kalerkantho


সাহাবায়ে কেরামের ভাষা ও সাহিত্যচর্চা

মুহাম্মাদ মিনহাজ উদ্দিন   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভাষা মানুষের মৌলিক অনুষঙ্গ। ভাষাকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীতে বেড়ে উঠেছে অসংখ্য জনপদ ও মানবপল্লী। নদীর স্রোত যেমন সদা বহমান, ভাষার গতিও তেমনই অনিঃশেষ ধাবমান। কালের পরিক্রমায় ভাষার গতি কখনো ব্যাহত হয় না। হয়তো মোড় নেয় ভিন্ন দিকে। উন্নতির শিখরে নয়তো পরিবর্তনের গহ্বরে। পৃথিবীর প্রতিটি ভাষায় রয়েছে নিজস্ব মাধুর্য ও দ্যোতনা। ছন্দের মহিমা ও শব্দবৈভবের কারিশমা। নির্মাণশৈলী ও বর্ণনায়নের রূপময়তা। যে বর্ণনাভঙ্গি ও নির্মাণশৈলী হৃদয়াঙ্গনে সৃষ্টি করে নিসর্গের ব্যঞ্জনা। স্রোতস্বিনীর কল্লোলতা। এবং আরো যা কিছু ভাষাকে দেয় শ্রুতির মধুরতা ও পাঠের মনোহর সুখ। সেটিকে আমরা সাহিত্য বলতে পারি। ভাষা ও সাহিত্য একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অঙ্গাঙ্গিভাবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে জীবনযাত্রায় ভাষা ও সাহিত্যের আবেদন অত্যন্ত ব্যাপক ও বহুধাবিস্তৃত এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা।

কবি-সাহিত্যিকরা হলেন ভাষার সেবক। তাঁরা ভাষা-সাহিত্যের সেবা করে যান তাঁদের রচনাসম্ভার ও ভাষাশৈলী উপহার দিয়ে। ভাষার বসনে তাঁরা পরিয়ে দেন সৌকর্যের মণিহার ও অলংকার। তাঁদের অবদান পুঁজি করে এগিয়ে চলে নিজ নিজ জাতির বহুমাত্রিক ও সুদীর্ঘ অভিযাত্রা।

সাহিত্যের রয়েছে রকমফের ও বহু প্রকারভেদ। ইসলামী সাহিত্য ও অনৈসলামী সাহিত্যকে প্রধানতম হিসেবে ধরা যায় এবং আলোচনার অবকাঠামো দাঁড় করানো যায়।

ইসলামী সাহিত্যের রয়েছে আদিগন্ত বিস্তীর্ণ কথকতা। যা নাতিদীর্ঘ ও বিশদ আলোচনার দাবি রাখে। তবে আমরা এ প্রবন্ধে শুধু ইসলামী সাহিত্যের সূচনাপর্বে সাহাবায়ে কেরামের আলোচনা-সমালোচনা কেমন ছিল, সে সম্পর্কে অতিসংক্ষেপে আলোচনার প্রয়াস পাব।

রাসুল (সা.)-এর সাহাবিদের প্রত্যেকেই ছিলেন নিজস্ব ভাষা (আরবিতে) অত্যন্ত পারদর্শী ও সাহিত্যপ্রতিভার অধিকারী। কবিতার ক্ষেত্রে রাসুলের সাহাবিখ্যাত ‘ত্রয়ী’ হাসসান ইবনে সাবিত, আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ও কাব ইবনে মালিক (রা.)-এর পারঙ্গমতা সাহিত্যমহলে সুবিদিত। প্রধান চার খলিফার তিনজনই সাহিত্যাকাশে চৌদ্দশির মতো আলো ঝলমলে। ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনানুযায়ী তাঁদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা প্রচুর কবিতা রয়েছে। প্রসিদ্ধ কিছুসংখ্যক সাহাবির শের বা কবিতা নিয়ে বৃহৎ কলেবরে অনেক বইও বের হয়েছে। বাংলাদেশের মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ সাহেবের সংকলনে এমন একটি কিতাব ‘রাওয়ায়ে মিন আশআরিস সাহাবা’ নামে মিসর থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

হজরত আলী (রা.)-এর অসাধারণ পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্য সংকলন ‘নাহজুল বালাগা’র মৌলিক ও অনূদিত কপি বিশ্বের উচ্চশ্রেণির সাহিত্যপ্রতিষ্ঠান ও পাঠকদের কাছে বেশ আদৃত।

