kalerkantho


নও মুসলিম গ্যারি এহিরাডর দৃষ্টিতে ইসলাম

মুহাম্মদ হানিফ শরিফ

২৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



গ্যারি এহিরাড। বর্তমান নাম আবদুল করিম। ফিলিপাইনের দেবিউ অরিয়েন্টালের সাঙ্কায় তাঁর জন্ম। তিনি এক ক্যাথলিক খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। লোপান স্কুল অব ফিশারিজে পড়ালেখা করেন। ১৯৮৪ সালে এহিরাড ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ১৯৯৫ সালের ১৪ আগস্ট এহিরাড সৌদি আরবের জেদ্দায় গাড়িচালকের চাকরি নেন। তাঁর মনিবের নাম মোহাম্মদ আজিম নকশাবন্দি। ইসলাম সম্পর্কে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি নিম্নোক্ত জবাব দেন। তাঁর এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মুহাম্মদ হানিফ শরিফ। এটি তাঁর লেখা Why Islam is our only choice বইয়ে সন্নিবেশিত হয়েছে।   

প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণ করার পেছনে কোন বিষয়টি আপনার মধ্যে কাজ করেছিল? 

গ্যারি : প্রথমত, ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত পরিষ্কার ও সহজবোধ্য। এর আবেদন খুব হূদয়গ্রাহী ও মর্মস্পর্শী। কোরআন একমাত্র কিতাব, যাতে দীর্ঘ প্রায় ১৪০০ বছর পরও সামান্যতম পরিবর্তন হয়নি। এ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায় থেকে শেষ অবধি কোনো সংশয় কিংবা দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। কোরআনের প্রতিটি বিষয়ই যৌক্তিক ও ন্যায়পূর্ণ। আল্লাহ এক, একক ও সর্বশক্তিমান। তাঁর কোনো স্ত্রী বা সন্তান-সন্ততি কেন থাকবে? মানুষ হিসেবে আমাদেরই এদের প্রয়োজন। কারণ স্ত্রীর প্রয়োজন এ জন্য যে তিনি স্বামীর দেখাশোনা করেন। তদ্রূপ একজন মানুষ যখন দুর্বল হয়, বৃদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন যারা যুবক ও সবল, তারা তাদের সেবা করবে। আল্লাহ কখনো ক্লান্ত বা দুর্বল হন না। তাঁর প্রয়োজন হয় না ঘুমের বা বিশ্রামের। তাই তাঁর কোনো স্ত্রী-পুত্র-পরিজনের প্রয়োজন নেই।

তা ছাড়া ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলাম আমাদের দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পথ চলার নির্দেশ দেয়। বাইবেলে আমরা অনেক পরস্পরবিরোধী বক্তব্য লক্ষ করি। যিশু বলেন, আমি তাদের এমন কিছুই বলি না, যা আমি বলার জন্য নির্দেশিত হইনি। আমি বলি প্রভুর ইবাদতের কথা। যিনি আমার প্রভু ও তাদেরও প্রভু। তার পরও খ্রিস্টানরা কিভাবে যুক্তি দেখাতে পারে যে তারা যিশুর ইবাদত করবে।

বাইবেলের প্রটেস্ট্যান্ট সংস্করণের ৬০০টি ভলিউম এবং রোমান ক্যাথলিক সংস্করণের ৭৩টি ভলিউম আছে। এসবের কোথাও এমন একটি বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায় না, যেখানে যিশু নিজেকে খোদা বলে দাবি করেছেন। অথবা তাঁর (যিশুর) উপাসনার কথা তিনি বলেছেন। বাইবেলের শিক্ষা হলো, যিশু তাঁর পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের নিয়ম বাতিল বা ধ্বংস করার জন্য আসেননি। বরং তিনি সেই শিক্ষাই প্রচার করেছেন, যা তাঁর পূর্বসূরিরা প্রচার করে এসেছেন। সংক্ষেপে বলা যায়, নবীদের বাণীর লক্ষ্য ছিল মানুষ ও স্রষ্টার মধ্যে, আর মানুষে মানুষে উপযুক্ত এবং বাস্তব সম্পর্ক গড়ে তোলা।

খ্রিস্টান ধর্মে মানুষ ও স্রষ্টার সঙ্গে মধ্যস্থতা করার ধারণা প্রচলিত আছে। কিন্তু ইসলাম এর কোনো বাস্তবতা স্বীকার করে না। পাপ বা অপরাধ স্বীকার করার জন্য বা তা মার্জনা করার জন্য কোনো পাদরি বা ধর্মযাজকের কাছে ধরনা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ইসলামে নেই। ইসলামের বিধান মতে, ধনী-গরিব, সবল-দুর্বল, শিক্ষিত-অশিক্ষিত-নির্বিশেষে সব মুসলমানের স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। ইসলামে প্রতিটি বিষয়ই সহজ, স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। ইসলাম মতে, মানুষের শুরু জীবন দিয়ে, তারপর হলো মৃত্যু, বিচার দিবস ও তৎপরবর্তী জীবন। তাই দুনিয়ার জীবনের সময়টি মানুষের জন্য পরীক্ষার সময়। মানুষের এই জীবনের পর তার মৃত্যু হয় ও বিচার অনুষ্ঠিত হবে তার কাজকর্মের ওপর। আর এটা দুনিয়ার একজন পরীক্ষার্থীর ফলাফল ঘোষণা হওয়ার দিনের সঙ্গেই তুলনীয়। মানুষের এই যে দ্বিতীয় জীবন, সেটি মানুষ হয় উপভোগ করবে সুখ দিয়ে অথবা দুঃখ ভোগ করার মাধ্যমে। আর এটা তার পরীক্ষার সময়কালের কাজেরই ফসল। 

