kalerkantho

সুড়ঙ্গ

শাহ্‌নাজ মুন্নী

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সুড়ঙ্গ

বড়রা মনে করে, তারা নিজেরাই শুধু সব বোঝে, আর ছোটরা বুঝি কিছুই বোঝে না। এটা যে তাদের কত বড় ভুল, সেটা আমার মতো যারা ছোট মানুষ, যাদের বয়স দশ, এগারো অথবা বারো, তারা সবাই খুব ভালো করে জানি।

কিন্তু কিছু বলি না। বলে কী হবে? কিছু বললে বড়রা চোখ বড় বড় করে বলবে—দেখেছ, কেমন ইঁচড়েপাকা!

তার চেয়ে এই ভালো, কিছুই যেন বুঝি না—এমন ভাব করে বড়দের আশপাশে ঘুরঘুর করা। ওরা নিজেদের মধ্যে অনেক গোপন কথা বলাবলি করে, আমি চুপচাপ সেসব শুনে যাই, আর এমন ভাব করি, যেন কিছুই শুনিনি, কিছুই বুঝিনি। যেমন এখন বড়দের কথাবার্তা শুনে আমি বেশ বুঝতে পারছি, সবাই খুব চিন্তিত। ইয়াহিয়া খান নামের একজনের কথা বলছে বড়রা, আর বলছে শেখ মুজিবুর রহমান নামের কারো কথা। কিছুদিন আগে এখানে ভোট হয়েছে। বড়রা সবাই নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছে। সেসব আমি জানি। কতবার বড়দের সঙ্গে আমিও মিছিলে গেছি।

বলেছি—নৌকা, নৌকা। কিন্তু এখন শুনছি, যারা ভোটে জিতে গেছে, তাদের নাকি মানা হচ্ছে না। এসব নিয়ে সবাই খুব চিন্তায় আছে।

বিকেলবেলা মাঠে আমি বন্ধুদের সঙ্গে মিলে সাতচাড়া খেলি, মাঠে দাগ কেটে কাবাডি, নয়তো ডাংগুলি খেলি। আর বড়দের কাছ থেকে শোনা কথাগুলো নিয়ে ভাবি। বেশ বড় একটা গোলমাল হবে বলে মনে করছে বড়রা। আমার বাবা অফিস থেকে ফিরে সন্ধ্যায় রেডিও ছেড়ে গম্ভীর হয়ে খবর শোনেন। আগে যখন মা, বড় আপা আর আমি সিনেমার গান নয়তো নাটক শুনে রেডিওর ব্যাটারি ফুরিয়ে ফেলতাম। তখন বাবাকে বলে বলে রেডিওর ব্যাটারি আনাতে পারতাম না। এখন ব্যাটারি ফুরিয়ে গেলে বাবা বাজার থেকে তাড়াতাড়ি নতুন ব্যাটারি কিনে আনেন। আমি হারিকেনের আলোয় পড়ার বইটা সামনে মেলে রেখে কান খাড়া করে রেডিওর খবর শুনি। ইয়াহিয়া আর শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে নাকি আলোচনা হবে। বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন—এতে কি আর ঝামেলা মিটবে? আমার তখন খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করে—কী হলে ঝামেলা মিটবে, বাবা? কিন্তু জিজ্ঞেস করি না। করলে তো আর উত্তর পাব না।

পরদিন আমার পাড়ার বন্ধু নয়নকে আমি বড়দের ভাব নকল করে বলি—দেশের কী অবস্থা রে?

নয়ন ঠোঁট উল্টে বলে—অবস্থা কেরাসিন। চল, তোরে একটা জিনিস দেখাই।

আমি আবার একটু ভাব নিয়ে বলি—শোন, এত দিন আমরা স্কুলে পড়েছি, আমাদের দেশের নাম পাকিস্তান। এবার থেকে দেশের নাম হবে বাংলাদেশ। জয় বাংলা। বুঝলি।

এসব কথায় নয়নের কোনো ভাবান্তর হয় না। সে বলে—একটা পুরনো সুড়ঙ্গ খুঁজে পাইছি, দেখবি তো চল...