ভাষা-সাহিত্য ও কবিতাচর্চার ক্ষেত্রে কিছু কিছু সাহাবির নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও রূপরেখা ছিল। ইতিহাসবেত্তারা দাবি করেছেন, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) সর্বাধিক সাহিত্যসমালোচনা ও পর্যালোচনা করতেন। তাঁর এসব চর্চা হতো পুরোপুরি রাসুলের দিকনির্দেশনা ও ইসলামের নিয়ম-নীতি অবলম্বনে। কবিতার ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, সমালোচনা ও মতামত ইসলামী সাহিত্যের প্রতিনিধিত্ব এবং সুস্থ চিন্তাধারার রূপায়ণ করে। সাহিত্যকে সুসংহত ও উপাদেয় করতে তাঁর ভূমিকা ছিল অনেক বেশি। কাব্যচর্চায় তিনি ছিলেন প্রাগ্রসর। তিনি বিভিন্ন সময় রাসুল (সা.)-কে কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন। তাঁর বক্তব্য ও আলোচনাগুলো ছিল কবিতা ও প্রবাদবাক্যের আবরণ মোড়ানো। অসংখ্য কবিতা তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল। কোনো কিছুর দলিল উপস্থাপন বা প্রমাণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিংবা জীবনের কোনো অনুঘটনায় কবিতা উল্লেখ করতে তিনি ভীষণ স্বাচ্ছন্দ্য ও উৎসাহ বোধ করতেন।

তিনি স্বভাবজাতভাবে কবিতার চর্চা করতেন। নিজের রচিত কবিতা বারবার মুখে আওড়ায়ে মুুখস্থ করতেন। আর সময়-সুযোগ মতো বিভিন্ন উপলক্ষে আবৃত্তি করতেন।

কবিতার শ্লোক ভাঙাগড়ার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য রুচিশীলতার পরিচয় দিতেন। সৌন্দর্যবোধও ছিল বেশ উচ্চমার্গের। বিখ্যাত মনীষী ইবনে রশিক তাঁর আল-উমদাহ্ কিতাবে উল্লেখ করেন, কবিতাঙ্গনে হজরত ওমর (রা.) তাঁর যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমালোচক ও সূক্ষ্মদর্শী ছিলেন।’

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, তাঁর চেয়ে অধিক কবিতা মুখস্থকারী কাউকে আমি দেখিনি। ঐতিহাসিক আসমায়ি ও ইবনুল জাদিয়া বলেন, কোনো কাজ করতে গিয়ে তিনি ক্লান্তি ও অবসাদ অনুভব করলে কবিতা আবৃত্তি করতেন।

কবিতার মাধ্যমে তিনি সুকুমারবৃত্তি, সদাচরণ, নিষ্ঠা ও মানবিক গুণাবলি চর্চার তাগিদ দিতেন। অনুরূপভাবে কবিতার মাধ্যমে বক্তব্যকে ধারালো ও শাণিত করারও আদেশ দিতেন। তিনি তাঁর গভর্নর হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.)-কে পত্র লিখেছিলেন আশপাশের মানুষদের কবিতা আত্মস্থ করার আদেশ দেওয়ার জন্য।

সাহাবি কবি জুহাইর ইবনে আবি সালামার কাব্যদক্ষতা ও ভাষা-প্রাঞ্জলতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে হজরত ওমর (রা.) ধর্মীয়, শৈল্পিক, চারিত্রিক ও বয়নবিষয়ক কিছু পরামর্শও দিয়েছিলেন। যেগুলো কবি জুহাইরের জীবনে ও কাব্যচর্চায় বেশ প্রভাব ফেলেছিল।

ইসলামের আরেকজন বড় খলিফা হজরত মুআবিয়া (রা.)-ও সাহিত্যপ্রেমী ও কাব্যরসিক ছিলেন। সাহিত্য-সমালোচনাধর্মী তাঁর অনেক আলোচনার বর্ণনা রয়েছে। তিনি একবার তাঁর ভাই জিয়াদকে পত্র মারফত আদেশ দেন, জিয়াদের পুত্রকে যেন কবিতা মুখস্থ করানো হয়। তিনি বলেন, ‘তাঁকে উত্তম কবিতাসমগ্র শিক্ষা দিচ্ছ না কেন? কারণ কোনো অবাধ্য উত্তম কবিতা আবৃত্তিতে অভ্যস্ত হলে বাধ্য হয়ে পড়ে। কৃপণ আবৃত্তি করলে সে বদান্যতায় মগ্ন হয়। কোনো কাপুরুষ আবৃত্তি করলে সে শৌর্যবীর্যে আপ্লুত হয়।’ (আল-ইকদুল ফরিদ) তাঁর সাহিত্যসংক্রান্ত দিকনির্দেশনা ছিল ধর্মীয় ও চারিত্র্যিক দৃষ্টিকোণ অবলম্বন করে। ইসলামপূর্ব যুগে নারীর আলোচনা ছিল অন্যতম এক উপজীব্য বিষয়। ইসলাম এ ধরনের বল্গাহারা বিষয়টি নিয়ন্ত্রণাবদ্ধ করে। হজরত মুআবিয়াও তাঁর সময়কার কবি-সাহিত্যিকদের এ ব্যাপারে যত্নবান হওয়ার আদেশ দিতেন। তিনি বিভিন্ন সময় কবি-সাহিত্যিকদের বলতেন, ‘নারীদের দিয়ে তোমরা উপমা তৈরি কোরো না। বরং তোমরা তোমাদের কীর্তি নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করতে পারো। আর যেসব প্রবাদ-প্রবচন হৃদয় শাণিত করে ও অন্যকে শিষ্টের শিক্ষা দেয়, তা ব্যবহার করতে পারো।’ (আল-ইকদুল ফরিদ)