প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণের পর এখন আপনার কেমন মনে হচ্ছে? 

গ্যারি : খুবই ভালো লাগছে। এখন আমি খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি। ইসলামে আদি বা মূল পাপ বলতে কোনো ধারণা নেই। আমাদের আদি পিতা আদম (আ.) এবং মাতা হাওয়া (আ.) একটি ভুল করেছিলেন। এর জন্য তাঁরাই দায়ী ছিলেন। আর আল্লাহ তাঁদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়ে গেছে। আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে সেই ভুলের ভার বহন করছি না। তাই সেই ভুল কাজের জন্য আমাদের ওপর কোনো দায়িত্ব বর্তায় না। আমাদের কাজকর্মের জন্য শুধু আমরাই দায়ী হতে পারি। ভালো কাজ করা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকা আমাদের কর্তব্য। আমরা কখনো তা এককভাবে করি, কখনো বা সম্মিলিতভাবে। আর এসব কাজের জন্য আমরা পরকালে জবাবদিহি করব। ইসলামের এই জবাবদিহির ধারণা আমাকে আমার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করেছে। এটি আমার তৎপরতা সম্পর্কে যত্নবান করেছে।

প্রশ্ন : ইসলামের পথে আসার ক্ষেত্রে আপনার তৎপরতা কখন থেকে শুরু হয়? 

গ্যারি : লোপান বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার সময় আমার একজন মুসলিম বন্ধু ছিল। সে আমাকে একটি বই পড়তে দিল। বইটির নাম Islam, the Religion of All Prophets. বইটি আমি খুব যত্নসহকারে পড়লাম। সেখানে এক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘যিশু ইসলামেরই একজন নবী ছিলেন।’ কিন্তু আমার পূর্বেকার ধর্মে (খ্রিস্টান ধর্ম) যিশুকে সম্বোধন করা হয়েছে প্রভু বলে। আরো বলা হয়েছে, ‘কোনো মুসলমান যদি যিশুকে (ঈসা আ.) নবী বলে বিশ্বাস না করে, তাহলে তাঁর ঈমান থাকবে না।’ ইসলামের এই ধারণা পেয়ে আমি খুব বিস্মিত হলাম। তাই কালবিলম্ব না করে আমি ছুটে গেলাম আমার পরিচিত প্রতিবেশী এক নও মুসলিমের কাছে। আমি তাকে তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ‘ইসলাম মানে আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা বা আনুগত্য প্রকাশ করার নাম। ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। আমি জানতে পারলাম, যিশুর মাতা মারিয়াম। পবিত্র  কোরআনে তাঁর নাম অতি সম্মানের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। তারপর আমি ১৯৮৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আমার নিজ প্রদেশ দেবিউ অরিয়েন্টালে ইসলাম গ্রহণ করি। 

প্রশ্ন : আপনার পরিবারের সদস্যরাও কি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন?

গ্যারি : হ্যাঁ, আমার পরিবারের সদস্যরা ইসলাম ধর্মকে সানন্দে মেনে নিয়েছেন। আমি ইসলামের শিক্ষার কথা পরিবারের সদস্যদের কাছে সুন্দরভাবে তুলে ধরি। ইসলাম সম্পর্কে তাদের মধ্যে যেসব ভুল ধারণা ছিল, তা দূর করার চেষ্টা করি। আমার অব্যাহত চেষ্টার ফলে তিন বছর পর তারা ইসলামের গণ্ডির মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

প্রশ্ন : আপনার বর্তমান পরিকল্পনা কী?

গ্যারি : মহানবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘আমার একটি বাক্য হলেও তা প্রচার করো।’ এই হাদিসটি হচ্ছে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। আমি সুন্দর ব্যবহার ও কথার মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করতে চাই। তা ছাড়া আমি আমার নিজ প্রদেশে একটি ছোট্ট ইসলামী প্রচারকেন্দ্র স্থাপন করতে চাই। সেখান থেকে আমি ইসলামের প্রচার ব্যাপকভাবে চালাতে ইচ্ছা পোষণ করছি। ‘Why Islam is our only choice’ বই থেকে লেখাটি অনুবাদ করেছেন ইকবাল কবীর মোহন

 



মন্তব্য