kalerkantho


কোরআনের বর্ণনায় জান্নাতি শিশু-কিশোর

মুফতি মাহমুদ হাসান   

২৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কোরআনের বর্ণনায় জান্নাতি শিশু-কিশোর

যেকোনো বিষয়ে অধ্যয়নের সঠিক পন্থা হলো, আগে ওই বিষয়ের বিজ্ঞ পারদর্শীদের কাছ থেকে বিষয়টি সম্পর্কে মৌলিক ধারণা অর্জন করা। শাস্ত্রের সঙ্গে চিন্তা ও রুচির আত্মীয়তা সৃষ্টি করা। এরপর বিজ্ঞদের পরামর্শ অনুসারে অধ্যয়নে এগিয়ে যাওয়া। কোরআন-সুন্নাহ অধ্যয়নের বেলায়ও একই কথা। এর ধারক-বাহকদের থেকেই আগে কোরআন-সুন্নাহর মৌলিক শিক্ষা অর্জন করতে হবে। কোরআনের রুচি, চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। যখন হৃদয় প্রস্তুত হবে, দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠিত হবে, তখন কোরআন ও সুন্নাহ অধ্যয়নের মাধ্যমে সঠিক মর্ম উপলব্ধি করা যাবে।

বর্তমানে মানুষের মস্তিষ্কে পশ্চিমা চিন্তাধারা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। হৃদয়ে শিকড় গেড়ে বসে আছে ভোগবাদ ও বস্তুবাদ। এমন আগাছায় আকীর্ণ হৃদয়, স্বভাব ও চরিত্র নিয়ে যখন কেউ কোরআন-সুন্নাহর অনুবাদ পড়ে, তখন এর সঠিক মর্ম উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না। বরং ফল হয় উল্টো। এমন একটি বিষয়ের অবতারণা করছি এখানে।

কোরআনে বর্ণিত জান্নাতি কিশোর

কোরআনে কারিমে জান্নাতের নেয়ামতগুলোর বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তাদের আশপাশে ঘোরাফেরা করবে চিরকিশোররা। পানপাত্র, জগ ও প্রবাহিত ঝরনার শরবতপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে।’ (সুরা : ওয়াকিয়া, আয়াত : ১৭-১৮)

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তাদের সেবায় চারপাশে ঘুরবে বালকদল; তারা যেন সুরক্ষিত মুক্তা।’ (সুরা : তুর, আয়াত : ২৪)

অন্য আয়াতে এসেছে, ‘আর তাদের চারপাশে প্রদক্ষিণ করবে চিরকিশোররা; তুমি তাদের দেখলে বিক্ষিপ্ত মুক্তা মনে করবে।’ (সুরা : দাহর, আয়াত : ১৯)

ওই আয়াতগুলোয় জান্নাতবাসীদের সেবায় লিপ্ত কিশোরদের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এ জন্য আয়াতগুলোতে দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, ‘গিলমান’ ও ‘বিলদান’। আরবিতে ‘গিলমান’ শব্দটি ‘গোলাম’-এর বহুবচন এবং ‘বিলদান’ শব্দটি ‘ওয়ালাদ’-এর বহুবচন, দুটির অর্থই হলো বালক।

আল কোরআনের শিক্ষা ও চেতনার সঙ্গে পরিচিত—অর্থাৎ মুমিনরা এ আয়াতের এ অর্থ বুঝেছেন যে জান্নাতবাসীদের অভ্যর্থনা ও সেবায় এ কিশোররা নিয়োজিত থাকবে।

