kalerkantho


নির্জনে বিয়ে পরিবার না মানলে করণীয়

মাওলানা উমায়ের কোব্বাদি   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জিজ্ঞাসা : আমার বয়স ২৮ ও বউয়ের বয়স ২৩। দুজনের কুফুও একই। চাকরি না থাকায় আমরা গোপনে বিয়ে করে আলাদাভাবে বসবাস করছি ঢাকায়। সেও অনার্সে পড়ে। কিন্তু গ্রামে কোনো প্রমাণ ছাড়াই কেউ কেউ রটিয়ে দেয় যে আমরা বিয়ে করে ফেলেছি। এতে আমার পরিবার মেয়েকে কোনোভাবেই মেনে নেবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। তাদের এই অবস্থায় কোনোভাবে রাজি করানোও যাবে না। আর বিপদ আরো বাড়ার আশঙ্কায় আমিও বিয়ের কথা অস্বীকার করেছি। এমতাবস্থায় মা-বাবাকে খুশি করার জন্য তাঁদের কথায় বউকে তালাক দেওয়া শরিয়তে জায়েজ আছে কি না? আমরা কেউ কাউকে ছাড়তে চাই না। ছাড়া সম্ভবও নয়। দুজনই ইসলাম অনুযায়ী জীবনযাপনের চেষ্টা করছি।

জবাব : এক.  প্রকৃতপক্ষে গোপন বিয়ে অসামাজিক, অমানবিক, অকৃতজ্ঞতাপূর্ণ ও লজ্জাজনক কাজ। এ জন্য বিয়ের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ইসলাম পছন্দ করে না। আপনাদের এত বিপত্তির পেছনে রয়েছে গোপন বিয়ে! ইসলামের নির্দেশনা হলো, ‘বিয়ে করবে ঘোষণা দিয়ে। ’(মুসনাদে আহমাদ : ৪/৫)

আর তা না হলে এ রকম বিপত্তি বাধবে! হাদিসে এসেছে, আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক সাহাবির বিয়ের খবর শুনে নির্দেশ দেন, ‘বিয়ের ঘোষণা প্রদান করো এবং মসজিদে তা সম্পাদন করো। আর এর জন্য দফ (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) বাজাও।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১০৮৯)

দুই. নিন্দনীয় হলেও বিয়ে যেহেতু গোপনে করেই ফেলেছেন, এখন এই বন্ধন রক্ষা করতে হবে। মনে রাখবেন, এটি কোনো ছেলেখেলা নয়। বরং এটি হলো, আল্লাহ তাআলাপ্রদত্ত ও নির্দেশিত নারী-পুরুষের সারা জীবনের একটি চিরস্থায়ী পূত-পবিত্র বন্ধন। ইসলামে তালাকের সুযোগ রাখা হয়েছে খুবই অপছন্দনীয়ভাবে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক যখন তিক্ত পর্যায়ে চলে যায় এবং সমাধানের কোনো পথ থাকে না, তখনই তালাক দেওয়া হয়ে থাকে। তার পরও ইসলামে তালাক একটি জঘন্যতম বৈধ কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) তা চরমভাবে ঘৃণা করতেন। হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত হালাল হলো তালাক।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২১৭৭)

এ জন্য অতীব প্রয়োজন (যা শরিয়তে ওজর বলে গণ্য) ছাড়া স্বামীর জন্য তালাক দেওয়া জায়েজ নয়, স্ত্রীর জন্যও তালাক চাওয়া বৈধ নয়। যেহেতু তালাক স্বামীর অধিকার, তাই বিশেষত স্বামী এ ক্ষেত্রে নিছক মা-বাবার চাপ বা বলপ্রয়োগের কারণেও তা প্রয়োগ করতে পারবে না। কারণ সৃষ্টির আনুগত্যের সীমারেখা বর্ণনা করতে গিয়ে রাসুল (সা.) বলেন, ‘অসৎকাজে আনুগত্য নয়; আনুগত্য শুধু সৎকাজের ক্ষেত্রেই হতে হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১৪৫)

তিন. সুতরাং আপনি এখন যা করবেন তা হলো,(ক) অস্বীকার করে অন্যায়ের পর অন্যায় আর নয়; বরং মা-বাবার সঙ্গে এ বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করুন। আপনি তাঁদের সঙ্গে অকৃতজ্ঞতাপূর্ণ আচরণ করেছেন, তা তাঁদের কাছে স্বীকার করে নিন। পাশাপাশি এটাও বুঝিয়ে বলুন যে আপনি তাঁদের সঙ্গে যে অন্যায় আচরণ করেছেন, এর শাস্তি আপনি পেতে পারেন; আপনার স্ত্রী নয়। এর প্রতিকার হিসেবে তালাকের মতো দুর্ঘটনা ঘটলে তা হবে আরেকটি অন্যায়।

(খ) এর পরেও যদি তাঁরা তালাকের কথা বলেন, তাহলে দেখুন, তাঁদের কথা সঠিক ও যুক্তিসংগত কি না? যদি তাঁদের কথা সঠিক ও যুক্তিসংগত হয় এবং সে কারণে তালাক ছাড়া আর কোনো পথ বাকি না থাকে, পাশাপাশি যদি তালাক প্রদান করার দ্বারা আপনার জিনায় জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে মা-বাবার সন্তুষ্টির জন্য স্ত্রীকে তালাক দিতে হবে। হজরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার একজন স্ত্রী ছিল। যাকে আমি ভালোবাসতাম। কিন্তু আমার বাবা [হজরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.) যৌক্তিক কারণে] তাকে পছন্দ করতেন না। তিনি আমাকে বললেন তাকে তালাক দিতে। কিন্তু আমি তালাক প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানালাম। তখন আমার বাবা রাসুল (সা.)-এর কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করলে রাসুল (সা.) বললেন তাকে তালাক দিয়ে দিতে। ফলে আমি আমার স্ত্রীকে তালাক প্রদান করি। (মুসনাদে আবু দাউদ তায়ালিসি, হাদিস : ১৯৩১, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৪৭১২, আবু দাউদ, হাদিস : ৫১৩৮)

পক্ষান্তরে তালাকের কারণ যদি যৌক্তিক না হয়, শুধু বউয়ের প্রতি ঈর্ষাবশত এটি হয়, তাহলে তালাক দেওয়া আপনার জন্য জায়েজ হবে না।

(গ) পরিশেষে আপনাকে ধৈর্য ধরার ও মা-বাবার সঙ্গে কোনো অবস্থায়ই অসদাচরণ না করার পরামর্শ দিচ্ছি। আপনার স্ত্রীকে তাঁদের সঙ্গে এমন ভালো ব্যবহার দেখাতে বলুন, যাতে তাঁদের মন নরম হয়। আর অবশ্যই আল্লাহর কাছে দোয়া অব্যাহত রাখুন। তিনিই প্রকৃত সমাধানদাতা।

লেখক : খতিব ও মাদরাসা শিক্ষক


মন্তব্য