kalerkantho


শয়তানের মিশন ও ভিশন

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম   

২৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পবিত্র কোরআন মজিদে ‘শয়তান’ শব্দটি ৬৩ বার আর এর বহুবচন ‘শায়াতিন’ শব্দটি ১৮ বার উল্লেখ করা হয়েছে। শয়তান যে মুমিনের প্রকাশ্য শত্রু—এ কথাটি পবিত্র কোরআন মজিদের অসংখ্য জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন—

১। সুরা বাকারার ১৬৮ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিঃসন্দেহে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।

২।  সুরা বাকারার ২০৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, হে ঈমানদাররা! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।

৩।  সুরা আনআমের ১৪২ নম্বর আয়াতে রয়েছে, আল্লাহ তোমাদের যা কিছু দিয়েছেন, তা থেকে খাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ  কোরো না। অবশ্যই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।

৪।  সুরা আরাফের ২২ নম্বর আয়াতে রয়েছে, আর তাঁদের (হজরত আদম ও হাওয়ার) প্রতিপালক তাঁদের ডেকে বললেন, আমি কি তোমাদের এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করিনি এবং বলিনি যে শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?

৫।  সুরা ইউসুফের ৫ নম্বর আয়াতে রয়েছে, নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।

৬।  সুরা ইসরার ৫৩ নম্বর আয়াতে রয়েছে, নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।

৭।  সুরা ফাতিরের ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, শয়তান তোমাদের শত্রু। অতএব, তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ কোরো।

শয়তানের মিশন : আল্লাহর অবাধ্য, অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হয়ে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হওয়ার পর শয়তান একটি মিশন নিয়ে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয়ী হয় এবং সে স্বীয় মিশন পূর্ণ করার জন্য আল্লাহর কাছে সময় ও সুযোগ প্রার্থনা করে। আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে পরীক্ষা করার জন্য তাঁর প্রার্থনা কবুল করেন। আল্লাহ তাআলার বাণী—শয়তান বলল, আমাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত সুযোগ দিন, আল্লাহ তাআলা বলেন, তুমি সুযোগপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত। (আরাফ : ১৫) আর শয়তান এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তার মিশন বাস্তবায়নের জোর প্রচেষ্টা চালায়।

প্ররোচিত করা : শয়তান হজরত আদম ও হাওয়া (আ.)-কে প্ররোচনা, ধোঁকা ও প্রলোভন দেখিয়ে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেতে প্ররোচিত করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, অতঃপর শয়তান উভয়কে প্ররোচিত করে, যাতে তাঁদের অঙ্গ, যা তাঁদের কাছে গোপন ছিল, তাঁদের সামনে প্রকাশ করে দেয়। সে বলল, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করেননি, তবে তা এ কারণে যে তোমরা না আবার ফেরেশতা হয়ে যাও কিংবা হয়ে যাও চিরকাল বসবাসকারী। সে তাদের কাছে কসম খেয়ে বলল, আমি অবশ্যই তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী। (সুরা আরাফ : ২১-২২) আরো ইরশাদ করেন, অতঃপর শয়তান তাঁকে কুমন্ত্রণা দিল, বলল, হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দেব অনন্তকাল জীবিত থাকার বৃক্ষের কথা এবং অবিনশ্বর রাজত্বের কথা? (সুরা ত্বাহা : ১২০)

পথভ্রষ্ট করা : শয়তানের স্বঘোষিত মিশন হলো, মানুষকে মিথ্যা আশ্বাস ও প্রবঞ্চনা দ্বারা পথভ্রষ্ট করা এবং আল্লাহর অবাধ্যতায় তার অনুসারী বানানো। শয়তান আল্লাহ তাআলাকে বলেছে, আমি অবশ্যই তাদের পথভ্রষ্ট করব, বৃথা আশ্বাস দেব, তাদের নির্দেশ দেব, যার ফলে তারা পশুর কর্ণচ্ছেদ করবে এবং তাদের নির্দেশ দেব, যার ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করবে। (সুরা নিসা : ১১৯)

ধোঁকা দেওয়া : ধোঁকা দেওয়া শয়তানের অন্যতম কৌশল। শয়তান হজরত আদম ও হাওয়া (আ.)-কে ধোঁকা দিয়ে বলল, মানুষের পরিণাম হলো মৃত্যু, তবে এ বৃক্ষের ফল যে খাবে, সে চিরজীবী হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, অতঃপর শেষ পর্যন্ত শয়তান এ ব্যাপারে তাদের পদস্খলন ঘটাল এবং তারা যেখানে ছিল, সেখান থেকে তাদের নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার প্ররোচনা দ্বারা বহিষ্কৃত করে। (সুরা বাকারা : ৩৬)

