kalerkantho


ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড

প্রযুক্তি মেলায় শিশুদের দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১১:১১



প্রযুক্তি মেলায় শিশুদের দিন

মেলায় উচ্ছ্বসিত শিশুদের সঙ্গে অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। ছবি : তারেক আজিজ নিশক

মা-বাবাসহ পরিবারের বড়দের বাধায় কিংবা পাঠ্য বইয়ের চাপের কারণে ছোটরা সিলেবাসবহির্ভূত জ্ঞান অর্জন করতে পারছে না। এভাবে শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনাকেই অঙ্কুরে বিনষ্ট করা হচ্ছে।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর প্রযুক্তি মেলায় শিশুদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ সেশনের আলোচকরা এই উদ্বেগ ব্যক্ত করেন।

সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এ মেলায় ছিল শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। ডিজিটাল মেলায় অংশ নিতে এসেছিল অসংখ্য শিশুও। মা-বাবার সঙ্গে স্টল ঘুরে ঘুরে তথ্য-প্রযুক্তির নানা বিষয় তারা দেখেছে মুগ্ধ চোখে। সরকারের আইসিটি বিভাগের আয়োজনে গত বুধবার থেকে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭'।

সকাল সাড়ে ১০টায় ছিল 'চিলড্রেন্স ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড' শীর্ষক সেশন। এতে প্রথম শ্রেণি থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। ডিজিটাল বাংলাদেশ, প্রগ্রামিং ও কোডিং বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে সমৃদ্ধ হয়ে কোডিং ও প্রগ্রামিংয়ে উদ্বুদ্ধ করা হয়। কোডিংয়ের মাধ্যমে অ্যাংরি বার্ডস গেমস তৈরির প্রক্রিয়াও দেখানো হয়।

ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ রাজধানীর কয়েকটি স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নেয়। আলোচনা শেষে মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখে শিক্ষার্থীরা। সম্মেলন কেন্দ্র-লাগোয়া মেলার অংশ শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখরিত হয়ে ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক লাফিফা জামালের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। এতে বক্তব্য দেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। এ ছাড়া দুই খুদে শিক্ষার্থী নাসিতাত জাইনাহ রহমান ও অনুমা চৌধুরীও বক্তব্য দেয়।

নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ড্রোন বানানোর গল্প শুনিয়ে অধ্যাপক জাফর ইকবাল বলেন, 'আমাদের ছেলে-মেয়েরা অনেক মেধাবী। কোনো কিছু করতে চাইলেই পারে। বাড়তি প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না। প্রস্তুতি না থাকলেও আমার ছেলে-মেয়েরা ড্রোন বানিয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। কোনো কিছু তৈরির চেষ্টা করলেই ব্যর্থ হয়নি।' তিনি বলেন, 'ই-মেইলে অনেকে আমার কাছে জানতে চায় আমাদের পিতা-মাতা বই পড়তে দেয় না। ফল ভালো করতে পাঠ্য বই পড়তে বলে। আমি তাদের বলব, লুকিয়ে লুকিয়ে বই পড়বে। শীতের দিনে কম্বলের নিচে টর্চ লাইট জ্বালিয়ে বই পড়বে। বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। ধরা পড়লে বলবা, জাফর ইকবাল স্যার পড়তে বলেছে। প্রগ্রাম বা কোডিং করতে হবে। এটাতে মাথা নষ্ট হবে না বরং চর্চা বাড়বে।' অবসরে কিংবা কাজের ফাঁকে তিনি প্রগ্রামিংয়ে কোডিং করতে পছন্দ করেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'কোনো কাজ করতে কিংবা লিখতে ভালো না লাগলে কোডিং করি। এটা করতে ভালো লাগে। মজা পাই। মস্তিষ্ক খাটিয়ে কোনো কাজ করতেই ভালো লাগে। কাজেই এই কোডিংয়ে কাজ করতে হবে, তবে পড়াশোনা ঠিক রেখেই।'