বলেই ভোঁ-দৌড়। আমিও ওর পেছন পেছন দৌড়াই। নয়ন একটা ফাঁকা মাঠ পেরিয়ে নদীর পাড় ধরে, হালট ভেঙে দৌড় দেয়। দৌড়াতে দৌড়াতে চষা ক্ষেতের বড় বড় মাটির ঢেলায় ঘষা লেগে আমার পায়ের চামড়া ছড়ে যাচ্ছিল, তবু নয়ন থামছিল না। যখন আমি ছুটতে ছুটতে একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, তখন ও থামল গ্রামের প্রায় শেষ মাথায় বহুদিনের পুরনো একটা ভাঙা দালানের সামনে। আমরা একে বলি বিক্রম রাজার বাড়ি। এখন এই বাড়িতে কেউ থাকে না। বাড়ি ভর্তি ঘন ঝোপ, ঝোপ ভর্তি বিষকাঁটালি আর নাম-না-জানা আরো অনেক রকম আগাছা। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে প্রায়। আমার কেমন ভয়-ভয় লাগে। নয়ন ভাঙা বাড়ির উঠানের মতো জায়গাটার এক কোনায় দুই হাতে ঝোপঝাড় সরিয়ে একটা আংটা লাগানো লোহার চাকতির মতো কিছু একটা বের করে। তারপর আংটাটা ধরে টান দেয়। আমি দেখি, চাকতি সরে গিয়ে একটা বড়সড় গর্তের মুখ বেরিয়ে এসেছে। গর্তের ভেতরটা অন্ধকার।

—নামবি?

নয়ন আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে। আমার ভয় লাগে। বলি—নারে, আজকে না। ভেতরে কী অন্ধকার, দেখ!

—মোমবাতি আছে, ম্যাচও আছে, অন্ধকার লাগবে না। চল নামি, একটা মজা দেখতে পাবি।

বলেই নয়ন তার প্যান্টের পকেট থেকে দুটি মোমবাতি বের করে আনে। ফস করে দেশলাই জ্বালায়। আমার হাতে একটা মোম ধরিয়ে দিয়ে ও নেমে পড়ে গর্তে। উপায় না দেখে ওর পেছন পেছন আমিও নেমে যাই। দেখি গর্তের ভেতরে সিঁড়ির মতো ধাপ কাটা আছে। নয়ন আগে আগে এগিয়ে যায়, ওর পেছনে আমি ভয়ে ভয়ে পা টিপে এগোই। কোনো রকমে একজন মানুষ হাঁটতে পারে—এমন চাপা সুড়ঙ্গটা। হঠাৎ মনে হয় পায়ের ওপর দিয়ে সরসর করে কী যেন একটা চলে যায়! সাপ নাকি? কানের কাছে কী যেন ডানা ঝাপটায়! বাদুড়? অন্ধকারে বুঝতে পারি না।

নয়ন বলে—এই সবুজ, শোন, যখন দেশে পাঞ্জাবিরা আসবে আর একটা গোলমাল বেধে যাবে, তখন আমরা এখানে লুকিয়ে থাকব।

গুহার ভেতর ওর কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। যেন কেউ ওর সঙ্গে সঙ্গে বলে—লুকিয়ে থাকব...থাকব...থাকব...

এগুলো কি আসলেই প্রতিধ্বনি, না প্রেতাত্মা? হয়তো বিক্রম রাজার মৃত আত্মীয়স্বজন ওরা। কে জানে? আমাদের সঙ্গে সঙ্গে কি তাহলে ওরাও হেঁটে আসছে? মওকামতো পেলে ঘাড় মটকে দেবে? রক্ত চুষে খাবে?

সামনে থেকে নয়ন বলে—কি রে, ভয় লাগছে? ওর সঙ্গে সঙ্গে যেন আরো অনেকে বলে—ভয় লাগছে...লাগছে...লাগছে...এ...এ...এ?

আমার হঠাৎ কেমন দমবন্ধ লাগে। মনে হয়, বুঝি এক্ষুনি দম আটকে মরে যাব। নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য মনে হচ্ছে একফোঁটা বাতাসও পাচ্ছি না। হয়তো এই গর্তের ভেতরেই মরে পড়ে থাকব, বাড়ির কেউ কোনো দিন আমাকে খুঁজেও পাবে না। এসব ভাবতে গিয়ে ভয়ের চোটে অস্থির হয়ে যখন আমার মনে হলো, এক্ষুনি বুঝি মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছি, তখনই হঠাৎ ঠাণ্ডা বাতাসের একটা ঝাপটা এসে চোখেমুখে লাগল।