মন্দ ও অশ্লীল কাজের নির্দেশ : শয়তান আল্লাহ তাআলার সঙ্গে এ চ্যালেঞ্জ দিয়েই নেমেছে যে সে মানুষকে বিভ্রান্ত করে ছাড়বে। অতঃপর সে কুপ্ররোচনার মাধ্যমে মানুষের সামনে অশ্লীল ও খারাপ জিনিসকে আকর্ষণীয় ও উত্তম হিসেবে পেশ করে। হালালকে হারাম, হারামকে হালাল, দ্বিনের বাইরের কথাকে দ্বিনের কথা বলে চালিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, অবশ্যই সে (শয়তান) তোমাদের খারাপ ও অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেবে। আর যেন আল্লাহর সম্পর্কে এমন কথা বলে, যা তোমরা জানো না। (সুরা বাকারা : ১৬৯)

নিজেদের দলভুক্ত করার প্রচেষ্টা : শয়তান মানুষদের বশীভূত করে নিজেদের দলভুক্ত করে নেয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, শয়তান তাদের বশীভূত করে নিয়েছে, অতঃপর আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে। তারা শয়তানের দল। সাবধান, শয়তানের দলই ক্ষতিগ্রস্ত।

সরল পথে বসে থাকা : শয়তান মুমিনদের পথভ্রষ্ট করার জন্য সদা সচেষ্ট। এ লক্ষ্যে সে সিরাতুল মুস্তাকিমে বসে থাকে, যাতে কেউ এ পথে আসতে না পারে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,  শয়তান বলল, আপনি আমাকে যেমন উদ্ভ্রান্ত করেছেন, আমিও অবশ্য তাদের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকব। অতঃপর তাদের কাছে আসব তাদের সামনের দিক থেকে, পেছন দিক থেকে, ডান দিক থেকে ও বাঁ দিক থেকে। আপনি তাদের বেশির ভাগকে কৃতজ্ঞ পাবেন না। (সুরা আরাফ : ১৬-১৭)

মানুষের শিরা-উপশিরায় বিচরণ : শয়তান আল্লাহপ্রদত্ত ক্ষমতা লাভ করে আদম সন্তানের শিরা-উপশিরায় বিচরণ ও চলাফেরা করে আদমসন্তানকে পথহারা করে। মহানবী (সা.) বলেছেন, অবশ্যই শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় বিচরণ করে। (বুখারি, হাদিস : ১২৮৮, মুসলিম হাদিস : ২১৭৪)

ইবাদতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা : শয়তান মুমিনের ইবাদতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে ইবাদত নষ্ট করে দেয়, যাতে তাকে সে পুণ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। হজরত ওসমান ইবনে আবুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার রাসুল (সা.)-এর কাছে আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! শয়তান আমার মাঝে ও আমার নামাজ ও কিরাতের মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় এবং তাতে জটিলতা সৃষ্টি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি যখন তার উপস্থিতি অনুভব করবে, তখন তার কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে এবং তোমার বাঁ দিকে তিনবার থুথু ফেলবে। বর্ণনাকারী বলেন, রাসুল (সা.)-এর কথা অনুযায়ী আমি অনুরূপ করলাম। ফলে আল্লাহ তাআলা আমার কাছ থেকে শয়তানকে দূর করে দেন। (মুসলিম)

কুমন্ত্রণা দেওয়া : শয়তান মুমিনকে কুমন্ত্রণা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের কারো কাছে শয়তান এসে বলে, এটা কে সৃষ্টি করেছেন? ওটা কে সৃষ্টি করেছেন? এমনকি সে এরূপ প্রশ্নও করে থাকে যে তোমার প্রভুকে কে সৃষ্টি করেছেন? সুতরাং শয়তান যখন এ পর্যায়ে পৌঁছে, তখন ওই ব্যক্তির উচিত আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা ও (শয়তানের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হওয়া থেকে) বিরত থাকা। (বুখারি ও মুসলিম)

সবার সঙ্গে শয়তান আছে : সব মানুষের সঙ্গে শয়তান আছে। মহানবী (সা.) বলেন, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যার সঙ্গে জিন ও ফেরেশতাদের মধ্য থেকে কাউকে সঙ্গী নিযুক্ত করা হয়নি। সাহাবিরা আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আপনার সঙ্গেও কি জিন সঙ্গী নিযুক্ত আছে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, হ্যাঁ, আমার সঙ্গেও আছে। তবে আল্লাহ তাআলা তার ওপর আমাকে বিজয়ী করেছেন। ফলে সে আমার অনুগত হয়ে গেছে। সে আমাকে কল্যাণকর কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজের পরামর্শ দেয় না। (মুসলিম) মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমরা বাঁ হাতে খেয়ো না, কারণ শয়তান বাঁ হাতে খায়। (মুসলিম, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নম্বর-১৯৮)

 

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী। 



মন্তব্য