kalerkantho


পুঁজিবাজারে নির্বাচনী চাপ!

অস্থিতিশীলতার শঙ্কায় শেয়ার কেনার চেয়ে বিক্রি বেশি

রফিকুল ইসলাম   

১৬ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



পুঁজিবাজারে নির্বাচনী চাপ!

নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রির চাপ ততই বাড়ছে। সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের বিপরীতমুখী অবস্থান ‘শঙ্কা’ বাড়াচ্ছে পুঁজিবাজারে। এতে অনেকে শেয়ার বিক্রি করে মূলধন তুলে নিচ্ছে, যাতে তারল্য সংকটও দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ বলছে, একটি চক্র নির্বাচনকালীন শঙ্কার কথা কৌশলে ছড়িয়ে পুঁজিবাজারকে প্রভাবিত করছে। ডিএসইর তথ্যানুযায়ী, গত এক মাসে ডিএসইর বাজার মূলধন ও লেনদেন ব্যাপকহারেই কমেছে। শেয়ার বিক্রি করে মূলধন উঠিয়ে নেওয়ায় গত এক মাসে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে মূলধন বেরিয়েছে। আর মূলধন বাইরে চলে যাওয়ায় তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। যদিও পরে শেয়ার কেনার চাপ কিছুটা বাড়ায় মূলধন বাজারে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী নির্বাচনকে ঘিরে অস্থিরতার শঙ্কায় এমনটি ঘটছে। দেশে অস্থিরতা ঘটবে কি না সেটাও নিশ্চিত না, কিন্তু শঙ্কা থেকে শেয়ার বিক্রি করায় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ ও একাধিক কর্মসূচিতে অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও ভাটার টানের প্রভাব থেকেও বাদ পড়ে না পুঁজিবাজার। ব্যবসা ভালো না হওয়ায় বছর শেষে আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, যাতে বিনিয়োগকারী শেয়ার গ্রাহকরা কম লভ্যাংশ পায়।

সূত্র বলছে, নির্বাচনের সময় এলেই পুঁজিবাজারে অস্থিরতা বাড়ে, বড় অঙ্কের বিনিয়োগ বেরিয়ে যায়, যা পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক চরিত্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের কারণে পুঁজিবাজারে বড় প্রভাব পড়ার কথা নয় তবুও হুজুগে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে।

সূত্র জানায়, বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশই শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগ তুলছে। কয়েক মাস ধরেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি করেই চলেছে। এতে বাজার নিম্নমুখী হওয়ায় অস্থির হয়ে উঠেছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। তারাও অব্যাহতভাবে শেয়ার বিক্রি করছে।

জানা যায়, আইনি প্রক্রিয়া ও বাধা পেরিয়ে চীনকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে পেয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। চীনের শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ ২৫ শতাংশ শেয়ার কিনে মালিকানা পেয়েছে। কৌশলগত অংশীদার পেলে নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারে আসবে এমন প্রত্যাশা ছিল সংশ্লিষ্টদের। চীন স্টক এক্সচেঞ্জে মালিকানা বুঝে পেলেও পুঁজিবাজারের উন্নতির কোনো চিহ্ন পড়েনি। বরং উল্টো শেয়ার বিক্রির চাপে সূচক কমছেই, লেনদেনও নিম্নমুখী।

জানা যায়, পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ‘ভালো’ কম্পানির শেয়ারের জোগান আবশ্যক কিন্তু ভালো কম্পানির সংখ্যা খুবই কম। স্বল্প মূলধনের কম্পানিই বেশি। যেখানে বিদেশি কম্পানিগুলো দেশে ব্যবসা করলেও পুঁজিবাজারে আসছেই না। আর তাদের আনতেও সরকার কিংবা সংশ্লিষ্টদের দৃশ্যমান বড় কোনো উদ্যোগ নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের আগে দেশে ‘অস্থিতিশীলতায়’ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখা সম্ভব হয় না। নির্বাচনকালীন অস্থিরতা অহরহ ঘটনায় পরিণত হওয়ায় তারাও আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করছে। নির্বাচনের পর বাজার স্বাভাবিক হলে বিদেশিদের পদচারণা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া বাজার নিম্নমুখী হলে বিদেশিরা পুঁজিবাজারে আকৃষ্ট হয়।

মূল্যসূচক কমেছে : সেপ্টেম্বর মাসের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত পুঁজিবাজারে ২০ দিন লেনদেন হয়েছে। যার আট দিন মূল্যসূচক বেড়েছে আর ১২ দিন কমেছে। সূচক হ্রাস-বৃদ্ধির মধ্যে সেপ্টেম্বরে মূল্যসূচক কমেছে ২২১ পয়েন্ট। মাসের প্রথম কার্যদিবসে সূচক ছিল পাঁচ হাজার ৫৯০ পয়েন্ট। মাস শেষে সূচক দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৩৬৯ পয়েন্ট। একই সঙ্গে লেনদেন ও বাজার মূলধনও কমেছে।

সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা মূলধন বেরিয়েছে : বাজার মূলধন পর্যালোচনায় দেখা যায়, মাসের শুরুতে ডিএসইতে মূলধন ছিল তিন লাখ ৯৬ হাজার ৭৩৭ কোটি ৮০ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। মাসের শেষ দিন মূলধন দাঁড়ায় তিন লাখ ৮৭ হাজার ৩৫৬ কোটি ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। সেই হিসাবে এক মাসে ডিএসইর মূলধন কমেছে ৯ হাজার ৩৮১ কোটি ৪৬ লাখ ৩৮ টাকা।

কমেছে বিদেশি বিনিয়োগ : চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসের মধ্যে সাত মাসেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করছেন বেশি, যা কিনেছেন তার চেয়ে বেশি বিক্রিই করছেন। এতে দেখা যায়, গত আট মাসে শেয়ার কেনার চেয়ে বিদেশিরা ৩০২ কোটি ৯৮ লাখ টাকার শেয়ার বেশি বিক্রি করেছেন। এই সময়ে বিদেশিরা তিন হাজার ৩৯৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকার শেয়ার কিনেছেন কিন্তু বিক্রি করেছেন তিন হাজার ৬৯৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার। এতে পুঁজিবাজারে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ কমেছে।

সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসের হিসাব অনুযায়ী, বিক্রির চেয়ে বিদেশিরা শেয়ার কিনেছেন বেশি। এই সময়ে বিদেশিরা ২৪৭ কোটি ৫১ লাখ টাকার শেয়ার কিনেছেন, কিন্তু বিপরীতে বিক্রি করেছেন ২১২ কোটি ৩৪ লাখ টাকার। অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ৩৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আগস্ট মাসে বিদেশিরা ১৭৬ কোটি দুই লাখ টাকার শেয়ার কিনলেও বিক্রি করেছিলেন ১৮১ কোটি ৭৭ লাখ টাকার। এ হিসাবে আগস্ট মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ক্রয়ের চেয়ে পাঁচ কোটি ৭৫ লাখ টাকার শেয়ার বেশি বিক্রি করেছিলেন।

এক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগও আটকে : কৌশলগত অংশীদারের কাছে শেয়ার বিক্রির ব্রোকারদের প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আসেনি। ব্রোকারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পুরো অর্থই আগামী তিন বছর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে হবে, তবেই গেইন ট্যাক্স ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এই ঘোষণায় ব্রোকাররা বলেছিলেন, এই টাকা পুরোটাই পুঁজিবাজারে থাকবে। কিন্তু এখনো এসআরও জারি না হওয়ায় বাজারে আসছে না এই অর্থ, যা ডিএসইর অ্যাকাউন্টে জমা রয়েছে। সরকারের ট্যাক্স কেটে রেখে ব্রোকাররা এই অর্থ হাতে পেলেই নতুন করে বিনিয়োগ করবে বলে জানা গেছে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাক আহমেদ সাদেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচন এলে পুঁজিবাজারে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়, কিন্তু নির্বাচনে পুঁজিবাজারে তেমন প্রভাব পড়ার কথা নয়। তবুও বিনিয়োগকারীরা শঙ্কা থেকেই শেয়ার বিক্রি করেন।’

বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাজারে কিছুটা তারল্য সংকট রয়েছে। আবার নির্বাচনের প্রভাবও রয়েছে। নির্বাচনের আগে অস্থিতিশীলতার শঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা বাজারে ঢুকতে ভয় পাচ্ছে, যদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা স্বাভাবিক পরিস্থিতির অবনতি হয়।’

একটি ব্রোকার হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘একটা গোষ্ঠী দেশের পরিস্থিতি খারাপ বা অস্থিতিশীল হতে পারে এমন গুজব বাজারে ছড়াচ্ছে। তাদের লক্ষ্য বাজারটাকে প্রভাবিত করা। তারা নেতিবাচক কথা ছড়িয়ে শেয়ারের দাম কমিয়ে মুনাফা লুটতে চায়। আর সেই ফাঁদে পা দেয় বিনিয়োগকারী। অনেকে শেয়ার বিক্রি করে বাজার ছাড়ছে। সেটা কাম্য নয়, নির্বাচনের কারণে পুঁজিবাজারে বড় প্রভাব পড়বে না। এ জন্য জেনেশুনেই শেয়ার বিক্রির পরামর্শ দেন তিনি।



মন্তব্য