গিলমানের ব্যাখ্যা বুঝতে চিন্তার ভ্রষ্টতা

যারা কোরআনের শিক্ষা থেকে দূরে সরে কোরআন পাঠ করে, তারা এ আয়াতগুলোতে অন্য কিছুর আভাস পায়। আয়াতগুলোর মর্ম বুঝতে যারা বিভ্রান্ত হয়েছে, তারা সাধারণত দুই ধরনের—এক হলো, ইহুদি-খ্রিস্টান, দ্বিতীয় হলো ধর্মদ্রোহী নাস্তিক। উভয় দলের মধ্যেই চিন্তাবিভ্রাটের এ ঐকমত্য দেখা যায় যে তারা এর দ্বারা কোরআনের ওপর অপবাদ দিতে চায়! তারা এ আয়াতের মতলব বুঝেছে যে জান্নাতিরা ওই কিশোরদের থেকে যৌনসুখ লাভ করবে। নাউজুবিল্লাহ।

অথচ কোরআনের শত-সহস্র তাফসিরগ্রন্থের কোথাও এ কথার ন্যূনতম ইঙ্গিত নেই যে বেহেশতি কিশোররা যৌনানন্দ লাভের জন্য সৃষ্ট। তাহলে এই বিকৃত মানসিকতার লোকেরা আয়াতের এ উদ্দেশ্য কোত্থেকে পেল? এর উত্তর হলো, আগাছায় আকীর্ণ হৃদয়, কুরুচিপূর্ণ স্বভাবের অধিকারী ও ভোগবাদের নগ্ন ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি এর চেয়ে ভালো আর কী চিন্তা করতে পারে?

কোরআন-হাদিস সমকামিতা সম্পর্কে সতর্ক করেছে

কোরআনের একাধিক জায়গায় কওমে লুতের বলাৎকার ও সমকামিতার ঘৃণ্য অপকর্মের জন্য ভয়াবহ শাস্তির বর্ণনা এসেছে। অসংখ্য হাদিসে এর নিকৃষ্টতা, ঘৃণ্যতা ও এসব লোকের ভয়াবহ পরিণতির আলোচনা এসেছে। আলেমরা বলেন, দুনিয়ার কিছু অবৈধ জিনিস জান্নাতে বৈধ হবে, যেমন দুনিয়ায় পুরুষের জন্য চারের অধিক স্ত্রী রাখা অবৈধ হলেও আখেরাতে নিষেধ থাকবে না, বরং জান্নাতবাসীদের এর চেয়ে ঢের বেশি স্ত্রী থাকবে। তবে সমকামিতা এমন একটি কুরুচিপূর্ণ কাজ, যা দুনিয়ায় তো হারামই, জান্নাতেও তা অবৈধ। কোনো জান্নাতি ব্যক্তির স্বভাবপরিপন্থী এ কাজের প্রতি চাহিদা থাকবে না এবং কেউই এহেন হীন কাজে লিপ্ত হবে না। কেননা জান্নাতিরা হবেন উত্তম রুচি ও বোধসম্পন্ন। (বারিকাতুন মাহমুদিয়া : ৪/১১২)

সমকামিতা একটি কুরুচিপূর্ণ স্বভাব

কথায় আছে, যে পাত্রে যা আছে তা থেকে সেটাই বের হবে। নচেৎ সুরুচিপূর্ণ লোকদের কল্পনায়ও সমকামিতার যে বিষয়টি আসে না, কুিসত মানসিকতার লোকেরা কোরআনের মধ্যে তার বৈধতা খুঁজে বেড়ায়! কোরআনের বর্ণনামতে সর্বপ্রথম এ কুরুচিপূর্ণ কাজ কওমে লুতের কাছ থেকে প্রকাশ পেয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, পাপাচারে নিমজ্জিত জাহেলি যুগেও আরবরা কখনো এহেন কাজে লিপ্ত হতো না। এমনকি তাদের কল্পনায়ও আসেনি যে এক পুরুষ অন্য পুরুষ দ্বারা যৌনসুখ লাভ করতে পারে। খলিফা ওয়লিদ ইবনে আবদুল মালিক বলেন, ‘কোরআনে কারিমে যদি কওমে লুতের কুরুচিপূর্ণ কাজটির ঘটনার বর্ণনা না আসত, তাহলে আমরা ধারণাই করতে পারতাম না যে কোনো পুরুষ অন্য পুরুষের সঙ্গে এহেন কর্ম করতে পারে।’ (তারিখে ইবনে কাসির : ৯/১৮৪)