—এই দেখ, এসে গেছি।

নয়ন বলে। গর্তের এপাশে বের হওয়ার মুখটাও ঝোপঝাড়ে ঢেকে আছে। নয়ন হাত দিয়ে ঝোপ সরিয়ে বের হয়ে আসে। ওর পেছন পেছন আমিও। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিই। জায়গাটা নদীর পারে, একদম বড় ব্রিজটার পাশে। নয়নের মুখে যুদ্ধজয়ের হাসি। ও ঝোপ টেনে আবার গর্তের মুখটা লুকিয়ে ফেলে।

আমি বাড়ির পথে রওনা দিই। ঘরে ঢুকতেই মায়ের মুখোমুখি। মা ঘরে বাতি দিচ্ছিলেন। আমার দিকে তাকিয়েই এক চিত্কার দিলেন—একি অবস্থা তোর! কই ছিলি? সারা গায়ে মাটি, কালিঝুলি।

—মনে হচ্ছে খনি শ্রমিক। মাটির তলে কাজ করে এসেছে।

আমার নাইনে পড়া বড় বোন পেছন থেকে নাকি-নাকি গলায় বলে। মা বলে—যা, এক্ষুনি পুকুরে যা। গোসল করে পরিষ্কার হয়ে আয়।

আমি আর কিছু বলি না। চুপচাপ গোসল করতে চলে যাই। কারণ ওদের তো আর গোপন সুড়ঙ্গের কথা বলা যাবে না।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, বাবার চোখ লাল, মার মুখও থমথমে! একটু পর পর আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছছেন।

বড় আপা ফিসফিস করে বলল—জানিস, কালকে রাতে ঢাকায় মিলিটারিরা আক্রমণ করেছে, গুলি করে অনেক মানুষ মেরে ফেলেছে। ছাত্রদেরও মেরেছে। ছোট মামার কথা মনে করে মা অনেক কান্নাকাটি করেছেন।

আমার তখন মনে পড়ল আমাদের ছোট মামা ঢাকায় থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ইকবাল হলে থাকে। ছোট মামার জন্য আমারও মনটা কেমন কেমন করতে থাকল।

একটু পরে মনু কাকা এসে খবর দিল, নদী পার হয়ে ঢাকা থেকে নাকি হাজার হাজার লোক গ্রামের দিকে আসছে। বড়দের পেছন পেছন আমরা ছোটরাও দৌড়ে গেলাম ঘাটের দিকে। গিয়ে দেখি অনেক মানুষ। আমাদের মতো বাচ্চারাও আছে। বড়রাও আছে। সবাই যেন খুব ভয় পেয়েছে—এমন চেহারা। —ঢাকা ওরা পুড়িয়ে দিয়েছে, সামনে যাকে পেয়েছে, তাকেই গুলি করে মেরেছে। ওরা বলাবলি করছিল। এর মধ্যে কয়েকজন আমাদের কাছে পানি চাইলে আমরা দৌড়ে গিয়ে বাড়ি থেকে জগ ভর্তি পানি নিয়ে আসি। মনু কাকা বালতি ভর্তি দুধ নিয়ে আসে ছোট ছোট বাচ্চাদের খাওয়ানোর জন্য।

নয়ন ওদের বাড়ি থেকে ব্যাগ ভরে চিঁড়া-মুড়ি নিয়ে আসে পালাতে থাকা ক্লান্ত মানুষগুলোর জন্য।

আমাদের সমান বয়সী একটা মেয়ে দেখি হাঁটু ভেঙে ঘাটেই বসে পড়েছে। ওর পা কেটে গেছে, তাই আর হাঁটতে পারছে না। মেয়েটার মায়ের কোলে ওর ছোট ভাই। সঙ্গে আর কেউ নেই। আমি দৌড়ে গিয়ে বাড়ি থেকে তুলা আর ডেটল নিয়ে আসি। তারপর নয়ন আর আমি মিলে মেয়েটার পা ব্যান্ডেজ করে দিই। ওর মা আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে আবার চলতে শুরু করেন। মেয়েটাও ওর মায়ের পাশে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে দূরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর আর ওদের দেখা যায় না। মেয়েটার জন্য খুব মায়া লাগে আমার। নয়নেরও দেখি আমার মতোই অবস্থা।

—বড় হয়ে ওই মেয়েটাকে খুঁজে বের করে বিয়ে করব আমি, দেখিস।

নয়ন বলে।

নয়নটার একটুও লজ্জা নেই। বুদ্ধিও মনে হয় কম। চারদিকে কী ভয়ানক অবস্থা, আর ও কিনা ভাবছে বিয়ের কথা!

