kalerkantho


ভোটের অঙ্কে অন্ধকারে দুই স্থলবন্দর

আরিফুর রহমান ও মানিক আকবর   

১৬ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ভোটের অঙ্কে অন্ধকারে দুই স্থলবন্দর

ভারত থেকে পণ্য আমদানি সহজ করার পাশাপাশি খরচ কমাতে চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় একটি স্থলবন্দরের ঘোষণা দেওয়া হয় ২০০২ সালে। কিন্তু এক যুগের বেশি সময় পরও তা ঘোষণার মধ্যেই পড়ে আছে।

এই সময়ে বাংলাদেশ ও ভারত অংশে সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে কোনো কাজ হয়নি। দামুড়হুদার পাশের উপজেলা জীবননগরের দৌলতগঞ্জ স্থলবন্দরের ঘোষণা আসে ২০১৩ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে। ঘোষণার চার বছর পেরোলেও প্রস্তাবিত স্থলবন্দরের দুই অংশে এখনো অবকাঠামো উন্নয়নকাজ শুরু হয়নি। দুটি স্থলবন্দরই স্থবির হয়ে পড়ে আছে। ফলে এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের এখনো বেনাপোল দিয়েই পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। এতে পণ্য আমদানিতে বেশি খরচ পড়ছে, সময়ও বেশি লাগছে।

সরেজমিন স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোটের অঙ্কের কারণে জট খুলছে না প্রস্তাবিত দুই স্থলবন্দরে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি এক বছরের বেশি কিছু সময়। দামুড়হুদা ও জীবননগর এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য আলী আজগর টগর।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভোট হারানোর ভয়ে দর্শনায় স্থলবন্দর হবে নাকি দৌলতগঞ্জে স্থলবন্দর হবে, সেটি নিয়ে কোনো ভূমিকা রাখছেন না সংসদ সদস্য। দুই উপজেলার ভোট দরকার তাঁর। তিনি যদি দর্শনার পক্ষে কথা বলেন, তাহলে জীবননগরের ভোট হারাতে পারেন। আবার জীবননগরের পক্ষে কথা বললে দামুড়হুদার ভোট হারাতে পারেন। ভোটের এমন কঠিন বাস্তবতায় স্থলবন্দরের কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।

অবশ্য চুয়াডাঙ্গা-২ (দামুড়হুদা-জীবননগর) আসনের সংসদ সদস্য আলী আজগর টগর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি চাই দর্শনাতে একটি স্থলবন্দর হোক, দৌলতগঞ্জেও হোক। দুটিই ব্যবসায়ীদের জন্য জরুরি। ’

একটি জেলায় দুটি স্থলবন্দর কতটুকু যৌক্তিক হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে আলী আজগর টগর আরো বলেন, ‘সেটি দেখার বিষয় সরকার এবং স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের। আমার দেখার বিষয় নয়। তবে দর্শনায় যেহেতু এখন একটি স্থল শুল্ক স্টেশন আছে, তাই সেখানে স্থলবন্দর না করে দৌলতগঞ্জে করা যেতে পারে। দর্শনায় একটি কনটেইনার বোর্ড করা যেতে পারে। ’

দর্শনা ও দৌলতগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, দর্শনায় যেহেতু বিএনপি সরকারের আমলে স্থলবন্দরের ঘোষণা এসেছিল, তাই বর্তমান সরকার সেখানে স্থলবন্দরের জন্য অবকাঠামো উন্নয়নে আগ্রহী নয়। এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মাতলুব আহমাদও দৌলতগঞ্জে স্থলবন্দরের পক্ষে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে জানা গেছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান দৌলতগঞ্জে গিয়ে সেখানে স্থলবন্দরের ঘোষণা দিয়ে আসেন।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দর্শনায় স্থলবন্দর করার বিষয়ে ভারতের আগ্রহ কম। দেশটির নজর দৌলতগঞ্জ স্থলবন্দরের দিকে। স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল হক কালের কণ্ঠকে জানান, বাংলাদেশের দৌলতগঞ্জ ও ভারতের মাজদিয়ার মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা দর্শনা ও গেদের তুলনায় অনেক ভালো। তা ছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দৌলতগঞ্জে আগে শুল্ক স্টেশন ছিল। স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দর্শনায় এখন একটি স্থল শুল্ক স্টেশন আছে। সেখান দিয়ে ভারতের গেদে হয়ে রেলযোগে পণ্য বাংলাদেশের দর্শনায় ঢুকে। সব কার্যক্রমই চলে সেখানে; শুধু স্থলবন্দর নেই। কিন্তু দৌলতগঞ্জে কিছুই নেই। এ বিষয়ে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান তপন কুমার চক্রবর্তী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দৌলতগঞ্জ ও দর্শনা দুই জায়গাতে স্থলবন্দরের বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা আছে। দুই উপজেলার কারো হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ’