কোরআন-হাদিসে জান্নাতি কিশোরদের বর্ণনা

‘গিলমান’বিষয়ক আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় সব তাফসিরবিদ একমত যে সুদর্শন কিশোররা জান্নাতবাসীদের অভ্যর্থনা, পানপাত্র এগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত থাকবে। কিশোররা এসব কাজে ছোটাছুটি করতে থাকবে। তাদের সৃষ্টিই হলো জান্নাতিদের সেবার জন্য। প্রখ্যাত তাফসিরবিদ ইমাম রাজি (রহ.) বলেন, দুনিয়ায় যেমন ছোট ছেলেরা মা-বাবাকে পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়, ঘরে মেহমান এলে চেয়ার এগিয়ে দেয়, নাশতা-পানি নিয়ে আসে, জান্নাতি বালকরাও জান্নাতবাসীদের সন্তানসহ থাকবে। জান্নাতের যেহেতু সবই সুন্দর, জান্নাতে অসুন্দর বলতে কিছুই থাকবে না, তাই ওই বালকদেরও মণিমুক্তার মতো সুন্দর দেখাবে। তবে এদের সৌন্দর্য যৌন আকর্ষণীয় হবে না। (দেখুন : তাফসিরে কাবির : ২৮/২১১, ৩০/৭৫২, ইবনে কাসির : ৮/২৯২, রুহুল মাআনি : ১৪/৩৫, মাযহারি : ১০/১৫১, ছফওয়াতুত তাফসির : ৩/২৪৮, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস : ৩৪০০৪)

হাদিস শরিফে আছে, ‘সর্বনিম্ন জান্নাতি ব্যক্তিও যখন কোনো কাজে একজন সেবককে ডাকবে, তখন সহস্র সেবক কিশোর লাব্বাইক—হাজির বলে উপস্থিত হবে।’ (তাফসিরে সালাবি : ৯/১২৯, কুরতুবি : ৯/৬৯)

আধুনিক পৃথিবীতেও দেখা যায়, কোনো সম্মানিত অতিথির অভ্যর্থনায় শিশু-কিশোরদের দাঁড় করানো হয়, শিশুরা ফুলেল শুভেচ্ছায় অতিথিকে বরণ করে নেয়। কোনো হতভাগা অতিথি কি এসব বালকের প্রতি যৌন দৃষ্টিতে তাকায়? জান্নাতি কচি-কাঁচা শিশুও অনুরূপই হবে। আমরা দুনিয়ার বিষয়ে এ জিনিসটি বুঝি, জান্নাতের বিষয়ে তা বুঝতে কেন কষ্ট হয়? কোরআনের বেলায় কেন অন্য চিন্তা আসে? মতলব কী?

শত-সহস্র তাফসিরগ্রন্থের কোথাও এ কথা উল্লেখ নেই যে এসব বালক জান্নাতিদের যৌন আনন্দের জন্য নির্ধারিত। কেননা যৌন আনন্দের জন্য তো জান্নাতি রমণীরাই যথেষ্ট, কোরআনের ভাষায় যাদের ‘হুর’ বলা হয়েছে। একেকজন জান্নাতির জন্য তো অসংখ্য হুর স্ত্রী হিসেবে থাকবেই।

কিশোররা সর্বোত্তম পোশাকে আচ্ছাদিত থাকবে

কারো কারো কাছ থেকে শোনা যায়, জান্নাতি গিলমানরা উলঙ্গ থাকবে। আল্লাহ তাআলাই জানেন, এসব অপজ্ঞান যে কারা দুনিয়ায় প্রচার করে। শয়তান ছাড়া কোনো মানুষ এসব বিভ্রান্তিকর কথা প্রচার করতে পারে না। কোরআনের আয়াতে তো আছে, ‘আর তাদের সেবায় চারপাশে ঘুরবে বালকদল; তারা যেন সুরক্ষিত মুক্তা।’ (সুরা : তুর, আয়াত : ২৪)

