kalerkantho


বগুড়ায় হাত বদলেই দ্বিগুণ বাড়ে সবজির দাম

লিমন বাসার, বগুড়া   

১৭ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বগুড়ায় হাত বদলেই দ্বিগুণ বাড়ে সবজির দাম

সবজির পাইকারি বাজার মহাস্থানহাটে বিক্রির জন্য রাখা ফুলকপি

সবজির পাইকারি বাজার মহাস্থানহাটে এখন প্রতি কেজি ফুলকপি বিক্রি করে কৃষকরা পাচ্ছে ৩৫ টাকা (প্রতি মণ এক হাজার ৪০০ টাকা)। অথচ সেখান থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারে সাধারণ ক্রেতাদের প্রতি কেজি ফুলকপি কিনতে হয় ৭০ টাকায়।

শহরের বকশীবাজার ও কলোনি বাজারে তো দাম আরো ১০ টাকা বেশি।

একইভাবে মহাস্থানহাটে কৃষকরা যেখানে এক কেজি বেগুন বিক্রি করে ২৭ টাকা ৫০ পয়সা (প্রতি মণ এক হাজার ১০০ টাকা) দরে, সেখানে তা জেলা শহরের বড় তিনটি কাঁচাবাজারে এক লাফে উঠে যায় ৬০ থেকে ৭০ টাকায়।

সম্প্রতি সরেজমিন খোঁজ নিয়ে পাইকারি মোকাম থেকে খুচরা বাজারে শীতকালীন অন্যান্য সবজির দামেও বড় পার্থক্যের চিত্রই মিলেছে। সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজার ভরা সবজি থাকলেও মাসখানেক ধরে দামটা একেবারেই নাগালের বাইরে। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছে, এবার অন্য সময়ের চেয়ে বৃষ্টি হয়েছে অনেক বেশি। এ কারণে কৃষকের ক্ষেতে সবজি নষ্ট হওয়ায় সরবরাহ কমেছে, তাই বিক্রি করছে বেশি দামে।

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর গ্রামের কৃষক আবুল ফজল জানান, মহাস্থানহাটে ৭০০ টাকা মণ দরে মুলা বেচে এসেছেন। তাঁর এই মুলা কিনে বগুড়ায় নিয়ে ব্যাপারীরা দ্বিগুণ দামে বিক্রি করছে।

শিবগঞ্জ উপজেলার চণ্ডিহারা গ্রামের কৃষক লুৎফর রহমান বলেন, তিনি মহাস্থানহাটে সোয়া মণ করলা এনে প্রতি মণ এক হাজার টাকা দরে এবং একই গ্রামের নুর আলম ৩৫ টাকা কেজি দরে আড়াই মণ ফুলকপি ও ২২ টাকা কেজিতে দেড় মণ বাঁধাকপি বিক্রি করেছেন।

নাজিরপুর গ্রামের কৃষক আবু তাহের দুই মণ চিচিঙ্গা এনে প্রতি মণ এক হাজার ১০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন।

পাইকারি বাজার মহাস্থানহাটে প্রতি কেজি ফুলকপি ৩৫ টাকা, বাঁধাকপি ১৮ টাকা, হাইব্রিড মুলা সাড়ে ১৭ টাকা, লম্বা বেগুন ৩০ টাকা, গোল বেগুন ৪০ টাকা, শসা ২২ টাকা, পটল ৩২ টাকা, করলা ৩৫ টাকা, কাঁচা মরিচ ৮০ টাকা, পেঁপে ১২ টাকা, বরবটি ৩০ টাকা, চিচিঙ্গা ২৮ টাকা, কচুর মুখী ২০ টাকা এবং প্রতিটি জালি কুমড়া ২৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

খুচরা বাজার শহরের ফতেহ আলীতে প্রতি কেজি লম্বা বেগুন ৬০, গোল বেগুন ৮০, কাঁচা মরিচ ১২০, কচুর মুখী ৪০, মিষ্টি কুমড়া ৪০, ওলকচু ৪০, ফুলকপি ৬০, বাঁধাকপি ৪০, করলা ৮০, পটল ৪০, শিম ১৪০, ঝিঙে ৪৮, ঢেঁড়স ৬০, বরবটি ৮০, পেঁপে ৩০, কাঁকরোল ৫০ এবং দেশি শসা ৬০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। শহরের বকশীবাজার ও কলোনি বাজারে সবজির দাম আরো বেশি।

এ প্রসঙ্গে বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক প্রতুল চন্দ্র সরকার বলেন, বৃষ্টি হলেও তাতে শীতকালীন আগাম সবজির (রবিশস্য) কোনো ক্ষতি হয়নি। বাজারেও সবজির কোনো ঘাটতি নেই। গোটা জেলায় এবার তিন হাজার হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজির চাষ হয়েছে। দাম বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

মহাস্থানহাট কাঁচা-পাকা মাল আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, সারা বছরই মহাস্থানহাট বাজারের চেয়ে বগুড়া শহরের বাজারগুলোয় দ্বিগুণ দামে সবজি বিক্রি হয়। মহাস্থানহাট থেকে বগুড়া শহর পর্যন্ত ১২ কিলোমিটারে প্রতি কেজি সবজি পরিবহনে সর্বোচ্চ এক টাকা খরচ হয়। এর সঙ্গে খুচরা বিক্রেতাদের অন্যান্য খরচ ও লাভের হিসাব যোগ করলেও প্রতি কেজিতে দামের পার্থক্য ১০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। অথচ সেখানকার পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা যোগসাজশ করে প্রতি কেজিতে দ্বিগুণ মুনাফা লুটছে। সরকারিভাবে সবজির বাজার তদারকি না থাকায় এমন হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের জেলা বিপণন কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, ব্যবসায়ী পর্যায়ে যেকোনো কৃষিপণ্য ২৫ শতাংশের বেশি লাভে বিক্রি করার সুযোগ নেই। কিন্তু ফতেহ আলী বাজারের ব্যবসায়ীরা যুক্তি দেখায়, তারা কৃষকের কাছ থেকে বাছাই করা পণ্য কিনে বেশি দামে বিক্রি করে। এ জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।

বছরে ১০ কোটি টাকার সবজি নষ্ট : মাঠপর্যায়ের কৃষকদের মতে, যদি তাদের উৎপাদিত এসব সবজি মৌসুমে সংরক্ষণ করে রাখা যেত, তাহলে অন্য মৌসুমে ভালো দামে সেগুলো বাজারজাত করা যেত। আর ভোক্তাও ন্যায্য মূল্যে সব রকমের সবজি পেত সারা বছর। কৃষি বিভাগের মতে, উত্তরাঞ্চলে মৌসুমে শুধু সংরক্ষণের অভাবে পচে নষ্ট হয়ে যায় প্রায় ১০ কোটি টাকার সবজি। আবার অতিরিক্ত ফলনের কারণে প্রচুর সরবরাহ থাকায় কৃষকও উপযুক্ত বাজারমূল্য পায় না। সস্তায় বিক্রি করতে হয় সেসব সবজি। বগুড়া চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আমজাদ হোসেন তাজমা উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের এই দুরবস্থার কথা চিন্তা করে ১০ বছর আগে কাহালু এলাকায় চালু করেছিলেন বিশেষায়িত হিমাগার অ্যাগ্রোফ্রেশ। চালুর পর সবজি চাষিরা ভর বছর সংরক্ষণ করেছে তাদের সবজি। কিন্তু ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণে দুই বছর পরেই বন্ধ হয়ে গেছে সেই সংরক্ষণাগার।


মন্তব্য