তবে দামুড়হুদা উপজেলার এক ব্যবসায়ী জানালেন, দৌলতগঞ্জে স্থলবন্দর করতে গেলে দুই অংশেই অনেক মানুষকে উচ্ছেদ করতে হবে তাদের জায়গা থেকে। জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। তা ছাড়া বাংলাদেশ অংশে ভবন নির্মাণ, কাস্টমস, পুলিশ ফাঁড়িসহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। যাতে বিশাল পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। কিন্তু এত অর্থ সরকার দেবে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন ওই ব্যবসায়ী। অবশ্য দর্শনা নাকি দৌলতগঞ্জ, কোথায় স্থলবন্দর হবে তা দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের ওপরই নির্ভর করবে বলে অভিমত স্থানীয়দের।

চুয়াডাঙ্গায় কেন স্থলবন্দর জরুরি তা জানতে চাইলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে, এখন যশোরের বেনাপোল থেকে ঢাকায় যেতে যে সময় লাগে, চুয়াডাঙ্গায় স্থলবন্দর হলে সময় দুই থেকে তিন ঘণ্টা কমে আসবে। চুয়াডাঙ্গায় স্থলবন্দর হলে ভারতের কলকাতার সঙ্গে ঢাকার দূরত্ব কমবে ৮০ কিলোমিটারের মতো। এতে করে ব্যবসায়ীদের পণ্য আমদানি সহজ হবে। একই সঙ্গে পণ্য আমদানি করতে এখন যে পরিমাণ ভাড়া লাগে, সেটিও কমে আসবে। পথে পথে সময় অপচয় ও পণ্য আনা-নেওয়াতে হয়রানিও কমবে।

এদিকে স্থলবন্দর বাস্তবায়নের দাবিতে দুই উপজেলাতে ‘বন্দর বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠিত হয়েছে। কমিটি তাদের মতো করে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তদবির করছে। কেউ কেউ ভারতে গিয়েও যোগাযোগ করছে যার যার এলাকায় স্থলবন্দর করতে। দর্শনা বন্দর বাস্তবায়ন কমিটির পক্ষে যুক্তি হলো, ১৯৬২ সাল থেকে সেখানে রেলওয়ে ওয়াগনের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়ে এখনো চলছে। সেখানে কাস্টমস ও আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট রয়েছে। মৈত্রী ট্রেনও চলছে এই রুটে। এখন শুধু সড়কপথে আমদানির ব্যবস্থা করলে পণ্য আমদানি আরো সহজ হবে। নতুন নতুন কর্মসংস্থান হবে। ভারতের অংশে ৮০০ মিটার আর বাংলাদেশ অংশে ৩০০ মিটার রাস্তা করতে পারলেই বাংলাদেশের দর্শনা ও ভারতের গেদে সীমান্ত দিয়ে ট্রাকযোগে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা যাবে। আর দৌলতগঞ্জ বাস্তবায়ন কমিটির যুক্তি হলো, আগেই সেখানে শুল্ক স্টেশন ছিল। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থাও ভালো।

এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দর্শনা ও দৌলতগঞ্জ দুই জায়গায় স্থলবন্দর জরুরি। এতে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবে। তবে স্থলবন্দর বাস্তবায়ন করতে হলে সবার মধ্যে সমন্বয় জরুরি। এককভাবে স্থলবন্দর হবে না। সবার সহযোগিতা নিয়ে এগোলে কাজটা সহজ হবে। ’

দর্শনা স্থল শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা জে এম আলী আহসান জানালেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তাদের ৯ কোটি টাকা বেশি আদায় হয়েছে। ওই বছর তাদের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬০ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৬৯ কোটি টাকা। এর আগের বছর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪ কোটি টাকা। আদায় হয়েছিল ৫৭ কোটি টাকা। তিনি জানান, দর্শনা স্থল শুল্ক স্টেশন দিয়ে এখন বোল্ডার স্টোন আমদানি হচ্ছে। যা পদ্মা সেতুতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া স্টোন চিপস বা ছোট পাথর, ফ্লাই অ্যাশ, সয়াবিন, ভুসি, খৈল ও চাল আমদানি হচ্ছে।

প্রস্তাবিত দৌলতগঞ্জ স্থলবন্দর সরেজমিন দেখা গেছে, বাংলাদেশ অংশে ছোট ছোট কিছু অবকাঠামো নির্মাণকাজ হলেও ভারত অংশে কোনো কাজই শুরু হয়নি। স্থানীয়রা জানায়, ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে চুয়াডাঙ্গার দৌলতগঞ্জ ও ভারতের মাজদিয়া পয়েন্টে শুল্কবন্দর স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকার বন্দরটি বন্ধ করে দেয়। এরপর দুই দফায় ১৯৭২ ও ১৯৯৪ সালে বন্দরটি পুনরায় চালু হলেও পরে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।


মন্তব্য