kalerkantho


ভালো পণ্যই দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে জনপ্রিয় হয়

শরিফ রনি   

৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভালো পণ্যই দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে জনপ্রিয় হয়

অটোমোবাইলশিল্পে সফল ব্র্যান্ডের কথা বললে অনেকের হোন্ডার কথাই মনে পড়ে। বাংলাদেশেও মোটরসাইকেল বলতে কেউ কেউ ‘হোন্ডা’ বোঝেন। এমনকি অন্য ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলকেও গ্রামাঞ্চলের মানুষ ‘হোন্ডা’ বলে ডাকে। সোচিরো হোন্ডার গড়া জাপানের বহুজাতিক কম্পানি হোন্ডা মোটর আজ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই জাপানি প্রতিষ্ঠান ইন্টারব্র্যান্ডের জরিপে বিশ্বের শীর্ষ ব্র্যান্ডের তালিকায় ২০তম স্থানে রয়েছে। দিনে দিনে গড়ে ওঠা এই বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডের সাফল্যোর কাহিনি শুনিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ইভিপি অ্যান্ড করপোরেট ব্র্যান্ড অফিসার সেজি কুরাইশি। সম্প্রতি ব্র্যান্ড চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি হোন্ডার ব্যবসায়িক দর্শন, পণ্যের বাজার, পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া, গ্রাহক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন।

১৯৪৮ সালে সোচিরো হোন্ডা প্রতিষ্ঠা করেন হোন্ডা মোটর কম্পানি, যার মূলমন্ত্র ‘স্বপ্নের শক্তি’। শ্রম ও একনিষ্ঠতার বদৌলতে এই কম্পানিই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে বিশ্ববিখ্যাত হোন্ডা কম্পানি। ১৯৫৯ সাল  থেকেই বিশ্বের শীর্ষ মোটরসাইকেল নির্মাতার মুকুটটি হোন্ডার দখলে।

হোন্ডা জন্মলগ্ন থেকে উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে চলছে বলে জানালেন সেজি কুরাইশি। তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি অটোমোবাইল, মোটরসাইকেল এবং বিদ্যুত্চালিত পণ্য উৎপাদনে নিয়মিত নতুনত্ব যোগ করে জীবনযাপন সহজ করেছে। ১৯৪৮ সাল থেকে বিরামহীন পথচলায় প্রতিষ্ঠানটিকে নিতে হয়েছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে হোন্ডাজেট ও হোন্ডারোবটিকস সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে চলছে। সেই সঙ্গে করপোরেট দুনিয়ায় স্বমহিমায় গ্রাহক সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হচ্ছে।’

হোন্ডার ব্র্যান্ড ভ্যালু বিশ্বব্যাপী ব্যবসা সম্প্রসারণে কেমন প্রভাব ফেলছে—এমন প্রশ্নের জবাবে সেজি কুরাইশি বলেন, ‘হোন্ডার প্রধান শক্তি সহযোগীরা। তাঁরা হোন্ডাকে ভালোবেসে কাজ করেন। তাই গর্বিত হওয়ার মতো ব্র্যান্ডের নামে পরিণত হয়েছে হোন্ডা। তবে এই ব্র্যান্ডটির বিস্তারে গ্রাহকের ভূমিকাও কম নয়। তাঁদের মাধ্যমে হোন্ডা জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হোন্ডার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই একটি বিষয়ে গুরুত্ব দেন, তা হলো ভোক্তার সন্তুষ্টি। আমরা চাই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁদের সংযুক্ত করতে।’

তিনি আরো বলেন, ‘হোন্ডার ব্যবসায়িক দর্শনে হলো পারস্পরিক সম্মান। হোন্ডা বিশ্বাস করে, সংশ্লিষ্ট সহযোগী, যাঁরা পণ্য উৎপাদন, উন্নয়ন ও বিপণন করেন তাঁদের এবং ভোক্তার সঙ্গে আনন্দ-অনুপ্রেরণা শেয়ার করতে হবে। আমি ৩৬ বছরের কর্মজীবনে ২৬ বছর কাটিয়েছি বিভিন্ন দেশে। এ সময় হোন্ডার দর্শন অনুসরণ করে অনেক সুফল পেয়েছি। উদাহরণস্বরূপ, বিদেশি করপোরেশনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজ করা কঠিন। ভাষা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ আলাদা হওয়ায় স্বার্থগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তবে এগুলো মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছি পারস্পরিক স্বীকৃতি এবং সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে। এর ফলে আমি বুঝতে পেরেছি, দুনিয়াজুড়ে হোন্ডার দর্শন সর্বজনীন।’