শহর থেকে লোকজনের এমন আসা-যাওয়া পর পর কয়েক দিন চলল।

একদিন বিকেলে মাঠে খেলছি। হঠাৎ দেখি ব্রিজের ওপর দিয়ে লাইন ধরে বড় বড় ট্রাক, জিপ—এসব আসছে। নয়ন বলল—পাঞ্জাবিরা আসছে রে, তাড়াতাড়ি বাড়ি চল।

বাড়ি গিয়ে মাকে বললাম রাস্তায় দেখে আসা বড় গাড়িগুলোর কথা। মা আর আপা তো ভয়ে অস্থির! সেদিন রাতেই আমরা সবাই গাটরি-বোঁচকা বেঁধে আমাদের গ্রাম ছেড়ে হাঁটতে হাঁটতে আরো দূরের গ্রামের ভেতরে চলে গেলাম আমাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে। গিয়ে দেখি আমাদের মতো পালিয়ে আসা আরো অনেক মানুষ ওই বাড়িতে ভিড় জমিয়েছে। রাতে সবাই মিলে গোল হয়ে বসে রেডিও শোনে। নতুন একটা স্টেশন হয়েছে, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র। সেটা বাবা ঠিকমতো ধরতে পারছিলেন না। আমি নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঠিক পেয়ে গেলাম ওটা। আমার খুব অহংকার হলো রেডিওটা ঠিকমতো ধরতে পারলাম বলে।

একটু পরই রেডিওতে চরমপত্র শুরু হয়ে গেল। একজন লোক খুব মজা করে ঢাকাইয়া ভাষায় মিলিটারিদের নাস্তানাবুদ হওয়ার গল্প বলতে শুরু করল। আমরা সবাই সেসব শুনে হেসে কুটি কুটি হচ্ছিলাম। খুব মজা লাগছিল আমাদের। ভালো ভালো গানও হচ্ছিল রেডিওতে। সেসব গান এমন যে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। আমার তো গান শুনে ইচ্ছা করত দৌড়ে যুদ্ধে চলে যাই।

এর কয়েক দিন পর বাবা বললেন—এখন তো পরিস্থিতি অনেক শান্ত হয়ে এসেছে। চলো, এবার নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাই।

তো আমাদের বাড়ি ফিরে আসতে পেরে আমার খুব ভালো লাগছিল। ফিরে এসে নয়নের সঙ্গেও দেখা হলো। আমাদের স্কুল বন্ধ, সারা দিন খেলাধুলা করি। মাঝেমধ্যে ওই সুড়ঙ্গটার কাছেও যাই। রাতের বেলা বড়দের কথাবার্তা আর রেডিও শুনে বোঝার চেষ্টা করি চারপাশে কী হচ্ছে।

যাদের বয়স বেশি, সেই কাকাদের কেউ কেউ বলেন—আরে, পাকিস্তানি আর্মির সঙ্গে খালি হাতে যুদ্ধ করে আমাদের ছেলেরা কি আর পারবে?

যে কাকাদের বয়স কম, তাঁরা বলেন—পারবে না মানে! আমাদের মুক্তিবাহিনী এমন চোরাগোপ্তা হামলা করছে যে ওরা পালানোর পথ খুঁজে পাচ্ছে না।

কম বয়সী কাকাদের কথা আমার বেশি পছন্দ। কয়েক দিন ধরে আমি আর নয়ন মিলে মুক্তিবাহিনী মুক্তিবাহিনী খেলা খেলছি। নয়ন পাঞ্জাবি হতে চায় না, আমিও চাই না। তাই দুজনেই মুক্তিযোদ্ধা। কাঠ দিয়ে দুটি বন্দুক বানিয়েছি দুজন। সেই বন্দুক নিয়ে মিছামিছি পাকিস্তানিদের গুলি করি। একদিন ও রকম খেলছি, হঠাৎ দেখি লুঙ্গি পরা দুটি অচেনা লোক এদিক-ওদিক তাকিয়ে হেঁটে আসছে। আমাদের দেখে ওরা ডাকল, বলল—আচ্ছা, ওই ব্রিজের কাছে যাওয়ার অন্য কোনো পথ আছে, যেদিক দিয়ে গেলে মিলিটারিরা দেখবে না...?