ফেসবুকের প্রসঙ্গ তুলে ধরে জাফর ইকবাল বলেন, 'ফেসবুক আমাদের তরুণ প্রজন্মের মাথা খেয়ে ফেলছে। যারা শুরুর দিকে ফেসবুক তৈরিতে যুক্ত ছিলেন তাঁরাও বলছেন এটি পৃথিবীর ছেলে-মেয়েদের নষ্ট করছে। আমি প্রযুক্তি ব্যবহার করব, তবে প্রযুক্তি যেন আমাকে ব্যবহার না করে। সামাজিক যোগাযোগে এর প্রয়োজনীয়তা আছে, তবে অযথা নয়। ফেসবুকে অযথা সময় নষ্ট না করে মস্তিষ্ক খাটিয়ে কোডিং করতে হবে। ঠিক কাজে এটাকে ব্যবহার করতে হবে। জিপিএ ৫ পেলে পিতা-মাতা খুশি হয়। তবে ভালো ফল করতে কোচিংয়ে যাবা না। গাইড বই পড়বা না। কোনো বিষয়ে বুঝতে না পারলে চার-পাঁচ বন্ধু একসঙ্গে বসে সমাধান করবা। সমাধান হয়ে যাবে। আর ফল ভালো করার পর প্রগ্রামিং করতে হবে।'

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, 'দিনটি কেবল শিশুদের। শিশুদের মানসে তথ্য-প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা দিতেই এই আয়োজন। দেশে এক লাখ ৭০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাড়ে চার কোটির বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এসব শিক্ষার্থী তথ্য-প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হলেই বিশ্বকে জয় করতে পারবে, আর দেশও এগিয়ে যাবে। এখন কেবল কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়ুয়া শিক্ষার্থীই তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে জানবে না, সব শিক্ষার্থী এই বিষয়ে জানতে পারবে। নতুন প্রজন্মই ভবিষ্যৎ দেশ গড়বে। কাজেই এই প্রজন্মের শিশুরা তথ্য-প্রযুক্তি সম্পর্কে জানলে সমৃদ্ধ দেশ গড়তে পারবে।'

আগ্রহ থাকলেও স্কুলে পরীক্ষার কারণে বুধবার যন্ত্রমানবী সোফিয়াকে দেখতে পারেনি ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রী নাসিতাত জাইনাহ রহমান। এখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়লেও তথ্য-প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় কয়েক বছর আগেই। মায়ের কাছ থেকে কম্পিউটার প্রগ্রামিং বা কোডিং দেখা থেকেই প্রযুক্তিতে হাতেখড়ি। পড়াশোনা ঠিক রেখে এখন অবসরে কোডিং করে সময় কাটায়। অলস সময় বা অযথা বসে না থেকে মস্তিষ্কের চর্চা অব্যাহত রাখে। নাসিতাত বলে, 'তথ্য-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্ব অনেক দূর এগিয়েছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে আমাদের আগামী প্রজন্মকে তথ্য-প্রযুক্তিতে যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে।'

গাজীপুরের কাশিমপুর থেকে বাবার সঙ্গে মেলায় এসেছে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিনহাজুল আবেদিন। কালের কণ্ঠ'র সঙ্গে আলাপচারিতায় সে বলে, 'তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে জানতে এই মেলায় এসেছি। শিক্ষণীয় অনেক কিছুই দেখলাম। তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখা সম্ভব।' নবম শ্রেণির ছাত্রী নুসরাত মেহজাবিন পোস্তগোলা থেকে মেলায় যোগ দিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্টলে আইকিউ পরীক্ষা দিতে লাইনে দাঁড়িয়েছিল। নুসরাত বলে, 'মেলায় অনেক কিছুই দেখলাম। প্রযুক্তির বিষয়ে আগ্রহের কারণে দেখতে এসেছি। অনেক বিষয় জানতে পারলাম।'


মন্তব্য