আয়াতে সুরক্ষিত শব্দ দ্বারাও তো বোঝা যায় যে কাপড় পরিহিত থাকবে। এ ছাড়া তাফসির ইবনে কাসিরে রয়েছে যে তাদের পোশাক-পরিচ্ছদও অনেক সুন্দর ও আকর্ষণীয় হবে। (৮/২৯২)

নিজেদের কুকর্মের দায় কোরআনের ওপর চাপাবেন না

যেসব ইহুদি-খ্রিস্টান কোরআনে বর্ণিত গিলমানের আয়াতের অপব্যাখ্যা করে কোরআনের ওপর অপবাদ দিতে চান, তাঁদের স্মরণার্থে বলি যে কোরআন-হাদিসের কোনো স্থানেই এহেন অপকর্মের সুযোগ দেওয়া হয়নি। বরং এর প্রতি ঘৃণা ও অভিসম্পাত করেছে। বরং বাইবেলে ধর্মগুরুদের ব্যাপারে সমকামিতার ঘটনাও উদ্ধৃত হয়েছে। যদিও মুসলিমরা বিশ্বাস করেন, এহেন অপকর্মের প্রতি উৎসাহদাতা কালাম আল্লাহপ্রদত্ত হতে পারে না। যদিও বাইবেলের কোনো কোনো স্থানে সমকামিতা থেকে নিষেধ করা হয়েছে, কিন্তু কিছু কিছু স্থানে ইহুদি-খিস্টানদের মান্যবর ধর্মগুরুদের এ অপকর্মের ঘটনাও উদ্ধৃত হয়েছে। এসব ঘটনা সাধারণ ইহুদি-খ্রিস্টানদের এ কুিসত কাজের প্রতি উৎসাহিত করে। এখানে কয়েকটি ঘটনার উদ্ধৃতি উল্লেখ করছি : একজন ইহুদি ধর্মগুরুর বলাৎকারের বর্ণনা এসেছে, ‘অতঃপর তিনি বালকটির ওপর শুয়ে গেলেন এবং তার মুখের ওপর মুখ, চোখের ওপর চোখ ও হাতের ওপর হাত রেখে তাকে টানা দিলেন, অতঃপর বালকটির শরীর উষ্ণ হয়ে উঠল।’ (বাইবেল পুরনো নিয়ম, রাজাবলি দ্বিতীয় ৪ : ৩৪)

‘শাওল ও যোনাথন দুজন পুরুষই পরস্পর প্রেমিকযুগল ছিলেন।’ (বাইবেল পুরনো নিয়ম, স্যামুয়েল দ্বিতীয় ১ : ২৩)

বাইবেলের অনুসারীরা তাদের নেতাদের এসব কুরুচিপূর্ণ ঘটনার বৈধতা দেওয়ার জন্যই কোরআনে কারিমের আয়াতের অপব্যাখ্যায় লেগেছে। নচেৎ কোরআনে কারিমের একাধিক আয়াতে যে কাজকে ঘৃণ্য বলা হয়েছে, সে কাজ দিয়েই কোরআনের ওপর অপবাদ দিতে কেন তারা এত তত্পর?

বাইবেলে উল্লিখিত এসব ঘটনার দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয় যে যে কিতাব ধর্মগুরুদের এসব কুরুচিপূর্ণ ঘটনার মাধ্যমে জনসাধারণকে এ ন্যক্কারজনক কাজের প্রতি উৎসাহিত করে, তা কখনো আল্লাহর বাণী হতে পারে না। আর ধর্মদ্রোহী নাস্তিক ও সমকামীরা, যারা কোরআনের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করে, তাদের ব্যাপারে তো নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। তাদের বেলায় জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তির ওই কথাই যথেষ্ট :  ‘সব ব্যভিচারীই চায় জগতের সব মানুষ ব্যভিচারী হয়ে যাক।’

 

লেখক : ফতোয়া গবেষক ও মুহাদ্দিস


মন্তব্য