আমি আর নয়ন চোখ চাওয়াচাওয়ি করি। আমরা জানি দিনরাত  মিলিটারিরা ওই ব্রিজ পাহারা দেয়। আশপাশে কাউকে ঘেঁষতে দেয় না। ওই ব্রিজের ওপর দিয়ে ওদের বড় গাড়িগুলো যায়। এই লোকগুলো তাহলে কেন মিলিটারিদের চোখ এড়িয়ে ব্রিজের কাছে যেতে চাইছে? নয়ন উল্টো জিজ্ঞেস করে—আচ্ছা, আপনারা কি মুক্তি?

লোক দুটি এবার হেসে ফেলে। বলে—হ্যাঁ, আমাদের কথা কাউকে বলো না কিন্তু...

আমরা দুজনই মাথা নাড়ি—বলব না। নয়ন টুপ করে নিচু হয়ে ওদের পা ধরে সালাম করে ফেলে। তারপর আমাদের গোপন সুড়ঙ্গের কথা খুলে বলে ওদের। মুক্তিযোদ্ধা দুজন আমাদের সঙ্গে যায়, সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢোকে, বের হয়। চারপাশটা ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে।

নয়ন ফিসফিস করে বলে—এটাকে বলে রেকি করা, বুঝলি? তারপর শুরু হবে অপারেশন।

এর মধ্যে আমরা মুক্তিযোদ্ধা দুজনের নাম জেনেছি। একজনের নাম আইনাল, আরেকজন শামসুদ্দিন। ওদের কথাবার্তা থেকে আমরা বুঝলাম, ব্রিজটা ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার প্ল্যান করছে ওরা।

—এই ব্রিজ দিয়েই ওদের সব গাড়ি আর রসদ যায় উত্তরের জেলাগুলোতে, তাই আমাদের কমান্ডার বলেছেন, যেভাবেই হোক ব্রিজটা ভেঙে দিতে হবে। তোমাদের সুড়ঙ্গটা আমাদের কাজে লাগবে, এদিক দিয়েই লুকিয়ে ব্রিজের একেবারে কাছে চলে যেতে পারব আমরা। মুক্তিযোদ্ধা আইনাল বলে।

—আচ্ছা, কবে এটা করবেন?

নয়ন জিজ্ঞেস করে।

মুক্তিযোদ্ধা শামসুদ্দিন স্পষ্ট করে দিন, তারিখ, সময় কিছুই জানায় না। শুধু বলে—করব, খুব শিগগিরই।

নয়ন আকুল হয়ে বলে—আমি আপনাদের সঙ্গে অপারেশনে থাকতে চাই, আমাকে নেবেন?

মুক্তিযোদ্ধারা মৃদু হাসে। বলে—তুমি এখনো অনেক ছোট ভাই, আরেকটু বড় হয়ে নাও।

—ছোট না, আমার বয়স বারো। আমি অনেক কিছু পারি।

নয়ন বলে।

মুক্তিযোদ্ধারা ওর পিঠ চাপড়ে দিয়ে চলে যায়।

নয়ন কিন্তু হাল ছাড়ে না। আমাকে বলে—দেখিস, আমি একদিন মুক্তিযুদ্ধ করেই ছাড়ব।

—সে তো আমরা প্রতিদিনই করছি।

আমি কাঠের বন্দুক নাড়িয়ে বলি।

—আরে এ রকম খেলা-খেলা না, আমি সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছি।

কিন্তু কিভাবে সেটা হবে জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল নয়ন। মনে মনে কী ফন্দি করছে কে জানে? তা না বলতে চাইলে কী আর করা, আমিও আর জানার জন্য চাপাচাপি না করে তাড়াতড়ি বাড়ি ফিরে যাই।

তখন সন্ধ্যা হয় হয় অবস্থা। বাড়ি ফিরে দেখি, বাবার চেহারা থমথম করছে। উনি বললেন—আজ রাতেই আবার আমাদের দূরের গ্রামে চলে যেতে হবে। পরিস্থিতি ভালো না। এলাকায় মুক্তিবাহিনী চলে এসেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই বড় একটা যুদ্ধ লাগবে।

