kalerkantho


স্পেনের খ্রিস্টান নারীরাও বোরকা পরেন!

মাহফুয আহমদ   

২৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মুসলিম ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষী স্পেনের দক্ষিণে অবস্থিত একটি প্রাচীন শহরের নাম কাদিজ। হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী এই শহর মুসলিম ইতিহাসের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এবং চতুর্দিকে সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত। শুধু স্পেন নয়, পুরো ইউরোপ তথা পশ্চিমা বিশ্বে এই শহরের বাণিজ্যিক, শৈল্পিক ও অন্যান্য ঐতিহ্য বেশ আলোচিত, প্রশংসিত ও স্বীকৃত।

মুসলমানরা অত্যন্ত কৃতিত্ব, সফলতা, সৃজনশীলতা ও উন্নয়নশীলতার সঙ্গে ৮০০ বছর স্পেন শাসন করেছিলেন। তখনকার সময় পশ্চিমা দেশগুলো সভ্যতার সবক নিতে স্পেন আসত। স্পেন ছিল পূর্ব-পশ্চিম—সর্বত্র অনুকরণীয় একটি রাষ্ট্র। দুর্ভাগ্যবশত সেখানে মুসলমানরা শাসনক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, মুসলিম ঐতিহ্যের স্পেন অন্যদের হাতে চলে যায়। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সেই স্পেনে আজ অবধি মুসলমানদের ধর্মীয় ও জাগতিক স্মৃতি, ইসলামী সভ্যতার ছাপ ও মুসলিম ঐতিহ্যের বহু স্থাপনা দেখতে পাওয়া যায়। এ সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে ইসলামী সভ্যতার একটি চিহ্নের কথা পেশ করা হবে; যা অদ্যাবধি আন্দালুসিয়ার (আধুনিক স্পেনের) কাদিজ শহরে ব্যবহৃত ও দৃশ্যমান রয়েছে। সেটি হলো, নারীদের নিজেদের শরীর ঢেকে রাখা। ইতিহাস সাক্ষী যে মানবজাতির শুরু থেকেই সভ্যসমাজের নারীরা নিজেদের সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষার্থে স্বীয় শরীর ঢেকে রাখেন। ইসলাম ধর্মে এ ক্ষেত্রে রয়েছে সুস্পষ্ট বিধান ও বিশেষ গুরুত্ব। সে জন্য মুসলিমসমাজে নারীদের বোরকা পরা একটি সহজাত ও স্বাভাবিক বিষয়। আন্দালুসিয়ার নারীরাও যে বোরকা পরতেন, তা তো বলাই বাহুল্য। তবে আশ্চর্যের কথা হলো, অধুনা কাদিজ শহরের নারীরাও নিজেদের ঢেকে রাখতে বিশেষ এক ধরনের বোরকা পরে থাকেন।

স্পেনের দেশীয় ভাষায় বহুল প্রকাশিত একটি সাড়া জাগানো জাতীয় দৈনিকের নাম হলো ‘এল এস্পিওনাল’ বা দ্য স্প্যানিশ। ২৯ অক্টোবর, ২০১৬ তারিখে একটি চমৎকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপিয়েছে।

নাতিদীর্ঘ সেই স্প্যানিশ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “কাদিজ শহরের একটি এলাকা ‘ভাজের ডি লা ফ্রনতেরা’, যা শ্বেতাঙ্গদের গ্রাম নামে পরিচিত, সেখানে কালো কাপড় দ্বারা নারীর পূর্ণ শরীর ঢেকে রাখা ঐতিহ্যগত একটি পোশাক হিসেবে ব্যবহৃত ও বিবেচিত হয়ে আসছে। কোনো পর্যটক যদি সেই এলাকা ঘুরতে যান, তাহলে স্পষ্টত তিনি সেটা প্রত্যক্ষ করবেন। স্থানীয় কোনো নারীর চেহারা কেউ দেখতে পারবে না। সব কিছু ঢেকে রাখা, শুধু বাঁ চোখ ছাড়া। এমনকি স্থানীয় লোকজনও কোনো নারীকে বিশেষভাবে এই পোশাকে চিনতে পারবে না। বড়সড় পোশাকে নারীরা সবাই আবৃত; চেনার উপায় নেই।”

ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে যে নারীদের গায়ে কালো এই বিশেষ পোশাকটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অনেক সাংবাদিক ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। যেমন—রয়টার্সের ফটোগ্রাফার ডেল পজো, ফটোগ্রাফার জসে ওরটিজ ইশাগো প্রমুখ এ বিষয়ক ডকুমেন্টারি প্রস্তুত করেছেন এবং এই পোশাকের ঐতিহ্যগত ও ঐতিহাসিক ভিত্তি আবিষ্কারের প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন। তা ছাড়া ব্রিটিশ লেখক রিচার্ড ফোর্ড আলজাজিরার বিশ্লেষণের মতোই এই পোশাকটিকে মুসলিম ঐতিহ্যের অবশিষ্ট চিহ্ন বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ সম্পর্কে তাঁর লেখা ‘হ্যান্ডবুক ফর ট্রাভেলার্স থরু আন্দালুসিয়া অ্যান্ড রিডার্স অ্যাট হোম’ (১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ) বইয়ে বিশদভাবে আলোকপাত করেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, ঐতিহ্যময়ী এই পোশাকটি আসলে কী? পত্রিকাটির ওই প্রতিবেদনে এ প্রসঙ্গে পর্যালোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘কিছুদিন আগে কাতার টিভি এই পোশাককে মুসলমানদের বোরকা হিসেবে প্রচার করেছে। শুধু তা-ই নয়, কাদিজের মুসলিম-অমুসলিম পর্যটকরাও একই কথা বলে থাকেন। বরং কেউ কেউ তো আরো আগ বাড়িয়ে মন্তব্য করেন, এটি মূলত স্পেনে দীর্ঘ মুসলিম শাসনকালের রয়ে যাওয়া একটি চিহ্ন। তবে কারো কারো এতে দ্বিমত রয়েছে। তারা এটাকে সেখানকার সাংস্কৃতিক একটি ঐতিহ্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, এটি মূলত শেল্টার বা ছায়া হিসেবে বিবেচিত। আর তা বিত্তবান সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীদের বিশেষ পোশাক। কারণ দিনমজুর খেটে খাওয়া পরিবারের নারীদের গরম আবহাওয়ার ওই অঞ্চলে কাজের জন্য ঘরের বাইরে যেতে হতো, সূর্যের তাপের নিচে কাজ করতে হতো। আর যাঁরা ধনী পরিবারের নারী, তাঁদের ঘরের বাইরে কাজ করতে যেতে হয় না। তাই তাঁরা নিজেদের পুরো শরীর ছায়া দিয়ে ঢেকে বের হন।’ (https://www.elespanol.com/reportajes/grandes-historias/20161028/166484185^0.html)

ইতিহাস সম্পর্কে অবগত বিজ্ঞ পাঠকের এতে সন্দেহ করার অবকাশ নেই যে এই পোশাক মূলত ইসলামী শাসনামলে নারীদের পরিহিত বোরকারই রেখে যাওয়া একটি রূপ বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বিশেষত এক চোখ খোলা রেখে বোরকা পরিধানের এই পদ্ধতিটি ইসলামে স্বীকৃত। পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবা, তাবেয়িন ও তত্পরবর্তী মুফাসসিররা হুবহু এই পদ্ধতির কথাই বলেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মোমিনদের নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের ‘জিলবাবের’ কিছু অংশ নিজেদের ওপর ঝুলিয়ে দেয়, তাদের চেনার ব্যাপারে এটাই সবচেয়ে কাছাকাছি পন্থা হবে। ফলে তাদের কষ্ট দেওয়া হবে না। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আহজাব : ৫৯)

স্পেনের (আন্দালুসিয়ার) কর্ডোবা (কুরতুবা) নগরীর বিশ্ববিখ্যাত মুফাসসির আল্লামা মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ আল কুরতুবি (রহ.) (১২১৪-১২৭৩ খ্রিস্টাব্দ) এই আয়াতের তাফসিরে সাহাবি ও তাবেয়িদের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। আরবি পরিভাষায় জিলবাব বলতে বড় চাদরকে বোঝানো হয়; যা ওড়নার ওপর পরিধান করা হয়।

এই জিলবাবের ব্যাখ্যায় রঈসুল মুফাসসিরিন সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), সাহাবি আলী (রা.)-এর শিষ্য আবিদা আস-সালমানি, কাতাদাহ প্রমুখ বলেন, মোমিন লোকদের স্ত্রীরা মাথার ওপর থেকে চাদর এভাবে পরিধান করবেন, চলার পথে রাস্তা দেখার জন্য চক্ষু ছাড়া শরীরের অন্য কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যাতে প্রকাশ না পায়। (আল জামি লি আহকামিল কোরআন; কুরতুবি, ১৪/২৪৩, দারুল কুতুব, কায়রো)

স্পেনের মুসলিম শাসনামল ও উপরিউক্ত আয়াতের তাফসিরের মধ্যকার যোগসূত্রের প্রতি লক্ষ রেখে যৌক্তিকভাবে এ কথা বলা চলে যে কাদিজ শহরের নারীদের এই পোশাকটি মূলত ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং মুসলিম ঐতিহ্যের অবশিষ্ট একটি রূপমাত্র। ১৯৩৬ সালে স্পেন সরকার কর্তৃক এজাতীয় পোশাক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও তা বেশিদিন কার্যকর হয়নি। স্থানীয় নারীরা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী এই পোশাক পরেই বের হতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

আধুনিক বিশ্বমানচিত্রের স্পেন দেশটি আবারও ইসলামী শাসনকালের সেই স্বর্ণযুগে ফিরে যাক এবং মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে আবার স্পেনের জনগণ সমৃদ্ধ ও সুরভিত হয়ে ইউরোপে নেতৃত্বের আসন গ্রহণ করুক—সেই মাহেন্দ্রক্ষণের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছি।

   

লেখক : আলোচক, ইকরা টিভি, লন্ডন।


মন্তব্য