kalerkantho


২০ হাজার কোটি ডলার চীনা পণ্যে ট্রাম্পের শুল্ক

৬ হাজার কোটি ডলার মার্কিন পণ্যে চীনের পাল্টা শুল্ক

বাণিজ্য ডেস্ক   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



৬ হাজার কোটি ডলার মার্কিন পণ্যে চীনের পাল্টা শুল্ক

আবারও পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ করল যুক্তরাষ্ট্র-চীন। গত সোমবার নতুন করে চীনের ২০ হাজার কোটি ডলার পণ্যে শুল্ক আরোপ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর জবাবে গতকাল মঙ্গলবার চীনও যুক্তরাষ্ট্রের ছয় হাজার কোটি ডলার পণ্যে শুল্ক আরোপ করল। এতে বাণিজ্য আলোচনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করে চীন।

ট্রাম্পের এ ঘোষণার ফলে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক আমদানি পণ্যে শুল্ক বসল। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চীন পাল্টা ব্যবস্থা নিলে আরো ২৬৭ বিলিয়ন ডলার পণ্যে শুল্ক বসানো হবে। গত সোমবার এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেন, ‘কয়েক মাস ধরেই আমরা চীনকে তাদের অন্যায্য বাণিজ্য বদলানোর জন্য বলেছি এবং আমেরিকান কম্পানিগুলোর সঙ্গে যথাযথ আচরণ চেয়েছি; কিন্তু তারা তা বদলায়নি। ফলে চীনের এ আচরণ দীর্ঘ মেয়াদে আমেরিকার অর্থনীতির জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।’ তিনি বলেন, মনে হচ্ছে চীন তাদের অন্যায্য বাণিজ্য বন্ধ করতে আগ্রহী নয়, মেধাস্বত্ব চুরির কাজটিও।

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন শুল্ক কার্যকর হতে যাচ্ছে চীনের ওপর। এতে দেশটির মোট ২৫ হাজার কোটি ডলার পণ্যে আমেরিকান শুল্ক বসছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ২০ হাজার কোটি ডলার পণ্যে প্রাথমিক শুল্ক থাকবে ১০ শতাংশ, যা এ বছর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। আগামী বছর থেকে এ হার বেড়ে হবে ২৫ শতাংশ। ফলে মোট ২৫ হাজার কোটি ডলারের পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে চীনের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকাতে হবে।

এতে যেসব পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে চীনের তৈরি ভয়েস ডেটা রিসিভার, প্রিন্ডেট সিরকুট বোর্ড, কম্পিউটার মেমরি মডিউল, স্বয়ংক্রিয় ডেটা প্রসেসর এবং অফিসসজ্জার জন্য যন্ত্রাংশ। ভোক্তা পণ্যের মধ্যে রয়েছে চীনের সমুদ্রখাদ্য, আসবাব। লাইটিং পণ্যের মধ্যে রয়েছে টায়ার, কেমিক্যাল, প্লাস্টিক ও বাইসাইকেল।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের জবাবে গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, নিজেদের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় এবং বৈশ্বিক মুক্তবাণিজ্যের ধারা বজায় রাখতে চীন পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ছয় হাজার কোটি ডলার পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক বসবে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে। উড়োজাহাজ, সয়াবিন, কফি, মাংসসহ যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ হাজার পণ্য এর আওতায় পড়বে।

গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র লিন্ডসে ওয়াল্টার্স বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে চীনের অন্যায্য বাণিজ্যের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রাখবে। আমরা চীনকে উৎসাহিত করি তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ মেয়াদের উদ্বেগের বিষয়টি সুরাহা করে।’

নতুন শুল্ক আরোপ হলে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া অ্যাপল পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে কম্পানটি দাবি করেছিল। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক থেকে বাদ রাখা হয়েছে স্মার্টওয়াচ, ফিটবিট, বেবি কার সিটসহ বেশ কিছু ভোক্তা পণ্য। তবে ট্রাম্প প্রশাসন তৃতীয় দাপে সব পণ্যে শুল্ক আরোপ করলে তখন আইফোনসহ অ্যাপলের সব পণ্যে শুল্ক বসবে।

ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন থেকে বাণিজ্যিক ছাড় আদায়ের জন্য চাপ দিয়ে আসছেন। এ ছাড়া প্রতিবেশী কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো থেকে বড় অঙ্কের আমদানি পণ্যের ওপরও শুল্ক আরোপ করেছেন। এসব শুল্কহার ২৫ শতাংশ থেকে শতভাগ পর্যন্ত। এর প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপও শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে এক দেশের অন্য দেশের পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাড়তি অর্থ পরিশোধ করতে হবে। পাল্টাপাল্টি এ শুল্ক আরোপের অংশ হিসেবে চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলার ওপর বড় অঙ্কের শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।

পাল্টাপাল্টি এসব শুল্কে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ওপর কী প্রভাব পড়বে—এ বিষয়ে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর ফলে বাংলাদেশ আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে কিছু ক্ষেত্রে সুবিধা পেতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বল্প মেয়াদে কিছু সুবিধা পেলেও দীর্ঘ মেয়াদে বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার শিকার হতে পারে বাংলাদেশও।

এ প্রসঙ্গে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা ও ঢাকা চেম্বারের (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ‘এসব দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের তুলনায় তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য খুবই ছোট। তবে এর ফলে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য সুবিধা পেতে পারে। সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।’

অন্যদিকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলায় বাড়তি শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ক্রয়ে বাংলাদেশ কিছু সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে এ ধরনের বাণিজ্য যুদ্ধে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা অন্যরাও প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করবে। ফলে একের পর এক প্রতিরক্ষণ দেয়াল তৈরি হবে। এর সঙ্গে আরো নতুন নতুন দেশ যুক্ত হতে পারে। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতি শ্লথ হয়ে যাবে। চূড়ান্তভাবে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাতে আমাদের মতো দেশের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আশা করব, যুক্তরাষ্ট্র যেটা শুরু করেছে, সেখান থেকে ফিরে আসবে।’

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে বিশ্ববাণিজ্য ভালো অবস্থায় থাকলে আমাদের জন্য ভালো। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন যা করছে, তাতে সার্বিকভাবে বিশ্ববাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের জন্য ভালো কিছু দেখা যাচ্ছে না।’ এএফপি, রয়টার্স, গার্ডিয়ান।



মন্তব্য