বাবার অনুমানটা যে ঠিক, তা বুঝতে পেরেও আমি কিছু বললাম না। আমি তো জানি মুক্তিযোদ্ধারা কিছুদিনের মধ্যেই অপারেশন করবে। সেদিন রাতেই বোঁচকাবুঁচকি বেঁধে আমরা আবার চলে গেলাম আরো দূরের গ্রামের দিকে, আমাদের দূরসম্পর্কের কোনো এক আত্মীয়ের বাড়িতে। ওখানেই একদিন বড়দের বলাবলি করতে শুনলাম, আমাদের গ্রামের নদীর ওপরের ব্রিজটা নাকি উড়িয়ে দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধারা। আর এতে দশ-বারোজন পাকিস্তানি মিলিটারি আর দুজন মুক্তিযোদ্ধা মারা গেছে। আমার চোখে তখন মুক্তিযোদ্ধা আইনাল আর শামসুদ্দিনের চেহারা ভেসে উঠল। হায় হায়! ওদের আবার কিছু হয়নি তো! খুব অস্থির লাগে আমার। কার কাছ থেকে কিভাবে যে খবর পাই? বড়দের কাছ থেকে শুনতে পাই, ব্রিজটা ভেঙে যাওয়ায় মিলিটারিদের নাকি খুব অসুবিধা হয়েছে। এদিকে সারা দেশে এখন মুক্তিযোদ্ধারা ছড়িয়ে পড়েছে। পাকিস্তানিরা যেখানে যাচ্ছে, সেখানেই মার খাচ্ছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আর বেশিদিন বাকি নেই।

একদিন বাবা বললেন—এখন আমরা বাড়ি ফিরে যেতে পারি। পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়ে ফেলেছে।

আমাদের গ্রামে এসে দেখি সবাই খুশি। শুধু আমাদের মায়ের মনটা খারাপ হয়ে আছে ছোট মামার জন্য। আমরা তত দিনে জেনে গেছি, ছোট মামা আর ফিরবে না। মিলিটারিদের গুলিতে মারা গেছে।

আমি চারপাশে নয়নকে খুঁজি। যত দূর জানি, যুদ্ধের সময় ওরা এই এলাকায়ই ছিল। তাই একদিন খুঁজতে খুঁজতে ওদের বাড়ি যাই। কিন্তু বাড়ি কোথায়? গিয়ে দেখি একটা পোড়া ভিটা পড়ে আছে। ওদের পাড়ার একজন জানাল, মিলিটারিরা এই বাড়িটা পুড়িয়ে দিয়েছে।

কিন্তু নয়ন কোথায়? ও কি তাহলে...? আমি আর ভাবতে পারি না। কান্নায় চোখ ভরে ওঠে।

আমি হাঁটু ভেঙে ওই পোড়া ভিটাতেই বসে পড়ি। কাঁদতে কাঁদতে ভাবি, নয়ন তো মুক্তিযোদ্ধা হতে চেয়েছিল। এভাবে তো আগুনে পুড়ে মরতে চায়নি ও।

হঠাৎ টের পাই, কেউ একজন আমার কাঁধে হাত রেখেছে। চমকে পেছনে তাকিয়ে দেখি, মুক্তিযোদ্ধা আইনাল। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে আরো কাঁদতে থাকি। আইনাল বলে—কেঁদো না ভাই, মন খারাপ কোরো না। তোমার বন্ধু মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে। ও আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে।

আমি মুক্তিযোদ্ধা আইনালের কথা বুঝতে পারি না। ওর দিকে তাকিয়ে থাকি।

আইনাল আবার বলে—হ্যাঁ, আমরা যখন ব্রিজে ডিনামাইট লাগাতে যাই, তখন নয়ন আমাদের সঙ্গে ছিল। ও দিনরাত সুড়ঙ্গের মুখ পাহারা দিত, কখন আমরা অপারেশনে যাই সেটা দেখতে। যেদিন আমরা যাচ্ছিলাম, সেদিন অনেক মানা করেছি। কিন্তু ও কিছুতেই শুনল না। ডিনামাইট লাগিয়ে যখন ফিরছিলাম, তখনই পাকিস্তানি সেনারা গোলাগুলি শুরু করে। আমরাও পাল্টাগুলি চালাই। একসময় ডিনামাইট বার্স্ট হয়, এর মধ্যে নয়ন আর শামসুদ্দিন মারা পড়ে। পরে নদীর ধারেই ওদের কবর দিই আমরা। আর ডিনামাইটের বিস্ফোরণে বিক্রম রাজার সুড়ঙ্গের মুখটাও বন্ধ হয়ে যায়।

 

আমাদের গ্রামের সবাই এখন নয়ন আর শামসুদ্দিনের নাম জানে। স্বাধীনতা আর বিজয় দিবসে তাদের কবরে ফুল দেয়। নদীর পারে এখনো বাঁধাই করা আছে একটা বড় কবর আর আরেকটা ছোট কবর।


মন্তব্য