ইবনে রশিকের ‘আল-উমদাহ’তে আছে, হজরত মুআবিয়া বলতেন, ‘কবিতা মানুষের মেধা বিস্তৃত করে। ভাষায় বাগ্মিতা আনয়ন করে। বচনে সাবলীল করে তোলে।’ তিনি আরো বলতেন, ‘প্রত্যেক ব্যক্তির আপন সন্তানকে শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া আবশ্যক। আর উত্কৃষ্ট মানের কবিতা শিক্ষা দেওয়া অন্যতম শিষ্টাচার।’

মসজিদ-ই-নববীর ভেতরে শুধু কবিতা পাঠের জন্য আলাদা একটি মিম্বর (মঞ্চ) তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে দাঁড়িয়ে রাসুলকবি হজরত হাসসান ইবনে সাবিত (রা.) কবিতা আবৃত্তি করে মুসলমানদের উদ্দীপ্ত করতেন। চেতনায় শুদ্ধতার পরশ বুলিয়ে দিতেন। মুসলমানদের গৌরবগাথা ও কাফিরদের নিন্দাকাব্য আবৃত্তি করতেন। কবি হজরত কাব ইবনে জুহাইর (রা.) রাসুল (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করে তাঁর প্রশংসাজ্ঞাপক কবিতা রচনা করেন ‘বানাত সুআদ’। যা সাহিত্যের অন্যতম আকরগ্রন্থ হয়ে আছে। কবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার কবিতাগুলো সাহিত্য পরিমণ্ডলে সদা দেদীপ্যমান। তাঁর জিহাদসংক্রান্ত কবিতাগুলো মুসলমানমানসে এখনো চেতনার ঝড় বইয়ে দেয়।

রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায় তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা পেয়ে সাহাবিদের মধ্যে যাঁদের কাব্যপ্রতিভা ও সৃজনশীলতা ছিল, তাঁরা সবাই কবিতাচর্চায় অত্যধিক ঐকান্তিক হয়ে ওঠেন। তাঁদের মধ্যে হজরত হাসসান ইবনে সাবিত, জুুহাইর ইবনে আবি সালামা, লাবিদ ইবনে রাবিআহ, কাআব ইবনে জুহাইর, আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা, কাআব ইবনে মালিক, আব্বাস ইবনে মিরদাস, জুহাইর ইবনে জুনাব সুহাইম, আন-নাবিগা ওরফে আবু লায়লা (রা.) প্রমুখ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। নারী সাহাবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন নবীকন্যা ফাতিমা, খানসা (রা.) প্রমুখ।

ইসলামে কোনো অচ্ছুৎ ভাষা নেই। সব ভাষাই আল্লাহর সৃষ্টি। ভাষাকে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিদর্শন বলে উল্লেখ করে ইরশাদ করেন—‘তাঁর আরো এক নিদর্শন হচ্ছে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।’ (সুরা রুম : ২২)

অন্য ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রেও ইসলামের উৎসাহ রয়েছে। হজরত জায়িদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে রাসুল (সা.) ইহুদিদের ষড়যন্ত্র ও ইসলামবিরোধী কার্যকলাপের আঁচ পাওয়ার জন্য হিব্রু ভাষা শিক্ষার আদেশ দিয়েছিলেন। তিনি মাত্র ১৫ দিনে হিব্রু ভাষা আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন। রাসুল (সা.) খুশি হয়ে তাঁর জন্য দোয়াও করেছিলেন। ইসলাম সুস্থ, মার্জিত ও শুদ্ধরূপে সাহিত্যচর্চার পূর্ণ সমর্থন করে। বরং এটা ইসলামের বিধানও বটে। কবি-সাহিত্যিকদের বিভিন্ন রকমের উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা করে রাসুল (সা.) একটা রূপরেখা দিয়ে গেছেন। আর তাঁর পরবর্তী সময়ে সাহাবিরা তাঁর দিকনির্দেশনার সতত অনুসরণ করে আমাদের জন্য অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।

লেখক : উপসম্পাদক, ডেইলি মাই-নিউজ এরাবিক



মন্তব্য