থাকলে পৃথিবীর অসাধারণ জীবনযাত্রা সম্পর্কে বেখবর থাকতাম। অনুবাদ আপনাকে ও আমাকে টোটাল পৃথিবীর কালচার, সংগ্রাম ও আশা-আকাঙ্ক্ষার একটা সূচি এনে দিয়েছে। অনুবাদ ভাবনাকে সালাম ও স্যালুট জানানো উচিত।

রাশান শিখে তলস্তয় পড়া কঠিন। জাপানিজ শিখে মুরাকামি পড়া আরো কঠিন। আরবি শিখে আলিফ লায়লা পড়া সহজ? রুশোকে পড়ার জন্য ফরাসি শিখতে হতো। ইতালিয়ান শিখতে হতো গ্রামসিকে উপলব্ধি করতে।

ভাবতে পারেন, কী কঠিন বিপর্যয় থেকে অনুবাদকরা আমাদের নিস্তার দিয়েছেন?

অনুবাদ নিছক অনুবাদ নয়। এটা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ শাখা। অনুবাদ খুব সূক্ষ্মতম রচনা। নিয়মমাফিক কাজ। স্বাধীনতা কম, চাপ বেশি অনুবাদে। অনুবাদককে উভয় ভাষায় সমান পারঙ্গম হতে হয়।

উভয় ভাষার কারসাজি ও রূপরাজির ব্যাপক জানাশোনা ছাড়া অনুবাদ যথার্থ হয় না। অনুবাদ সুচারুরূপে সম্পাদিত হলে সুজলা, সুফলা ও পুষ্পগলা হয়।

অনুবাদক যোগ্য ও প্রাজ্ঞ হলে মূল ভাষার সুষমা, সৌরভ ও সৌন্দর্যরূপ অনুবাদে খেলে যায়। যথাসুন্দর অনুবাদ পৃথিবীকে চমত্কৃত করেছে। মূলের কৌশল ও প্রাঞ্জল সৌষ্ঠব অটুট রাখা বহু বই আপনি পড়েছেন।

অনুবাদককে মূল লেখকের চিন্তা, আবেগ, টেকনিক ও ভাষারীতি হৃদয়ঙ্গম করে অনুবাদে হাত দিতে হয়। তখন অনুবাদ মূল বইয়ের ছায়ায় সুগঠিত হয়। অনুবাদ সফল ও সার্থক হয়। এ জন্য মূল লেখকের সমচিন্তা, সমভালোবাসা ও সমবোধির সারথি হতে হয়।

এসব বাদ দিয়ে বস্তা ভরা, দিস্তা ভরা শব্দান্তর অনুবাদ নয়। এসব আবর্জনা ছাড়া কিছু নয়। প্রথম শ্রেণির বইয়ের অনুবাদ করার জন্য দুই ভাষার প্রথম শ্রেণির বোদ্ধা ও ভাষাবিদ হতে হয়। আপনার ও আমার ভাষাভঙ্গি ও ভাষা বিভাগ আগে যাচাই করা উচিত।

আমার কি কোরআনের অনুবাদ করার যোগ্যতা আছে? মার্ক্সের ক্যাপিটাল যে কেউ অনুবাদ করলে অখাদ্য হবে। আমি আরবের লেখক আয়িজ ক্বরনির অনুভূতি বুঝি? কোন সাহসে তাঁর বই অনুবাদ করি? তাঁর বিপুলভাবে প্রশংসিত বইকে তামাশা বানানোর অধিকার আমরা রাখি না। সৈয়দ কুতুব শহীদের সাহিত্য নিজে বুঝি না, বাংলা ভাষা আমার অচেনা, আমি তাঁর বই তর্জমা করি? এসব খুবই নিগৃহীত পাপ। খুবই নির্লজ্জ অপরাধ।

অনুবাদের নামে এক ব্যবসায়িক ফিতনা শুরু হয়েছে। লোভ-লালসা আমাদের দেউলিয়া করে ছুড়ে মারছে।

অনুবাদ করা ভালো কাজ। তবে যথাযথ কলম ও মগজ থেকে অনুবাদ শুরু হওয়া উচিত।

মানুষ আবর্জনার স্তূপ দেখে বীতশ্রদ্ধ ও বিরক্ত। মূল লেখক সম্পর্কে ভুল মেসেজ যাচ্ছে। এসব খিয়ানত।

ভালো অনুবাদক সাঁকো তৈরি করে বিশ্বের সঙ্গে। খারাপ ও অযোগ্য অনুবাদক ধোঁয়া ও ময়লা ছড়ায়।

আল্লাহ আমাদের কল্যাণকর পথে পরিচালিত করুন।

লেখক : কবি ও গবেষক


মন্তব্য