২০০১ সালে হোন্ডার স্লোগান ‘দ্য পাওয়ার অব ড্রিমস’ বা স্বপ্নের শক্তি নির্ধারণ করা হয়। নতুন স্বপ্ন বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নিতে স্লোগানটি কম্পানির ট্যাগলাইন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ প্রসঙ্গে সেজি কুরাইশি বলেন, ‘স্লোগানটি একটি করপোরেট আবহ তুলে ধরে, যেখানে সবাই স্বপ্ন থেকে ক্ষমতায়িত হয় এবং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নিয়ে সেই স্বপ্ন সত্য করে। এটি হোন্ডা ব্র্যান্ডের আদর্শিক ভিত্তিও।’

বিশ্বব্যাপী হোন্ডার জনপ্রিয়তার কারণ সম্পর্কে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এর পেছনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। প্রথমত, হোন্ডার উৎপাদিত পণ্য গুণগত মানের এবং নির্ভরযোগ্য। আরো স্পষ্ট করে বললে, আমরা যে পণ্যটি তুলে ধরছি সারা দুনিয়ার গ্রাহকের জন্য, তাঁরা সেটা কিভাবে দেখছেন আমরা তা লক্ষ করি। ভালো পণ্যই নিজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গ্রহণযোগ্য হয়। আমাদের লক্ষ্য ১২০ শতাংশ গুণগত মানের পণ্য দেওয়া। কাঙ্ক্ষিত মান না পেলে পণ্য বাতিল করি। দ্বিতীয়ত, আমরা সর্বদা ভোক্তার প্রয়োজন ও প্রত্যাশা বিবেচনা করি। এ জন্য হোন্ডার সহযোগীরা বিভিন্ন দেশে কাজ করেন। এভাবে আমরা পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রয়ের প্রক্রিয়ায় নানা উদ্যোগ নিই। ফলে আমরা হোন্ডার ব্র্যান্ড মূল্য আরো বাড়াতে চাই এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে এগিয়ে যেতে চাই।’

হোন্ডা পণ্য উৎপাদন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে পরিবেশ ও নিরাপত্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বলে জানালেন সেজি কুরাইশি। তিনি বলেন, ‘অন্য যেকোনো কম্পানির তুলনায় হোন্ডার কারখানা অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব। আমরা পণ্যের নিরাপত্তায়ও বিশেষ গুরুত্ব দিই। আমরা শুধু মোটরসাইকেল বা গাড়ির ড্রাইভারের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত নই। কারণ রাস্তায় আরো অনেক মানুষ চলাচল করে। তাদেরও নিরাপত্তা নিয়ে ভাবি। ১৯৬০ সাল থেকে হোন্ডা যানবাহনের নিরাপত্তা ইস্যুতে নানা উদ্যেগ নিচ্ছে, যা দুনিয়াব্যাপী চলছে। আমরা পণ্যের নিরাপত্তায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসছি, যেমন—ড্রাইভারদের জন্য এআরএস এয়ারব্যাগ সিস্টেম।’

কম্পানির নতুন উদ্যোগ সম্পর্কে কুরাইশি বলেন, ‘আমরা বিশ্বের অগ্রযাত্রায় রোবটিকস নিয়ে গবেষণা করছি। হোন্ডাজেট বিজনেসও সম্প্রসারিত হচ্ছে। হোন্ডা সব সময় পণ্য বহুমুখীকরণের চেষ্টা চালিয়ে যায়। এর মধ্যে আছে অটোমোবাইলস, মোটরসাইকেল ও বিদ্যুত্চালিত পণ্য (ওয়াটার পাম্প ও স্ট্রিং ট্রিমার)।


মন্তব্য