kalerkantho


গ্যালাক্সি নোট ৭ বিপর্যয় : স্যামসাং ব্যর্থ হতে পারে না

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৫ অক্টোবর, ২০১৬ ১৫:৫৬



গ্যালাক্সি নোট ৭ বিপর্যয় : স্যামসাং ব্যর্থ হতে পারে না

সম্প্রতি স্যামসাংয়ের সর্বশেষ স্মার্টফোনটি বিশ্ব বাজারে ছাড়ার পরপরই তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। পরিবার নিয়ন্ত্রিত কম্পানিটি যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় জর্জরিত তারই একটি লক্ষণ এই ঘটনা।

যার ফলে কম্পানিটি দলগতভাবে চিন্তা করায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং নব নব উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার এই কম্পানিটি ২০১৪ সালে ৩০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। এই আয় দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ২০ শতাংশের সমান। অথচ কম্পানিটি গত মাসের প্রথমদিকে বাজার থেকে এর স্মার্টফোন সিরিজের সর্বশেষ সংস্করণ গ্যালাক্সি ৭ প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছে। বাজারে ছাড়ার মাত্র এক সপ্তাহ পর হ্যান্ডসেটটির ব্যাটারিতে সমস্যা দেখা দেয়। এর ব্যাটারির অত্যধিক গরম হওয়া এবং বিস্ফোরণের মতো ঘটনাও ঘটে।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী শহর সিউলের পাশেই অবস্থিত দেশটির সরকার ও শিল্পখাতের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত স্টার্টআপ অ্যাকসিলারেটর জিসিসিইআই। প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান ডেভিড সেহইয়ন বায়েক বলেছেন, “স্যামসাং জানিয়েছে খদ্দেররা তাদের সমস্যাগ্রস্ত হ্যান্ডসেটের পরিবর্তে নতুন ব্যাটারি সম্বলিত নতুন মডেলের স্মার্টফোন চাচ্ছেন। অথচ আশঙ্কা করা হচ্ছে, সাফল্যের পর আত্মতুষ্টি তৈরি হওয়ায় স্যামসাংয়েরও নোকিয়া কিংবা সনির মতো বাজে পরিণতি মেনে নিতে হতে পারে।
স্যামসাং অবশ্য বলেছে, “যে কোনো কম্পানিরই দলগত চিন্তার ফাঁদে আটকে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ‘আমরা স্যামসাং, আমারা ব্যর্থ হব না। ’ আর এখানেই আপনারা সবসময় ভুলটা করা শুরু করেন। ”
স্যামসাংয়ের লোকবল ৪ লাখ ৫০ হাজার। আর এতে যে প্রতিভার সম্মিলন ঘটেছে তাতে গ্যালাক্সি ৭ এর মতো বিপর্যয় না ঘটাই যৌক্তিক ছিল। কিন্তু স্যামসাং তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
কিন্তু এমন বিপর্যয় ঘটার কারণ কী? এর একটি কারণ হয়তো তাদের লোকবলের বৈচিত্রহীনতা। অথবা এমনও হতে পারে তারা অতিবেশি দলগত চিন্তার ফাঁদে আটকা পড়েছে।
স্যামসাং এখন এর প্রতিষ্ঠাতা লি বিয়ুং-চুল এর পরিবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তার ছেলে লি কুন হি এখন কম্পানিটির চেয়ারম্যান। ২০১৪ সালে লি কুন হি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তার ছেলে লি জায়ে ইয়ং কম্পানিটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
চলতি বছর ব্লুমবার্গ পত্রিকা চলতি বছরের সেরা উদ্ভাবনী দেশের তালিকায় দক্ষিণ কোরিয়াকে শীর্ষে রেখেছিল। অথচ পরিবার নিয়ন্ত্রিত কম্পানিটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় জর্জরিত। যার ফলে কম্পানিটি এর উদ্ভাবনী ক্ষমতা হারিয়েছে।
কম্পানিটির সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া অতিবেশি উঁচুনিচু ভেদাভেদগ্রস্ত। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা স্বৈরতান্ত্রিক মনোভঙ্গি লালন করেন। তাদের মনোভঙ্গি অনেকটা এমন- আমি সিদ্ধান্ত দেব আর তোমরা শুধু তা অনুসরণ করবে। আমার যদি কোনো ভুল হয়, তাহলে তা নিয়ে কথা বলা যাবে না। এটা আমার সমস্যা নয়, তোমাদের সমস্যা। আর আমরা যদি সফল হই, তাহলে আমিই সবে করেছি। অর্থাৎ দলগত সাফল্য ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
এমন মনোভঙ্গির কারণে স্যামসাং ইতিমধ্যেই চীনের স্মার্টফোনের বাজারে সুনাম খুঁইয়েছে। চীনের বাজারে স্যামসাং স্থানীয় কম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। কয়েক বছর আগেও চীনের স্মার্টফোনের বাজারে শীর্ষস্থানটি স্যামসাংয়ের দখলে ছিল। অথচ চীনের বাজারে স্যামসাংয়ের অবস্থান এখন ছয় বা সাত নম্বরে নেমে এসেছে।
স্টার্টআপ অ্যাকসিলারেটর জিসিসিইআই মূলত ছোট ছোট প্রযুক্তি কম্পানিগুলোকে পরামর্শ এবং আর্থিক সহায়তা সেবা সরবরাহ করে থাকে। এর প্রধান উদ্দেশ্য বড় বড় কম্পানিশাসিত দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ব্যবসায় উদ্যোগের প্রসার ঘটানো। এবং বিদ্যমান কম্পানিগুলোর মধ্যেই উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রসার ঘটানো।
মি. বায়েক আরো বলেন, “ব্যক্তিমালিকানাধীন খাত কোনো কিছুরই উদ্ভাবনে আগ্রহী নয়। প্রাইভেট সেক্টর কিছুই করছে না। ফলে সরকারকেই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হচ্ছে। ”
“আমাদেরকে বড় বড় কম্পানিগুলোর মধ্যেও উদ্ভাবনের একটি উপায় খুঁজে বের করতে হবে। কারণ বড় বড় কম্পানিগুলো নিজেরা কিছুই উদ্ভাবন করছে না। ”
স্যামসাংয়ের আগে হুন্দাই এবং এলজির মতো পরিবার নিয়ন্ত্রিত বিশ্বখ্যাত কম্পানিগুলোও সংকটের আবর্তে পড়েছে। গত মাসে দক্ষিণ কোরিয়া ভিত্তিক বিশ্বের বৃহত্তম জাহাজ কম্পানি হানজিনও নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বড় বড় কম্পানিগুলোর আরেকটি লোট্টেও এখন দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত। অথচ এই কম্পানিগুলো দেশটির অর্থনীতির সিংহভাগ দখল করে রয়েছে।
সূত্র: দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ড


মন্তব্য